অদিতির জানালায় রাত্রি নেমেছিল

অদিতির জানালায় রাত্রি নেমেছিল

 

_________________নওশীন শাখী

 

তখন আমার দম ফেলার ফুসরত নেই। দুইহাতে ঘর সামলাই, অফিস সামলাই, দশ বছরের ছোট্ট মেয়েটাকে সামলাই… একা থাকার সেই ছয়টা বছর! ছয় বছরের বারোটা ঈদ, ছয়টা সামার ভ্যাকেশন, শব-ই-বরাত, শব-ই-কদর…. মা-মেয়ে মিলে ঢাকা শহরের দু’রুমের ছোট্ট ফ্ল্যাটটাতে কাটিয়ে দিলাম। এক সকালে বুকে করে এইটুকুন মেয়েটাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম, সেই মেয়েটা দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেল! স্কুল থেকে ফিরে টিএন্ডটি দিয়ে ফোন করে জানিয়ে দেয়,
– আমাকে ভ্যানমামা বাসায় দিয়ে গেল আম্মুনি। আমি এখন ফ্রেশ হয়ে, খেয়ে নিবো। তুমিও খেয়ে নিও, আচ্ছা? বিকেল হতেই চলে এসো কিন্তু! অফিসের কাজ হলে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াতে ইচ্ছে করেনা আমার! বাসায় যে আমার বুকের পাঁজরের একটা হাড় রয়ে গেছে। কখন ওটাকে বুকে নেব, তবেই শান্তি! আমার এইটুকু মেয়েটা বিছানা গোছায়, টেবিল গোছায়, স্কুলের ইউনিফর্ম পড়ে মাথা আঁচড়ে রেডি হয়। তারপর আমাকে বলে ” আম্মুনি, তোমার কেতকী রেডি! এবার একটা ফু দিয়ে দাও। নীচে ভ্যানমামা ওয়েট করছে!” আমি মাথায় ফু না দিলে ওর নাকি সব পড়া গুলিয়ে যায়! কেতকীর দুই বছর বয়সে যখন ওর বাবা রোড এ্যাকসিডেন্টে দু’পা হারালো, তখন আমি বাচ্চাদের স্কুলে পড়াই। ছোট অংকের বেতনে টেনেটুনে চলেই যাচ্ছিলো। আড়াই বছরের কেতকীকে দাদীর কাছে রেখে আমি স্কুলে যাই, ফিরি সেই সন্ধ্যার আগে। ফিরে কেতকীকে বুকে নিয়ে কৌশিকের ভারী বুকটায় মাথা রাখি। পঙ্গুত্ব ওকে একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছিলো। রাতে ঘুম ভেঙে গেলে যখন দেখতাম ও জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, তখন মনে হত যেন আকাশে আশ্রয় খুঁজছে ছেলেটা! আমি আস্তে করে কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করতাম
– ঘুম আসছেনা?
ও কিছুই বলতোনা। শুধু নিস্পলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো। আমি সে চোখের ভাষা বুঝতাম। তবু কিছু করতে পারতামনা। করার ছিলোনা!
কৌশিক আর আমি ভালোবেসে
বিয়ে করেছিলাম। মোবাইল ফোন, এসএমএসের যুগে চিঠিটে প্রেম করতাম আমরা। দেখা হলেই চিঠি আনতে হতো। কৌশিক মাঝেমাঝে চিঠি আনতে ভুলে যেত। তার বিনিময়ে কম কিল,ঘুষি, খামচি খেতোনা! তখন কৌশিক ফাইনাল ইয়ারে। পড়াশুনার প্রসার, পাশাপাশি ছোট্ট একটা চাকরি খোঁজা, আমাকে সময় দেয়া সব মিলেমিশে জগাখিচুড়ি হয়ে যাচ্ছিলো। বাবা হুট করে বিয়ে ঠিক করে ফেললেন আমার। বিয়ে করলে কৌশিককেই করবো জানিয়ে দেবার পর বাবা যখন বললেন, ” আমার পছন্দে বিয়ে করো, নাহলে ঐ মুখ আমাকে আর দেখিওনা” তখন ভীষণ রাগে এক কাপড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। আমার ভালোমানুষ শ্বশুড় তখন আমাদের বিয়ে দিয়ে আমাকে ঘরে তুললেন। তারপর কত ঝড় ঝাপ্টা পেরিয়ে কৌশিকের খুব ভালো একটা চাকরি হলো, আমি পড়াশুনা কমপ্লিট করলাম… সেদিন আমাদের থার্ড এ্যানিভার্সারি ছিল। কৌশিক আমার জন্য কি এনেছিলো জানেন? একজোড়া লাল টুকটুকে জুতো। এইটুকু এইটুকু দুটো জুতো। আমার চারমাস চলছে, আসছে আমাদের ভালোবাসার সারথি। গিফট দেখে আমি লজ্জায় ওর বুকে মুখ লুকিয়েছিলাম। তারপর কেতকী এলো। তখন আমার ভরা সংসার, শ্বশুড়, শ্বাশুড়ি, স্বামী, সন্তান. ..দু’বছরের মাথায় সব অগোছালো হয়ে গেল। কৌশিকের এ্যাকসিডেন্ট, আমার চাকরি-ঘর-বাচ্চা সামলানো… তাও বোধহয় সৃষ্টিকর্তা শাস্তি দেয়া শেষ হয়নি। বাথরুমে পা পিছলে মাথা দিয়ে প্রচন্ড রক্তক্ষরণে কৌশিক আমাকে ছেড়ে একেবারেই চলে গেল! ও শেষ পর্যন্ত আকাশে আশ্রয় করেই নিলো!
প্রতিদিন রাতে আমি কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে বসতাম। কত কথা বলতাম গাছটার সাথে। মাঝে হৃদপিন্ড থেকে অন্ননালীতে উঠে আসা কষ্টেরর দলাটা ঢোক গিলে নীচে নামিয়ে দিতে না পরলে গাছে মাথা ঠুকে কাঁদতাম। আমার যে কেঁদে বুকের কাছের শার্ট ভিজিয়ে দেবার মানুষটা আর নেই! কোথায় কাঁদবো? পুরোনো চিঠি, সাদা গোলাপের শুকিয়ে যাওয়া পাপড়ি, জোছনারাতে কৃষ্ণচুড়ার নীচে কৌশিকের আবৃত্তি করে শোনানো কবিতা… সব স্মৃতি আঁকড়ে আঁতিপাতি করে বাঁচার চেষ্টা করছি, তখন একদিন যখন ওর মা বলল-
– আমার ছেলেটারে তুই খাইছিস! তোর জন্য বাপটা আমার চইলা গেল! থাকতে পারিনি তখন! বিশ্বাস করুন পাঠক, পারিনি! কেতকীকে নিয়ে চলে এসেছিলাম। তারপর একার জীবন…একাই বেশ চলে যাচ্ছিলো। সকালে মা-মেয়ে বেড়িয়ে যাই। বিকেলে এক হই, গল্প করি, হাসি, রাতে মেয়েটাকে বুকে নিয়ে ঘুমাই। কেতকী ঘুমিয়ে গেলে জানলায় এসে দাঁড়াই, আকাশে হাজার তারার ভেতর কৌশিককে খুঁজি। জোছনারাতে একা একা কবিতা পড়ি, তারপর ঘুমিয়ে যাই!
হুট করেই সরোজ আমার জীবনে জায়গা করে নিতে চাইলো। সরোজ নতুন জয়েন করার পর আমার উপর ভার পড়লো সবকিছু বুঝিয়ে দেবার। বিভিন্ন কাজে একসাথে অফিসের বাইরেও যেতে হতো। ক্লায়েন্টদের খুব সুন্দর করে হাতে রাখার কৌশল খুব ভালো জানতো সরোজ! একদিন সকালবেলা অফিসে পৌঁছানোর পরপরই আকাশটা ভ্যা করে কেঁদে দিলো! আমি আনমনা হয়ে গেলাম! বিয়ের আগে বৃষ্টি হলেই আমি কৌশিককে ফোন করে কবিতা শুনতে চাইতাম!
এপাশ ওপাশ রাত্রি ফুরায় মন খারাপের
ভোরে..
পশলা মেঘে বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে ঝরে..
আয় বৃষ্টি টাপুর টুপুর, আয় বৃষ্টি ঝেপে.. মন খারাপের বৃষ্টি, তোকে দুঃখ দেব মেপে..
মেঘ পিয়নের কোথায় বাড়ী, কোথায় সে কোন দুরে..
আষাঢ় হলেই কোথায় থেকে আসে আকাশ
জুড়ে….
আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম! অফিসের একগাদা ফাইল বিরস মুখে তাকিয়ে আছে! বস এখনো আসেনি। বৃষ্টিতে আটকে গেছে বোধহয়! গ্লাস দিয়ে দেখা যাচ্ছে কলিগরা জটলা পাকিয়র গল্প করছে। সুইচটা কেন যে ঠিক করেনা কে জানে! এক কাপ চায়ের কথা বলতে হলে দরজা পর্যন্ত হেঁটে আসতে হয়, তারপর মুখ বের করে চেঁচিয়ে বলতে হয় একটা চা! অফিসের কার সাথে তেমন হৃদ্যতা নেই আমার। কাজেরর ফাঁকে ফাঁকে আড্ডা, খিলখিল করে হাসা, রসিকতা, টিটকারি, ফোঁড়ন কাটা, আবার মিলে যাওয়া, এসব আসেনা আর! আমার জীবনে স্বয়ং আমি আর কেতকী ছাড়া আর কেউ নেই, কিচ্ছু নেই! দরজা খুলে মুখ বাড়িয়ে চ্যাঁচাতে যাবো, বুকের ভেতর টা ধ্বক করে উঠলো! এতক্ষণ গ্লাসে ঘেরা রুমে ছিলাম বলে শুনতে পাইনি,
মেঘ পিয়নের কোথায় বাড়ী, কোথায় সে কোন দুরে..
আষাঢ় হলেই কোথায় থেকে আসে আকাশ
জুড়ে..
মন খারাপের দিস্তে গুলি কখন বিলি করে
রাত জাগা কোন ভোরে, মেঘের দ্বি-
প্রহরে..
পাকদন্ডী পথের দ্বারে বাগান ঘেরা ঘরে..
এখন রোদ উঠেছে, মেঘ পিয়নের যাওয়ার সময় প্রায়..
যেসব চিঠি হয়নি বিলি পড়েছে ঝরণায়..
হুবহু কৌশিকের গলা!
“কে? কে বলছে কবিতাটা? কে, কে? ” কবিতা থেমে গেল! সরোজ উঠে দাঁড়ালো! জটলা থেকে বেরিয়ে এসে বলল,
– আমি বলছিলাম অদিতি। বৃষ্টি হচ্ছিলো, বস আসেনাই, তা…
– বস আসেনি বলে কাজ কর্ম সব বৃষ্টিতে ভেসে গেছে? বসে বসে কবিতাযাপন করছিলেন! আপনি কি ষোল বছর বয়সী কিশোর হয়ে গেছেন মিস্টার সরোজ?? চিৎকার করে মাথা ধরিয়ে ফেলেছি। চেয়ারে ধপ করে শরীর ছেড়ে দিলাম। কোথায় তুমি কৌশিক? আই নিড ইউ!! সেদিনের পর সরোজকে সরি বলা হয়নি। যা করেছি,বেশ করেছি একটা ভাব নিয়ে নিজের কাজ করে গেছি। দূরে সর যাক, সবাই দূরে থাকুক আমার থেকে! কাউকে ভালো লাগেনা আমার! জন্মদিনে সক্কালবেলা কেতকী কপালে চুমু দিয়ে বললো আজ আম্মুনির জন্মদিন! হ্যাপী বার্থডেএএ আম্মুনিইই… কেতকী,
আমার এইটুকু মেয়েটা আমার বার্থডে মনে রেখে দিয়েছে, উইশ করেছে! চোখে পানি এসে গেল আমার।
– ওরে আমার কলিজাটা, আয় মা, আমাকে আরেকটু আদর করে দে, আজ থেকে আমি তোর মেয়ে, ঠিকাছে? কেতকী খিলখিল করে হাসলো। মেয়েটার ঠোঁটদুটো একদম ওর বাবার মতন হয়েছে! হাসলে হঠাৎ হঠাৎ ওর বাবার মুখটা এসে পড়ে! আজ অফিসে যাবার মুড একদমই ছিলনা। মেয়েটাকে সারাদিন বুকের ভেতর ঢুকিয়ে বসে থাকতাম। কেতকীর সামনে ফাইনাল পরীক্ষা, এখন মিস করা উচিৎ হবেনা ভেবে নিজে স্কুলে ছেড়ে এলাম। আমার তেইশতম জন্মদিনে কৌশিক তেইশটা সাদা গোলাপ এনেছিলো আমার জন্য। সাথে প্রিয় কবিতার বই। এত্তগুলো গোলাপ পেয়ে আমি খুশিতে টগবগ করছিলাম। সাদা গোলাপ আর কৃষ্ণচূড়ার প্রতি খুব বেশি দূর্বলতা ছিল আমার। তাই দেখা হলেই গোলাপ আনতো কৌশিক। যেদিন খোঁপা করা থাকতো সেদিন খোঁপায় গেঁথেও দিতো। বার্থডে তে ইচ্ছে করেই হাতখোঁপা করে গিয়েছিলাম। জানততাম সরোজ সাদা গোলাপ আনবে। কিন্তু এতগুলো! ভাবিনি! খুশিতে বারবার বলছিলাম – তুমি না, খুব ভালো!
স্টার্ট বন্ধ করায় ভাবনায় ছেদ পড়লো। সিএনজি অফিসের সামনের মোড়টায় জ্যামে আটকে গেছে। ভাগ্যিস জ্যাম ছিল! নয়তো অফিস পার করে চলে যেত, বলতেই পাতামনা!
ভাড়া মিটিয়ে বাকিটুকু হেঁটেই এলাম।
রুমে ঢুকে বড়সড় একটা ঝাঁকুনি খেলাম! টেবিলে চারটে সাদা গোলাপ, ছোট্ট একটা গিফটবক্স আর একটা কার্ড। শুভ জন্মদিন অদিতি।
ভালো লাগা পিছু না ছাড়ুক, ভালো থাকবেন?
again, HAPPY BIRTHDAY..
রুম থেকে বেরিয়ে চিৎকার করা থেকে খুব কষ্টে নিজেকে কন্ট্রোল করলাম আমি। ভারি গলায় জিজ্ঞেস করলাম-
কে ফুল রেখেছে টেবিলে? পাঠকদের ধারনা সত্যি। সরোজই ফুল রেখেছিলো। নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে কিছু বলার আগেই বললাম রুমে আসুন!
সরোজ আমার সামনের চেয়ারটায় বসে আছে, মুখেচোখে সামান্য পরিবর্তন নেই। দেখে মনে হচ্ছে আমি গান শোনাবো বলে তাকে ডেকে চেয়ারে বসিয়ে রেখেছি আর ও গান শোনার মুডে চলে আসার চেষ্টা করছে! আমার মনে হল আমার গায়ে কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে!
– টেবিলে ফুল কেন রেখেছেন আপনি? – সাথে উইশটাও তো ছিল। ওটা দেখে বোঝা উচিৎ ছিল যে উইশ করার জন্যই ফু…
– আপনি কি এখন আমাকে শেখাবেন, কি দেখে কি বোঝা উচিৎ?
– আপনি তো আমাকে কথাই ব…
– আপনার কথা বলার দরকার নেইতো!! আপনি কি কাজ করছিলেন করুন গিয়ে! আর নেক্সট টাইম এসব ফালতু কাজ করবেননা। গোলাপ টোলাপ পছন্দ না আমার! বুঝেছেন? নাউ লিভ!! সরোজ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। রাগ ঠিকমতন ঝাড়তে না পেরে মাথা দপদপ করতে লাগলো আমার! রেগেটেগে ভীষণ বড় ভুল করে ফেললাম। একটা প্রোজেক্টের ফাইল রেডি করতে গিয়ে গড়মিল করে ফেললাম! সেই প্রোজেক্ট টার কাজ সরোজ আর আমার করার কথা ছিল। ওর কাজটুকু ও করেছে। বাকিটা করার ভার আমার। আসল জায়গাটায়ই প্যাঁচ লাগিয়ে ফেলেছি। আর সেটা ধরতে পেরেছেন বস। আমি রিচেক করার আগেই ফাইল পাঠিয়ে দিয়েছিলাম! অনেক ঝামেলা হবার পর আমার চাকরি যায় যায় অবস্থা! তখন সরোজ স্যারকে বলল,
– ভুলটা আসলে আমি করেছি স্যার! নিজের ঘাড়ে দোষ নিয়ে মহৎ সাজা হচ্ছে!!
– মোটেই না! আমি চ্যাঁচালাম! সরোজ বলল, – আমি কি আপনার সাথে একা কথা বলতে পারি স্যার? আমি এখন স্যারের রুমের বাইরে বসে আছি। অকারণেই রাগে ফোঁসফোঁস করছি আর পানি সমেত ঠান্ডা চায়ে চুমুক দিচ্ছি! ছাড়বোনা!এই লোকটাকে আমি ছাড়বোনা! একেতো রাগিয়ে আমার ভুল করিয়ে দিলো, এখন আমাকে রুম থেকে বের করে কি কথা বলছে কে জানে! অসহ্য! অসহ্য!! এবং অসহ্য!
কিছু সময় পর ভেতরে আমার ডাক পড়লো। ঘটনা যা ঘটেছে তা হলো সরোজ পুরো দোষটা নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিয়েছে। আর আমার বদলে চাকরিটা যাচ্ছে ওর! আমি কারো করুণা চাইনি পাঠক বিশ্বাস করুন! সবার সামনে সত্যিটা ও বলতে পারিনি! কেতকী? কি
হবে আমার কেতকীর? কোথায় যাবো ওকে নিয়ে আমি? খুব বেশি স্বার্থপরের মত কাজ করেছিলাম সেদিন। সরোজকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন করলেন এরকম?
– কেতকীর জন্য!
– কী??
সরোজ সেদিন কিচছু না বলে বেরিয়ে গিয়েছিলো। কেতকীর জন্য মানে? কেতকীকে কি করে চেনে সরোজ? প্রশ্নে প্রশ্নে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। ভেতর ভেতর খারাপও লাগছিলো ভীষণ! অন্যায় করছি, নিজের দোষ অন্যকাউকে নিজের ঘাড়ে নিতে দেখে আটকাইনি! ভুল হয়ে গেছে!
আমি পারছিলামনা। মনে হচ্ছিলো সরোজের দয়ায় বেঁচে আছি, খাচ্ছি দাচ্ছি! সাতদিন পর আমিও চাকরিটা ছেড়ে দেই। টিউশনি শুরু করি। প্রথমে দুটো তারপর তিন,চার করে ছয়টা টিউশনি করে পার করে দিচ্ছিলাম। খুব বেশি ভালো চলছিলোনা। আরেকটা ভালো চাকরির খোঁজ করতাম সবমসময়। ইন্টারভিউ ও দিয়েছিলাম বেশ কয়েকটা। কেতকীর বয়স চৌদ্দ এখন। খরচ বাড়ছে। সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি! বেশ কয়েক জায়গায় সিভি দিয়েও ডাক পাচ্ছি না! ভীষণ হতাশ লাগছিলো! ছোটবেলায় মা বলতো, “মানুষ ততক্ষণ হারে না যতক্ষণ না হার টা বরণ করে না নেয়!” প্রকৃতি হেরে যাবার তাড়া দিচ্ছিলো খুব! পড়িমরি করে তবুও ছুটছিলাম! কেতকীর জন্য আমি পারবো। পারতে হবে! আমার মুখচোখ দেখে কেতকী জিজ্ঞেস করতো,
– কি হয়েছে তোমার, আম্মুনি?
– কিছুনা রে বেটি। তোর আম্মুনির কিচ্ছু হয়নি তো!
কেতকী আমার কথা কতটুকু বিশ্বাস করতো আমি জানিনা। তবে দ্বিতীয়বার আর জিজ্ঞেস করতোনা। পরদিন সকালে একটা কোম্পানি থেকে ডাক এলো। ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে বড়সড় ধাক্কা খেলাম! সরোজ! আমি কি ভুল দেখছি?
– আসুন অদিতি। বসুন। সিভি দেখেই আপনাকে সিলেক্ট করা হয়েছিলো। ইন্টারভিউটা..
– আবার? আপনি আবার দয়া দেখাচ্ছেন আমাকে?
– আমরা পরে বাইরে কথা বলি অদিতি? কফিশপ? দশমিনিট? অনলি দশমিনিট।
আশেপাশে আরো তিনজন দেখে আমি আর কথা বাড়াইনি।
আমরা কফিশপে বসে আছি। দুই মিনিট ধরে বসে থাকার পরেও সরোজ যখন কথা বলছিলো না, তখন আমিই শুরু করলাম।
– সেদিনের প্রশ্নটা আজও কাঁটার মত বিধে আছে সরোজ। আপনি কি বলবেন, সেদিন কেন আমায় বাঁচিয়ে দিলেন? আজ কেন আবার বাঁচাতে চাইছেন? – আমি এখন সবটা বলবো, আপনি কি ধৈর্য নিয়ে একটু শুনবেন? প্লিজ? – বলুন।
– আমার ভাগনে কে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে আপনাকে দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম আপনিও আমার মতনই ভাগনী কে নিতে টিতে এসেছেন। আমার ভাগনের নাম সাকিব। কেতকীর ক্লাসমেট। ওকে কেতকীর কথা জিজ্ঞেস করতেই ও আমার ভাবনায় ছাই ফেলে দিল! আপনি কেতকীর মা। মিস্টাল কৌশিকের ব্যাপারেও জেনেছিলাম একটু একটু। আপনি বিবাহিত এবং মা শুনে ভালোলাগাটাকে চেপে রেখেছিলাম। কিন্তু যখন বিয়ের জন্য বাড়িতে চাপাচাপি করছিলো, আমি অন্যকাউকে বেছে নিতে পারিনি। বারবার আপনি যেন চোখের সামনে চলে আসছিলেন।
– আপনি আমাকে কিসব গল্প শোনাচ্ছেন! আমি দুটো সহজ প্রশ্ন করেছি সরোজ!
– লেট মি ফিনিশ!
– অবশ্যই না! আপনি সিনেমার কাহিণী শোনার বিন্দু মাত্র আগ্রহ নেই আমার! – প্লিজ অদিতি। প্লিজ?
দুটো মানুষের কন্ঠস্বরে এতটাও মিল থাকে? আমি রেগে গেলে কৌশিক নরম গলায় বলতো “প্লিজ অদিতি, প্লিজ” আমি সরোজের গলায় কৌশিকের স্বর শুনতে পাচ্ছি কেন? আমি আর কথা না বাড়িয়ে বসে শুনছিলাম। আমি সরোজের কথা শুনছিলাম না, কন্ঠস্বর শুনছিলাম।
– তারপর অনেক কষ্টে জানতে পারি আপনি কোথায় চাকরি করেন। বাবার হেল্প নিয়ে সেখানেই জয়েন করি, শুধু প্রতিদিন আপনাকে কাছে থেকে কিছু সময় দেখবো বলে, বিশ্বাস করুন! এসবকিছু বলার দুঃসাহস আমার ছিলনা! আমি বলিনি। বলতে চাইওনি, যদি আপনি আঘাত পান? কেতকীকে ঘিরে আপনার পৃথিবীতে আমি আসতে চাইনি। পাশে থাকতে চেয়েছি। শুধুই পাশে থাকতে চেয়েছি। হুট করর আপনি চাকরি হারানোর ভুল করে ফেললেন, আমি কেতকীর কথা ভেবে সব দোষ নিজের করে নিলাম।
কেতকীকে নিয়ে কোথায় যাবেন আপনি? আমার মাথার উপর আমার বাবা আছে, কেতকীর কেউ নেই।
আমার হঠাৎ বুকটা কেঁপে উঠলো। কেতকীকে নিয়ে ভাবার আমি ছাড়াও কেউ থাকতে পারে?
– সেইতো দয়াই হলো!
– না অদিতি! আমি ভালোবেসেই করেছিলাম। ও তো আপনারই অংশ। আপনাকে ভালোবাসলে ওকে বাদ দেই কি করে?
– আপনি কি জানেন, আপনি কি বলছেন? আমার এই প্রশ্নের ধারের কাছ দিয়েও গেলনা সরোজ!
– আমি সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বাবার কোম্পানির হালল ধরলাম। একমাস পর খোঁজ নিয়ে দেখি আপনি সেখানে নেই! কত খুঁজেছি আপনাকে! কেতকীও স্কুল বদলে ফেলেছে! পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম! কোথাও নেই আপনি। মনে হতো সবটা হারিয়ে ফেলেছি! কিচ্ছু নেই আমার!
সিভির ফাইলে আপনাকে পেয়ে আত্নহারা হয়ে গিয়েছিলাম, জানেন? আমি আপনাকে বাঁচানোর কেউনা। বেঁচে থাকার সঙ্গী হয়ে থাকার অনুমতি চাইছি অদিতি!
– স্টপ ইট্! কৌশিকের জায়গায় অন্যকেউ আসতে পারবেনা! কক্ষনো না!
– আমিতো কৌশিক হতে চাইনা অদিতি।
– থামুন। আর কিচ্ছু শুনতে চাইনা আমি। ভালো থাকবেন।
আমি সরোজকে মেনে নেইনি। কেতকী নিয়েছে। কেতকীর সঙ্গে সরোজের দেখা হয় সাকিবের জন্মদিনে। গল্পে গল্পে সরোজেরর সাথে ফ্রি হয়ে গেছিলো। তারপরের ঘটনাগুলো বোধহয় বেশি দ্রুত ঘটে গেল। সরোজ কেতকীর বন্ধু হয়ে গেল। মেয়ে আমার বড় হয়ে গেছে! সরোজের মনে খুব যত্ন করে রাখা আমার ছবিটাও ধরে ফেলেছে। আমাদের দু’জনকে এক করে দেবার জন্য উঠে পড়ে লেগেও গেছে! আমি কেতকীকে বারবার না বলতে পারিনি। সরোজকে কেতকীর বন্ধুবাবা হিসেবে একসেপ্ট করেছি। আমার সসরোজের বিয়ে হয়েছে সাত বছর হলো। কেতকী এখন থার্ড ইয়ার। এখনো জোছনারাতে জানলায় দাঁড়িয়ে তারা দেখি। পাশে সরোজ দাঁড়িয়ে থাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
– আমি খুঁজতে হেল্প করবো?
আমি কিছু বলিনা। সরোজে কাঁধে মাথা রেখে ভাবি, একটা মানুষের মনে এত বিশালতা কোথা থেকে এলো!
সরোজ কবিতা বলে, মনে হয় শুধু আমি, আর শুধু তুমি আর ঐ আকাশের পউষ-নীরবতা রাত্রির নির্জনযাত্রী তারকার কানে কানে কত কাল
কহিয়াছি আধো আধো কথা!…..

সমাপ্ত

 

“ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪- ঈদ সংখ্যা ২০১৫” এ  প্রকাশিত । পাঠকের অনুরোধে আবারো পুনঃপ্রকাশ করা হলো ।