আত্মসমর্পণ : সরকারের নিকট দস্যুর, দস্যুর নিকট সরকারের ?

জামিল আহম্মেদ মুকুল

আত্মসমর্পণ : সরকারের নিকট দস্যুর, দস্যুর নিকট সরকারের ?

● জামিল আহম্মেদ মুকুল

জামিল আহম্মেদ মুকুল● সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দর বনকে ঘিরে বেশ কয়েকটি ঘটনা সংঘঠিত হয়েছে। একের পর এক দস্যু বাহিনী সরকারের নিকট আত্মসমর্পণ করার ফলে সুন্দর বনকে ঘিরে যাদের জীবন-জীবিকা তাদের মধ্য এক ধরনের স্বস্তি ফিরে আসছে সরকার ও মিডিয়ার ( প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রোনিক্স) এমনই বক্তব্য। গত কয়েক বছর ধরে সুন্দর বন কে ঘিরে চলা ঘটনা বিশ্লেষণে ব্যক্তি বা সংগঠনের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বের দাবি রাখে।
একদিকে সুন্দর বন কে ঘিরে পুঁজিপতিদের অশুভ তৎপরতা অন্যদিকে দস্যুদের উৎপাত। দস্যু। কাদের কে দস্যু বলবো ?
প্রকৃত দস্যু কারা তা এ লেখায় সার্বিক ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আপাতত দৃশ্যমান দস্যুদেরকে নিয়ে আলোচনা করা যাক। বর্তমানে যারা দস্যুরুপে তৎপর এদেরকে কিভাবে চিহ্নিত করা যায় ? বনদস্যু না জলদস্যু ? এক কথায় বলা যায় এরা উভয়চর দস্যু। সুন্দর বনের মৌয়াল, কাঠুরে, গোলপাতা সংগ্রহকারীদেরকে এরা যেমন অপহরণ করে তেমনি রেণু পোনা, মৎস্যজীবিদের কে অপহরণ, লুটপাট দীর্ঘদিন ধরে ছিল নিত্তনৈমিত্তিক ব্যপার। কথার পিঠে প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক যে দস্যুরা দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদে নির্বিঘ্নে কিভাবে তাদের অপকর্ম গুলো চালাতে পারলো ? দস্যুতা বৃত্তি নিয়ে তো স্হানীয় এবং জাতীয় পত্র পত্রিকাতে শত শত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এতোদিন কেনই বা তারা নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালাতে পেরেছে আর এখন কি এমন কারণ ঘটেছে যে আত্মসমর্পণ করছে ? অতীতে কি এমন শর্ত বিদ্যমান ছিল যার কারনে দীর্ঘদিন বেপরোয়া দস্যুবৃত্তি ধরে রাখতে পেরেছিল মাস্টার সহ অন্যরা। আর এখন পরিবর্তিত কোন্ শর্ত হাজির হয়েছে যে, দস্যুরা আত্মসমর্পণ করছে ? আসলে শর্তটা শ্রেণী স্বার্থরক্ষাকারী বিভাজিত এবং স্বভাবতই আকন্ঠ দূর্নীতিতে ।

নিমজ্জিত প্রশাসনের মধ্যেই বিদ্যমান। সুন্দর বনে তৎপর প্রায় ডজন খানেক দস্যু বাহিনীর তৎপরতা স্হানীয় প্রশাসন অর্থাৎ স্হানীয় পুলিশ, বন বিভাগের নিন্ম থেকে সর্ব্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাগন, স্হানীয় রাজনীতিকদের সন্তুষ্টু করেই বনদস্যুরা তাদের অস্ত্রবাজী চালিয়ে এসেছে। বন বিভাগের কর্তা ব্যক্তিগন আমার এ বক্তব্যে নাখোশ হতে পারেন তবে, কথাটি দিবালোকের মতোই সত্য। না হলে সুন্দর বন, উপকূলীয় বনাঞ্চল, মধুপুর গারো পাহাড় বা পার্বত্য অঞ্চলের রেঞ্জে পোস্টিং -এর জন্য এতো তদবীর কেন ? বন খেকো ওসমান গণির কথা আমরা ভুলে যায়নি। ভুলে যায়নি তার বাড়ী থেকে উদ্ধার হওয়া দশ কোটি টাকার কথা। এ টাকার উৎস তো পোস্টিং বাণিজ্য আর বনাঞ্চল থেকে অবৈধ আয়ের কমিশন। এ রকম আরো কতো যে ওসমান গণি ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে তার খবর কে রাখে।
আমাদের দেশে একটা প্রবাদ চালু আছে ” মাছ খায় সব পাখি, দোষ হয় মাছরাঙ্গার “। তো নগদ নারায়ন চলে সব ডিপার্টমেন্টে আমরা শুধু দেখি পুলিশ বাহিনীর। কথা হচ্ছিল দস্যু বাহিনী গুলোর টিকে থাকার শর্ত কি ? শর্ত হচ্ছে এরা সকলকেই সন্তুষ্ট করে কিন্তু দস্যুতার তকমা লাগে শুধু তাদের গায়েই। বর্তমানে সুন্দর বন ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলে যে শর্ত হাজির হয়েছে তা হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কোস্ট গার্ড এবং র্যাপিড এ্যাকশান ব্যটেলিয়ান দস্যুদের বিরুদ্ধে যে অব্যাহত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে অভিযানে নগদ নারায়নে নির্মোহতা দস্যুদেরকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। এরা এখন জীবন বাঁচাতে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিয়েছে। তবে, আমাদের সরকার বাহাদুরের আত্মতুষ্টির সুযোগ এখানে খুব বেশি নেই। দূর্ধষ মাস্টার বাহিনীর একাংশ আত্মসমর্পণ করলেও অন্য অংশটি দস্যুতা বৃত্তি ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ৩১মে ২০১৬ মাস্টার বাহিনীর ১০ সদস্য মাস্টারের নেতৃত্বে আত্মসমর্পণ করে। অব্যহত অভিযানের মুখে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয় মজনু ও ইলিয়াস বাহিনী। ১৬ জুলাই ২০১৬স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে।

 

 

[fblike]

আমরা যদি ভেবে থাকি আড়াইটা দস্যু বাহিনীর আত্মসমর্পণে সুন্দর বনে শান্তির নহর বয়ে যাবে, তাহলে নির্বোধই থেকে যাবো; এখনো প্রায় ডজন খানেক দস্যু বাহিনী সেখানে সক্রিয়। সক্রিয় সরকার নিয়োজিত বন খেকো বন রক্ষীরা। বন অধিদফতরের বন রক্ষীদের কে কেন বন খেকো বলছি আগে ওসমান গণির প্রসঙ্গে তা আলোচনা করেছি। বর্তমানে সুন্দর বনে একটি চলমান ঘটনা বলি ঃ প্রতি বছর গ্রীস্মকালীন সময়ে বনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। কেন আগুন লাগে তার কারণ অনুসন্ধানে প্রতি বছর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও আদ্যাবধি তদন্ত রিপোর্ট কখনোই প্রকাশ হয় না। সুন্দর বন সংলগ্ন এলাকাবাসির নিকট শোনা ঃগাছকেটে পাচারকারী চক্রের সাথে সখ্যতা থাকে এক শ্রেণীর বন রক্ষীদের । দুয়ের যোগসাজসে প্রতি বছর আগুন লাগে বনে, নষ্ট হয় আলামত। সমস্ত দোষ চাপে মৌয়ালদের ঘাড়ে।

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিরোধীতা, বাদ-প্রতিবাদ, লং মার্চ, যুক্তি-তর্ক উপস্হাপন সত্ত্বেও ১২ জুলাই ২০১৬ তারিখে সরকার ” বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশীপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড ” চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তিটির ভদ্রতোচিত নাম দেওয়া হয়েছে ‘ মৈত্রি সুপার থারমাল পাওয়ার প্লান্ট ‘। নির্মাণ প্রতিষ্ঠান হেভি ইলেক্ট্রিক লিমিটেড ( ভারত) অর্থায়নে ভারতের এক্সিম ব্যাংক। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
আমরা খুব ভাল করেই জানি যে, যখন কোন দোশের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে মোটা অংকের ঋণ অন্য কোন দেশকে দেয় তখন এর পেছনে শর্ত থাকে হাজারটা ; এর মধ্য অন্যতম শর্ত হচ্ছে ঋণের অর্থ ক্রয়কৃত মেশিনারিজ বা অন্যান্ পন্যের ৬০% অথবা ৭০% দাতা দেশ থেকে ক্রয় করতে হবে। বিশেষজ্ঞ নিতে হবে ঋণ প্রদানকারি দেশ অথবা তাদের পছন্দ মত ফার্ম থেকে ইত্যাদি।
প্রশ্ন হচ্ছে সরকার নিরবে এই চুক্তিটি কেন করলো ? বিদ্যুৎ জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ প্রতি মন্ত্রী নছরুল হামিদ বলেছেন, যারা বিরোধীতা করেছেন তাদের সাথে আমরা বসেছি। কিন্তু তাঁরা ( বিরোধীতাকারীরা) এ প্রকল্পের বিপক্ষে তেমন কোন বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমাণ হাজির করতে পারেনি।
মামনীয় বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অন্ধ বা লেখাপড়া জানেন না এটা আমি বিশ্বাস করতে চাই না। তবে একথা বলতে চাই যে, কয়লা ভিক্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সম্পর্কে যেসকল ক্ষতি কারক দিকেরর ( পরিবেশগত) বিজ্ঞান ভিক্তিক ও তথ্যবহুল উপাত্ত জাতির সম্মুখে তুলে ধরা হয়েছে ; লাভ-ক্ষতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে তা আপনার গোচরিভূত থাকলে আপনি মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতেন তবুও চুক্তি নামায় স্বাক্ষর করতেন না। তর্কের খাতিরে ধরেই নিচ্ছি যে, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে যারা বিরোধীতা করছে তারা বিরোধীতার খাতিরেই বিরোধীতা করছে। কিন্তু মাননীয় প্রতিমন্ত্রী বাহাদুর আপনাদের মন্ত্রীসভার প্রভাবশালী কোন মন্ত্রী যখন এর ক্ষতির দিক নিয়ে কথা বলেন তখন কি তিনিও বিরোধীতার খাতিরেই তা বলেন না সত্য চেপে রাখতে পারেন না তাই বলেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি২০১৬ মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহীত বলেছিলেন, “রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে সুন্দর বনের ক্ষতি হবে ঠিকই।’একই প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন ‘ কিন্তু স্হান পরিবর্তন করা যাবে না ‘। ”
০৯ জুন২০১৬ জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য এ কে এম মইদুল ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে পরাবেশ ও বন মন্ত্রী জনাব আনোয়ার হোসেন মজ্ঞু বলেন, ” রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগেওয়াটের কয়লা ভিক্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে যথোপযুক্ত শর্তারোপ করে এ প্রকল্পের অনুকূলে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুমেদন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত মিটিগেশন মেজার্স যথাযথ ভাবে বাস্তবায়িত হলে সুন্দর বনের ক্ষতি হওয়ার আশংকা নেই। রামপালে কয়লা ভিক্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদফতর থেকে এখনো পর্যন্ত পরিবেশ ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। ”

[fblike]

পরিবেশ অধিদফতরের আইন অনুযায়ী কয়লা ভিক্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ” রেড ক্যাটাগরি”র আওতায় পড়ে এধরনের একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান স্হাপনের পূর্বে সমীক্ষার বহু ধাপ অতিক্রম করে চুড়ান্ত সার্টিফিকেট অর্জন করতে হয়। অথচ পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়াই রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে গেছে। কিসের লোভেএই আইনকে পাশ কাটানো ? ১২ জুলাই ২০১৬ চুক্তিটি সম্পদন হয়েছে, ১৩ জুলাই দেশের সবচেয়ে বেশি পঠিত দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন তন্ন তন্ন করে খুজেও চুক্তি সম্পর্কে একটি বর্ণও সংবাদ পাইনি! ১৪ জুলাই দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাতে যা এসেছে তা হচ্ছে ১৩ জুলাই বেলা ১১.০০ টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে ৫৩ টি পরিবেশবাদী সংগঠনের প্লাট ফর্ম ‘ সুন্দর বন রক্ষা জাতীয় কমিটি ‘ সংবাদ সম্মেলন করে ১২ জুলাই কালো দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দেন কমিটির আহবায়ক এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। বাসদ-সিপিবি, গনসংহতি আন্দোলন সহ বিশিষ্ট জনেরা চুক্তিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
আমরা দীর্ঘদিন থেকেই বলে আসছি বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিরোধী নই; দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিদ্যুতের প্রয়োজন রয়েছে। রয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহু বিকল্প স্হান কিন্তু সুন্দর বনের কোন বিকল্প নেই।

আজা যারা রাজধানীর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে এই অসম ও পরিবেশ বিধ্বংসী চুক্তিটি করলেন তারা না হলেও এর অভিঘাত মোকাবেলা করতে হবে আমরা যারা দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাস করি তাদেরকে। শত শত বছর ধরে ঘূর্ণি ঝড় আর সাইক্লোনের হাত থেকে এ অঞ্চলকে রক্ষায় প্রকৃতির ঢাল হিসেবে সুন্দর বন যেমন তার ভূমিকা পালন করে এসেছে তেমনি এ বনের সম্পদ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। বছরে হাজার হাজার পর্যটক আসে প্রকৃতির অপার বিস্ময় সুন্দর বন পরিভ্রমনে; আয় হয় বৈদেশিক মুদ্রা। দেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৫১% জুড়ে রয়েছে সুন্দর বন, আর বনজ সম্পদ থেকে আসা মোট আয়ের ৪১%, কাঠ ও জ্বালানী উৎসের ৪৫% আসে এ বন থেকে ( সূত্র বিশ্ব খাদ্য সংস্হা ১৯৯৫)। বেশ কিছু শিল্পের কাঁচা মালের উৎস এ বন। নিউজ প্রিন্ট,দেয়াশলাই, হার্ডবোর্ড, আসবাবপত্র তৈরীর কাঠ, নৌকার কাঠ প্রাপ্তির অন্যতম প্রধান উৎস সুন্দর বন।
এ বন থেকে নিয়মিত আহরিত হয় গোলপাতা, মধু মৌচাকের মোম, বিভিন্ন জাতের মাছ, কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ইত্যাদি। সুন্দর বনের ভূমি একই সাথে প্রয়োজনীয় আবাসস্হল, পুষ্টি উৎপাদক, পানি বিশুদ্ধকারক, পলি সঞ্চয়কারী, ঝড় প্রতিরোধক, উপকুল স্হিতিকারী শক্তি সম্পদের আধার এবং বিশ্বের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।
এ বনের নদী-খালে প্রায় ৩০০ প্রজাতির মাছ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। স্হানীয় জনসাধারণের অর্থাৎ দেশের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণিজ প্রোটিনের ৮০% চাহিদা এক সময় এ বনের নদী-খাল থেকে আহরিত মাছ থেকে মিটতো। অপরিকল্পিত মৎস আহরণের কারণে তা এখন কমে গেছে। ২০০৪ সালের জরিপ অনুযায়ী বিশ্ব খ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছিল ৫০০ টি, ২০১১ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩০০ টি তে। ৩০০ প্রজাতির মাছ ( প্রকৃত সঠিক সংখ্যা নিয়ে কোন গবেষণা হয়নি) ২৭০ প্রজাতির পাখি, ৪২প্রজাতির স্তন্যপায়ী ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ০৮ প্রজাতির উভচর প্রাণীর আবাসস্হল এ বন।

[fblike]

এ বনের নদী গুলো নোনা ও মিঠা পানির মিলন স্হল। গঙ্গা অববাহিকা থেকে নেমে আসা মিঠা পানি বঙ্গপোসাগরের নোনা পানিকে ঠেকিয়ে দেয়। মোট সুন্দর বনের ৬২% অর্থাৎ ৬০১৭ বর্গ কিলোমিটার বাংলাদেশের মালিকানায়। এতো বড় একটা সম্পদ যেখানে এখনো পর্যন্ত বিরল প্রজাতির কিছু কুমির, শশুক সহ বেশ কয়েকটি প্রাণী তাদের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে। এই সমগ্র সম্পদ আজ হুমকির মুখে। শত শত বছর ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস, সরকারের রাজস্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্র সুন্দর বন আজ মুনাফা লোভী গুটি কয়েক উন্মাদের লালসার শিকার। মাস্টার, মজনু বা ইলিয়াস বাহিনীর দস্যুতা বৃত্তির অস্ত্রের চেয়ে শত গুন ভয়ংকর অস্ত্রে এরা সজ্জিত। ব্রিফকেস ভর্তি ডলার, কূটকৌশল আর চুক্তি নামক অস্ত্রে সজ্জিত কোট-প্যান্ট পরা উচ্চ শিক্ষিত আধুনিক এই দস্যুরা বেশি ভয়ঙ্কর। সর্ব বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল আজ আক্রান্ত। এদের সাথে ডলার আর কূটকৌশলের সাথে
আরো ভয়ংকর যে অস্ত্রটি আছে তা হচ্ছে ঋণ আর এর পেছনের কঠিন সব শর্ত।
এই সব দস্যুরা টাকা দিয়ে লোভী আমলা আর স্হানীয় রাজনীতিকদের কে সহজেই কিনে নেয়। আর এ কথা তো সকলেরই জানা যে, অন্নুনত দেশের রাজনীতিক-আমলারা অপেক্ষাকৃত অদক্ষ এবং দূর্নীতিগ্রস্হ। এরা টাকা খাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। কেনার আগেই যে বিক্রি হয়ে যায় তাদেরকে কিনতে খরচও হয় সামান্য।
একদিকে সুন্দর বনের ছিচকে দস্যুদের কে সরকার অস্ত্র সমর্পন করাচ্ছে অন্যদিকে সেই বনেই আধুনিক দস্যুদের ঘাঁটি গাঁড়ার সকল পথ উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।
মাস্টার বা মজনু বাহিনীকে অব্যাহত অভিযানে আত্মসমর্পণ করানো যাচ্ছে, ভবিষ্যতেও যাবে কিন্তু, আধুনিক এই কোর্ট-প্যান্ট পরা ভদ্রবেশি দস্যুদের ( অপরাধ বিজ্ঞানী সুদারল্যান্ড যাদেরকে বলেছেন হোয়াইট কালার ক্রিমিনাল/ ভদ্রবেশি অপরাধী) বেলায় তা হওয়া সম্ভব নয়। এদের পক্ষে থাকে আন্তর্জাতিক আইন। সেই আইন প্রনয়ণে এদের নেপথ্য ভূমিকা থাকে। আন্তর্জাতিক আইন যেন তার পক্ষে যায় তার নিশ্চয়তা এরা আগে ভাগেই চুক্তির বশীভূত আমলা-রাজনীতিকদের কে দিয়ে করিয়ে নেয়। ভবিষ্যতের কোনো সরকার বেঁকে বসতে চাইলে আন্তর্জাতিক আদালতে ক্ষতি পূরণ চাইতে যাওয়ার দরজাটা এদের খোলা থাকে। এবং তা করতে এরা পিছ পা হয় না।

এ কথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যখন নতুন করে কয়লা ভিক্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ তো দুরের কথা পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টি স্বরণে রেখে চালু কেন্দ্র গুলো ধিরে ধিরে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে তখন সেই প্রযুক্তি চড়া মূল্যে অনুন্নত বা স্বল্প উন্নত দেশ গুলোতে রপ্তানি কোন মহৎ উদ্দেশ্যে হচ্ছে না, হচ্ছে মুনাফার স্রোত সচল রাখার জন্য। আর এটা নিশ্চিত করছে তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলোর দূর্নীতি গ্রস্থ শাসক শ্রেণী। বিভিন্ন রকম যুক্তির ফিরিস্তি দিয়ে এ লেখার কলেবর আরো দীর্ঘ করার কোন ইচ্ছে আমার নেই।
যে সমাজের শাসক শ্রেণী ” কানে দিয়েছি তুলা, আর পিঠে বেঁধেছি কুলা ” নীতি গ্রহণ করে সে সমাজে নীতি কথা মূল্যহীন। লেখাটির শেষ টানতে চাই বিশিষ্ট লেখক মইনুল আহসান সাবেরর একটি ছোট্ট মন্তব্য দিয়ে। চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর ১৬/০৭/২০১৬ সাবের ভাই ফেসবুকে একটি মন্তব্য করেছিলেন * সুন্দর বনে েকের পর এক দস্যু বাহিনী আত্মসমর্পণ করছে। অপেক্ষা করুণ। রামপাল হয়ে গেলে বাঘ-হরিণ, সাপ, পোকামাকড় যা আছে তারাও আত্মসমর্পণ করবে *। মন্তব্যটি যত ছোট তার মর্ম কথা ঠিক ততোটাই গভীর।

 

[fblike]

 

লেখক: সম্পাদক
ফাস্ট বিডি নিউজ২৪ডট কম
fastbdnews24.com
jamilmukul365@gmail.com

 

 

ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪/ই ই