ওদের ঈদ 

ওদের ঈদ

                                    কে. এস. খান

হ্যাঁ।  সামনেই আসছে ঈদ। ঈদ নিয়ে আমাদের জল্পনা কল্পনা আর ব্যাস্ততার শেষ নেই। অনেক আনন্দের সাথেই হয়তো কাটবে আমাদের ঈদ। হাজার হাজার টাকার শপিং, দামি দামি জামা-কাপড়, আটা ময়দার মত প্রসাধণী দ্রব্যাদি, পারফিউম, দামি গহনা, নামি-দামি গার্মেন্টসে তৈরী পোশাক, ইন্ডিয়ান সিরিয়ালের নায়িকার নামানুসারে তৈরী মেয়েদের হাজার হাজার টাকার গা ভর্তি জামাকাপড় প্রভৃতি ছাড়া আমাদের ঈদ ? কল্পনাই করা যায় না!!!! কে কত টাকার শপিং করল, কার কত দামি কাপড়, এসব নিয়ে একটা প্রতিযোগিতার মত অবস্থা বিরাজ করে আমাদের সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর মাঝে। মোটামুটি ঈদের শপিং যার যত বেশি তার গর্বও যেন তত বেশি। অবশ্যই এটা হওয়া বাঞ্চনীয়। কারন হলো ঈদ তো আর বছরে বার বার আসবে না!!! অবশ্যই সকলকে নতুন জামা কাপড় দামি গহনা পরিধান করতে হবে। শুধু কি তাই সঙ্গে আইলানা, মাশকারা, লিপস্টিক, পারফিউম প্রভৃতি নাম না জানা আরো অনেক প্রসাধণী সামগ্রী দিয়ে গায়ের রং পরিবর্তন থেকে শুরু করে মুখের আকৃতি পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলতে হবে!!! আবার ঈদের দিন নিয়ে আমাদের রয়েছে কত পরিকল্পনা। কে কত দামি গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বের হবে, কে কোন রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ, ডিনার করবে, কার সাথে কতজন বড়লোক বন্ধু থাকবে, কে কোন পার্কে বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরতে বের হবে ইত্যাদি অনেক রকম প্লান যা বলে শেষ করা গেলেও আমার পক্ষে শেষ করা সম্ভব না। এত কিছুর পরেও আমাদের মাঝে কিসের যেন শূন্যতা বিরাজ করে। আমাদের আত্মা তবুও যেন তৃপ্ত হয় না। অনেকেই হয়তো বলতে চাইবেন আমি সকলকে এক পাল্লাতে ওজন করতে চাইছি। কিন্তু না, এর বাইরে অতি সামান্য সংখ্যক মানুষই পাওয়া যায় যার জন্য আলাদা করে কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। হ্যাঁ, তবে আমি আপনি হয়তো টাকার অভাব না থাকায় যা ইচ্ছা তাই করতে পারছি। হোক সেটা আমাদের প্রয়োজনীয় অথবা নিষ্প্রয়োজনীয়। কে আটকাচ্ছে আমাদের। আমার টাকা আমি খরচ করবো না তো কে খরচ করবে। আমার যেখানে ইচ্ছা সেখানেই আমি টাকা উড়াবো তাতে কার কি যায় আসে!!
না না খরচ করুন না । আপনাকে কে আটকাচ্ছে? কিন’ তার আগে আপনার পাশের ঐ অভাবি এতিম বাচ্চাগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন। রাস্তায় হাটার সময় একবার ফুটপাতের ঐ ভিখারী ছেলেটার দিকে তাকান। যারা দু’বেলা দু’মুঠো ভাত মুখে দিতে পারে না তাদের অবস’াটা একবার ভাবুন। ঈদ তো শুধু্‌্‌ই আপনার জন্য নয়। আপনার মতো তারও অধিকার আছে ঈদের খুশিটা উপভোগ করবার। জানি, আপনার মত তার সামর্থ্য নেই তাই তো সে পারছে না। তবে আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন তার প্রতি আপনার কতটুকু কর্তব্য পালন করার রয়েছে। আপনার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দরজায় কোন ফকির আসলে আপনি হয়তো তাকে ঝামেলা বলে বিদায় দিয়ে দিচ্ছেন। আপনার বাড়িতে কোন ফকির এসে বেল টিপলে হয়তো আপদ ভেবে কানে করছেন না। কিন’ মানুষ হিসেবে অবশ্যই সে আপনার কাছে এতটুকু পাওয়ার দাবি রাখে। জানি, এসব কথাগুলো বললে হয়তো ভাববেন ফ্রিতে উপদেশ দিতে অনেকেই পারে।  তবে আপনি একদিন আপনার শহরের রেল-স্টেশন, ছোট ছোট বস্তিগুলোতে গিয়ে স্বচক্ষে দেখেই আসুন না কিভাবে কাটছে তাদের ঈদ। তাদের জীবনেও ঈদ বলে কিছু আছে এটা তারা জানে তবুও অনেকের কাছেই আজো তা প্রায় অজানার মতই। অনেক বাবা-মা ই হয়তো তার সন্তানের জন্য একখানা নতুন কাপড় জোটানোর চেষ্টা করলেও আপনার আমার অসহযোগিতার কারনে তা আর হয়ে ওঠেনি। অবশেষে এই ব্যর্থতার কথা সন্তানের সামনে বলতে গিয়ে তার বুকের ভেতরটা হয়তো ফেটে যাওয়ার মত হয়েছে। অনেকেই হয়তো অনেক ঝাটা লাথি খেয়ে নিজের জন্য না পারলেও সন্তানের জন্য কোন বড়লোকের সন্তানের একখানা পুরাতন কাপড় জোগাড় করতে পেরে হাসিমুখে তাই নিজের সন্তানকে পরাচ্ছে। অবশেষে ঈদের সকালে মাংস, কোরমা, পোলাও এসবের গন্ধটুকুই হয়ত তাদের নাকে গিয়ে পৌছাচ্ছে। সেই গন্ধে হয়ত তাদের ছোট ছোট নিষ্পাপ অবুঝ শিশুদের জিহ্বাতেও পানি আসছে। কিন’ তবুও তাদের করার কিছুই নেই। অপারগ বাবা-মা তাদের সন্তানকে শুধুই মিথ্যা আশ্বাস দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে। আর ঐসব শিশুরা একদিন তাদের জীবনে এমন দিন আসবে এই প্রতিক্ষায় পার করছে প্রতিটি প্রহর। তবে সেই দিনটা কবে আসবে তা একমাত্র সেই উপরওয়ালাই ভাল জানেন। আসুন না আমরা সকলে মিলে ঈদেও খুশিটা ভাগাভাগি করে নেই।
এই ডায়লগটা হয়ত ঈদ আসলে অনেকেই দিয়ে থাকেন। কিন’ আসুন না আমরা বাস্তবে তা একবার করে দেখি!! ঈদের দিন আপনি আপনার পাশের এতিম বাচ্চাটাকে অথবা কাছের কোন রেলস্টেশন বা বস্তিতে গিয়ে কোন শিশুকে ব্যাংক থেকে তুলে আনা একটা নতুন ৫০ টাকার নোট ধরিয়ে দিন না!! তারপর দেখুন তার আনন্দটা কতটুকু। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি আপনার সন্তানকে জীবনে ৫০ হাজার টাকা দিলেও সে এতটা খুশি কখনো হয়নি। তাই আবারো সেই সকলের চিরচেনা কথাটি বলতে হচ্ছে,  ”আসুন আমরা সকলে মিলে ঈদের খুশিটা ভাগাভাগি করে নেই।”