খোলস

খোলস

               –————ফয়জুল কবীর

.
“মানুষ তো মানুষই। মানুষ আবার পশু হয় কি করে? মানুষকে মানুষ ভাবতে কি তোমাদের ঘৃণা হয় ভাইয়া?!!! এ পৃথিবীতে আমরা যারা আছি তারা সবাই তো মানুষ। একই দেহ একই প্রাণ। এখানে নারী পুরুষ সবাই সমান। বিভেদ সৃষ্টিকারীদের মন মানসিকতা কত নিচু এককবার চিন্তা কর। যত্তসব ব্যাক ডেটেড চিন্তা ভাবনা”
তুমুল তর্ক আর এক প্রকার ঝগড়া শেষে ভাইয়ের রুম থেকে বাদায় নিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী অনন্যা। ছেলে মেয়ে সবাই তাকে সমীহ করে চলে। বই নোট সবকিছু নিজেদের মধ্যে বিনিময় হয় অনায়াসে। হেসে খেলেই যেন দিন গুলো পার হয়ে যাচ্ছিল। ওরা বন্ধুরা মিলে আবার তাদের চিন্তাধারা প্রচার ও প্রসারের জন্য গ্রুপ তৈরি করে নিয়েছে। এই গ্রুপের প্রধান হলো অনন্যা। অবসর সময়ে গ্রুপের অন্যান্য সদস্যদের সাথে যোগাযোগ ও পরামর্শের মাধ্যমে নতুন নতুন চিন্তাধারা বিকশিত করাই ওর কাজ। কিভাবে সমাজের উন্নয়ন হবে এটা নিয়ে লক্ষ ভাবনা ওকে ঘুমাতে দেয় না। তাই যখনি নতুন কোন পরিকল্পনা মাথায় আসে তা নিয়ে আকাশের সাথেই সর্বপ্রথম আলোচনায় বসে। গ্রুপের বিষয় হলেও আকাশের সাথে বন্ধুত্বটা একটু গাঢ়, তাই ওকেই সর্বপ্রথম জানায়। এভাবেই এক সময় গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে ওদের।
কিছুদিন ধরে লক্ষ করছে আকাশ যেন একটু অন্যমনস্ক। অনন্যা জানতে চাইলেও একথা সেকথায় এড়িয়ে যায় সব সময়। তারপর গুমট আকাশ যেমন গাম্ভীর্য ছেড়ে শীতল বাতাসের সাথে বৃষ্টির আগমনী বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি সেও একদিন গাম্ভীর্য ছেড়ে বলে বসল “I Love you, অনন্যা আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছি।”
কিছু ক্ষণ চুপ থেকে অনন্যা জবাব দিয়েছিল-“দেখ আকাশ আমি তোমাকে জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু মনে করি, তোমাকে নিয়ে এসব ভাবি না।”
কিছু দিনের মধ্যে আবারো আগের মতো সহজ সম্পর্কে ফিরে আসে তারা। নীল শাড়িতে খুব মানায় অনন্যাকে। মাঝে মাঝে শাড়ী পরে ক্যাম্পাসে যায় ও। ওর সম্মানে ছোট খাটো পার্টিও হয় সেদিন। মন মাতানো কবিতা আর গানে মাতিয়ে দেয় সাধন।সে কবিতায় থাকে নিখাদ সৌন্দর্য্যের ছন্দ, থাকে না কোন মনমালিন্য কিংবা দন্দ্ব। সুখের ভাষণে আর কবিতার ছন্দে বিমোহিত হয় অনন্যা। আর শুধু ভাবে ভালো বন্ধু মানেই সুন্দর জীবন।
,
আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেবে লক্ষ তরুণ তরুণী। বান্ধবীরা সবাই পরামর্শ করে হলুদ শাড়ী পরে রমনার বটমূলে মিলিত হলো। গান আর হাসি আনন্দেই কেটে যাচ্ছে দিনটা। বন্ধুরা সব সেজেছে মনের মাধুরী মিশিয়ে। একে অপরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। নিতু এসে অনন্যার মাথায় সুন্দর একগুচ্ছ ফুলের মুকুট পরিয়ে দিয়ে টেনে নিয়ে চলল মূল ফটকের দিকে।
-কোথায় যাচ্ছিস নিতু?
-চল না একটু চারপাশ থেকে ঘুরে ফিরে আসি। কত রঙের মানুষ যে আজ নিত্য নতুন সাজে সজ্জিত করেছে নিজেদের তার ইয়াত্তা নেই।শুধু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে কি আর আনন্দ উপভোগ করা যায়?
ভিড় ঠেলে ধীরে ধীরে মূল ফটকে পা দিল ওরা। হঠাৎ করে পিছন থেকে অনন্যার শাড়ীতে টান পড়ল। সেদিকে নজর দিতে না দিতেই ডান দিক থেকে কে যেন হাতটা ধরে দিল ঝটকা টান। টাল সামলে নিতে না নিতেই বাম দিক থেকে শাড়ীটা প্রায় অর্ধেক ভূলুণ্ঠিত। এতক্ষণ পর সামনে থেকে অনন্যার ব্লাউজ ধরে টান দিল কেউ একজন। মুখ তুলে তাকাতেই আকাশের বিভৎস্য শয়তানি হাসি ভরা মুখটা দেখতে পেল ও। কিছু বলতে যাবে এমন সময় পিছন থেকে ব্লাউজে হেচকা টান পড়ায় সামনেটা উন্মুক্ত হয়ে গেল। দু’হাতে বুক আগলে মাথা ঘুরিয়ে সাধনের চোখে চোখ পড়ল ওর। এই চোখে শয়তানির ঝিলিক, এখন সেখানে সৌন্দর্য্যের কবিতার লেশ মাত্র নেই। আরো দুজন নিচ হতে শাড়ীতে টান দেওয়ায় কিছু বলার আগেই অর্ধনগ্ন অবস্থায় নিজেকে আবিষ্কার করল অনন্যা। চারদিক থেকে দলাই মলাইয়ে আহত দেহটা রাস্তায় গড়াগড়ি দিচ্ছে অথচ প্রতিবাদ করার মতো একটা কন্ঠ পর্যন্ত শোনা গেল না।
এ পর্যন্ত রেখে ওরা নতুন শিকারের সন্ধানে চলল অন্য কোন দিকে। কেউ একজন ধরে অনন্যার গায়ে জীর্ণ শাড়ীটি জড়িয়ে দিল কোন মতে। নিতুর অবস্থাও একই রকম। বিষন্ন মনে রিকশায় অনন্যা আর নিতু। ভাবনার সাগরে ডুবে গেছে অনন্যা…………..ভাবছে আর ভাবছে।
“সেদিন ভাইয়া একটু সংযত হয়ে একটু সাবধানে চলাফেরা করতে বলেছিল, তাই ওকে কত কথা শুনিয়ে দিলম। পশু শব্দটা ভাইয়ার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হবার সাথে সাথে কি যে তুমুল বকাটাই দিলাম। অথচ যাদের পক্ষ নিয়ে আপন ভাইটাকে এভাবে ছোট করলাম তারাই তো আজ আমাকে ব্যর্থ প্রেমের প্রতিশোধ নিতে লোক সম্মুখে বিবস্ত্র করতে এতটুকু দ্বিধা করল না। ”
অনন্যা কখনো এসব পুরোনো কিতাব পড়েনি, ভাইয়ের কোন নিষেধও শোনেনি। এই ভুলেন জন্য মনে মনে লক্ষবার ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে ভাইয়ের পড়া অনুবাদের শেষ অংশটুকু অস্ফুট স্বরে মুখ থেকে বেরিয়ে গেল—” হে প্রভু আমায় ক্ষমা করো। হাজার বছর আগে তুমি যা বলেছ নিঃসন্দেহে তা ঠিক বলেছ “……………….ওরা চতুষ্পদ পশু বরং তার চাইতেও নিকৃষ্ট।””