ছোটবোন

ছোটবোন

              ______হামমাদ রাগিব

নাবিলাটা আস্ত একটা অলস। আরেকটু খোলাসা করে বললে, ঘুমের গাধা। রাত দশটা হবার আগেই ঘুমিয়ে পড়বে আবার দিনের বেলা শুয়ে থাকবে পুরো দিন। কিভাবে যে পারে! আল্লাহ মালুম! আমি বাড়ি এলে তার যত সমস্যা। আমার কারণে তার ঘুমের সিলেবাস পুরা হয় না। শিডিউলে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর চে’ও বেশি বিপর্যয় ঘটে।

লাইটের আলোয় নাবিলা ঘুমোতে পারে না। আমি বাড়ি এলে বই-টই কিছু একটা নিয়ে পড়া বা জরুরি কোনো কাজের বাহানা ধরে সন্ধ্যার পর থেকে বসে থাকি তার রুমে। এগারোটা পর্যন্ত লাইট জ্বালিয়ে রাখি। ঘুমোবি, লাইটের আলোতে ঘুমা! যত রকমের অভিশাপ থাকতে পারে, সব তখন আমার উপর বর্ষিত হয়– ‘আল্লাহ, আমার ঘুমে যে ডিস্টার্ব দেয়, তারে জল্লাদ নাক চ্যাপ্টা প্যাঁচার মতো একটা বউ দিও… সারা জীবন যেন বউয়ের কাজ করতে করতে মরে…’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি কখনো কখনো কাটা গায়ে হাল্কা একটু লবণ ছিটিয়ে দিই– ‘আমি জল্লাদ, প্যাঁচার মতো বউ পাইলেও তোর জন্য কিন্তু লাল টুকটুকে একটা বর নিয়ে আসব…’
ব্যাস, অভিশাপবতীর মুখ এবার বন্ধ। লজ্জায় লাল হয়ে গেছে তার চেহরা।

দিনের বেলাও বেচারি ঘুমোতে পারে না দু’দণ্ড। শোয়া দেখলেই জ্বালাতন করি। পায়ের নিচে কাতুকুতু দিই। কাজ না হলে তেলাপোকা-থেরাপির ব্যবস্থা করি। ব্যাস, এবার আর বকাবকি নেই। অনুনয়। ‘ভাইয়া, তেলাপোকাটা ফেলে দে না, তোকে
মজা করে চা বানিয়ে দেব!”দিলে এখনই দিতে হবে। বাকি চলবে না। বাকির নাম ফাঁকি।’

কাতুকুতু কিংবা তেলাপোকা-থেরাপি, কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না আজ। সেই সকাল থেকে গাল ফুলিয়ে শুয়ে আছে নাবিলা। এখন বিকাল পাঁচটা বাজে। এক ফোঁটা পানিও মুখে দেয় নি এ পর্যন্ত। নাবিলার মন খারাপ থাকলে আমার কিচ্ছু ভাল্লাগে না।
সারাদিন থা থা থৈ থৈ করে বেড়ানো একটা বালিকা হঠাৎ চুপ হয়ে গেলে ভাল্লাগবার কথা না। বিশ্রী লাগবার কথা। আমার বিশ্রী লাগছে। ইচ্ছে করছে এখনই হোস্টেলে চলে যাই।

বাঁকা একগোছা রগ আছে নাবিলার ঘাড়ে। সবসময় বাঁকা থাকে না। মাঝে মাঝেই বাঁকা হয়। যখন বাঁকা হয়, খাওয়া-দাওয়া কথা-বার্তা সব বাদ দিয়ে শুয়ে শুয়ে অনশন করে। রগটা সোজা করা তখন বড্ড মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়।

নাবিলার রগ আজ বাঁকা। আমি বাড়ি থাকলে সাধারণত রগ-বাঁকা রোগ তার হয় না। ভাই-বোন দিনমান বই পড়া আবৃত্তি গান গাওয়া একটুতেই ঝগড়া একটুতেই মিল ইত্যাদি শত ব্যস্ততায় মেতে থাকি, রগ বাঁকানোর সময় কোথায়! কিন্তু আজ কেন বাঁকল বুঝতে পারছি না! মাকে জিজ্ঞেস করেও কিছু পাই নি। আয়-রোজগারহীন ছেলেকে টাকা-পয়সা বিষয়ক কোনো সমস্যা মা-বাবারা শুনান না।
শুনানো উচিত না। কাজের কাজ কিচ্ছু হবে না। খামাখা টেনশন করবে।

বিকেলের দিকে অনেক জোরাজুরির পর জানলাম কাহিনী কী। কাহিনী তেমন কিছু না। আবার অনেক কিছু। নাবিলার স্কুলে আগামী কাল বার্ষিক অনুষ্ঠান। মাকে সে অনেক দিন আগ থেকে বলে রেখেছিল অনুষ্ঠানের আগে ভাল একটা থ্রিপিস কিনে দিতে। আমাদের যত অনুযোগ-আবদার সব আমরা মাকে জানাই। বাবাকে বলতে পারি না। সাহসে কুলোয় না। বাবাকে আমাদের ভয় করে। বাবা অভাবী মানুষ। অভাবী মানুষ খিটখিটে মেজাজের হয়। বাবার মেজাজ খিটখিটে। অবশ্যি টাকা-পয়সা হাতে থাকলে বাবা প্রফুল্ল থাকেন। আমাদের ভীষণ ভাল লাগে তখন বাবাকে। আমরা তাই মনে-প্রাণে চাই বাবার হাতে সব সময় টাকা-পয়সা থাকুক।

মা আমাদের কাছে ডাল-ভাত। মাকে ভয় করে না। যখন যা দরকার জানিয়ে দিই। না পেলে কী করব না করব, কয় দিন উপোস থাকব, সেই আল্টিমেটামও দিয়ে রাখি। মা এখান থেকে সিলেক্ট করেন, কোনটা বাবাকে বলা যাবে, কোনটা যাবে না। অল্প মাইনের চাকুরি। সংসার চালাতে বড়ো বেশি কাঠ-খড় পুড়াতে হয় বাবাকে। আমাদের সব আবদার বাবাকে শুনান না মা। যেটা বাবাকে বলা যায় না, বাবার অজান্তে সেটা তিনিই পূরণ করবার চেষ্টা করেন। মা’র আয়ের উৎস বাবার পকেট। বাবাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে যে পাঁচ-দশ টাকা প্রতিদিন সরান, সেগুলোই অল্প অল্প করে জমিয়ে আমাদের ফায়-ফরমাশে কাজে লাগান।

গত মাস দুয়েক ধরে বাবার পকেটের অবস্থা খুবই খারাপ, অনিবার্যভাবে মায়ের ব্যাংকেরও তাই দুর্দিন চলছে। নাবিলার থ্রিপিসের বায়না মা পুরা করতে পারেননি। আমাদের সামনে স্বাভাবিক থাকবার চেষ্টা করলেও মাকে বেশ কয়েক বার দেখেছি, গোপনে চোখের পানি ফেলছেন। পুরো দিন ধরে মাও সম্ভবত কিছু খান নি।

আমি এম্পটি কোম্পানির সদস্য। পকেট সবসময় ফাঁকা থাকে। ইন্টার মিডিয়েট পর্যন্ত টিউশনি-ফিউশনির ব্যাপারে বাবার হান্ডেট ফোরটি ফোর জারি ছিল। টিউশনি করতে গেলে নাকি পড়াশোনার ক্ষতি হবে। রেজাল্ট ভালো আসবে না।
ভার্সিটিতে আসার পর অনেক কষ্টে অনুমতি পেয়েছি। টাকা-পয়সার ব্যাপারে এখন আর বাবাকে জ্বালাতে হয় না। টিউশনি থেকে যা পাই, কোনোমতে পকেট-খরচ চলে। এর বাইরে আলাদা কোনো শখ পুরা করবার মতো টাকা থাকে না। কলেজ-লাইফ থেকে অনেক
শখ ছিল একটা এন্ড্রোয়েড ফোন নেব। কিন্তু বাড়িতে বলি নি কখনো। জানি দিতে পারবেন না। মা শুধু শুধু আড়ালে চোখ মুছবেন। টিউশনির টাকা থেকে অল্প অল্প করে জমিয়ে সেদিন বাড়ি আসবার সময় একটা এন্ড্রোয়েড ফোন নিয়েছি। শখের জিনিশ অনেক দিন পর পেয়েছি। চাপা একটা আনন্দ কাজ করছে ভেতরে ভেতরে। রাতদিন মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। নিয়ম অনুযায়ী আজও পকেট একদম ফাঁকা। এম্পটি পকেটেই বিকেলে বাজারের দিকে বেরোলাম। মনটা প্রচণ্ড খারাপ।

নাবিলার জন্য দামি দুইটা থ্রিপিস কিনলাম। একটা নীল রঙের আরেকটা শাদা। নীল রঙ নাবিলার পছন্দ। আমার শাদা। শাদাটা পরলে নাবিলাকে নিশ্চিত ডানাকাটা পরীর মতো লাগবে। এন্ড্রোয়েড ফোনটা বিক্রি করে দিয়েছি। ছোট বোনের এক টুকরো নির্মল হাসির সামনে এ-রকম শত এন্ড্রোয়েডও কিছু না।