জলের গহীনে জল

 

জলের গহীনে জল

                      ________________ শামীম আরেফীন

ইদানীং আমার কী হয়েছে জানি না, সন্ধ্যা নামতেই ঘরের সব বাতি বন্ধ করে অন্ধকারে চুপচাপ বসে থাকতে ভালো লাগে। এ সময় কথা বলতেও ইচ্ছে করে না। মিলু ফোন করতে পারে ভেবে ফোনের সুইচ অফ করে রাখি। মা তেলে ভাজা পুরি-পিয়াজু বানিয়ে ডাকতে ডাকতে এক সময় হাল ছেড়ে দেন। অভ্রও ভয়ে এদিকে পা বাড়ায় না আর। একদিন ওকে খুব বকে দিয়েছিলাম। তখন থেকেই আর আসে না এ রুমে। আসে না তা নয়, ভাবী আসতে দেয় না।

সেদিন আমার কী হয়েছিল জানি না। সন্ধ্যার একটুপর, জানালার দিকে মুখ করে বসে ছিলাম। বাইরে তখন কালো মহিষের মতো অন্ধকার পেশি দেখাচ্ছে। কয়েকটা কাক কারেন্টের তার থেকে কা কা করে উড়ে গেলো ছাদের কার্নিশের উপর দিয়ে। নিচের রাস্তা থেকে রিক্সার টুংটাং সর্পিল আওয়াজ উঠে আসছে কানে। সামনের বাসার জানালাটা জ্বলে উঠেছে আলোয়। আমি জানালার দিকে তাকিয়ে আছি। কী যেন ভাবছি, কী যেন খুঁজছি। অভ্র তখন বিড়ালের মতো আমার কাছে এসে বললো— সোনাফুপি, ও সোনাফুপি, শোন! দেখে যাও, কার্টুন চ্যানেলটা আসছে না, তুমি একটু এনে দাও না প্লিজ…
খুব তেঁতে উঠেছিলাম হঠাৎ। অভ্র ভয়ে কেঁদে ফেলেছিলো। ভাবী এসে ওকে কোলে তুলে নিয়ে গেলো। খুব কাঁদছিলো। সেই রাতে নাকি জ্বরও এসেছিলো। ও হয়তো ভাবতেও পারেনি ওর সোনা ফুপি হঠাৎ অকারণে এতোটা রেগে উঠবে ওর উপর। বাসার অন্যরাও ভাবেনি। সবাই খুব অবাক হয়েছিলো। কিন্তু এ নিয়ে কেউ কিছুই বলেনি আমাকে। ভাইয়া তো সকালে উঠেই অফিসে বের হয় আর রাত হলে ফেরে। কথা বলার সময় কই! তবে সময় থাকলেও ভাইয়া আমাকে কিছুই বলতো না। আমি জানি, ভাইয়া অনেক ভালোবাসে আমাকে। আগে বাবার সামনে দু’-একবার ধমক দিলেও, সংসার ঘাড়ে নেওয়ার পর এখন কিছুই বলে না। ভাবী তো নিরীহ টাইপ, বকাঝকার মধ্যে নেই।

মা শুধু পরদিন দুপুরে খেতে বসে বলেছিলেন— অমন রাগ না করলেও পারতি। বাচ্চা ছেলে, তোকে পছন্দ করে বলেই তো…
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে মা আর কথা শেষ করতে পারেন নি। চামচে ভাত তুলে নিচু গলায় বললেন— আর ক’টা ভাত নে, এতো পড়াশোনা করিস, একটু না খেলে চলবে?

মা’র ধারণা খুব ভুল। আমি একদমই পড়াশোনা করি না। বই হাতে নিলে সেটা গল্পের বই-টই হবে। ক্লাসের বই দেখলেই কেমন বিরক্তি লাগে। বাকি সময়টা ল্যাপটপে বসেই কেটে যায়। ফেসবুকে ঢুকে এটা ওটা পড়ি। কে কেমন ঢঙে সেলফি আপলোট করছে দেখি। মানুষের কতো আনন্দ-মুহুর্ত বন্দী হয়ে আছে এই অন্তর্জালের ফ্রেমে। বন্ধুদের দু-একজনের সাথে মাঝে মাঝে চ্যাট হয়। ছেলেদের সাথে খুব একটা নয়। ওদের হ্যাংলামিটা আমার ভালো লাগে না। মা হয়তো ভাবেন, ল্যাপটপে বসে খুব পড়াশোনা করছি। মা’র তো এতো কিছু বোঝার কথাও নয়।

আমি বুঝতে পারি, মা আমাকে নিয়ে অনেক চিন্তা করেন। মা সামান্য বিষয় নিয়েও অনেক চিন্তা করতে পারেন। বিবাহ যোগ্য একটা মেয়েকে নিয়ে সব মায়েরই তো একটু আধটু চিন্তা হয়। আচ্ছা, আমি নিজেকে বিবাহ যোগ্য ভাবছি কেনো? বিবাহের জন্য কী কী যোগ্যতা লাগে তাও কি জানি সব? মা হয়তো জানেন। আমাকে তিনি বিবাহ যোগ্যই ভাবেন। তা না হলে সেদিন হুট করেই কেনো জিজ্ঞেস করলেন— খুকি, তুই কি কাউকে পছন্দ করিস?
মা আমাকে ‘খুকি’ বলে ডাকেন। বাবা ডাকতেন ‘ময়না’ বলে। আবার কখনও নামটা একটু ঘুরিয়ে ডাকতেন— রেনু মা, ও রেনু মা। ভাইয়া ডাকেন, বুড়ি। এই বাসায় কেউ আমার আসল নাম ধরে ডাকে না।
আমি বললাম— কেনো মা, হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেনো করছো?
— না মানে, তোর তো কাউকে পছন্দ থাকতেই পারে। তেমন হলে আমাদেরকে জানাস। না জানিয়ে কিছু করতে যাস না যেন।
— ধুর তুমি কী যে বলো মা! আমার কোনো পছন্দ নেই।
মা আবার বললেন— তুই কি বিয়ে করবি খুকি?
আমি প্রায় চমকে উঠেছিলাম। লজ্জাও কি পেয়েছিলাম একটু? হয়তোবা। মা আমার কাছে বিয়ের কথা বলবেন, এটা তখন পর্যন্ত ভাবতেও পারি নি। কিন্তু এখন বুঝি, এই জীর্ণ-শীর্ণ সংসারটা একা সামলাতে গিয়ে মা হাফিয়ে উঠেছিলেন। আমাকে পাত্রস্থ করতে পারলে তিনি হয়তো একটু চিন্তামুক্ত হতেন।

এখন কেবলই মনে হয়, সেদিন মাকে মিথ্যেটা বলা উচিত হয় নি। দিপু ভাইয়ের কথা বলে দিলেই পারতাম। আচ্ছা, মা দিপু ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিতে চাইলে তিনি কি রাজি হতেন? তার বাবা নাকি অনেক রাগী মানুষ। তিনি বোধ হয় রাজি হতেন না। দিপু ভাইয়ের মা খুব ভালো। আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। বাসায় গেলে জোর করে এটা-ওটা খেতে দিতেন। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে আমাকে তার পুত্রবধু করার জন্য তিনি একপায়ে দাঁড়িয়ে যাবেন!

দিপু ভাইদের বাসায় প্রথম গিয়েছিলাম মিলুর সাথে। দিপু ভাই মিলুর কাজিন। অবসরে তার কাছ থেকে ম্যাথ দেখিয়ে নিতো মিলু। আমিও ম্যাথে ভয়ানক দুর্বল ছিলাম। প্রতিবারই টেনেটুনে পাস। এক সেমিস্টারে তো প্রায় ফেল করেই বসেছিলাম। মিলু তখন দিপু ভাইকে বলে ওর সাথে আমারও পড়ার ব্যবস্থা করে দিলো।
দিপু ভাই অনেক সুন্দর করে কথা বলেন। গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা। মুখে সব সময় চাপা হাসি ঝুলে থাকে। এতো সুন্দর করে কোনো ছেলে হাসতে পারে সেটা তাকে না দেখলে বুঝতামই না। দিনে দিনে তিনি আমার খুব প্রিয় মানুষ হয়ে উঠলেন।

এক বৃষ্টির দিনে ছাতা নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। মিলুর জ্বর ছিলো তখন, ও যায় নি। বাসায় ফেরার সময় দিপু ভাই ছাতা ধরে এগিয়ে দিয়েছিলেন রিক্সা পর্যন্ত। সেদিনই প্রথম কোনো ছেলের পাশে হাঁটছি। এক ছাতার নিচে কখনও বাহুর স্পর্শ লাগতেই কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছি। কেনো অমন হয়েছিলো জানি না। ভেতরে ভীষণ কুঁকড়ে ছিলাম। চেষ্টা করছিলাম মাঝখানে দূরত্ব রেখে হাঁটতে।
কিন্তু দিপু ভাই খুব স্বাভাবিক স্বরে বললেন— আরে ভিজে যাচ্ছো তো, এদিকে সরে এসো।
আমি বললাম— না না, ঠিক আছে। অসুবিধা নেই।
— বৃষ্টির পানি গায়ে লাগলে ঠাণ্ডা লাগবে তো!
— না না, কিছু হবে না। বৃষ্টিতে আমি অনেক ভিজেছি, আমার ঠাণ্ডা লাগে না।
— তাই! বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে তোমার??
— হুম, খুব। তবে একা একা।
বলেই খুব লজ্জা পেলাম। ‘একা একা’ কথাটুকু কেনো বলতে গেলাম! তিনি তো জানতে চাননি এতো কিছু। নিজের উপর রাগ হলো একটু। মনে মনে নিজেকে শাসিয়ে দিলাম, কথা বলার সময় মেয়েদের অনেক হিসেব করে বলতে হয়। শব্দ চয়নেও সতর্ক থাকতে হয় সব সময়।
রিকশায় তুলে দেওয়ার সময় দিপু ভাই মুখে তীর্যক হাসি টেনে বললেন— আমিও কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজতে খুব পছন্দ করি। তবে একা নয়, সাথে কাউকে নিয়ে।

বাসায় ফিরতে ফিরতে বৃষ্টি থেমে গেলো। কিন্তু দিপু ভাইয়ের শেষ কথাটুকু অনেকগুলো প্রশ্ন হয়ে ভাবনার ভেতরে ঝরঝর করে ঝরতে লাগলো। ‘কাউকে’ বলতে তিনি কার কথা ইঙ্গিত করেছেন? বিশেষ কাউকে? দিপু ভাইয়ের কি বিশেষ কেউ আছে? কী নাম তার? সে কি আমার চেয়েও দেখতে সুন্দর?
খুব কান্না পেলো আমার। ঈর্ষা? হ্যা, আমি বুঝতে পারলাম, অদৃশ্য ঈর্শা আমাকে তাড়া করে নিয়ে যাচ্ছে অদ্ভুত অরণ্যের দিকে। গাঢ় সবুজ আর হলুদ লতাগুল্ম ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে ছুটে যাচ্ছি অচেনা গভীরে, ছুটতে ছুটতে ফেরার পথ হারিয়ে এক সময় শুকনো পাতা বিছানো একটা খোলা জায়গায় এসে দাঁড়ালাম। তার পাশেই দেখতে পেলাম পদ্মফুলে ছাওয়া একটা নিটোল জলাশয়। আমি টলমলে স্বচ্ছ জলে পা ডুবিয়ে বসতেই বৃষ্টি নেমে এলো। বৃষ্টিতে আমার চুল ভিজে গেলো। চোখের পাপড়ি ভিজে গেলো। কপাল বেয়ে ছোট্ট জলের স্রোত নাকের পাশ দিয়ে গড়িয়ে ঠোঁটের কাছে এসে থামলো। আর কাঁধের উপরে ছড়ানো চুলের আগা নিঙড়ে আরেকটা চিকন স্রোত বুকের খাঁজ দিয়ে নেমে গেলো নাভির দিকে। আমি চোখ বন্ধ করে স্থির বসে রইলাম। সমস্ত শরীর জুড়ে বৃষ্টির অনুভব। সমস্ত অস্তিত্ব যেন এক অদ্ভুত তৃষ্ণায় কাতর হয়ে উঠলো।
হঠাৎ অনুভব করলাম, দিপু ভাই আমার পাশে এসে বসলেন। আমার হাত দুটো মুঠোর মধ্যে পুরে নিয়ে বললেন— রিনা, একা একা ভিজছো কেনো? চলো আমরা জলে নেমে পদ্ম ফুল তুলে আনি!
জানি না এরপর আমার কী হয়েছিল, বৃষ্টি এলেই যখন ছাদে দৌড়ে যেতাম ভিজতে, তখনই মনে হতো কেউ যেন আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমার ভেজা হাত দুটো ধরে দুই দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমি চোখ বন্ধ করে পাতাশূন্য বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে আছি কারো বুকের কাছে। ভেজা লোমশ বুকের উষ্ণতা আমাকে পাগল করে তুলছে। আমি ভিজে যাচ্ছি তুমুল বৃষ্টিতে…

একদিন ঘন মেঘ ছিলো আকাশে। বারবার মেঘের ঘন্টা বেজে উঠছিলো বিকট আওয়াজে। মা পড়তে যেতে মানা করলেন, তবু শুনলাম না। সামনেই ম্যাথ এক্সাম। সিলেবাস শেষ করতেই হবে।ছাতা নিয়ে ছুটলাম দিপু ভাইদের বাসায়। সেদিনও মিলু আসে নি। মিলুর আন্টিরা সবাই কোথায় যেন বেড়াতে গিয়েছিলো। বাসায় দিপু ভাই-ই ছিলেন শুধু। ভেতরে একটা আড়ষ্ঠতা টের পেলেও প্রয়োজনের কাছে তা টিকতে পারলো না। ম্যাথ করার ফাঁকে দিপু ভাই হঠাৎ বললেন— ছাদে দারুণ বৃষ্টি হচ্ছে রিনা। চলো কিছুক্ষণ বৃষ্টি দেখে আসি। তারপর বাকি ম্যাথগুলো সলভ করব। দিপু ভাইয়ের সরল ভঙ্গিমা আমাকে কোনো প্রকার ভাবার সুযোগ দিলো না। খুব সহজভাবে তার সাথে ছাদের সিঁড়িঘরে উঠে এলাম। দিপু ভাই আপ্লুত হয়ে বললেন— রিনা, দেখো দেখো শিল পড়ছে। কী অদ্ভুত তাই না?
আমি বললাম— হুম খুব সুন্দর।
— কখনও শিল কুড়িয়েছো তুমি?
— হুম অনেক। জানেন, শিল কুড়িয়ে বাটিতে রাখতেই গলে যেতো। কিছুতেই বাটি ভরাতে পারতাম না।
বলতে না বলতেই কয়েক টুকরো শিলা বরফ ছুটে এসে পায়ের কাছে পড়লো। আমরা আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। আমার ভীষণ ভালো লাগছিলো। এক সময় ভুলেই গেলাম এটা আমাদের ছাদ নয় এবং দিপু ভাই আমার সাথে আছেন। আচমকা নেমে পড়লাম ছাদের উপর। ছুটে ছুটে শিল কুড়াতে লাগলাম। সিঁড়িঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দিপু ভাই আমার পাগলামী দেখছিলেন আর হাসছিলেন।
বৃষ্টির বেগ আরো বেড়ে গেলো। চারদিকে সাদা জলের দেয়াল। সব শব্দ ছাপিয়ে জল পড়ার তীব্র গুঞ্জন। আমি ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছি। এক সময় গলা ফাটিয়ে ডাক দিলাম দিপু ভাইকে। তিনি ভিজতে চাইলেন না। হাসলেন শুধু। আমি গিয়ে জোর করে নাছোড় কিশোরীর মতো হাত ধরে নামিয়ে আনলাম ছাদে। দু’জনে কী আনন্দে বৃষ্টিতে ভিজছি, বৃষ্টি কুড়াচ্ছি।

হঠাৎ খেয়াল করলাম, দিপু ভাইয়ের চোখ লাল হয়ে উঠেছে। আমি চিৎকার করে বললাম, আপনার তো অবস্থা খারাপ। আপনি চলে যান দিপু ভাই, ঠাণ্ডা লেগে জ্বর আসবে নয়তো।
দিপু ভাই গেলেন না। কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। আমি শিউরে উঠলাম। কিন্তু কোনো ভীতি টের পেলাম না। দিপু ভাই এগিয়ে এসে আমার মুখ উঁচু করে ধরলেন। আমার চোখ বন্ধ হয়ে এলো। তুমুল ঘোরগ্রস্থতায় তলিয়ে যেতে লাগলাম। বৃষ্টির তোড়ে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গলে পড়লাম নিটোল মুদ্রায়…

দিপু ভাইদের বাসায় এরপর আরো কয়েকবার যেতে হয়েছিলো। তারপর এক্সাম শেষ হলো। মিলু একদিন আমাদের বাসায় বেড়াতে এসে দিপু ভাইয়ের বিয়ের কথা জানালো। আমার তখন কক্ষচ্যুত গ্রহের মতো মহাশূন্যে ছিটকে পড়ার কথা। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। লক্ষ্য করলাম, আমার ভেতরে কোনো ভাবান্তর নেই। কখনও মনে হতো, দিপু ভাই আমার কে হয়? বান্ধবীর ভাই সুত্রে ভাই, শিক্ষক, প্রেমিক, কোনটা?
এরপর মাস খানিকের মধ্যেই আমার চোখের নিচে কালি লেপ্টে গেলো। চুপচাপ গুটিয়ে গেলাম নিজের ভেতরে। কোনো যন্ত্রণা নেই। আক্ষেপ নেই। দৃষ্টিতে কারো প্রতি ঘৃণাও নেই। শুধু সন্ধ্যা বেলায় বাতি জ্বাললে বড় অসহ্য লাগে এখন। কেউ নরম গলায় কথা বললেও খুব রাগ হয়। ভালো লাগে না।

অনেক ধরাধরি করে আমার জন্য উঁচু ঘরের কয়েকটা বিয়ে জুটিয়েছিলেন মা। কিন্তু আমার প্রতিবাদের সামনে তা টেকে নি।আমি বুঝতে পারি, মা খুব চিন্তায় পড়েছেন আমাকে নিয়ে। আত্মীয়দের অনেকেরই ধারণা, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে বড় কোনো মানসিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। মা অবশ্য কারো কথা বিশ্বাস করেন না। ভাইয়াকে বলে বলে মহল্লার মসজিদের ইমামের কাছ থেকে জ্বীনের তাবিজ আনিয়ে দিয়েছেন। ইমাম সাহেব বলেছেন, সর্বদা যেন পর্দা করে চলি। খোলা চুলে বাইরে বেরোলে নাকি বদ জ্বীনের আছর পড়ে। রোগীর অবস্থা খুব নাজুক শুনেই হয়তো ইমাম সাহেব ডাবল ডোজ দিয়ে দিয়েছেন। এক সাথে দুইটা তাবিজ। একটা কোমরে বাঁধতে হবে, আরেকটা গলায়। দুটোই রূপার মাদুলিতে মোম গলিয়ে মুখ বন্ধ করা।
আমি তাবিজ দুইটা খুব যত্ন করে দরজার সাথে ঝুলিয়ে রেখেছি।
একদিন মা ভয়ে ভয়ে এসে বললেন— খুকি, তাবিজগুলো ঠিক মতো পরেছিস তো?
আমি বললাম— না।
— কেনো? দেখ খুকি, তাবিজ হলো আল্লাহর কালাম। কাছে রাখলে সব সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে দেখিস।
— আল্লাহর কালাম তো নিশ্চয়ই পবিত্র, তাই না মা?
— হুম পবিত্রই তো।
— আমি যে খুব অপবিত্র মা। আমার অপবিত্র শরীরে পবিত্র জিনিস রাখলে যে আরো পাপ হবে। আমি অনেক পাপী!
— ছিহ খুকি, এরকম বলতে নেই।
মা আমার পিঠে আলতো করে হাত রাখলেন। আমার কেমন কান্না পাচ্ছিলো। ইচ্ছে করছিলো মাকে জড়িয়ে ধরে খুব খুব কাঁদি। কিন্তুু কোথায় যেন কান্না আটকে গেলো। বিপুল শূন্যতার উত্তাপে হয়তো শুকিয়ে গেছে সব জল। বারবার নিজের উচ্চারণ শ্রবনের গভীরে সশব্দে বেজে চলছে— আমি অপবিত্র! আমি পাপী! এই সমাজ এবং মানুষদের কাছে আমি অনেক পাপী!

মা চলে গেলে জানালার বাইরে তাকালাম। সামনের বিল্ডিঙের নিচ তলাটা দেখা যায়। গেটের কাছে একটা পিকাপ দাঁড়ানো। পাশেই আরেকটা সাদা প্রাইভেট কার। পিকাপে বড় বড় আলমারি, চেয়ার, টেবিল, আরো সব আসবাবপত্র তোলা হচ্ছে। মাসের শেষ দিন। বাসা বদল করে কেউ হয়তো চলে যাচ্ছে অন্য কোথাও। প্রাইভেট কারের পেছনে সিটে এক বৃদ্ধ উঠে বসলো। শাড়ি পরা আরেক মহিলার কোলে ছোট্ট একটা বাচ্চা বাবু কাঁদছে। মহিলা বোধ হয় বাবুটার মা। বাবুটা কাঁদছে কেনো? ওর কি খিদে পেয়েছে? আমার খুব ইচ্ছে করছে ওর নরম গাল টেনে আদর করতে। কান্না ভেজা চোখের পাতায় অনেকগুলো চুমু এঁকে দিতে। খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। মাথাটা ঝিম ঝিম করে ঘোরাচ্ছে। কা রাতে কেমন বমি বমি লাগছিলো। কিন্তু বমি হয় নি। পেটের উপর হাত রাখতেই কেমন অদ্ভুত শিহরণ টের পাচ্ছি। খুব বাঁচতে ইচ্ছে করছে আমার। নিচের ওদেরকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করছে, আমাকেও নিয়ে যান আপনাদের সাথে। এখান থেকে অনেক দূরে নিয়ে যান প্লিজ। আমি নতুন করে বাঁচতে চাই। মাতৃত্বের মধুর যন্ত্রণায় আরো অনেক দিন বাঁচতে চাই!