দুইটি রাজহাঁসের মৃত্যু

[ইনামুল হাসান ]

বাসে উঠে বসেছি। জানালার পাশে বসে হেডফোন
কানে লাগিয়ে কবিতা আবৃত্তি শুনছি আর ফেসবুকিং করছি। বাস থামছে একটু পর পর। শহর ছেড়ে তখনও বের হয়নি। কাউন্টার থেকে যাত্রী উঠাচ্ছে। শহরের একেবারে শেষের দিকের একটা স্টপেজ থেকে এক মহিলা তার স্বামীকে নিয়ে বাসে উঠলো। ব্যাগগুলো বক্সে দিয়ে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ হাতে রাখলো। দুইটা রাজহাঁস ব্যাগের ভিতর। গলাটা উঁচিয়ে রেখেছে। খানিক পর পর ডাক দিচ্ছে । বাসের যাত্রীদের ভিতর এক ধরণের যাত্রী থাকে যারা কোন উল্টো- পাল্টা সহ্য করতে পারেন না। এ শ্রেণীর যাত্রীরা সবসময় প্রশংসার দাবিদার। হাঁসের ডাক সবাইকে বিরক্ত করছিলো। মহিলা তাঁর স্বামীকে নিয়ে বসেছেন সিটে। হাঁসের ব্যাগটা তার স্বামীর হাতে। স্বামী বেচারার চেহারার ভিতর এক প্রকার অপরাধ বোধের রেখা ফুটে উঠেছে। বুঝাই যাচ্ছে জীবন্ত হাঁস বয়ে নেওয়ার পক্ষে তিনি ছিলেন না। এখন তিনি সন্তর্পণে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। কখন কে রাগ করবে সেই অপেক্ষায় আছেন। এদিকে মহিলা খুব ফুরফুরে মেজাজেই আছেন। বড় ছেলের বাসায় যাচ্ছেন। বড় ছেলের বৌ রাজহাঁস খেতে চেয়েছে। তাই বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। জবাই
করে নিয়ে গেলে ভালোই হতো কিন্তু জীবন্ত নিয়ে যাচ্ছেন । নাতি দুটো রাজ হাঁস দেখে ভয়ে পালাবে। অতঃপর দাদী আদর করে কাছে টেনে আলতো করে হাঁসের পাখম ছোঁওয়াবেন। এসব ভেবেই পুলকিত হচ্ছেন তিনি।
তারপর……
সেই বিশেষ যাত্রীদের শোরগোল শুরু হলো। হয় হাঁস নামাতে হবে আর না হয় সবাই নেমে যাবেন। আমিও সুর মিলালাম। ফুল সাউন্ড দিয়ে কবিতা শুনছি , এর মাঝেও হাঁসের প্যাক প্যাক ডাক কানে ভেসে আসছে। অসহ্য . .. যাত্রীদের কথায় হাঁসদুটোকে বক্সে দেওয়া হলো। সবাই হাঁফ ছেড়ে যেনো বাঁচলো। আমিও আবার নতুন উদ্যমে নতুন কবিতা প্লে করলাম। ‘মেহেদী পাতা দেখেছো নিশ্চয় .. উপরে সবুজ .. ভিতরে রক্তাক্ত …” কবিতা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙলো একটি নারী কন্ঠের ক্রন্দনের শব্দে। উঠে দেখি বাস ঘাটে চলে এসেছে। সবাই নেমে পড়েছে। বক্স থেকে মালামাল বের করে দিচ্ছে হেল্পার । আর ..
সেই হাঁসওয়ালী হাঁসদুটোকে এক কোণে নিয়ে মার্সিয়া করছে। তার স্বামীটা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। হাঁসদুটো মরে গেছে। হাঁসের মৃত্যুটা খুব করুণ ভাবে হয়েছে। নিজেকে তখন খুনি মনে হলো। কারণ বক্সে দেওয়ার জন্য আমিও সুর মিলিয়েছিলাম । সবাই হাঁসটার পাশ দিয়ে যাচ্ছে । কেউ তাকাচ্ছে, কেউ তাকাচ্ছে না। মহিলা নিজে নিজে কথা বলেই চলেছেন। একটা হাঁসের শোকে মানুষ এভাবে কাঁদতে পারে ? নিজেকে মেহেদি পাতা মনে হলো। কবিতার মতো।