নারী || মুসা হক

বই আলোচনা

——————-মুসা হক

বইয়ের নাম: নারী
লেখক: হুমায়ুন আজাদ প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের অনন্য গ্রন্থ এই ‘নারী’

বইটি ৯২ এর বইমেলায় প্রথম বেরোয় তারপর ১৯৯৫ এ হয় নিষিদ্ধ। তারপর আবার ২০০০ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক রায়ে নিষেধাজ্ঞা বাতিল হয়। লেখক পরিচিতি:
বইটির লেখক হুমায়ুন আজাদের নাম শুনেন নি এমন পাঠক পাওয়া যাবে না। ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল বিক্রমপুরের রাড়িখালে জন্মগ্রহণ করেন। এডিনবারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। তিনি ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সমালোচক ও ভাষাবিজ্ঞানী। প্রথাবিরোধী হিসেবে খ্যাত এই লেখকের রচনা বিপুল।
২০০৪ সালের ১২ই আগষ্ট তাঁকে জার্মানির মিউনিখের তাঁর বাসায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। বইটিতে কী আছে?

বইটিতে কী আছে সেটা এই ছোট আলোচনায় তুলে ধরাটা রীতিমত ধৃষ্ঠতা। তবে আগ্রহ জাগানোর জন্য কয়েকটা কথা তুলে ধরার চেষ্টা করা যায়। চারশত পৃষ্ঠার এই বইয়ে আছে দেশের নারীর কথা, বিদেশের নারীর কথা। এ যুগের নারীর কথা, আগের যুগের নারীর কথা। নারীর দুঃখ, কষ্ট আর পীড়নের কথা। ‘নারী ও তার বিধাতা পুরুষ’ ব্যঙ্গাত্মক এই নাম দিয়ে বইয়ের প্রথম প্রবন্ধটি শুরু। প্রথম প্রবন্ধের সারবস্তু নারীর প্রতি পুরুষের বিধাতাসুলভ মনোভাব। পুরুষের; নারীর উপর সক্রিয় থাকার প্রবণতার বিশ্লেষণ।
লৈঙ্গিক রাজনীতি নামক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন লেখক নারীর প্রতি পুরুষের পীড়ন হল রাজনৈতিক পীড়ন। শক্তিশালী যুক্তি আপনার চিন্তাকে প্রভাবিত করতে বাধ্য।
নারী হঠাত করে বন্দি হয়ে পড়ে নি। সেও মুক্ত ছিল একসময়। মাতৃতান্ত্রিক পরিবারকে টুটিয়ে পিতৃতান্ত্রিক পরিবার প্রতিষ্ঠায় নারীর হয়েছে ঐতিহাসিক পরাজয়। আলোচনায় উঠে এসেছে এই কথাও।
কখনো দেবি বানিয়ে তোষামুদ করে, কখনো বা আবার দানবী বানিয়ে বাধা দিয়ে চুপসে দেয়া হয়েছে নারীর মাথা তুলে দাড়ানোর আকাঙ্খা।
আইন-কানুন আর বিধি-বিধান চাপিয়ে থামিয়ে দেয়া হয়েছে নারীর অগ্রযাত্রার চাকা। কয়েকটি পৃথক প্রবন্ধে উল্লেখিত আলোচনা করেছেন লেখক।
পুরুষতান্ত্রিক এই যাত্রায় সামিল হয়েছেন প্রতিভাবানরাও। লেখক; একটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ এর বিভিন্ন লেখালেখি উদ্বৃত করে দেখিয়েছেন পুরুষতান্ত্রিক সঙ্কীর্ণতা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারেন নি রবীন্দ্রনাথও।
ভিন্ন একটি প্রবন্ধে সুপরিচিত মনোবিশ্লেষক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের নারী বিষয়ক তত্বকে অপবিজ্ঞান আখ্যা দিয়েছেন, খন্ড করেছেন ফ্রয়েডের যুক্তি, প্রমাণ করেছেন ‘ফ্রয়েডীয় কুসংস্কার’। লেখক ভোলেন নি নারীর শরীরের কথাও। পাঠককে নারীর শরীরের জৈবিক কাঠামোর ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা দিতে সচেষ্ট হয়েছেন তাঁর লেখায়। ভেঙে দিতে চেয়েছেন ভুল ধারণার দেয়াল। মেয়েশিশু তাঁর বাল্যকাল পেরিয়ে কৈশোর-তারুণ্যে এসে কীভাবে ‘মানুষ থেকে নারী’ হয়ে উঠে তার দুঃখগাঁথাও এঁকেছেন। বইটিতে রামমোহন রায়কে নারীর প্রাণদাতা আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে জীবনদাতা হিসেবে দেখয়িছেন লেখক। অল্পকথায় ব্যাখা করেছেন নারী অধিকার প্রদানে এই দুই মহাপুরুষের ভূমিকা। পুরুষাধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও কৌশলগত লড়াই করা দুই মহিয়সী মেরি ওলস্টোনক্রাফট ও বেগম রোকেয়াকে স্মরণ করেছেন শ্রদ্ধায়, দেখিয়েছেন তাঁদের চিন্তাধারা; নারীর জন্য তাঁদের ভাবনা।
সাহিত্যে নারীর অংশগ্রহণ, পুরুষের চোখে নারীর সাহত্য আর নারীর লেখায় নারী চরিত্র কেমন এসব আলোচনা করেছেন পরপর দুটি লেখায়। ‘নারীর ভবিষ্যত’ প্রবন্ধটির দ্বারা মোটামুটি সীমারেখা টেনেছেন নারী বইয়ের মূল আলোচনার। এছাড়া অতিরিক্ত আরো কিছ প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধও আছে। কেন পড়বেন বইটি?
যুগ যুগ ধরে নারী হয়ে আসছে নিপীড়নের শিকার। পুরুষের মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ভাবে সহ্য করছে বৈষম্য। এই অনৈতিকতাগুলো উপলদ্ধি করার জন্য পুরুষ পড়বে এই বইটি আর নারী এই বইটি পড়বে নিজের জন্য, নিজের পীড়নের ব্যাপারে সচেতন হবার জন্য, নিজের অধিকার উপলদ্ধি করার জন্য। পাঠপ্রতিক্রিয়া:
নারীর ব্যাপারে আমার মনে যে ধারণা লালিত ছিল, এই বইটি সেই ধারণাকে ধাক্কা দিয়েছে। যুগে যুগে মানবজাতির এক বিশাল অংশকে সব দিক থেকে দমিয়ে রাখার এই প্রবণতা দেখে আমি ব্যথিত হয়েছি। কত্থিত ঐশ্বরিক বিধান আর কত্থিত বিজ্ঞান এর নামে নারীদের উপর চাপিয়ে দেয়া খড়গ দেখে কুন্ঠা বোধ করেছি।
এক কথায়, বইটি তার আলো দিয়ে যেমন আমায় আলোকিত করেছে, তেমনি অন্ধকার চিহ্নিত করে দেখিয়ে দুঃখিতও করেছে।
বইয়ের যে দিকটা আমার কাছে কটু মনে হয়েছে সেটা হল, পুরো বইয়ে পুরুষকে পুরোপুরি নারীমুক্তি বিরোধী হিসেবে দেখানো হয়েছে। নারীর প্রতি পুরুষের ভালোবাসাও হয়েছে উপেক্ষিত। শেষ কথা:
আমি মনে করি, এই বইতে আছে প্রত্যেক নারীর মনের কথা। নারীর অবচেতন মনে জমে থাকা ক্ষোভের কথা। যদি নারী এই ব্যাপারে সচেতন হত এবং সমাজে কথা বলার সুযোগ থাকত তবে অবশ্যই তারা এই কথাগুলা বলত। আজ হুমায়ুন আজাদ নারীর হয়ে কথাগুলো বলে দিয়েছেন; নারী বলতে পারে নি। তবে বলতে না পারলেও বলে ফেলা কথাগুলোর ব্যাপারে নারী অনেকাংশেই একমত হবে, সেটা অবশ্যই জোর দিয়ে বলা যায়।