পরিবেশের সাথে পুঁজির সংঘাত ।। জামিল আহম্মেদ মুকুল

জামিল আহম্মেদ মুকুল

পরিবেশের সাথে পুঁজির সংঘাত

       ————–জামিল আহম্মেদ মুকুল

জামিল আহম্মেদ মুকুল

পরিবেশের সাথে পুঁজিবাদের সংঘাত কি অনিবার্য ছিল ? প্রশ্নটি কয়েক দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরে ফিরে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বসাধারণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

অপ্রীতিকর হলেও সত্য যে, উত্তরটি হচ্ছে হ্যাঁ অনিবার্যই ছিল। এই অনিবার্য পরিণতির সকল বৈশিষ্ট্যই ছিল পুঁজিবাদের গর্ভে লুকায়িত। বাংলাদেশ পুরোপুরি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র না আধা সামান্তবাদী, এ নিয়ে চায়ের টেবিলে তাত্ত্বিক বিতর্কের ঝড় উঠতে পারে। তবে, পুঁজিবাদী সমাজের সকল বৈশিষ্ট্য যে রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান থাকে তা এক সময় তার রুপান্তর প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত যে চেহারায় দাঁড়ায় তা পুঁজিবাদী অর্থাৎ মুনাফা কেন্দ্রীকতাকেই প্রাধান্য দেয়। এই মুনাফার কাছে মানুষের সাথে মানুষের, মানুষের সাথে প্রকৃতির সম্পর্ক গৌণ। মুনাফার হন্ধ পুঁজির মালিককে সেই রকমেই আকর্ষণ করে যেভাবে এক ফোটা মধু আকর্ষণ করে মাছি কে। ফুলবাড়ী কয়লা খনি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনন করা হবে না টানেল পদ্ধতিতে, এ বিতর্ক, বাদ প্রতিবাদ বিক্ষোভের রেশ কাটতে না কাটতেই পাবনার রুপপুর পরামাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার যৌতিকতা ও এর বিপর্যয়ের ভয়াবহতা বিশেষ করে জাপানের ফুকুশিমা পরামাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিপর্যয় ঘটার পর বাংলাদেশের মত দেশ যার প্রতিরোধ সক্ষমতা শূন্যের কোঠায়। সেই দেশে টেকসই জ্বালানী নীতি গ্রহণ না করে ঝুকিপূর্ণ নীতি গ্রহণে কঠোর সমালোচনা চলছে বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক পর্যায়ে। এসব প্রতিবাদ-প্রতিরোধ কর্মসূচী বাগেরহাটের রামপালে ওরিয়ন গ্রুপের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এবং সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের বাঁশখালির গন্ডামারা পশ্চিম বড়ঘোনায় কয়লা ভিক্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে সংঘাত-সংগ্রাম চলছে।

আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্হায় বিদ্যুৎ শক্তি উন্নয়নের এক অপরিহার্য শর্ত। আমরা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরোধী কখনোই ছিলাম না, এখনও নই। বিরোধীতা কোন্ পদ্ধতির যন্ত্রকৌশল প্রয়োগ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, এবং কোন্ স্থানে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়েই আলোচনা করা যাক। বিজ্ঞান সম্মত যুক্তিতর্ক দিয়ে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে লাভ-ক্ষতির হিসাব নিশ্চয়ই অন্যায় নয়।
বাগেরহাটের রামপালে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ মালিকানায় ৫ শ৬৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লা ভিক্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ২০১২ সালের ২৭ জুন পিডিবি-ওরিয়ন গ্রুপের খুলনা পাওয়ার লিমিটেডের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিপত্র অনুযায়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি খুলনাতে নির্মিত হওয়ার কথা থাকলেও কেন্দ্রটি নির্মাণ হচ্ছে মংলার বুড়িগঙ্গা ইউনিয়নের শ্যাওলা বুনিয়া গ্রামে। এ গ্রাম থেকে সুন্দর বনের দূরত্ব মাত্র ১০’২২ কিলোমিটার।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অবস্হানগত ছাড়পত্র ছাড়াই ২শ একর জমি নিয়ে কেন্দ্রটির নির্মাণ যজ্ঞ শুরু হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর নির্মাণ কাজ বন্ধ াখার নির্দেশ দিলেও তা মানছে না ওরিয়ন গ্রুপ। পরিবেশ আইন অনুযায়ী কয়লা ভিক্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ” রেড ক্যাটাগরির ” যা অত্যান্ত ভয়ংকর পরিবেশদূষণ শিল্প হিসেবে চিহ্নিত। এ কারণে কয়লা ভিক্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিূমাণের পূর্বেই পরিবেশ অধিদপ্তরের অবস্হানগত ছ্ড়পত্র আবশ্যক। ছাড়পত্র গ্রহণ পূর্বক প্রকল্প এলাকায় কোনো ধরণের নির্মাণ কাজ বা ভূমি উন্নয়ন করা যাবে না। বিদ্যুৎ মন্ত্রনালয় চুড়ান্ত ছাড়পত্র নেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল এপ্রল ২০১৪ অর্থাৎ এ লেখা যখন লিখছি ঠিক তার ২ বছর আগের কথা। বিদ্যুৎ মন্ত্রনালয়ের বেঁধে দেওয়া নির্ধারিত সমঢের মধ্যে ইআইএ(Environmental Impact Assessment) প্রতিবেদন জমা দেয়নি ওরিয়ন গ্রুপ।

 

 

ইআইএ প্রতিবেদনই অবস্হানগত ছাড়পত্র পাওয়ার চুড়ান্ত প্রক্রিয়া নয় ; ইআইএ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সেই রির্পোটটি পরিবেশ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দিতে হবে। সেই প্রতিবেদনের উপর গণশুনানী হবে। অতঃপর প্রকল্পটি যৌতিক মনে হলে পরিবেশ পরিবেশ অধিদপ্তর যদি মনে করে যে, “পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ” তবেই অধিদপ্তর চুড়ান্ত ছাড়পত্র দেবে। সেটি পেলেই কেবল মাত্র প্রকল্পের উন্নয়নকাজ শুরু করা যেতে পারে।
প্রকল্পের শুরু থেকেই পরিবেশ কর্মী, বুদ্ধিজীবি এবং বাম রাজনীতিকেরা বলে আসছেন যে,বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অস্তিত্ব হুমকির সম্সুখিন হবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে। সরকার, পরিবেশ কর্মী-রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের কোনো গুরুত্ব দেয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সুন্দর বনের কোনো ক্ষতি হবে না। বিশেষজ্ঞদের সংগৃহীত সকল প্রকার তথ্য-উপাত্ত কে বিদ্যুৎ জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয় সহ সরকারি মহল থোড়াই কেয়ার করেছে। পরিবেশ কর্মী, বিশেষজ্ঞ, এবং বাম রাজনীতিকরা বলেছেন, ” বিদ্যুৎ কেন্দ্রর অনেক বিকল্প আছে, কিন্তু সুন্দর বনের বিকল্প নেই “। এর প্রতিবাদে সুন্তর বন অভিমুখে লং মার্চ হয়েছে একাধিকবার। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অসৌজন্যমূলক আচারণ করা হয়েছে লং মার্চকারীদের সাথে প্রতিবার।
আমরা সুন্দর বনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্রাংকারের ডুবিতে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল তা দেখেছি, দেখেছি এ রকম বিপর্যয় মোকাবেলায় সরকারের সক্ষমতা কতোটুকু রয়েছে তাও।
সক্ষমতা যে শুন্যের কোঠায় তা বলার আর অপেক্ষা রাখেনা। ১৯ মার্চ ২০১৫ শ্যালা নদীতে আবারো ১ হাজার ৩শ টন কয়লা বোঝাই কার্গো ডুবেছে। কার্গোটি সরানোর কোনো উদ্যোগ( সরকারের) বা কার্গো মালিকের পক্ষ থেকে লক্ষ করা যায়নি।

 

কার্গো মালিককে এজন্য কোনো রকম শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন, অতুলনীয় এক ইকোসিস্টেম এর লীলা ভূমি এবং পরিবেশ দূষণ মুক্তকরণে সুন্দর বনের কোনো বিকল্প এদেশে নেই। ইতোমধ্যেই রামসার ও ইউনেস্কো তাদের উদ্বেগ জানিয়ে সরকার কে একাধিক চিঠি দিয়েছে। ইউনেস্কো এ হুঁশিয়ারিও দিয়েছে যে, প্রকল্প স্হগিত না করলে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকে সুন্দর বনের নাম প্রত্যাহার করা হবে। ভারতীয় কোম্পানি এনটিসিপি থেকে এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে নরওয়ে সরকারের গ্লোবাল পেনশন ফান্ড নিজেদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্হা সরেজমিন তদন্ত শেষে এ প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছে। দাবি জানিয়েছে খোদ বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বিভাগ ( লিখিত আপত্তি সহকারে)।

 

২১মার্চ ২০১৬ বিশ্ব বন দিবসের বিশেষ ক্রোড়পত্রতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দর বন ও উপকুলীয় সৃজিত বন নদীর পানির উৎস হিসাবে বিবেচিত না হলেও তা প্রাকৃতিক দূর্যোগ তথা ঝড়, জলোচ্ছাস, বন্যা ইত্যাদির হাত থেকে উপকূলীয় জনপদের রক্ষা কবচ হিসাবে কাজ করছে। ‘ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত অবশেষে স্বীকার করেছেন যে, ” রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে সুন্দর বনের ক্ষতি হবে ঠিক। ” একই সঙ্গে তিনি এ কথাও বলেছেন ” কিন্তু স্হান পরিবর্তন করা যাবে না। ” প্রশ্ন হচ্ছে কেন স্হান পরিবর্তন করা যাবে না মাননীয় মন্ত্রী ? নিজেদের ক্ষতি হবে জেনেও কেউ কি চুপ করে থাকে ? আপনাদের হাত-পা কাদের নিকট বাঁধা পড়েছে ? ভৌগলিক অবস্হানগত কারণে সুন্দর বন বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ হলেও তা বিশ্ব সম্পদ। একে রক্ষার দ্বায় দু’দেশের সরকারেরও। সরকারগুলোর নিস্ক্রিয়তা বা ব্যর্থতা দু’দেশের জনগনকে প্রতিবাদে এগিয়ে আসতেবাধ্য করেছে।

 

পুঁজিপতিদের আগ্রাসনের শিকার সুন্দর বন রক্ষাূ তাই দুই দেশের পরিবেশ কর্মী ও সচেতন জনগন প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছে। ২৭ এপ্রিল ২০১৬ রোজ বুধবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘ ফার্স্ট ট্রাক প্রজেক্ট মনিটরিং কমিটির ( অগ্রাধিকার প্রকল্প) সভায় ভারতীঢ এনটিসিপি ও খুলনা পাওয়ার লিমিটেড ( যার মুল কোম্পানি ওরিয়ন গ্রুপ) কে পাঁচ বছরের কর অবকাশ সুবিধা অর্থাৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্হাপনের যন্ত্র আমদানিতে কর মওকুফ ( ভ্যাট/মূসক) এবং কোম্পানিতে কর্মরত ভারতীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনের যুক্তি তুলে ধরেই সরকার রেন্টাল, কুইক রেন্টাল,পরামাণু এবং কয়লা ভিক্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদ্যুৎ আমাদের প্রয়োজন এ কথা সত্য; কিন্তু তার চেয়ে নির্মম সত্য হচ্ছে সুন্দর বন আমাদের নিকট তারচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এক সুন্দর বন কে ঘিরে বছরে লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকা। সুন্দর বন প্রাকৃতিক দূর্যোগ অর্থাৎ ঝড় জলোচ্ছাস ইত্যাদি থেকে সমগ্র দক্ষিণ অঞ্চল কে রক্ষা করে। একটি পূর্ণাঙ্গ গাছ বছরে ৬০ পাউন্ড বিষাক্ত গ্যাস বাতাস থেকে গ্রহণ করে সমপরিমাণ বিশুদ্ধ অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে। সেই বন ধ্বংস করে ভারতীয়-বাংলাদেশি কিছু পুঁজিপতির মুনাফাকে আমরা বড় করে দেখতে পারি না। বিদ্যুৎ আমাদের অবশ্যই প্রয়োজন কিন্তু সুন্দর বন কে বিসর্জন দিয়ে নয়। গুটি কয়েক মুনাফাখোর পুঁজিপতির স্বার্থ রক্ষার্থে বিশ্ব ঐতিহ্য সিন্দর বন কে আমরা বিসর্জন দিতে পারি না।
জাপানের ফুকুশিমা পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিপর্যয়ের পর সমগ্র বিশ্ব যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুকছে, তখন আমরা হাঁটছি উল্টো পথে।
লেখক ● সম্পাদক
ফাস্ট বিডি নিউজ২৪ডট কম
fastbdnews24.com

jamilmukul365@gmail.com

 

 

ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪/ই ই