পুঁজিবাদের সাথে পরিবেশের সংঘাত || জামিল আহম্মেদ মুকুল

জামিল আহম্মেদ মুকুল

ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ● 

জামিল আহম্মেদ মুকুল

জামিল আহম্মেদ মুকুল ● [dropcap]ঘূর্ণিঝড়[/dropcap] ও জলোচ্ছাসের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়। বাংলাদেশে ঝড়ের আঘাত হানার লক্ষ্যস্থল হচ্ছে টেকনাফ থেকে দুবলার পর পর্যন্ত ৭২০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূল এবং তৎসংলগ্ন দ্বীপ ও চরাঞ্চল। এই ৭২০ কিলোমিটারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে সুন্দরবন অর্থাৎ খুলনা-বরিশাল উপকূল ও মেঘনার মোহনায়। ৭২০ কিলোমিটার বিস্তৃত দীর্ঘ উপকূলের এই অঞ্চলটি (খুলনা-বরিশাল) আদর্শ টার্গেট।

সুদুর অতীতকাল থেকে এ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দূর্যোগ আঘাত হানলেও এর ইতিহাস রেকর্ড সংরক্ষণ শুরু হয়েছে ১৫৮৪ সাল থেকে। সম্রাট আকবরের শাসনামলে লিখিত আইন-ই-আকবরী এবং রিয়াজ-উস-সালাতিন গ্রন্থ থেকে প্রথম দালিলিক প্রমাণ উঠে আসে। ৪২২ বছর আগে এ অঞ্চলে ঘটে যায় এক প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় ঝড়। এই ঘূর্ণিঝড় খুলনা-বরিশাল অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসলীলা ঘটিয়েছিল। ১৫৮৪ সালে সুন্দরবনের বিস্তৃতি বরিশাল উপকুল পর্যন্ত প্রসারিত থাকার পর ও উপকূলীয় অঞ্চলটিতে ধ্বংসযজ্ঞ চলেছিল ব্যাপক। প্রকৃতির ঢাল সুন্দরবন প্রতিরক্ষা ব্যুহ রচনা করার পরও সেদিনের ঘূর্ণিঝড়ে ২ লক্ষ আদম সন্তানকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। উল্লেখ্য যে তখন সুন্দর বনের বিস্তৃতি ছিল নোয়াখালির মেঘনা মোহনা পর্যন্ত অপরদিকে জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল অনেক কম। বর্তমান সময়ের জনঘনত্বের পরিমাপে ৫ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটতো বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। বাংলাপিডিয়া থেকে ১৫৮৪ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ৪৮টি বড় ধরনের ঝড় ও জলোচ্ছাসের বিবরণ আমরা পাচ্ছি। যদিও এই সময়ের মধ্যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সংখ্যা শতাধিক। শুধুমাত্র ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঝড় ও জলোচ্ছাসে টেকনাফ থেকে দুবলার চর পর্যন্ত বিস্তৃত উপকুলীয় অঞ্চলে ১০ লক্ষ মানুষের জীবন দিতে হয়েছিল।

ঘূর্নিঝড় বা জলোচ্ছাসের বিস্তারিত ইতিহাস লিখতে আমি বসিনি। তবে, আলোচ্য বিষয়ের শিরোনাম ও উদ্দেশ্যর সাথে এর সম্পর্ক গভীর। প্রাণ-প্রকৃতি-জীববৈচিত্র পরস্পর পরস্পরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাণকে যেমন প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার অবকাশ নেই। তেমনি, বিচ্ছিন্ন করে দেখাও যায় না। বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা প্রাণ বিপন্ন করারই নামান্তর। মহাবিশ্বে এখনো পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া গ্রহের মধ্যে পৃথিবীই প্রাণ ধারণের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ বিরাজমান। অর্থাৎ বিজ্ঞানের এতো অগ্রসরতা সত্ত্বেও মানুষ চাইলেও চাঁদ বা অন্য কোন গ্রহে যেয়ে তার বসতি গড়ে তুলতে পারবে না। এসবদিক বিবেচনায় নিয়েই আমরা বলে থাকি” আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী বিনির্মাণই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার” কোনো পাঠক হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন। ‘সত্যিই তো আমাদের উত্তর প্রজন্মের জন্য একটি নির্মল বাসযোগ্য পৃথিবী বিনির্মাণ করতে হবে। সেই বিনির্মাণের সাথী আমিও হতে চাই। কে বাঁধা দিচ্ছে এ কাজে? আমি বলছি সব বাঁধা কি ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য? সব বল প্রয়োগ কি খালি চোখে দেখা যায়? সব উন্নয়ন কি সেই দেশের মানুষের স্বার্থে হয়। বেশির ভাগ (তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর) উন্নয়ন তো হয় শ্রেফ উন্নতদেশগুলোর নিজেদের স্বার্থেই। যুদ্ধ যেমন হয় অস্ত্র রপ্তানিকারক উন্নত দেশ গুলোর স্বার্থে ঠিক তেমনি যুদ্ধ পরবর্তী দেশ পুনর্গঠন ও হয়ে থাকে উন্নত দেশগুলোর স্বার্থে। এ দু’টোই ঘটে সেইসব স্বার্থকে কেন্দ্র করে যে স্বার্থকে আমরা বলছি ‘মুনাফা’। পুঁজিপতিদের মুনাফার প্রয়োজন, আর এই মুনাফার প্রয়োজনেই পুঁজিপতি বা পুঁজিবাদী সমাজ পৃথিবীর নানান স্থানে আগ্রাসন চালিয়ে থাকে। আগ্রাসনের এই মাত্রা আজ যে রূপে দাঁড়িয়েছে তাকে আমরা বলছি কর্পোরেট পুঁজি। ছোট ছোট স্থানীয় পুঁজি জমাট বেঁধে বৃহৎ অতিদানবে পরিণত হওয়া আধুনিক পুঁজির নাম “কর্পোরেট পুঁজি সাম্রাজ্য”।

সাম্রাজ্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রচ্ছন্ন ও আগ্রাসী রূপের নাম হচ্ছে কর্পোরেট সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের বিস্তার আঞ্চলিকতা কে মাড়িয়ে বিভিন্ন দেশে তার বাহু প্রসারিত করে। প্রসারিত বাহুর কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে দরকার হয় আঞ্চলিক অফিস, কোট টাই পরা কর্মচারী; কিন্তু মুল নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থাকে কর্পোরেট পুঁজির নিজ দেশে (হেড অফিস)। যেখান থেকেই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়, আসে বিশেষ নির্দেশনা। এসব সাম্রাজ্য বা বহুজাতিক কোম্পানির সাথে যুক্ত থাকে একাধিক দেশের রাঘব বোয়াল বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক বা উদ্যোক্তারা। আবার উৎপাদিত পণ্যের বাজার ও হয় অনেকগুলো দেশ জুড়ে। আমাদের মতো গরিবদেশ গুলো সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক সংস্থাগুলোর দিকে চেয়ে থাকে।

আমরা মনে করি এদের বিনিয়োগের ফলে দেশ উন্নত হবে, দেশের অভ্যন্তরে বর্হিদেশের পুঁজি সঞ্চালনের ফলে দেশীয় উদ্যোক্তা তৈরীর পথ সুগম হবে। আর অপরদিকে বহুজাতিক এই সব কর্পোরেশনের আদর্শ টার্গেট হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের এই সব দেশগুলো। এখানকার শ্রম অত্যান্ত সস্তা, রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিগ্রস্থ, আর সামরিক-বেসামরিক আমলারা কমিশন খাওয়ার মুখিয়ে আছে। সস্তা শ্রম আর বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের উৎস এদের উৎপাদিত পণ্যে এদে দেয় বিশাল অংকের মুনাফা। অসৎ রাজনীতিবিদ, আর ঘুষখোর আমলাদের কল্যাণে বিভিন্ন রকমের কর নানান কৌশলে ফাকি দিয়ে মুনাফার সিংহভাগ অবৈধ পথে নিয়ে যায় নিজ দেশে। উন্নয়নের পর্দা ঝুলিয়ে নিংড়ে ছোবড়া বানিয়ে ফেলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে। গরিব অসহায় নাগরিকদেরকে বঞ্চিত করে তাদের প্রাকৃতি থেকে প্রাপ্তযোগ্য সম্পদ থেকে। সময়ে এসব কোম্পানি গরিবদেশগুলোর স্থানীয় শিক্ষা-সাংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে; এর উদ্দেশ্য থাকে সুদুর প্রসারি। ধিরে ধিরে নিজেদের উপর নির্ভরশীল করে তোলে ওই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীগুলোকে। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধীর জন্য মাঝে মাঝে এদেরকে ভয়ংকর হয়ে উঠতে হয়। স্বার্থবিঘ্নকারী সরকারকে সরিয়ে পছন্দসই সরকার বসানোর উদাহরণ ডজন ডজন দেওয়া যেতে পারে।

মধ্যযুগীয় সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে এদের তফাৎ হলো এরা সরাসরি কোনো রাষ্ট্র দখল করে না। পর্দার অন্তরালে থেকে ক্ষমতার পালা বদলে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে। নিয়ন্ত্রকের মূলে থাকে মুনাফার নিশ্চয়তা। এর জন্য যত রকম কৌশল আছে কূটনৈতিক সামরিক, সাংস্কৃতিক সবকিছুই এরা ব্যবহার করে। এসব কোম্পানির বার্ষিক বাজেট তৃতীয় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশগুলোর জাতীয় বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি থাকে তাই এদের কাছে কোনো বাঁধা-বাঁধাই না।

৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস কে সামনে রেখে এ লেখা যখন লিখছি তখন ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে তান্ডব চালাচ্ছে ( আজ ২০/০৫/২০১৬ ইং তারিখ) ৭নং বিপদ সংকেত জারি করা হয়েছে। অথচ মাত্র ৭দিন আগেও অসহ্য গরমে পুড়ছিল দেশবাসী। প্রতিবেশি দেশের ওড়িষায় হিট স্টোকে কয়েকশত মানুষ মারা গেছে। প্রচন্ড গরমের মাঝে হঠাৎ ঘূর্ণিঝড় লন্ডভন্ড করে দিয়ে যাচ্ছে জনপদের পর জনপদ । এই পরিস্থিতিতে পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে আঞ্চলিক আবহাওয়া বদলে যাবে এটা স্বাভাবিক। বদলে যাওয়ার গতিরোধ করা হয়তো সম্ভব নয় তবে, শ্লোথ করা অবশ্যই সম্ভব। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ দায়ী না হলেও এর অভিখাতের সম্মুখীন বাংলাদেশ। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে নদী মাতৃক এই দেশটি। আঞ্চলিক পানি বন্টনে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিমাতাসূলভ আচরণ ইতোমধ্যেই ৫২টি নদীর মরে গেছে। মরে গেছে এইসব নদীগুলোর শাখা বা উপনদী সমূহ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অদুরদর্শী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নদী কমিশনের দায়িত্ব ঠিকমত পালন না করা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের দ্বারা নদী দখল, সময়মত নদী সংস্কার না করা ইত্যাদি কারনে প্রতিবছরের তুলনায় পরের বছর গরমের তীব্রতা বাড়ছে বৈ করছে না। দেশ মরুকরণ রোধে নেই নেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ। লোক দেখানো সামাজিক বনায়ন কর্মসূচী প্রতিবছরই পালন করা হয় কিন্তু তা লোক দেখানোই। ২১মার্চ ছিল আন্তর্জাতিক বন দিবস। এ দিবসে ঘটা করে বন অধিদপ্তর, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার থেকে যে বিশেষ ক্রোড়পত্র পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে তাতে বন বিভাগ ষ্পষ্টত চতুরতার আশ্রয় নিয়েছে। মাননীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সচিব এবং প্রধান বন সংরক্ষক বাণী দিয়েছেন। এ দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন বন রক্ষক, প্রশাসন ও অর্থ বন অধিদপ্তর।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে সম্মনিত মন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা অন্যদের লেখায় একটি দেশে কতটুকু বন থাকা প্রয়োজন আর বাংলাদেশে কত শতাংশ বন আছে তার উল্লেখ নেই। অর্থাৎ বন অধিদপ্তর পরিসংখ্যান দিতে পারছে না যে বাংলাদেশে কত শতাংশ বন সম্পদ রয়েছে। নাকি বন অধিদপ্তর লজ্জা পাচ্ছে সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করতে। নির্বিচারে বনজ সম্পদ ধ্বংস পরিকল্পিতভাবে বন উজাড়, ভূমি দস্যুদের কে বনজ সম্পদ দখল করতে দেওয়ার কারণে এদেশে এখন মোট ভূমির ৭/৮% বন সম্পদ রয়েছে। যা উল্লেখ করতে হয়তো বন অধিদপ্তরের কর্তা ব্যক্তিগন লজ্জা পাচ্ছেন। নদী মাতৃক দেশে বনজ সম্পদ নেই কথাটার অর্থ হলো, পুকুরে মাছ আছে কিন্তু পানি নেই, এর মত। একদিকে নদী মরে গেছে অন্যদিকে বন সম্পদ নির্বিচারে উজাড় করার ফলে দেশ দ্রুত মরুকরণ প্রক্রিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার উপর মড়ার উপর খাড়ার ঘা এর মত দেশে বিদ্যুৎ সংকটের অজুহাতে নতুন নতুন রেন্টাল, কুইক রেন্টাল, কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের হিড়িক পড়ে গেছে। দেশে বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে একথাটা খুবই সত্য, আর এটাও সত্য যে বিদ্যুৎ সংকট থেকে দেশকে বের না করতে পারলে উন্নয়নের চাকা এক সময় স্তব্ধ হয়ে যাবে। তবে, একথাও আমাদেকে মনে রাখতে হবে যে, বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে আমরা যে পদক্ষেপ গুলো নিচ্ছি তা যেন টেকসই হয়। একটি সংকট সমাধানে একাধিক সংকট টেনে আনার মত পরিস্থিতি যেন তৈরী না হয় সে দিক আমাদেরকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
মাগুর ছাড়া গ্যাস কুপের খনন দুর্ঘটনার বিপরীতে অক্সিডেন্টাল কোম্পানির কাছ থেকে বাংলাদেশ কোনো ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেনি। ওই দুর্ঘটনায় কত টাকার গ্যাস নষ্ট হয়েছে বা পরিবেশের কত ক্ষতি হয়েছে তার আর্থিক মুল্যই বা কতো সেটাও সরকারি পর্যায় থেকে বিশেষজ্ঞ দ্বারা সঠিক ভাবে নিরুপণ করা হয়নি। যে টুকু চেষ্টা করা হয়েছে তা করেছেন বেসরকারি পর্যায়ে দেশ প্রেমিক পরিবেশ সচেতন কিছু বিশেষজ্ঞ। মাগুরছড়া দুর্ঘটনা সর্বপ্রথম আমাদের দেশের দেশপ্রেমিক পরিবেশ সচেতন বাম রাজনৈতিক ও বুদ্ধীজীবি ও বিশেষজ্ঞদের রাজপথে নামতে বাধ্য করলো। প্রশ্ন উঠলো রাষ্ট্রের আমলারা যখন কোনো বিদেশি কোম্পানির সাথে চুক্তি করেন তখন কাদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন?
নিজ দেশের না কোম্পানির? অভিজ্ঞতা আমাদেরকে বলে আমলারা যখন কোনো বিদেশি কোম্পানির সাথে চুক্তি করে তখন বিদেশিদের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। শুধুমাত্র চুক্তিপত্রের শর্তে উল্লেখ না থাকার কারনে মাগুর ছড়ার ক্ষতিপূরণ আমরা আদায় করতে পারিনি। প্রশ্ন উঠতে পারে চুক্তিপত্র তৈরীর সময় এসব বিষয় মাথায় রেখে চুক্তিপত্র তৈরী করা হয়েছিল কি? আমাদের দেশবাসির মনে হয়েছে দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে ইচ্ছাকৃত ভাবেই চুক্তিপত্রে ফাঁক রাখা হয়। সাবেক জ্বালানী সচিব পরে বিএনপির মন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের ইউনিকলের নিকট থেকে দামি গাড়ী উপহার নেওয়া তার ছোট্ট একটা উদাহরণ। দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে উপটৌকন আসে না, যা আসে দেশি-বিদেশি কোম্পানির স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে। আমরা শুধু চোখের সামনে একটি গাড়ী নেওয়া দেখেছি; অন্দরমহলে আরো কতো লেনদেন হয়েছে অন্য পথে তার কোনো হিসাব কি আছে? অন্দর মহলে লেনদেন যে এখনো হচ্ছে না তাইবা বলি কিভাবে? গত পাঁচ বছরে এদেশে কোটিপতি বেড়েছে চৌত্রিশ হাজার। দেশটা কি আলাদীনের চেরাগ যে এক শ্রেণীর মানুষ হঠাৎ করেই কোটিপতি হয়ে যাচ্ছে? মাগুরছড়ায় অক্সিডেন্টালের পরে আমরা দেখলাম দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনি নিয়ে রঙখেলা। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়লা উৎপাদন কোম্পানি বিএইচপি ১৯৯৪ সালের ২০ আগষ্ট বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে ফুলবাড়ীতে কয়লা সম্পদ অনুসন্ধানের লাইসেন্স সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে ফুলবাড়ীতে উন্নতমানের বিশাল পরিমাণ কয়লা মজুদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। ৯৭ সালে বিএইচপি কোনো এক অজানা কারণে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ এশিয়া এনার্জির নিকট লাইসেন্স হস্তান্তর করে চলে যায়। এখানে প্রশ্ন ওঠে সরকার বিএইচপি যখন চুক্তি করলো তখন লাইসেন্স হস্তান্তর সংক্রান্ত ধারাগুলো দুর্বল রাখা হয়েছিল কার স্বার্থে? এদেশের আমলারা অপেক্ষাকৃত অদক্ষ এবং দুর্নীতিবাজ। তাই বলে দেশ বিক্রি করে দেওয়ার মত চুক্তি জেনে বুঝে এরা করবে? লাভজনক এবং উন্নতমানের কয়লা থাকার নিশ্চয়তা পাওয়া সত্ত্বেও বিএইচপি হঠাৎ করে চলে গেল কেন? আর ঠিক সেই সময় ভূইফোঁড় এশিয়া এনার্জির জন্ম। এই ভূইফোঁড় কোম্পানির নিকট বিএইচপির মত স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান কেনইবা লাইসেন্স হস্তান্তর করলো আর সরকারইবা কোন রহস্যজনক কারনে তা নিরবে মেনে নিল। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে না ট্যানেল পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন এই নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত জল্পনা-কল্পনা, বাদ-প্রতিবাদ, এক পর্যায়ে গণ বিস্ফোরণ। নিহত-আহতদের ত্যাগের বিনিময়ে ২০০৬ সালের ৩০ আগষ্ট সরকারের সাথে জনগনের একটি চুক্তি হয়। “ফুলবাড়ী চুক্তি”। সমগ্র বাংলাদেশের কোনো স্থানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করা যাবে না। এবং অনভিজ্ঞ, ভূইফোঁড় এশিয়া এনার্জিকে এদেশ থেকে বহিস্কার করতে হবে এই শর্তে সরকার-জনগনের সেদিন চুক্তি হয়। অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে, বিএইচপি তাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে সুনাম তা অক্ষুন্ন রাখতে এবং উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খননে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিষয়টি মাথায় রেখে বিরাট অংকের ক্ষতিপূলণের ঝুকি নিতে চাইনি। আবার সহজলভ্য মুনাফাকে হাতছাড়া করতে তারা ইচ্ছুক ছিল না, তাই নেপথ্যে থেকে জন্ম দেয় এশিয়া এনার্জি নামক সংস্থাটির। এই সংস্থার নিকটেই হস্তান্তর করে কয়লা উত্তোলনের লাইসেন্স। এতে করে বিএইচপির সুনাম একদিকে যেমন অক্ষুন্ন থাকলো, অন্যদিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দ্বায়ভার ও নিতে হলো না। মাঝখান থেকে মুনাফা হাতঘুরে ঠিকই বিএইচপির ঘরেই উঠবে (এটা নেহায়েৎ আমার অনুমান)। আমাদের পানি সম্পদ, আবাদি জমি, পরিবেশ-প্রতিবেশ চক্র বিনাশি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিরুদ্ধে ফুলবাড়ী অঞ্চলের বাঙালি আদিবাসি সকলের সম্মিলিত প্রতিরোধ লড়াই এখনো চলছে। সরকার যখন তার উপর অর্পিত দায়িত্ব এড়াতে চাচ্ছে তখন নিজেদের পরিবেশ-প্রতিবেশ চক্র বাঁচাতে নিজেদেরকেই এগিয়ে আসতে দিনাজপুরসহ সমগ্র উত্তরাঞ্চল ঐক্যবদ্ধ। ২০০৬ সালে সরকার-জনগন চুক্তির সময় বর্তমানের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেত্রী ছিলেন। ফুলবাড়ীর যৌক্তিক আন্দোলনে তার সমর্থনও ছিল। তিনি এখন ক্ষমতায়, অবিলম্বে সেই ঐতিহাসিক ফুলবাড়ী চুক্তি তিনি বাস্তবায়ন করবেন বলে আমরা আশা রাখি। বাতাসে গুঞ্জন আছে যে, ফুলবাড়ী কয়লা খনি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তোলনের মত আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত যেন সরকার নেয় সেই লক্ষে এশিয়া এনার্জি সরকারি আমলা এবং কিছু রাজনৈতিক নেতা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে আমাদের বিচক্ষণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এরকম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে দূরে থাকবেন। পরিস্থিতি যদি সেদিকে যায় তবে, উত্তরাঞ্চলের ভবিষ্যৎ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য সমগ্র দেশবাসীকে মাশুল দিতে হবে।

কয়লা নিয়ে আলোচনা আরো প্রয়োজন। এ লেখার মূল উদ্দেশ্যও অনেকটা সেরকম। তবে তার আগে ঘুরে আসা যাক-ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। বিদ্যুতের চাহিদা নেই এমন একটি দেশ খুজে পাওয়া দুষ্কর। পৃথিবীর প্রতিটি দেশ তার বর্ধিত বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

এক সময় ধারণা করা হতো পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র এসমস্যার সমাধানে সবচেয়ে ভালো উপায়। কিন্তু বিশ্বের দেশে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা ও তার বিরুপ প্রতিক্রিয়া মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। জাপানের কুকুশিমা পরমানু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিপর্যয় চোখ খুলে দিয়েছে সমগ্র বিশ্বকে। আন্তর্জাতিক আনবিকশক্তি কমিশনের সকল নিয়ম নীতি কঠোর ভাবে অনুসরণ করেই জাপানের পরমানু বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পরিচালিত হয়। ভূমিকম্প প্রবণ জাপানে যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি ও ব্যাপক ও উন্নতমানের। ফুকুশিমা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে অদক্ষতা বা অবহেলার কারণে বিপর্যয় ঘটেনি। ভূমিকম্প ও তৎ সৃষ্ট সুনামি বিপর্যয় ডেকে আনে। তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধার কর্মীদের টিম মাঠে নামে। এরপরও ক্ষয়ক্ষতি একেবারে কম হয়নি। এরপর থেকে বলতে গেলে সমগ্র বিশ্বই নবায়নযোগ্য টেকসই জ্বালানির দিকে ঝুকতে থাকে। জাপানে তো সর্বোচ্চ কারিগরি প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থাৎ এক কথায় সৌর বিদ্যুতের ব্যাপক ব্যবহার রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় স্থাপনে প্রনোদণা দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাপি সৌর বিদ্যুতের উৎপাদন ১০০ গিগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে ২০১৩ সালেই। বাংলাদেশে ইনফ্রাস্টাকচার ডেভলপমেন্ট কোম্পানি (ইউকল) এর তথ্য অনুযায়ি ২০১৫ সালের মধ্যে প্রায় দুই কোটি মানুষকে সোলার হোম সিস্টেমের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কাজ এগিয়ে চলছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিগত অবস্থান সুবিধাজনক হওয়ায় বছরের ৩৬৫ দিনের ২০/২৫ দিন ব্যতিত বাকি ৩৪০ দিনই সৌরশক্তির সন্তষজনকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

এতো সম্ভাবনা সত্ত্বেও রুপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ আমাদের সরকার শুরু করে দিয়েছে। অথচ বিপর্যয় রোধের প্রযুক্তি শূন্যের কৌঠায়। সুন্দর বনের শ্যালা নদীতে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে তেলবাহী ট্রাংকারের ডুবিতে ছড়িয়ে পড়া তেল যে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল তা রোধে সরকারের কোনো রকম প্রস্তুতি ছিল না। এমনিতে ভূ-অবস্থানগত কারণে ভূমিকম্পনের ঝুকির সম্মুখিন আমাদের দেশ। ইন্ডিয়ান প্লেট-বার্মিজ প্লেট এবং ইউরোনিয়ান প্লেটের মধ্যবর্তী অঞ্চল হওয়ায় বড় ধরণের ভূমিকম্পের ঝুকি সব সময় রয়েছে। কিন্তু বিপরীতে প্রস্তুতি কতটুকু? যে টুকু প্রস্তুতি আছে তা বন্যা-সাইক্লোন মোকাবেলার জন্য এবং তা অপর্যাপ্ত। এরপরও পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মত ঝুকি আমরা নিতে যাচ্ছি। যা পরিচালনায় বা ঝুকি মোকাবেলায় কোনো দক্ষকর্মী আমাদের নেই। আশঙ্কার আর একটি কারণ স্পষ্টত: আমরা দেখতে পাচ্ছি সরকার ২০১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোম্পানি ও তার কর্মকর্তা-পরিচালকদের কে দায় মুক্তি দিয়ে বিল পাস করেছে।

জাতীয় সংসদে পরামানু বিদ্যুৎ বিল ২০১৫ উত্থাপন করে তা আইনে রুপান্তর করা হয়েছে। “সরল বিশ্বাসে কৃত কাজকর্ম রক্ষণ” শিরোনামে এই বিলের ২৮তম ধারায় বলা হয়েছে এই অধ্যাদেশ জারির পূর্বে বা পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনার বিষয়ে সরল বিশ্বাসে কৃত কোন কাজকর্মের জন্য সরকার, চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রকল্প পরিচালক অন্য কোন পরিচালক, পরামর্শক, উপদেষ্টা, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোন দেওয়ানী বা ফৌজদারী মামলা বা অন্য কোন আইনত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না।

বিলের এই ধারাটি কিন্তু গা শিউরে ওঠার জন্য যথেষ্ঠ। ইচ্ছাকৃতভাবেও যদি নিম্ন মানের কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাহলেও “সরল বিশ্বাসে” শব্দ দুটি দিয়ে পার পাওয়া যাবে। পার পেয়ে যাবে প্রকল্পের রাঘব বোয়াল থেকে চুনোপুটি পর্যন্ত সবাই। বিপর্যয়ের সকল দায়ভার এদেশের আপমর জনসাধারণের এবং জীববৈচিত্রের।
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ দেশের জনগণের দায় মুক্তির দায় কে নেবে? পুঁজিপতি না মুনাফার উদ্দেশ্যে চালিত পুঁজি?

বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বিনিয়োগে বাগেরহাটের রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। সরকার এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ১৮৩৪ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা আছে প্লান্টটির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে পর্যায়ক্রমে ২৬৪০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা। দেশী-বিদেশী এসব বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনার সময় আমাদেরকে একটি হিসাব মাথায় রাখতে হবে। আর তা হলো আজকের দিনে কোন বিদেশী প্রাইভেট বিনিয়োগকারী কোম্পানি যদি হিসাব করে দেখে যে তিন বছরের মধ্যে তার বিনিয়োগ তুলে ফেরত পাবার সম্ভাবনা নেই তবে ঐ বিনিয়োগকে অনাকর্ষনীয় মনে করে। তার অর্থ হচ্ছে কোম্পানি আশা করে বিনিয়োগের ফেরত হতে হবে কমপক্ষে ৩৩%। এই হিসাবটি স্মরণে রেখেই দেশি-বিদেশী সকল বিনিয়োগকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সরকারি হিসাবে এই প্লান্টটি ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত সুন্দর বনের সংরক্ষিত অংশের ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বাস্তবে সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত। প্রশ্ন হচ্ছে ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত ওয়াল্ড হেরিটেজ সাইট টুকুই কি সুন্দরবন না বনাঞ্চলের সবটুকু জুড়েই সুন্দরবন? এর পাশাপাশি ভারতের অন্য একটি কোম্পানি এনটিসিপি ও খুলনা পাওয়ার লিমিটেড (ওরিয়ন গ্র“পের) এর যৌথ উদ্যোগে সুন্দরবনের অতি সন্নিকটে মংলার বুড়িগঙ্গা ইউনিয়নের শ্যাওলা বুনিয়া গ্রামে ৫৬৪ মেগওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন আরেকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। ওরিয়ন-এনটিসিপির এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সুন্দরবন থেকে ১০.২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পরিবেশ অধিদপ্তরের আইন অনুযায়ী কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র “রেড ক্যাটাগরির”। যা অত্যান্ত ভয়ংকর পরিবেশ দূষণ শিল্প হিসাবে চিহ্নিত। এ কারণে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পূর্বেই পরিবেশ অধিদপ্তরের “আবস্থানগত ছাড়পত্র” আবশ্যক। ওরিয়ন অবস্থানগত ছাড়পত্র ছাড়াই ভূমি উন্নয়ন ও অন্যান্য কাজ শুরু করেছে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সরকার ২০০ একর ভূমি বরাদ্দ ও দিয়েছে। এখানেই শেষ নয় ২৭ এপ্রিল ২০১৬ রোজ বুধবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ফাষ্ট ট্রাক প্রজেক্ট মনিটরিং কমিটির (অগ্রাধিকার প্রকল্প) সভায় ভারতীয় এনটিসিপি ও খুলনা পাওয়ার লিমিটেড (যার মূল কোম্পানি ওরিয়ন গ্র“প) কে পাঁচ বছরের জন্য কর অবকাশ সুবিধা অর্থাৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের যন্ত্র আমদানিতে কর মওকুফ (ভ্যাট/মূসক) এবং কোম্পানিতে কর্মরত ভারতীয় কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ২৩ মে ২০১৬ রোজ সোমবার একটি জাতীয় দৈনিক জানাচ্ছে “রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে প্রকল্পে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত ছয়টি পণ্যের উপর শতভাগ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট/মূসক) অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। মূল্য সংযোজন কর আইন ১৯৯১ এর ১৪ উপধারা (২) প্রদত্ত ক্ষমতা বলে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত ছয়টি পণ্য বা সেবার উপর শতভাগ এ মূসক অব্যহতি প্রযোজ্য হবে। এই পণ্য বা সেবার মধ্যে রয়েছে বন্দর, ফ্লেইট ফারাওয়ার্ড, বিমা কোম্পানী, প্রকল্পের কন্টাক্টর, সাব-কন্টাক্টরের স্থানীয়ভাবে পণ্য সেবা ক্রয় ও ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র কয়লা ভিত্তিক হওয়ায় এর বিপদ সমূহ সম্পর্কে আমাদেরকে আগে থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে এরকম প্রস্তুতি এ প্লান্ট দু’টিতে কতটুকু থাকবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিশেষ করে কোনো রকম নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করার প্রবণতা আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। কয়লায় পরিবেশ সম্মত সালফারের পরিমাণ ১%। ১% সালফারযুক্ত কয়লাকে আদর্শ কয়লা বলা হয়। বাংলাদেশের ইট ভাটা গুলোতে যে কয়লা ব্যবহৃত হয় সেখানে ৭ থেকে ১৫% সালফারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কোনো এক অজানা কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর এর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। রামপালে এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কি? রামপালে প্রতি বছর কয়লা পুড়বে ৪৭ লক্ষ ২০ হাজার টন। প্রতিদিন ১৩ হাজার মেট্রিকটন। এতে ছাই বা ফ্লাইএ্যাশ হবে প্রতিদিন ১ হাজার ৬শত মেট্রিকটন। ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতি বছর ৭৯ লক্ষ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে, যা শোষণ করতে প্রয়োজন ৩৪ কোটি গাছের। ৫২ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হবে (যদি কয়লায় ১% সালফারের উপস্থিতি ধরে নেওয়া হয়) যা এসিড বৃষ্টির জন্য প্রধানত দায়ী। ৩১ হাজার টন নাইট্রোজেন অক্সাইড উৎপন্ন হবে। ১৩০০ টন অতি ক্ষুদ্র ধুলার কণিকা যা ফুসফুসসহ বিভিন্ন রোগের কারণ। ১৯০০ টন বিষাক্ত কার্বন মনোঅক্সাইড, ৪৪০ পাউন্ড মারকারি পারদ, ৫৯০ পাউন্ড আর্সেনিক, ৩০০ পাউন্ড সীসা, ১০ পাউন্ড ক্যাডমিয়াম। বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখতে প্রয়োজন হবে বিপুল পরিমাণ মিঠা পানি। বিদ্যুৎ কেন্দ্র শীতলীকরণসহ বিভিন্ন কাজে পশুর নদী থেকে ঘন্টায় ৯ হাজার ১৫০ ঘনমিটার পানি উত্তোলন করতে হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহারের পর পরিশোধনের পর (যদি তা যথাযথভাবে পরিশোধিন করা হয় তবেই) ৫ হাজার ১৫০ ঘনমিটার পানি আবার নদীতে ফেরত যাবে। এর ফলে পশুর নদী থেকে প্রতি ঘন্টায় নীট পানি উত্তোলন হবে ৪ হাজার ঘনমিটার পানি। প্রতি ঘন্টায় এতো বিপুল পরিমাণ পানি প্রত্যাহারের ফলে নদীতে পানির যে শূন্যতা দেখা যাবে তা পূরণ হতে নোনা পানির আগ্রাসনের প্রবণতা বেড়ে যাবে আগের চেয়ে বেশি। প্রকল্পের কয়লা ধোয়ার জন্য ভূগর্ভস্থ থেকে ২৫ হাজার কিউবিক মিটার পানি উত্তোলন করা হবে প্রতিদিন। এ কাজ চলবে এক নাগাড়ে ২৫ বছর ধরে। এর ফলে ভূগর্ভের পানির স্তর নেমে যাবে, মিঠা পানির শূন্যতা পূরণ করবে নোনা পানি।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর আড়াইশ কিলোমিটার গতিতে আঘাত হানা সিডরের ধাক্কা সর্বপ্রথম রুখে দাড়িয়েছিল সুন্দরবন। বন অধিদপ্তর ও ইউনেস্কোর একটি বিশেষজ্ঞ দল সুন্দর বনের বন অবকাঠামো ও বৃক্ষরাজির ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করেছিলেন। আর্থিক পরিমাপে যা ধরা হয়েছিল ১ হাজার ২০ কোটি টাকা। পরিবেশ-প্রতিবেশ চক্রের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করা সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞ দল তখনই বলেছিলেন সিডরে ক্ষতিগ্রস্থ সুন্দরবনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে ন্যুনতম ১৫ বছর। আমি এখন কোনো রূপ সমীক্ষা ছাড়াই জোর দিয়ে বলতে পারি রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে এবং ওরিয়ন এনটিসিপি বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে ১৫ বছর নয় ১৫০ বছরেও সুন্দর বন মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারবে না। ১৫ ফেব্র“য়ারি ২০১৬ অর্থমন্ত্রী আবুল আল মুহিত অবশেষে স্বীকার করেছেন যে, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে সুন্দর বনের ক্ষতি হবে ঠিকই।’ একই সঙ্গে তিনি বলেছেন। কিন্তু স্থান পরিবর্তন করা যাবে না। প্রশ্ন হচ্ছে কেন স্থান পরিবর্তন করা যাবে না মাননীয় মন্ত্র? নিজ দেশের ক্ষতি হবে জেনেও কোন বিবেকবান মানুষ চুপ করে থাকে? আপনাদের হাত-পা কাঁদের নিকট বাঁধা। বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ হলেও সুন্দরবন বিশ্বের সম্পদ। এঁকে রক্ষার দায়ও দুদেশের সরকারের। সরকারের নিস্ক্রিয়তা বা ব্যর্থতা দু’ দেশের জনগণকে প্রতিবাদে-এগিয়ে আসতে বাধ্য করেছে। আমরাই এক সময় বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনকে সামনে রেখে বিশ্বব্যাপি আওয়াজ তুলেছিলাম” বাংলাদেশ বাঁচলে বিশ্ব বাঁচবে।” সেই আমরাই নিজেদের সর্বনাশ নিজেরাই ডেকে আনছি। কোপেন হেগেন সম্মেলনে বাংলাদেশ আওয়াজ তুলেছিল ‘বাংলাদেশ বাঁচলে বিশ্ব বাঁচবে’ কারণ পরিবেশ বিপর্যয়ে বিশ্বের প্রতি ৪৫ জনের মধ্যে ১জন এবং বাংলাদেশের প্রতি ৭ জনের মধ্যে ১জন জলবায়ু বিপর্যয়ের শিকার হবে। সমুদ্রর উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধি পেলেই বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ ভুমি তলিয়ে যাবে। জলবায়ু উদ্বাস্তু হবে ৩ কোটি মানুষ।

এমন পরিস্থিতিকে সামনে রেখে আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানীর ব্যবহার বৃদ্ধি না করে গুটি কয়েক মুনাফা খোর পুঁজিপতির মুনাফা লিপ্সার স্বার্থের নিকট দেশের নদ-নদী, বনসম্পদ, পরিবেশ-প্রতিবেশ চক্র বিনাশী কোনো কর্মকান্ডের নিকট সমর্থন করতে পারিনা। আমরা এই সব উন্মাদ মুনাফা খোরদের হাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যে স্বপ্নের দেশ বিনির্মান করতে চাচ্ছি তা নস্যাৎ করতে পরিনা। যারা সামান্য সর্দি-কাশি হলেও সিংগাপুর-থাইল্যান্ড বা বৃটেনে চিকিৎসা নিতে ছোটে তাদের মধ্যে কোনো দেশপ্রেম নেই। আমাদের উন্নয়ন দরকার, আমরা ক্ষুধা-দারিদ্র মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি। বিদ্যুৎ শক্তির প্রয়োজন আমাদের রয়েছে একথা সত্য কিন্তু বেইজিং এর মত উন্নয়ন আমরা চাইনা। যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাত্রার দূষণযুক্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। উন্নয়নের টাকা দিয়ে বিশুদ্ধ বাতাস ক্রয় করে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার উন্নয়ন আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। বেইজিং এ এখন খোলা বাজার থেকে জনগনকে বিশুদ্ধ বাতাস কিনতে হচ্ছে। যেরকম উন্নয়ন আমাদের প্রয়োজন নেই।

লেখকঃ জামিল আহম্মেদ মুকুল 
সম্পাদক- ফাষ্ট বিডি নিউজ ২৪ ডট কম | Fastbdnews24.com