বিনা অপরাধে কারাগারে চিকিৎসক

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে নার্সের ভুল ইনজেকশন পুশ করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় চিকিৎসককে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।

বাংলাদেশে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাওয়া অন্যতম বড় সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ড রাইটসের (এফডিএসআর) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাত মিল্টন ‘এ কেমন বিচার’ শিরোনামে লিখেছেন, “অধ্যাপক ডা. ওষুধের অর্ডার দিলেন। ইন্টার্নি ডাক্তার, যিনি নিজে আবার রোগীর আপন ভাইও, সেই অর্ডার লিখলেন। এবার নার্স ভুল করে প্রায় একই রকমের নামের আরেকটা ইঞ্জেকশন দিলেন যার ফলে রোগী মেয়েটি গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লো। গোপালগঞ্জের ঘটনা। এ নিয়ে মামলা হলো। মহামান্য বিচারক অধ্যাপক আর সেবিকাকে জেলে পাঠালেন। এখানে অধ্যাপকের দোষ কোথায়? বুঝলাম না, এ কেমন বিচার?”

এই পোস্টে এক মন্তব্যে হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল বলেন, “ধরে নিলাম ডাক্তারই ভুল করেছেন। তাকে জামিন দেওয়া হলো না কেন? এটা কি জামিন অযোগ্য অপরাধ? অপরাধ প্রমাণের আগেই তাকে জেলে ভরা হলো কেন?”

এ প্রসঙ্গে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলোজি অ্যান্ড ইমেজিং ডিপার্টমেন্টের মেডিকেল অফিসার ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী নিজের টাইমলাইনে এক পোস্টে বলেন, “একজনের ফেসবুক পোস্টে একজন অধ্যাপক ডাক্তার কমেন্ট করলে রাঙামাটি বদলি হয়। একজন নার্স ভুল ইনজেকশন দিলে অধ্যাপক ডাক্তারের নামে মামলা।”

প্রসঙ্গত, গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে নার্সের ভুল ইনজেকশন পুশ করার অভিযোগে ডাক্তার ও নার্সের জামিন আবেদন বাতিল করে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত।

জামিনের সময় শেষ হওয়ায় গতকাল (রোববার) গোপালগঞ্জ সদর আমলী আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন। কিন্তু শুনানি শেষে বিচারক মো. হুমায়ুন কবীর জামিন বাতিল করে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

জানা গেছে, গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুন্নী পিত্তথলিজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আব্দুল মতিনের তত্ত্বাবধানে একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তপন মণ্ডলের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন মুন্নি।

গত ২০ মে রাতে পিত্তথলিজনিত সমস্যার কারণে ডাক্তার তপন কুমার মণ্ডলের অধীনে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি হয় মুন্নি। পরদিন সকালে তার অপারেশন করার কথা ছিল। কিন্তু হাসপাতালের ফিমেল ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহনাজ সকালে রোগীর ফাইল না দেখে গ্যাস্ট্রাইটিসের ইনজেকশনের পরিবর্তে অ্যানেস্থেসিয়ার ইনজেকশন পুশ করেন। এতে সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। পরবর্তীতে তার অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাকে খুলনা আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেও তার অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ২৩ মে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্থানান্তর করা হয়।

প্রায় ৪৫ দিন পেরিয়ে গেলেও জ্ঞান ফেরেনি মুন্নীর। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছে সমাজবিজ্ঞান দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন ভুল চিকিৎসায় মুন্নির মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ওই ঘটনায় মুন্নির চাচা জাকির হোসেন বাদী হয়ে গত ২৩ মে গোপালগঞ্জ সদর থানায় চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. তপন কুমার মণ্ডল ও দুই নার্স শাহনাজ ও কুহেলিকাকে আসামি করে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন।