• আজ বৃহস্পতিবার, ১৫ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং ; ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৬ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী
  • বৈষম্যের শিক্ষা, বিভাজন বাড়াচ্ছে শিশু মননে

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●

     

    ছাইফুল ইসলাম মাছুম ● ওরা কেউ পড়ছে বাংলা মাধ্যমে, কেউ পড়ছে ইংরেজি মাধ্যমে, কেউ কেউ আবার পড়ছে আরবি মাধ্যমে। এছাড়াও রয়েছে আরও অনেক রকমের শিক্ষা। রাজধানী ঢাকা শহরে এমন নানান ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা বিভাজন সৃষ্টি করছে শিশুদের মনোজগতে।

    তারভীর আহমেদ (১১)এর বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি এলাকায়। পড়েন ঢাকা মোহাম্মদপুরের কাওমি মাদ্রাসা জামিয়াতুল আযীয আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার নাজেরা শ্রেনীতে। তিনি জানান, ছোট বেলায় মায়ের নিয়ত ছিল, সে যাতে বড় আলেম হয়, তাই মাদ্রাসায় পড়ছেন। মায়ের নিয়তের কথা জানালেন কেরানীগঞ্জের রহমত উল্লাহ ওমেরও(১১)। একই মাদ্রাসার আরেক শিক্ষার্থী ভোলা তজুমউদ্দিন এলাকার ইমাম শিকদার (৯)। তিনি জানান, তিনি আখেরাতের জন্য আলেম হতে চান। ইমাম শিকদার বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষা হলো দ্বীনে এলেম, আর সাধারন শিক্ষা হলো পৃথিবীর সাধরন এলেম।

    জামিয়াতুল আযীয আল ইসলামিয়া মাদ্রাসায় দেশের বিভিন্ন জেলার প্রায় পাঁচ শতাধিক শিশু শিক্ষার্থী রয়েছে। পুরো মাদ্রসা ঘুরে দেখা গেছে কোন চেয়ার টেবিল নেই। আধুনিক শহরে চলছে সনাতনি পদ্ধতিতে পাঠদান। এই মাদ্রসার প্রাপ্তন শিক্ষার্থী ইমাম উদ্দিন। বর্তমানে পড়ছেন মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজে থেকে ম্যানেজমেন্টে অনার্স পড়ছেন। তিনি ফাস্ট বিডিনিউজকে বলেন, প্রাচীন শিক্ষায় চেয়ার টেবিল ছিল না। আগের যুগের আলেমার যেভাবে পড়ে এসেছেন, মাদ্রাসায়ও সেভাবে পড়ানো হয়। চেয়ার টেবিলে পড়ালে কিতাবের বর খেলাপ হবে।’

    মোহাম্মদপুর বেড়ি বাঁধ এলাকায় কাছাকাছি দূরতে ১৮টি মাদ্রসা রয়েছে। মোহাম্মদপুর এলাকায় রয়েছে কাওমী হাফেজিসহ বিভিন্ন ধারার শতাধিক মাদ্রাসা। মাদ্রসা গুলোতে ধর্মীয় শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, বিজ্ঞান প্রযুক্তি, দেশ, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাদের কোন আগ্রহ নেই। সুযোগ নেই বৃত্তের বাহিরে নতুন কিছু জানার। মাদ্রাসাটির আরবি শিক্ষক মফিজুল ইসলাম জানান, আরবি শিক্ষার উপর তারা বেশি জোর দেন। তবে তিনি মনে করেন মাদ্রাসায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চা আরো বাড়ানো উচিত।

    অন্যদিকে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে ইংলিশ ভার্সনে ৫ম শ্রেনীতে পড়ছেন শাহরিয়ার আমিন অর্ক। তিনি জানান, তার পাঠ্য তালিকায় একটা মাত্র বাংলা বিষয় থাকলেও বাকি বিষয় গুলো ইংলিশে। কম্পিউটার ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান তার পাঠ্য ভূক্ত। অর্ক জানান, ভবিষ্যতে আমেরিকা থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে তিনি চিকিৎসক হতে চান।

    পাঁচ বছর ধরে মজার ইশকুলের মাধ্যমে পথশিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে আরিয়ান আরিফ। আরিয়ান আরিফ জানান, তাদের দুটি স্থায়ী স্কুলে জাতীয় কারিকুলামে পাঠদান করা হলেও, তিনটি স্কুলে পথশিশুদের নিজের নাম লেখা ও আচারনগত শিক্ষা দেন তারা।

    এমন নানান ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা বিভাজন সৃষ্টি করছে শিশুদের মনোজগতে। একই এলাকার, সমবয়সী শিশুদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে চিন্তার ফারাক। কেউ হয়ে উঠছে অতি আধুনিক, কেউ রয়ে যাচ্ছে সনাতনি খোসায়। শৈশবে কারও কারও মনোজগত তৈরি হচ্ছে স্বার্থন্বেষী, বিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে।

    এ প্রসঙ্গে শিশু সাহিত্যিক সঞ্জয় মুখার্জী বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা শিশুদের মনোজগত একটি বৃত্তে আবদ্ধ করে ফেলছে। ইংলিশ এবং আরবি ধারার শিক্ষা আমাদের সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। ওদের চিন্তায় দেশ প্রেম নেই। তিনি বলেন, শৈশবে যদি শিশুদের মনোজগত বিভক্ত চিন্তায় গড়ে উঠে, তাহলে ভবিষ্যতে জাতিগত ঐক্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।

    শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এনএম রাশেদা ফাস্ট বিডিনিউজকে জানান, ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১৭ ধারায় সার্বজনিন শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন বৈষ্যম থাকবে না। আমরা এমন শিক্ষা ব্যবস্থা অবশ্যই চাই না, যে শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের সংবিধান সমর্থন করে না। তিনি বলেন, বিভাজিত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুরা নৈতিক শিক্ষা পাচ্ছে না। আমারা শিশুদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থে গড়ে তুলছি, মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছি না।

    Close