ভৈরব বাঁচানোর লড়াই


Jamil Ahammed Mukul 1
জামিল আহম্মেদ মুকুল:

নাতন ধর্মের আরাধ্য পুরুষ শিবের আরেক নাম ভৈরব। শিব যখন মহাক্রোধে ক্রোধান্বিত হন তখন তাকে ভৈরব বলে ডাকা হয়। হিমালয়ের গঙ্গায়েত্রী পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে খরস্রোতা গঙ্গার শাখা নদী জলাঙ্গি হয়ে তীব্র স্রোত তার শাখার ভিতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে ছুটে চলে তখন এর রুদ্রমূর্তি দেখে ভীত এ জনপদের মানুষ নাম রেখেছিল ‘ভৈরব’। এক সময়ের সেই খরস্রোতা নদটি বিদেশি-দেশি আগ্রাসনে এখন মৃতপ্রায়। শত শত বছর ধরে বয়ে চলা এই নদ যে জনপদকেই স্পর্শ করেছে উর্বর করেছে তার ভূমি, সিক্ত করেছে সেই জনপদের মানুষকে। সেই মানুষগুলোর অর্বাচীন কর্মের ফলে সে আজ মৃতপ্রায়।

নদীমাতৃক এই দেশের ভেতর দিয়ে যে নদ-নদী গুলো প্রবাহিত হয়েছে তার প্রায় সকল ‘নদ’ ই দেশের দক্ষীণ-পশ্চিমাঞ্চলে তার অস্তিত্বের জানান দেয়। পদ্মা-কুমার-ভৈরব-কপোতাক্ষ নদের ভৌগলিক অবস্থান পরপর। এ নদ গুলোর সবই ধুকে ধুকে বেঁচে আছে। রাষ্ট্রের অপরিনামদর্শী পদক্ষেপ, ভূমিদস্যুদের আগ্রাসন আর আমাদের অর্বাচীন কর্মকান্ড এ অঞ্চলের সকল নদ-নদী গুলোই (মধুমতির কিছু অংশ ছাড়া) তাদের কার্যকারিতা হারিয়েছে। এ লেখা যখন লিখছি তখন তীব্র গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। নদ-নদী গুলো তাদের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারানোর ফলে আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন। অসময়ে বৃষ্টিপাত, অতিবর্ষণ, তীব্র শীত, তীব্র গরম, ঝড়ের প্রকোপ তো আছেই সেই সাথে যুক্ত হয়েছে সমুদ্রের নোনাপানির আগ্রাসন। প্রকৃতিতে শূন্যতার স্থান নেই। ভূঅভ্যন্তরের মিঠা পানির প্রবাহ কমে গেলে সমুদ্রের নোনাপানি এসে শূন্যতা পূরণ করে। নদ-নদীগুলোয় সারা বছর পানি না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে মানুষ। কৃষি-কারখানায় উৎপাদন এবং গৃহস্থলি কাজে উত্তোলন করতে হয় প্রচুর পানি।

যার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এই স্তর নেমে গেছে কোথাও কোথাও ত্রিশ ফিট আবার কোথাও তা চল্লিশ ফিটের মতো। ফলে শুস্ক মৌসুমের শুরুতেই অগভীর নলকূপ গুলোতে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে যায়।
প্রতিবেশি দেশের সাথে আমাদের অভিন্ন ৫৪ টি নদীর সম্পর্ক। ভৈরব তার একটি। প্রতিবেশি দেশের নন্দনপুর থেকে এ নদ মেহেরপুর হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ও দেশই ভৈরবকে মেরে ফেলার সকল আয়োজন সম্পন্ন করেছে। নন্দনপুরের ওপাশে রেগুলেটর তৈরী করে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে এর স্বাভাবিক প্রবাহ। ১৬০ কিলোমিটারের এই নদের মধ্যে ৩৭ কিলোমিটার প্রাণবন্ত আছে। শুধু প্রতিবেশি দেশের রেগুলেটর এই নদের মৃত্যুর একমাত্র কারণ নয়। এর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে নদের উপর নির্মিত অসংখ্য কালভার্ট সদৃশ্য ব্রিজ। নদের দু’পাশ থেকে বাঁধ দিয়ে মাঝখানে ছোট্ট ব্রিজ একে মরতে সাহায্য করেছে। সেই সাথে সরকারের উদাসীনতা ও দূর্নীতিবাজ একশ্রেণীর কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দখল হয়েছে নদের দু’পার্শ্বের জমি। সমগ্র বাংলাদেশে একই চিত্র। প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভূমিদস্যুরা প্রভাবশালী এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীক রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যুক্ত থাকায় এদেরকে উচ্ছেদ করা এক প্রকারে অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর যারা দখলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে চায় তারা হয়ে পড়ে কোনঠাসা। এ অঞ্চলের গড়াই-মাথাভাঙ্গা-কুমার-চিত্রা, মধুমতি-ভৈরব-কপোতাক্ষ-মুক্তেশ্বরী, হরিহর-ভদ্রা-শ্রীনদী সহ সকল নদ-নদীই আগ্রাসনের শিকার। ‘কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলন’, ‘ভৈরব নদে জোয়ারভাটা আনয়নের দাবীতে আন্দোলন’, ‘ভবদহ সংস্কার আন্দোলন’ এ জনপদে অতিপরিচিত আন্দোলন। ভৈরব অবৈধ দখলমুক্ত করে জোয়ার-ভাটার পরিবেশ তৈরীর দাবী এ অঞ্চলের সচেতন মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি।

Bhairab River Jessore

মূল কথা হচ্ছে, গড়াই-মাথাভাঙ্গা-মধূমতি-কুমার-ভৈরব-কপোতাক্ষ-শ্রীনদী সপ্রাণ থাকলে এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র রক্ষার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এতোটা মারাত্মক ভাবে আমাদেরকে আঘাত করতো না। দীর্ঘদিন থেকে এ অঞ্চলের সচেতন মানুষ এ দাবী নিয়ে রাজপথে সক্রিয় থাকলেও সরকার মহলের সাড়া মেলেনি, পেয়েছে শুধু আশ্বাস। অনেকদিন পর হলেও সরকার ‘ভৈরব নদ’ সচলের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তার জন্য সাধুবাদ জানাই।
এমনিতেই বৈশ্বয়িক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের স্তর বৃদ্ধিজনিত হুমকি আমাদেরকে মোকাবেলা করতে হবে। তার সাথে নোনাপানির আগ্রাসন, অতি বর্ষণ, সৃষ্ট বন্যা, অতি খরা, পরিবেশ উদ্বাস্তু পূণর্বাসন, এ সকল বিষয়ে পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা আদৌ সম্ভব নয়। ফলে একদিকে যেমন অভ্যন্তরীন ব্যাপক প্রস্তুতি প্রয়োজন তেমনি দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা দরকার পরিবেশ উদ্বাস্তু পূর্ণবাসনে। তাছাড়া নদীমাতৃক এই দেশের উন্নয়নে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা যদি নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা না যায় তাহলে তা বারবারই হোঁচট খাবে। ‘নদীই সভ্যতার প্রাণ’ ‘নদীই মানব উন্নয়নের নেপথ্য কারিগর’। নদী না থাকলে মানুষের সভ্যতা বিনির্মাণ পিছিয়ে যেত আরও হাজার বছর। আমরা যখন ভৈরব নদ অবৈধ দখলমুক্ত ও জোয়ার ভাটের দাবীতে যশোর শহরে মিছিল-মানববন্ধন করতাম তখন অনেকেই হেসেছে। ভৈরব নদ অবৈধ দখল মুক্তকরণ আন্দোলনে যাদের অবদান কোনো ভাবেই মুছে ফেলা যাবে না তারা হচ্ছেন, অধ্যক্ষ আফসার আলী স্যার এবং রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব কমরেড ইকবাল কবির জাহিদ।
যারা একই সাথে এই জনপদের দীর্ঘদিনের বড় পরিবেশ সমস্যা ‘কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলন’ ‘ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবীতে আন্দোলন’ করে আসছেন।

সদ্য প্রয়াত সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ’র পরিচালনায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা CFSD (সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট) এর অনু সংগঠন ‘সবার জন্য পরিবেশ একটি সামাজিক আন্দোলন’ এ অঞ্চলে যাত্রা শুরু করে ২০০২ সালে। প্রয়াত প্রবীণ সাংবাদিক জমির আহমেদ টুন, দৈনিক টেলিগ্রাম সম্পাদক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক ও সাংবাদিক নূর ইসলাম এ সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই সংগঠনের ব্যানারে’ ভৈরব নদে জোয়ার-ভাটার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল, প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ, হ্যান্ডবিল বিতরণ, মানববন্ধন সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছি। আমরা যে যে অবস্থানে থেকেই আন্দোলন করি না কেন সবার উদ্দেশ্য ছিল একই ‘ভৈরবকে বাঁচাতে হবে’ ‘বাঁচাতে হবে এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র-পরিবেশ।
সরকার মহোদয় ইতোমধ্যেই এ নদ খনন শুরু করেছে। উচ্ছেদ অভিযান চলছে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে। বাজারে কথা ভেসে বেড়াচ্ছে জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল আর বেশি দিন যশোরে থাকছেন না। একটি প্রভাবশালী মহল উচ্ছেদ ঠেকাতে তদবীরে ব্যাস্ত। বিশেষ করে দড়াটানা ব্রিজের পূর্ব প্রান্তের দখল ধরে রাখতে মরিয়া দখলদারেরা। এরা কিছুটা সফল হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে, এই ডিসি সাহেব প্রমোশন বা অন্য যে কারণেই বদলি হোন না কেন ভৈরবের দখলমুক্ত অভিযান সচল থাকবে। দখলমুক্ত জায়গাগুলো আবার যেন ভূমিদস্যুদের কবলে চলে না যায় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। এ কাজ প্রশাসনের একার নয়; তাই এগিয়ে আসতে হবে আন্দোলনের প্রতিটি কর্মীকেও। অপর দিকে বিতর্কিত ভবনগুলো ভেঙ্গে ফেলা আশু প্রয়োজন। দেশের প্রচলিত আইন ‘জাতীয় পানি নীতি ১৯৯৯’, ‘বাংলাদেশ পানি আইন ২০১২’ এর ধারাগুলো দিয়ে যদি উচ্ছেদ করা না যায় তাহলে ‘আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশন ১৯৯৭’ এর ধারার আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে।

Daratana Jashore 12
দড়াটানায় উচ্ছেদ অভিযান

মোদ্দা কথা, যে আইনেই হোক নদীগুলো বাঁচাতে হবে।
শুধু ভৈরব খনন নয় এ অঞ্চলের মিঠা পানির জীব-বৈচিত্র সংরক্ষণ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় নিম্নের প্রস্তাবনা গুলো সরকারের পরিকল্পনায় আনা জরুরী। তবেই এর থেকে আমরা কাঙ্খিত কিছু পেতে পারি।
     ১. ভৈরব খনন বলতে সমগ্র ভৈরব নদের যে অংশ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তার সবটাই খননকার্যের আওতায় এনে নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে ছোট ছোট রাবার ড্যাম তৈরী করে বর্ষা মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে তা পরে সেচ কাজে ব্যবহার করা। যদিও এই পানি সারা বছরের জন্য পর্যাপ্ত নয় তবুও একসাথে দু’টি উদ্দেশ্য এখান থেকে অর্জন করা সম্ভব হবে।
         (ক) ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমবে এবং কৃষকের অর্থের সাশ্রয় হবে। এতে কৃষক আর্থিক ভাবে লাভবান হবে। উল্লেখ্য যে, মেহেরপুর থেকে যশোের পর্যন্ত এ নদের দু’তীরে প্রচুর পরিমাণে ধান, ভূট্টা এবং তরকারি জাতীয় ফসল উৎপাদন হয়। তাছাড়া মিঠা পানির মাছের বংশ বিস্তারে সহায়তার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় নেয়ামক ভূমিকা পালন করবে।
         (খ) ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূরণে নদী সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। বছরের বড় একটা সময় নদীতে পানি ধরে রাখতে পারলে তার একটা অংশ ভূ-অভ্যন্তরীণ পানির স্তরে যেয়ে জমা হবে যা নোনা পানির আগ্রাসন প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
    ২. ভৈরব মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহের মহেশপুর হয়ে যশোরের চৌগাছার তাহেরপুরে এসে একটি শাখা নদের জন্ম দিয়েছে। যেটি কপোতাক্ষ নাম ধারণ করে ঝিকরগাছা-কেশবপুর হয়ে সাতক্ষীরার আশাশুনির মধ্য দিয়ে সাগরের দিকে ছুটে চলেছে। এই নদটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে খনন করে বর্ষার পানি সংরক্ষণে ব্যবহার করতে হবে ভৈরবের মতোই।
    ৩. ভৈরবের লোয়ার অংশে অভয়নগরে এসে নড়াইল থেকে আসা চিত্রা নদীর মিলন ঘটেছে।

অভয়নগরের আফ্রাঘাটে মিলে চিত্রা-ভৈরবের মিলিত স্রোতধারা রূপসা নদীর দিকে ছুটে চলেছে। আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে এই চিত্রা নদীটিও খনন করতে হবে। এইতো কিছুদিন আগেও এই নদীতে লঞ্চ চলাচল করতো। নদীর বুক ভরাট হয়ে যাওয়ায় এর নাব্যতা হারিয়েছে। ফিরিয়ে আনতে হবে চিত্রার হারানো দিন। তাহলেই নড়াইল অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা নদীপথ ব্যবহার করে তাদের পন্য আমদানী-রপ্তানী করতে পারবে। নদী তীরবর্তী ফসলি জমিগুলোও অল্প খরচে সেচকার্য করতে পারবে। একই সাথে ভৈরব-চিত্রার মিলিত স্রোত যেয়ে মিশেছে যে রূপসা নদীতে সেই নদীও খনন প্রকল্পের আওতায় না আনলে সব কিছুই পন্ডশ্রমে পর্যবসিত হবে। উভয় নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় শুধু ভৈরব খনন করলে রূপসা থেকে উল্টো নোনাপানি ভৈরব-চিত্রায় প্রবেশ করবে।
     ৪. যশোর জেলার চৌগাছা-কোটচাঁদপুর সীমান্তে অবস্থিত মর্জাদ বাওড়। এখান থেকেই উৎপত্তি ঘটেছে মুক্তেশ্বরী নদীর। পরে মুক্তেশ্বরী সদর হয় মনিরামপুরের ভবদহে যেয়ে শেষ হয়েছে। মূলত অভ্যন্তরীণ এই নদীটি বিভিন্ন বিলের পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে। এই নদীটি এবং এর খুব নিকট (কয়েক কিঃমিঃ পরেই) দিয়ে বয়ে যাওয়া হরিহর নদী দু’টিও খনন করে বর্ষাকালীন পানির আধার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মেটানো যায় দেশীয় মাছের চাহিদা। এছাড়াও এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে যে বাওড় গুলো রয়েছে সেগুলো সংস্কারের অভাবে ভরাট হওয়ার পথে। দখল হয়ে যাচ্ছে এর ভূসম্পত্তি । যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করলে এই বাওড় হতে পারে আমাদের সহজলভ্য মিঠা পানির আরেক বড় উৎস।

দড়াটানায় ভৈরব নদের উচ্ছেদ অভিযান

ভৈরবের পরিবেশগত গুরুত্ব যেমন আছে, তার অর্থনৈতিক গুরুত্বও অত্যাধিক এবং দিন দিন তা বাড়ছে বৈ কমছে না। বিশেষ করে মংলা বন্দর সচল করার সরকারের যে মহাপরিকল্পনা রয়েছে তার সাথে যুক্ত হতে যাচ্ছে রেলপথ। ভৈরবসহ আলোচনায় উল্লেখ করা নদীগুলো সচল হলে এঅঞ্চলের নদ-নদী গুলোর দুই তীরে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে আগ্রহশীল হয়ে উঠবে। গড়ে উঠবে নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা। লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। যার প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতেও।
আমরা খুব ভালো করেই জানি পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় পুঁজি সেখানেই লগ্নি হতে আগ্রহবোধ করে যেখান থেকে মুনাফা সহ নিজেকে ফেরত আনতে পারবে। এমনকি জনগনের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্র নামক সামাজিক সংগঠনটিও শুধুই জনগনের প্রয়োজন মেটাতে অর্থ ব্যয় করে না, লাভ না থাকলে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের এই নৌপথের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত লাভজনক একটা বিনিয়োগ। যা নানান উপায়ে বহুগুনে ফেরত আসবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। সেই সাথে পরিবেশ সুরক্ষা ও পরিবেশ দূষণ জনিত সৃষ্ট রোগের পেছনে রাষ্ট্রের ব্যয় কমে যাবে।

একটি নদীর অর্থনৈতিক গুরুত্ব কতোখানি তা নতুন করে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। অভয়নগরে ভৈরবে জোয়ার-ভাটা থাকার কারণেই সেখানে গড়ে উঠেছে শত শত কল কারখানা। সিমেন্ট ফ্যাক্টরী, জুটমিল, ট্যানারি, কয়লা-পাথর-সারের বিভাগীয় ডিপো সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার নেপথ্য কারণই হচ্ছে নৌপথ ব্যবহার করে স্বল্প খরচে পন্য আনা-নেওয়া করা। খুলনা বিভাগের অন্যতম অর্থনৈতিক জোন এখন নদ তীরবর্তী এ অঞ্চল। এই অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ আমরা যশোর শহর পেরিয়ে সাতমাইল পর্যন্ত প্রসারিত করতে চাই। এটা তখনই সম্ভব হবে যখন ভৈরবের জোয়ার-ভাটা সাতমাইল পর্যন্ত প্রসারিত করা সম্ভব হবে।

আরও পডুনছবিতে দেখুন যশোর শহরের নতুন রূপ

পৃথিবীর সকল উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের সময় হয় নদী না হয় সমুদ্রকে প্রধান্য দেওয়া হয়। এখনো পর্যন্ত সকল আমদানি-রপ্তানীর সিংহভাগ জলপথে হয়ে থাকে। বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ি দেশের অভ্যন্তরীণ পন্য পরিবহনের ৭৫% ই নৌপথে হয়। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০ ভাগ বাস করে নদী তীরবর্তী অঞ্চলে। নদী বিশ্বের ৬০ ভাগ মিঠা পানির জোগান দেয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এখনো পর্যন্ত ২০০ কোটি মানুষ ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীল। এই যখন বিশ্ব পরিস্থিতি তখন কোনো অবস্থাতেই আমরা আমাদের অভ্যন্তরীণ পানি সম্পদকে হেলাফেলা করতে পারি না। অধিকন্তু হিমালয় কেন্দ্রীক মিঠা পানির উৎস নিয়ে যে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু হয়েছে তার অভিঘাত ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে দিতে হচ্ছে। ভারতের টিপাইমূখী বাঁধ নির্মাণ এবং চীনের ইয়াংসাংপো নদীর গতিপথ পরিবর্তনের মিশন আমাদেরকে নতুন করে শংকার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামে দেনদরবার করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় বিশ্ব ফোরামে সোচ্চার থাকার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নদীসম্পদ বাঁচিয়ে রেখে বর্ষা মৌসুমে পানি ধরে রেখে কাজে লাগানের মাস্টার প্লান বাস্তবায়ন করাই হবে সমায়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
তা না হলে দেশের উত্তরাঞ্চলের মরুকরণ প্রক্রিয়া রোধ করা বা দক্ষিণ অঞ্চলে নোনা পানির আগ্রাসন থেকে আমাদের নিস্তার নেই। শুধু কয়েক কিলোমিটার নদী খনন বা কিছু উচ্ছেদে এ সমস্যার সমাধার হবে না, যা হবে তা অর্থের অপচয় মাত্র। সংশ্লিষ্ট মহল এসব বিষয় পরিকল্পনায় রেখে এগুলে তবেই ভৈরব সহ এ অঞ্চলের নদীগুলো যেমন বাঁচবে তেমনি তার সুফল পাওয়াও যাবে।

লেখক:
সম্পাদক
ফাস্ট বিডি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম
jamilmukul365@gmail.com

ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪/এআইএফ/কেএস