মানুষ হব || ফয়জুল কবীর

মানুষ হব

 

সাকিব বাবা মায়ের ৩য় সন্তান, ৩য় শ্রেণিতে পড়ে। একটু দুষ্টু আর চঞ্চল।সারাটা দিন হৈ হুল্লোড় আর খেলায় মেতে থাকা ওর স্বভাব। তবে দুষ্টু হলেও পিতা মাতার অবাধ্য হয় না কখনো। ওর এক ভাই ওএক বোন পড়ালেখা করছে বিশ্ববিদ্যালয় ও ১০ম শ্রেণিতে। ভাই যখন বাড়িতে আসে তখন তো সাকিব আনন্দ আর খুশিতে এমন ভাব করে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি সে। মাঝেমাঝে ফোনে ভাইয়ার সাথে কথা বলার সময় শত আবদার আর ইচ্ছার ঝুড়িটা খুলে বসে। এ ব্যাপারে ছোট ভাইয়ের ইচ্ছা পূরণে ত্রুটি করে না আহমদ। বাড়িতে আসার সময় ভাইয়ের জন্য উপহার কিনতেই ব্যস্ত থাকতে হয় দু’দিন। বিভিন্ন স্টল ঘুরে ঘুরে পছন্দ মত উপহার কিনতে পারলেই যেন তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলা যায়। উপহার গুলোর মধ্যে বই আর শিক্ষণীয় খেলনাই প্রধান। ছবির বই গুলো দেখতে দেখতে এই বয়সেই সে শুনেছে অনেক মানুষের গল্প, যারা মানবতাকে বাঁচাতে সভ্যতাকে গড়তে, জীবন দিয়েছে অকাতরে। সে শুনেছে পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ জন্ম নিলেও ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে কতিপয় মানুষ। ওরা নিঃস্বার্থভাবে তাদের মেধা মানব কল্যাণে নিয়োজিত করেছিল। সে শিখেছে সকালবেলা ঘুমের চেয়ে উত্তম কাজ কি। কি মানুষকে সাফল্য এনে দিতে পারে। সকালবেলা যখন ভাইয়ের সাথে নদীর ধারে হাঁটতে বেরোয়, মৃদুমন্দ বাতাস ওদেরকে স্বগত জানিয়ে বিশুদ্ধ বাতাসে এক বুক নিঃশ্বাস নিতে দেয়। ঘাসফুল গুলো ওদেরকে সবুজ গালিচায় সাদা ফুলের নকশা আঁকা উষ্ণ অভিনন্দন জানায়। আর হাঁটতে হাঁটতে কত গল্প বলে ভাইয়া ওকে জানিয়ে দেয় জগৎ অধিপতির অপার দান যার কোন সংখ্যা নেই। জানিয়ে দেয় কিভাবে, কত ত্যাগ আর পরিশ্রমের মাধ্যমে আহমদ নেজাদ কামারের ছেলে হয়ে জন্ম নিয়েও একজন সফল রাষ্ট্র নায়কের কথা। সাকিব একথা শুনতে শুনতে হেঁটে চলে তবু তার আকর্ষণ কমে না। সে অবাক হয়ে শোনে তারেক বিন জিয়াদ কিভাবে আত্মবিশ্বাস আর প্রভু ভক্তির উপর ভর করে গুটি কয়েক লোক নিয়ে স্পেন জয় করেছিল। কিভাবে স্পেনকে করেছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বারপ্রান্ত।

সেবার রোজার সময় এক লঙ্কা কান্ড ঘটাল সাকিব। বাড়ির আর সবার মতো সেও রোজা রাখতে চায়। কোন ভাবেই তাকে বোঝানো গেল না যে তার রোজা রাখার প্রয়োজন নেই। শেষে বাবা বললেন, ঠিক আছে, তবে ছোটদের রোজা দুপুর পর্যন্ত। দুপুরে একবার ইফতার করে আবার সন্ধ্যা পর্যন্ত রোজা। কিন্তু সকল প্রকার প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থতার দিকে ধাবিত হল, তখন মা বললেন, ঠিক আছে সে রোজা রাখতে পারবে। ভোরে সেহেরী খেতে উঠে মা যখন সবার প্লেটে খাবার দিয়ে সাকিবের প্লেটে দুধ, কলা, পাটালী দিতে যাবে তখন সাকিব নাকি সুরে কেঁদে কেঁদে বলল, সবাই আগে আগে সেহেরী খেয়ে নিয়ে এখন আমার জন্য দুধ কলা! আমি খাব না।
বাড়ি সুদ্ধ সবার হাসতে হাসতে পেটে খিল লাগার অবস্থা।
ঈদের আর চারদিন বাকি। মহল্লার সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত। সাকিবের জন্যও ওর বাবা নতুন জামা কাপড় কিনেছে। চারিদিকে যেন আনন্দের জোয়ার। মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় সবাই একথা গুলোই আলোচনা করছিল। হঠাৎ সুজন দল ছাড়া হয়ে দ্রুত হেঁটে চলে গেল। সাকিবের কেন জানি মনে হল চারিদিকে সমুদ্রসম আনন্দের উত্তাল ঢেউ স্বত্ত্বেও সুজনের বুকে দুঃখের ঢেউ যেন বাঁধ মানতে চায় না। নামাজ শেষে সুজনের সাথে বাড়িতে আসতে আসতে অনেক কথা হল। সাকিব ওকে নতুন পোশাক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে ও উত্তর দিল, গরিবের আবার ঈদ! বাবা নেই, মা আর কত দেবে?” সুজনের বাবা পাঁচ বছর আগে দুর্ঘটনায় মারা যায়। সুজন কখনো বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আবদার করে বলতে পারেনি তার শখের কথা, লাল জামা কিংবা জুতার কথা।
ঈদের দিন সকালে সাকিব তার নিজের জন্য কেনা নতুন পাঞ্জাবীটা নিয়ে মাকে সব কথা খুলে বলল। মা তাকে সাথে কিছু সেমাই দিয়ে সুজনদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিল। সুজন আর তার মা তো এ ঘটনায় যেমন অবাক তেমনি খুশি হল। এ ঘটনায় সাকিবের মা যত খুশি হল তার চেয়ে বেশী খুশি আর দোয়া করল, যেদিন তার শিক্ষক এসে বলল- ভাবী আপনার ছেলের কথায় তো আমরা সবাই হতবাক। সাথে কিছু শিক্ষাও যেন পেয়ে গেলাম। সেদিন স্কুল পরিদর্শক এসে ক্লাসের সব ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন কার কি হবার ইচ্ছা। কেউ বলল ডাক্তার হবার কথা, কেউবা ইঞ্জিনিয়ার, কেউ নাবিক, পাইলট এবং আরো অনেক কিছু। কিন্তু আপনার ছেলেকে যখন জিজ্ঞাসা করল তখন ও খুব ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে ডান হাতটা বুকের উপর রেখে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কন্ঠে বলল,”স্যার, আমি মানুষ হব।”

লেখা : ফয়জুল কবীর