• আজ বৃহস্পতিবার, ২১শে মার্চ, ২০১৯ ইং ; ৭ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ১৩ই রজব, ১৪৪০ হিজরী
  • মায়া

    মায়া

                       ______আহমদ রাজু

     

    দুই হাতের ব্যাগ দু’টি ধপাস করে ঘরের মেঝেতে রেখে বলল, চলে এলাম; এক্কেবারে তোমাকে কিছু না জানিয়ে।
    শিশিরের চক্ষু চড়কগাছ! সে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মায়ার দিকে। মুখ থেকে কী শব্দ বের করবে তা বুঝে পায় না। নীরবতা ভেঙ্গে মায়া বলে ওঠে, চমকাবার কিছু নেই। আমি সত্যি স্ব শরীরে এসেছি তোমার সামনে। এই নাও ছুঁয়ে দ্যাখো বলে শিশিরের সামনে দু’হাত বাড়িয়ে দেয়। শিশির হাত ধরে হ্যাচকা টানে মায়াকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, তুমি হঠাৎ আমার এখানে চলে আসবে ভাবতেই পারিনি। আসলে আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। স্বপ্ন দেখছি নাতো?
    মায়া শিশিরের বুকে মাথা গোঁজা অবস’ায় বলল, তোমার এখনও কি সন্দেহ আছে?
    -কিন’…
    -এর ভেতরে তোমার কিন’ ফিন’ এনোনাতো। তার থেকে বলো কেমন আছো? তোমার চাকুরী কেমন চলছে?
    শিশির মায়াকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে বলল, ভাল; খুব ভাল। বিশেষ করে আজকের দিনটা আরো ভাল।
    মায়া বুকে মুখ গোজা অবস’ায় বলল, কেন? আজকে বেশি ভাল থাকার কি হলো?
    -আজ যে আমার বউ এসেছে হৃদয়পুরে। বলল শিশির।
    -আমাকে তুমি সত্যিই খুব ভালবাসো না?
    -ওসব ভালবাসা বাদ দিয়ে আগে ফ্রেস হয়ে নাও। পরে ভালবাসার হিসাব করা যাবে।
    মায়ার মুখ দেখে শিশির বুঝতে পারে সে খুব ক্লান-। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে। ও নিশ্চয় ট্রেনে এসেছে। এখানকার ট্রেন যাত্রা খুব সুখকর নয়। পেট্রাপোল থেকে সোজা কোলকাতা। মনে মনে ভাবে শিশির। মায়াকে প্রশ্নটা করার ইচ্ছা মনে জাগলেও শেষ পর্যন- থেমে যায়।

    মায়া বাথরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে এসে শিশিরের পাশে বসে বলল, আসার সময় বাড়িতে কাউকে দেখলাম না। তুমি কি একাই থাকো এখানে?
    -কি বোকার মত প্রশ্ন মায়া? তোমার কি মনে হয় আমার আরো বউ আছে?
    -আমি ঠিক তা বলিনি। বলছিলাম, কী সাংঘাতিক রাজবাড়ি! তুমি একাই ভাড়া নিয়েছো?
    -তোমার কী মনে হয়?
    -একা মানুষ; এত বড় রাজবাড়ি ভাড়া নেবার কী দরকার?
    -একা কোথায়; তুমিতো রয়েছো।
    -ফাজলামো বাদ দাও; বলো এই রাজবাড়ি ভাড়া নেবার রহস্যটা কী।
    -প্রথম যখন চাকুরীতে এলাম তখন একা বলে কেউ আমাকে বাড়ি ভাড়া দিতে রাজী হচ্ছিল না। অনেক খুঁজেছি; পাইনি। যেখানে যাই ‘ব্যাচেলরকে বাড়ি ভাড়া দেবো না’ বলে চোখের সামনে দরজা বন্ধ করে দেয়। উপায় না পেয়ে শেষপর্যন- এই বাড়িটা ভাড়া নিই।
    -বাড়িটা তুমি আগে থেকে চিনতে? উৎসুক প্রশ্ন মায়ার।
    শিশির খাটের ওপর ঠিক হয়ে বসতে বসতে বলল, এই বাড়িটা খালি আছে শুনেছিলাম। আমি ভাড়া নেবার ছয়মাস আগে যে ভাড়াটিয়া ছিল তারা স্বামী-স্ত্রী একসাথে আত্মহত্যা করে। তারপর যে ঐ কাহিনী শোনে সে আর বাড়িটা ভাড়া নিতে চায় না। আমি যখন বাসা পাচ্ছিলাম না তখন উপায় না পেয়ে এই বাড়ি ভাড়া নিলাম। ভাড়াও কম। মাসে পনেরো’শো। বাড়ির মালিক খুব ভাল। ভদ্রলোক থাকেন এখান থেকে আধা কিলোমিটার দূরে। এখানকার খোঁজও নেন না। ভাড়ার টাকাটাও কোনদিন নিতে আসেননি। আমি নিজেই ওনার বাড়িতে দিয়ে আসি।
    -তোমার এখানে ভয় করে না?
    -ভয় করেনা তা নয়। কিন’ কী করবো বলো?
    -তা ঠিক। মায়া প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল, কী জংলি করে রেখেছো ঘরটাকে?
    শিশির হাসতে হাসতে বলল, তুমি যখন এসেছো তখন আবার সবকিছু সভ্য হয়ে উঠবে।
    -রান্না কি তুমি নিজে করো। প্রশ্ন মায়ার।
    -সে সময় কই? সকাল আর রাতে হোটেল থেকেই খেয়ে আসি। দুপুরেতো অফিসে খাবার ব্যবস’া আছে।
    -আর হোটেলে খেতে হবে না। এখন তোমার বউ এসেছে। আমি যতদিন আছি ততদিন বাড়িতেই রান্না হবে।
    -অন-ত আজকের মত হোটেল থেকে নিয়ে আসি। কাল থেকে রান্নার বিষয়টা ভাবা যাবে। তুমি বিশ্রাম নাও। আমি হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আসছি।
    মায়া গম্ভীর ভাব প্রকাশ করে বলল, শোন; বাজারের ভেতর যাবার দরকার নেই। ধারে- কাছের হোটেল থেকেই খাবার নিয়ে আসবে।
    -কেন? শিশিরের প্রশ্ন।
    -বলাতো যায় না কখন কি হয়। তোমাকে যা বললাম তাই করো।
    -আচ্ছা। ঘর থেকে বেরিয়ে যায় শিশির।

    দু’শো বছরের পুরোনো ছোটখাট দোতলা বাড়িটা হয়তো জমিদার বাড়ি বললে অমূলক হবে না। খুব বেশি বড় না হলেও রাজকীয় ভাবের কোন ঘাটতি নেই এখানে। সামনে সাঁন বাঁধানো পুকুর। চওড়া পাঁচিলে ঘেরা সবকিছু। বৃহৎ সদর দরজা, যা নকশাকাটা লোহার তৈরী। বাড়িটার কিছু কিছু জায়গায় চুন সুড়কিতে বয়সের ছাঁপ দেখা গেলেও রাজকীয় ঢ়ং শেষ হয়ে যায়নি।
    এ এলাকার মানুষ ভুত প্রেতে খুব একটা বিশ্বাস না করলেও এই জমিদার বাড়িকে সবাই ভূতের বাড়ি বলে জানে। কেউ কেউ রাতে এখানে গলাকাটা ঘোড়া ঘুরে বেড়াতে দেখেছে। দেখেছে এ মুল্লুকে এক পা, আর অন্য মুল্লুকে এক পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দানবকে। প্রতি রাতে আশ পাশের বাসিন্দারা এখান থেকে চাপা কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়। যে কারণে রাত হোক আর দিন হোক এলাকার কেউ এদিকে আসার নামও করেনা। যারা বাইরের সৌন্দর্য দেখে বাড়িটা ভাড়া নেয় তারা কিছুদিন পর হয়তো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যায় নতুবা ভয়ে অন্য কোথাও চলে যায়।
    শিশির বাড়িটা ভাড়া নেবার পর তেমন কাউকে এদিকে আসতে দেখেনি। অবশ্য সে যে মনে মনে ভয় পায়না তা ঠিক নয়; পায়। প্রতি রাতে বাইরে কেউ পাইচারী করে যা বুঝতে পারে শিশির। মাঝ রাতে মাঝে মধ্যে দোতলার দিক থেকে কান্নার আওয়াজ তার কানে আসে। ভয়ে কুঁকড়ে যায় তখন। মনে মনে ভাবে পুরনো বাড়ি, অনেক কিছুর আনাগোনা থাকতেই পারে। তাদের কোন ক্ষতি না করলে তারাও কিছু বলবে না বলে বিশ্বাস শিশিরের। কোন কোন দিন নিজেকে শান-্বনা দিয়েছে এ হয়তো মনের ভুল। সবচেয়ে বড় সত্যি বাড়িভাড়া না পাওয়ায় নতুন চাকুরী বাঁচাতে এখানেই মাথা গুঁজে থাকতে হচ্ছে তাকে।
    দুপুরের কড়া রোদ শিশিরের চোখে এসে লাগে। সে পকেট থেকে চশমাটা বের করে চোখে দ্যায়। তার এই অসুখটা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। রোদের দিকে দু’চার মিনিট তাকালেই শুরু হয় মাথায় যন্ত্রণা। যদি একটু বেশি চিন-া করে তাহলেও একইভাবে যন্ত্রণা শুরু হয়; যা চলতে থাকে সারাদিন, যতক্ষণ না ঘুম আসে। পারতোপক্ষে সে ঔষধ খেতে চায় না। যেদিন বেশি যন্ত্রণা হয় সেদিন একটা করে টামেন আর ভারগন ট্যাবলেট একসাথে গিলে খায়।
    রাস-ায় হাঁটতে হাঁটতে মনের কোণে কয়েকটা প্রশ্নের উদয় হয় তার। নতুন চাকুরীর ঠিকানা বাংলাদেশের কাউকে জানানো হয়নি এখনও। তবে মায়া কোলকাতায় এসেছে কিভাবে? বাথরুমে পানি ছিল না। টিউবওয়েলটা বেশ দূরে। অথচ বাথরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে আসে কিভাবে? বাড়িটা তার অচেনা, আজই প্রথম এসেছে। তাহলে সে এখানে নির্দ্বিধায় ঘুরে বেড়ায় কিভাবে? এমনকি বাথরুমটাও তাকে চিনিয়ে দিতে হয়নি!
    বাজারের ভেতরে ঢোকার প্রথম গলির মুখে পৌঁছানোর সাথে সাথে দূরে একটা বিকট শব্দ হয়। সাথে সাথে শুরু হয় মানুষের আত্মচিৎকার। শিশির দৌঁড়ে যায় সেদিকে। যেয়ে দেখে যে হোটেল থেকে খাবার নেবার জন্যে যাচ্ছিল সেই হোটেলে বোমা মারা হয়েছে। অনেক মানুষের ছিন্ন ভিন্ন দেহ পড়ে আছে সমস- হোটেল জুড়ে। আহত মানুষদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে স’ানীয় লোকজন।
    বোমা যদি আর মিনিট খানেক পরে ফাটতো তাহলে নিজেরও একই অবস’া হতো; মনে মনে ভাবে শিশির। সে এ নারকীয় তাণ্ডব দেখে খাবার না নিয়েই বাড়ি ফেরার পথ ধরে। রাস-ায় হাঁটতে হাঁটতে তার ভাবনাটা আরো দৃঢ় হয়। মায়া বাজারে আসার সময় কেন ভেতরের হোটেলে যেতে নিষেধ করেছিল? তবে কি সে এ ঘটনা ঘটবে তা আগেই বুঝতে পেরেছিল? সত্যি তার মায়া কিনা সন্দেহ হয় শিশিরের। সে ভাবনাটা দৃঢ় হবার সুযোগ পায়না। চোখের সামনে যে আছে, যার সাথে কথা, হৃদয়ে হৃদয় রাখা সে কিভাবে ভুল হতে পারে! পীচঢালা পথের সাথে ভাবনাটা মিশিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে আসে শিশির।
    যতই চিন্তা মাথা থেকে দূর করতে চায় ততই কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া বিভৎ্‌স দৃশ্যাবলী ক্ষণে ক্ষণে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সে ভয়ার্ত চেহারায় মায়ার সামনে যেয়ে দাঁড়ায়। মায়া তার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কোথাও কিছু হয়েছে?
    শিশির মুখে কিছু না বলে সম্মত্তি সূচক মাথা নাড়ায়।
    -কী হয়েছে?
    -আমি যে হোটেলে যেতে চেয়েছিলাম সেখানে দুষ্কৃতিরা বোমা মেরেছে। অনেকে মারা গেছে।
    -কী বলছো এসব? কবে-কখন? বিস্মিত মায়া।
    -আমি সেখানে পৌঁছানোর মিনিট খানেক আগে।
    আৎকে ওঠে মায়া। বলল, তোমার কিছু হয়নিতো?
    -না; আমি ঠিক আছি।
    -তোমাকে আমি আগেই বলেছিলাম, কাছাকাছি কোন হোটেল থেকে খাবার আনতে। তুমি ওখানে যেতে গেলে কেন?
    -আসলে এখানকার সবচেয়ে ভাল হোটেল ওটাই। ভাল মানের খাবার বলতে সবাই একনামে চেনে। তুমি আমার এখানে আজই এলে। ভাবলাম ওখান থেকে খাবার এনে দুজনে একসাথে বসে পেটপুরে খাব।
    -যাকগে; যা হবার হয়েছে। ঘরে চাল-ডাল কিছু আছে?
    শিশির একটু ভেবে বলল, আছে মনে হয়। তুমি বসো, আমি দেখছি বলে অন্য ঘরে যাবার জন্যে উদ্যত হলে মায়া তার হাত টেনে ধরে বলল, তোমাকে আর কিচ্ছু করতে হবে না। আমি দেখছি।
    -কি বলো? তুমি আজই এলে। দু’চার দিন না গেলে সবকিছু বুঝবে কিভাবে?
    -তোমার ও নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। শিশিরকে হ্যাঁচকা টানে খাটের ওপর বসিয়ে বলে, তুমি এখানে বসো। আমি জলদি রান্না করে নিয়ে আসছি।
    মায়া রান্না করতে গেলে শিশির ডুবে যায় কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার মাঝে।

    মায়া এসেছে বেশিদিন হয়নি। এই ক’দিনে অনেক অস্বাভাবিক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে শিশির। সেদিন শিশিরকে অফিসে যেতে দেয় না। একপ্রকার জোর করে বাড়িতে আটকিয়ে রাখে মায়া। শিশির তাকে অনেক অনুনয় করে বলে, নতুন চাকুরী, তাছাড়া প্রাইভেট কোম্পানী। ছুটি না নিয়ে বাড়ি থাকা ঠিক নয়। বস রাগ করবেন। মায়া তার কোন কথা শোনে না। দুপুরবেলা খবর আসে অফিসের ছাঁদ ধসে বেশ কয়েকজনের প্রাণহানী ঘটেছে।
    মাঝে মহল্লার মানুষদের সাথে শিশির আর মায়ার পিকনিকে যাবার কথা ছিল। চাঁদাও দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। পিকনিকের দিন মায়া বেঁকে বসে। সে যাবেনা বলে সাফ সাফ জানিয়ে দেয়। সেদিন মায়ার ওপর প্রচণ্ড রাগ হলেও তা চেপে রেখে পিকনিকে যাওয়া থেকে বিরত থাকে শিশির। পরে সংবাদ আসে সেই পিকনিকের গাড়িটি ত্রিশ ফুট গভীর খাদে পড়ে গেছে। হতাহত হয়েছে বহু মানুষ।
    এমন অদূ্ভত কাণ্ডকারখানা দেখে শিশির বুঝে উঠতে পারেনা কি হচ্ছে এসব? মায়ার কাছে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করে কোন উত্তর পায়না। তার বক্তব্য, তোমাকে আমি এমনি অফিসে যেতে নিষেধ করেছিলাম। শরীর ভাল লাগছিল না বলেইতো পিকনিকে যাইনি ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব সহজ উত্তরে মন ভরে না শিশিরের। সে নিজের মনে প্রশ্ন করেও কোন প্রশ্নের কূল কিনারা পায় না।

    মায়া তিন মাসের ভিসা নিয়ে কোলকাতায় এসেছে। আগামীপরশু মেয়াদ শেষ। মায়া দেশে ফেরার কথা বললে শিশির বলে, তুমি যদি চাও তাহলে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করি?
    মায়া শিশিরের মাথার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল, না থাক। কিছুদিন পরে তুমিইতো দেশে যাচ্ছো। অনেকদিনইতো থাকলাম।
    -আর ক’টা দিন থেকে যেতে পারতে?
    -তাই কি হয়? বাড়িতে এক মাসের কথা বলে এসেছিলাম। তিন মাস পার হয়েছে। সবাই দুশ্চিন-ায় আছে। আমাকে যেতে দাও। তুমি আর না করোনা। আর হ্যা, তুমি আগামী মাসেই এ বাড়ি বাদ দিয়ে অন্য বাসায় উঠবে।
    -কেন? উৎসুক প্রশ্ন শিশিরের।
    -এমনি বললাম। এ বাড়িতে তোমার মানায় না।
    -তার মানে আমি অযোগ্য? হেসে ওঠে শিশির।
    মায়া স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দেয়, আমি তোমাকে ঠিক তা বলিনি।
    -তবে?
    -আসলে এখানে তোমার একা একা থাকা ঠিক হচ্ছে না।
    -এতদিন পরে এ কী কথা বলছো? তুমি আসার পরপরই যদি জানাতে তাহলে দু’জনে একসাথে বাসা খুঁজে বের করতাম?।
    -আসলে তখনতো আমার মনে হয়নি। এখন মনে হয়েছে তাই বললাম। তুমি আমাকে কথা দাও; আগামী মাসেই নতুন বাসায় উঠবে?
    -কিন’ কে…….
    শিশিরের মুখের ভাষা সম্পূর্ণ হবার আগেই মায়া বলে ওঠে, কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না। তবে জেনে রেখো, আমি তোমার কোন অমঙ্গল চাইনা।

    মায়া বাংলাদেশে চলে যাবার পনের দিন পরে তার ইচ্ছানুযায়ী শিশির নতুন বাসায় উঠে। বাসাটা অফিস থেকে বেশ দূরে। মায়াকে কথা দিয়েছিল সে এ মাসে নতুন বাসায় উঠবে। তাইতো বেশি বাছ বিচারের প্রয়োজন অনুভব করে না।
    শুক্রবার সরকারী ছুটি। শিশির খাটের ওপর কাত হয়ে শুয়ে টিভির সংবাদ দেখে। হঠাৎ একটি সংবাদে তার চোখ সি’র হয়ে যায়। ‘দেবীপুরের অতি প্রাচীন জমিদার বাড়িটা ধসে পড়েছে; হতাহতের কোন খবর এখন জানা যায়নি। তবে উদ্ধারকারী দল ধারণা করছে মানুষগুলোর বাঁচার সম্ভাবনা কম। উদ্ধার তৎপরতা চলছে’। সংবাদটা দেখে তার মনে পড়ে মায়ার কথা। মায়া নিশ্চয় ভবিষ্যৎ বুঝতে পারে। তা না হলে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে তাকে বার বার বাঁচিয়ে এনেছিল কিভাবে?
    স্ত্রীকে ছেড়ে আর দূরদেশে থাকতে মন সাঁই দেয়না শিশিরের। সে চাকুরী ছেড়ে দেশে ফিরে যাবার সিদ্ধান- নেয়।

    -দীপা; আছিসরে দীপা? এ যে ছোটভাই এসেছে! ঘরের মেঝে মোছায় ব্যস-ছিল শিশিরের ছোট বোন দীপা। ডাক শুনে প্রথমে তার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠলেও পুরোনো ব্যথায় মুখ কালো করে শিশিরের সামনে এসে দাঁড়ায়।
    শিশির হাসি মুখে বলল, কিরে তোর মন খারাপ কেন? এই দ্যাখ, আমি এসে গেছি। আর কোলকাতায় যাবো না। এখন থেকে আমরা একসাথে থাকবো।
    দীপা মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে; কোন কথা বলে না। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে যা শিশিরের চোখ এড়ায় না। সে এগিয়ে গিয়ে বোনকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলল, পাগলী, কাঁদতে হয়? এখনতো হাসবি। আমি আর তোদের ছেড়ে কোত্থাও যাচ্ছি না।
    দীপা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, তুমি এসো ভেতরে। দীপা ছোটভাইয়ের বাহুডোর থেকে মুক্ত হয়ে ঘরের ভেতরে যাবার জন্যে পা বাড়ায়।
    দীপাকে উদ্দেশ্য করে শিশির বলল, তোর ভাবী কোথায়? তাকেতো দেখছিনা?
    কথাটা শুনেই দীপার আরো কান্না পায়। সে শব্দ করে কেঁদে ওঠে।
    শিশির অশুভ কিছু আঁচ করতে পারে। তার নিশ্বাস দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বলল, তোর ভাবী কোথায়? বলছিস না কেন?
    দীপা কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে বলল, ছোটভাই ভাবী নেই।
    -নেই মানে?
    -ভাবী পরপারে চলে গেছে।
    -কী বলছিস তুই! কিভাবে ঘটলো এসব? চোখ ছল ছল করে ওঠে শিশিরের।
    -তুমি কোলকাতায় যাবার কিছুদিন পরে টাইফয়েড জ্বর হয়েছিল। ডাক্তার-কবিরাজ অনেক দেখিয়েছিলাম। নয়দিন জ্বরে ভুগে মৃত্যুকে বরণ করেছে আমার ভাবী। মুখ ঢেকে আবারো শব্দ করে কেঁদে ওঠে দীপা।
    -কী আবল তাবল বকছিস? পাগল হয়েছিস নাকি? সেতো পনের দিন আগেই আমার কাছ থেকে এসেছে?
    দীপা কান্না থামিয়ে বলল, তোমার কাছ থেকে এসেছে মানে? কি বলছো তুমি?
    -তোদের তাহলে কিচ্ছু বলেনি?
    -কে কি বলবে?
    -তোর ভাবী আমার ওখানে গিয়েছিল। তিনমাস কাটিয়ে গত পনের দিন আগে দেশে ফিরে এসেছে।
    দীপা কোন ভাষা খুঁজে পায়না। সে কি বলবে তার ভাইকে? বলল, কি বলছো ভাইয়া এসব? তোমার হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে।
    -কেন ভুল হবে আমার? মায়াকে আমি চিনি না?
    -ভাইয়া তুমি বিশ্বাস করো, সে মারা গেছে আরো এক বছর আগে। তুমি ঠিকানা দিয়ে যাওনি বলে তোমাকে জানাতে পারিনি। চলো ভাইয়া দেখবে চলো।
    দীপা শিশিরকে নিয়ে যায় যেখানে মায়াকে কবর দেওয়া হয়েছে। এলাকাবাসীর মুখ থেকে মায়ার মৃত্যু আর তার কবর দেখে অবিশ্বাস করার কোন সুযোগ থাকে না শিশিরের। তার মায়ার নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে জেনে মুহূর্তে হাত পা অবশ হয়ে যায়। মাথা ঘুরে ওঠে তার। সে মাটিতে বসে পড়ে।
    শিশিরের মনে হাজার প্রশ্নের উদয় হয়, মায়ার রূপ ধরে কে তার কাছে গিয়েছিল? কে তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বার বার বাঁচিয়েছিল? কে তাকে ভালবেসেছিল-ভালবাসার গল্প শুনিয়েছিল? তবে কি সে অন্যকেউ নাকি ছায়াহীন মায়া?

    You can share