মুক্তিযোদ্ধারাই হোক প্রতিবাদের প্রেরণা

খালেদ সাইফুল্লাহ জুয়েল ● ডিসেম্বরে চেয়েছিলাম মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের গল্প লিখতে। পরিচিত অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিলো। তাদের গল্প আগেই শুনেছি, তবে সেগুলো লেখা হয়নি। আমি চাইছিলাম অপরিচিত কারো গল্প লিখতে। তাই চলে গেলাম মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ে।

মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন কাজ নিয়ে সেখানে আসেন। সেখানে আমারও কারণে-অকারণে মাঝে মাঝেই যাওয়া-আসা হয়। আমি একজন সাংবাদিক এবং তাদের কাছ থেকে যুদ্ধের গল্প শুনতে চাই এটা কিভাবে বুঝিয়ে বলবো সেটা চিন্তা করতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হলো। কয়েকজনের সাথে কথা বললাম, কেউ রাজী হয় না। দুই একজনের মুখ দেখে সন্দেহ হলো যে আসলেই তার যুদ্ধের কোনো গল্প আছে কিনা। তারপর এক ব্যাক্তিকে পেলাম, যাকে দেখে বেশ শিক্ষিত মনে হলো। তাকে বুঝিয়ে উঠতে সক্ষম হলাম। জানতে পারলাম তিনি বন বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তার সাথে কথা বলা শুরু করলাম। সে বলতে চাইলো।

আমি রেকর্ডার চালু করে শুনতে শুরু করলাম। সে যখন যুদ্ধে যায় তখন মাত্র ক্লাস নাইনে পড়ে। শরণার্থী হয়েই প্রথমে ভারত যান। তারপর আগরতলায় প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেন। মৌলভীবাজারের সীমান্তেই তারা যুদ্ধ করত। সেপ্টেম্বর মাসে চা বাগানে একটা অপারেশন চালানোর কথা ছিলো। তারা অপারেশন শুরু করার আগেই মিলিটারিরা অতর্কিতে হামলা চালায়। মুহূর্তেই গুলিবিদ্ধ হয় অনেকে। অধিকাংশ যোদ্ধা-ই প্রাণ হারায়। ইনি কোনমতে চা বাগানের ভেতর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পালিয়ে বাঁচতে পারেন। আশ্রয় নেন একজন চা শ্রমিকের কুড়েঘরে। তার বেঁচে ফেরার গল্প বলতে গিয়ে আমার সামনেই দু’দফায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তারপর চোখ-মুখ ধুয়ে এসে আবার শুরু করেন তার গল্প। তার যুদ্ধের গল্প, বিজয় ছিনিয়ে আনার গল্প। তার অশ্রুর প্রতিটি ফোটায় আমি খুজে পেয়েছিলাম দেশের প্রতি সত্যিকারের মমত্ববোধ, ভালোবাসা। শিখেছিলাম দেশের জন্য কিভাবে নিঃস্বার্থ ত্যাগ স্বীকার করা যায়। কথা শেষে তার ছবি তুলতে চাইলাম কিন্তু প্রথমে রাজী হলেন না। অগত্যা যে অবস্থায় ছিলেন সে অবস্থাতেই ছবি তুলতে বাধ্য হলাম।

তারপর তার গল্প লিখে ফেললাম। ছবির অভাবে সেই গল্প প্রকাশ হবে না জেনে আর পত্রিকাতে পাঠালাম না। তার গল্প হয়ত পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হলো না, কিন্তু তার সেই বীরত্বের গল্প আমার ল্যাপটপে রয়ে গেছে। মাঝে মাঝেই সেটা খুলে পড়ি। নিজের ভেতরে একটা শক্তি-সাহস আনার চেষ্টা করি। এইসব যোদ্ধারাই আমাদের মত তরুন প্রজন্মকে দেশের জন্য ভাবতে শেখায়। কিভাবে মানুষের স্বার্থে অকাতরে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া যায় সেই শিক্ষা দেয়। এইসব বীর সন্তানেরাই আমাদেরকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখায়, আমাদের কলমে ছন্দ এনে দেয়। স্বাধীনতার এই মাসে বীর সন্তানদেরকে লাল সালাম।