রেন্ট হোম : শহরের পরিচিত গল্প

রেন্ট হোম : শহরের পরিচিত গল্প

___________বিএম খালিদ হাসান

পর্বঃ ০১

মেইনরোড থেকে গলি ধরে পুরনো বিল্ডিংটার কাছে থামলো একটা সিএনজি । খাঁচার মত গ্রিল লাগানো দরজাটা ঠেলে সাবধানে রাস্তায় নামলো রেজওয়ান ।

– কত টাকা হয়েছে ?
– ১৩০ টাকা স্যার ।
– ২০ টাকা খুচরা হবে ?

১৫০ টাকা রেখে পকেট থেকে একটা ২০ টাকার নোট বের করে দিলো সিএনজি চালক । শপিং ব্যাগ আর জিনিসপত্রগুলো নামিয়ে নতুন বাসায় ঢুকলো রেজওয়ান । পুরনো দোতলা বাড়ি । রাজউকের ভাষায় অবশ্য পুরনো নয়, পরিত্যক্ত ! ঢাকা শহরে জায়গার বড় অভাব । ফ্ল্যাট গুলোর ও চড়া দাম ! চাকরির সুবাদে আপাতত এটায় উঠেছে স্ত্রী অনন্যাকে নিয়ে ।

কলিংবেল চাপ দিলো রেজওয়ান । কয়েক মুহুর্ত অপেক্ষা করেও সাড়া পেলো না । আবার চাপ দেওয়ার জন্য সুইচের দিকে হাত এগোতেই দরজা খুলে গেলো । অনন্যা । হাতের ব্যাগগুলো নিতে নিতে বললো,

– কি ব্যাপার, আজ এত তাড়াতাড়ি ? এগুলো কি ?
– আগে ছুটি হয়ে গেলো, সোজা মার্কেটে গেলাম, কিছু কেনাকাটা করলাম
– হুম, দেখতেই পাচ্ছি, পুরো মার্কেটটাই কিনে এনেছো !

দুজনে মিলে ব্যাগগুলো ভিতরে নিয়ে গেলো । রেজওয়ান শার্টের উপরের বোতামটা ঢিলে করে দিয়ে সোফায় বসে পড়লো । ফুলস্পিডে ফ্যান ঘুরছে । ভাগ্যিস লোডশেডিং নেই । বাইরের তাপদাহটা ফ্যানের বাতাসে কমে আসছে । অনন্যার কথায় বাস্তবে ফিরে এলো রেজওয়ান,

– ফ্রেশ হয়ে এসো, ভাত দিচ্ছি…
– আসছি…

পর্বঃ ০২

অনন্যা ম্যাগাজিন পড়ছে । দুপুরে খাওয়ার পর বিশ্রাম শেষে রেজওয়ান এসে সোফায় বসলো ।

– নতুন বাসা কেমন লাগছে ?
– এত কাজ আর বলো না, সবকিছু নতুন করে সাজাতে হচ্ছে…
– কয়েকটা দিন মাত্র । চাকরিটা সবে হলো । একটু গুছিয়ে নিই, এরপর দুজনের জন্য সুন্দর একটা ফ্ল্যাট নিয়ে নেবো । কয়েকটা মাস একটু কষ্ট করো…

অনন্যা ম্যাগাজিনটা টি টেবিলে রেখে রেজওয়ানের পাশে এসে বসলো…

– আমি তো বলিনি আমার কষ্ট হচ্ছে । আমি জানি একদিন আমাদের ও সবকিছু হবে । তখনকার সুখের কাছে এটা তো কিছুই না !
– এজন্যই তোমাকে এত ভালবাসি !

…বলে বাচ্চাদের মত করে অনন্যার নাক টিপে দিলো রেজওয়ান ।

– হয়েছে ! আর রোমান্টিক হতে হবে না ! বসো, চা করে আনছি ।

কিচেনে গেলো অনন্যা । টি টেবিল থেকে ম্যাগাজিনটা হাতে নিলো রেজওয়ান । ঘর ডেকোরেশনের টিপস বিষয়ক একটা আর্টিকল । কিচেন থেকেই অনন্যা জিজ্ঞাসা করলো, “চিনি দেবো ?” । “দু চামচ…” বলে ম্যাগাজিনটা রেখে টিভির রিমোট টা হাতে নিলো রেজওয়ান ।

চলমান সাদা কালো আলোক ঝটা ঝিরঝির করে উঠলো । সম্ভবত কেবল লাইনে সমস্যা । দীর্ঘদিন অব্যবহৃত বাড়িতে কিছুই ঠিক থাকার কথা নয় । দুর থেকে একটা অস্পষ্ট সুরেলা আওয়াজ ভেসে আসছে ।

টিভি অফ করে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো ও । আওয়াজটা আগের মতই অস্পষ্ট । কানখাড়া করে শব্দগুলো ধরার চেষ্টা করতে লাগলো রেজওয়ান । কোনো একটা গান । সুরের সাথে বাদ্যযন্ত্রের ঝংকার ও আছে । ঝংকারটা এবার একটু জোরেই হলো । তবে সেটা চায়ের কাপের সাথে চামচের ঠোকাঠুকি লেগে ।

অনন্যা চা নিয়ে এসেছে । একটা মোলায়েম হাসি দিয়ে গরম চায়ের কাপটায় চুমুক দিলো রেজওয়ান । চা টা দারুণ করে অনন্যা ।

পর্বঃ ০৩

আসবাবপত্র গোছানোর চেয়ে এত পুরনো বাড়ির ধুলোময়লা ঝাড়ু দেওয়াই যেন বেশি কষ্টকর । স্টোররুমে প্রবাসী মালিকের ব্যবহৃত অনেক জিনিস রয়ে গিয়েছে অ্‌যান্টিক হিসেবে । মাকরশার জালে জড়ানো ট্র্যাংক, পিতলের লম্বা কলসি, একজোড়া মিলিটারি বুট, কিছু ছেড়া মালার অংশবিশেষ, আরো অনেক কিছু । তার মধ্য থেকে অনন্যার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিলো একটা নুপূর ।

একটাই । অন্যটাকে এদিকে ওদিকে খুঁজে পেলো না । পরে দেখলো কেমন । অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো অনন্যার মুখে । হয়তো একসময় এবাড়ির কোনো এক রূপসী কন্যার পায়ে শোভা পেতো নুপুরগাছি । সারা বাড়িতে রিনিক ঝিনিক ঝংকার তুলে রাজত্ব করতো… । সুস্থির পায়ে পরে থাকা অবস্থায়ই অনন্যার কানে সেই রিনিক ঝিনিক শব্দ বাজছে । শব্দ থেমে গেলো কারো উপস্থিতিতে । রেজওয়ান পিছন থেকে কাধের উপর দিয়ে হাত রেখে জড়িয়ে ধরে বললো…

– কি করছো ?
– ও তুমি ! দেখছো না, সব এলোমেলো পড়ে আছে । দেখে মনে হয় ভূতের বাড়িতে এসেছি !

একটা পিতলের কলসি দেখিয়ে বললো, “ওটা এখানে রাখো তো…” ।

– তুমি ভূত বিশ্বাস করো ?
– ধুর ! ভূত বলে সত্যিই কিছু আছে নাকি ! তুমি করো ?
– হ্যা, করি তো !
– আশ্চর্য ! ভূত বিশ্বাস করো ! কেন ?
– এইযে তুমি বললে ভূতের বাড়িতে এসেছি, তাই !
– হাহাহা ! দুষ্টামি রাখো তো !

পিতলের কলসিটা নিচে রাখতে গিয়ে অনন্যার পায়ের নুপুরটা চোখে পড়লো রেজওয়ানের…

– এই, তোমার পায়ে ওটা কি ?
– নুপূর ! নিচে পেলাম !
– একটু দাঁড়াও, আমি আসছি…

বলে রুমে গেলো রেজওয়ান । অনন্যা অপেক্ষা করতে থাকলো । রেজওয়ান এসে বললো…

– চোখ বন্ধ করো !
– চোখ বন্ধ করবো ! কেন ?
– আহা ! করো না ! সারপ্রাইজ আছে ?
– সারপ্রাইজ ! হুমম…

…বলে চোখ বন্ধ করলো অনন্যা । রেজওয়ান একটা সুন্দর ডিজাইনের লকেট দেওয়া চেইন পরিয়ে দিলো অনন্যাকে ।

– ওমা ! এটা কখন আনলে ?
– অফিসের কাজে শপিং কমপ্লেক্সে গিয়েছিলাম, জুয়েলারির দোকানে এটা দেখে পছন্দ হলো, নিয়ে এলাম !
– কত খরচ হলো ?
– বেশি নয়, আট হাজার…
– এতগুলো টাকা নষ্ট করতে গেলে কেন ?
– নষ্ট কই ! আমার কাছেই তো থাকছে সবসময় !

…বলে অনন্যার কপালে নিজের কপাল ছোঁয়ালো । দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরেই স্টোর রুম থেকে বের হয়ে গেলো । স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ফ্লোরে পড়ে রইলো নুপূরটা

পর্বঃ ০৪

রাত ১১টা ।
রেজওয়ান বিছানায় শুয়ে পড়েছে ।
একটু পরে লাইট অফ করে অনন্যাও শুয়ে পড়লো । ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে ঘুরছে । এখন রাত ২টা বেজে ১০ মিনিট । অনন্যা আধঘুমো চোখে ওয়াশরুমে গেলো । ট্যাপ বন্ধ করে যখন ফিরে এলো রেজওয়ান আগের মতই ঘুমাচ্ছে । ঘুম ভাঙলো সকালে অনন্যার ডাকে…

– ব্রেকফাস্ট রেডি

ব্রেকফাস্ট সেরে অফিসের জন্য রেডি হচ্ছে রেজওয়ান । অনন্যা শুকনো কাপড় দিয়ে প্লেটগুলো মুছে টেবিলে রাখছে । রেজওয়ান আসতেই প্লেটটা রেখে টাই বেঁধে দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালো । রেজওয়ানকে জিজ্ঞাসা করলো…

– তুমি কি কোনো কারণে টেন্সড ?
– কেন বলো তো ?
– রাতে ওয়াশরুমে গিয়ে ট্যাপ বন্ধ করতে ভূলে গিয়েছিলে…
– কই না তো !
– মাঝরাতে উঠে দেখি পানি পড়ছে…
– কি জানি ! সারাদিন ছোটাছুটির পর খুব ঘুম পেয়েছিলো, কিছুই মনে নেই !
– কখন ফিরবে ?
– অফিস শেষে ম্যাডাম !
– অফিস কখন শেষ হবে ?
– যখন আমি ফিরবো !
– শুধু দুষ্টামি !

হাত দিয়ে রেজওয়ানের চুলগুলো ঠিক করে দিলো অনন্যা । সি অফ করে দরজাটা আটকে দিলো । অনেক কাজ বাকি । একটা পুরনো পেইন্টিং আছে । সেটা ড্রয়িং রুমে লাগানোর চিন্তাটা মাথায় এলো । জায়গা খুঁজে পেতে দেরি হলো না ।

পুরনো বাড়িতে রং ফিকে হয়ে গিয়েছে । কিন্তু সোফার পিছনের দেয়ালটায় একটা চারকোণা সাদা অংশ দৃশ্যমান । সম্ভবত আগে একটা পেইন্টিং টাঙানো ছিলো । একটা পিনও আছে । ছবিটা ঝুলিয়ে দিয়ে দেখতে থাকলো অনন্যা । দূর্বা ঘাস আর ফসলের মাঠের ঢেউখেলানো দৃশ্যের একটা অয়েল পেইন্ট ।

হঠাত্ কিচেন থেকে একটা পাতিল পড়ার শব্দ এলো । ছেড়া কাগজগুলো ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে রেখে কিচেনে গেলো অনন্যা । জানালার একটা পাল্লা খোলা । তার ঠিক নিচের দিকে ফ্লোরে একটা পাতিল গড়াগড়ি খাচ্ছে ।

পর্বঃ ০৫

রেজওয়ান ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোতে দৃশ্যমান ঘটনাপ্রবাহ দেখছে । দুজন পুলিশের কনস্টেবল কথা বলতে বলতে গলির এমাথা থেকে ওমাথায় গেলো । তারা দৃষ্টিসীমার বাইরে যেতেই একজন শীর্ণকায় লোক ধীরে ধীরে গলির ওমাথা থেকে এমাথায় হেঁটে এলো । একবার চোখাচোখি ও হলো যেন । লোকটা একটা ল্যাম্পপোস্টের কাছে গিয়ে থেমেছে ।

অনন্যা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি রেজওয়ান । টের পেলো ওর কথা শুনে,

– কি করছো এখানে ?
– তুমি ! কখন এলে ?
– বেশ কিছুক্ষণ
– এসেছো যখন কৃত্রিম চন্দ্রালোক উপভোগ করো !
– আঁধো আলোতে গলিটা খুব সুন্দর দেখায়, তাই না ?
– হুম, তবে তোমার চেয়ে বেশি নয় !

অনন্যা আলোর কথা বলতেই ল্যাম্পপোস্টের কাছে দাঁড়ানো লোকটার কথা মনে পড়লো ।

– হাহাহা ! তুমি পারোও !
– হাসিটা অবশ্য একটু বেশি সুন্দর হতে পারে !
– আচ্ছা, এদিকটায় কি চোর ডাকাতের উপদ্রব খুব ?
– এরকম কিছুই শুনিনি । কেন ?
– আজ ড্রয়িং রুমে কাজ করছিলাম । একটা শব্দ পেয়ে দেখি কিচেনের জানালা একটা খোলা…
– কিছু হারিয়েছে ?
– না, কিছুই হারায়নি । কি জানি ! বিড়াল ও হতে পারে । চলো ডিনার করতে যাই ।
– চলো !

দুজনে ব্যালকনি থেকে ভিতরে চলে এলো । প্রতিদিনের মত সকালে অফিস আছে । ডিনার সেরে শুয়ে পড়াই ভালো । সেটাই করলো ওরা ।

রাত ৩:১০ টায় অনন্যার ঘুম ভেঙে গেলো । কিছু একটা পড়ার শব্দ । তবে এবার স্টোররুম থেকে । লাইট জ্বালিয়ে সবকিছু চেক করলো অনন্যা । তৃতীয় কোনো কিছুর উপস্থিতি নেই । লাইট নিভিয়ে ফিরে আসার সময় লক্ষ্য করলো ওয়াশরুমে ট্যাপ থেকে পানি পড়ছে ।

আবার সুইচটা টিপে কাজ হলো না, পাওয়ার কাট মনে হয় । রেজওয়ান ঘুমাচ্ছে । ওয়াশরুমে কেউ যাওয়ার প্রশ্নই আসে না । অন্ধকারে কান চেপে শব্দটা লক্ষ্য করে এগোতেই কারো সাথে ধাক্কা খেলো । স্পর্শেই বোঝা গেলো রেজওয়ান ।

– তুমি !
– কি ব্যাপার ! অন্ধকারে কি করছো ?
– কিছু না, ওয়াশরুমে…

বলতে বলতে খেয়াল করলো ট্যাপ থেকে পানি পড়ার কোনো আওয়াজ আর নেই ।

– কারেন্ট চলে গিয়েছে । একটা চার্জার লাইট কিনতে হবে । কাল একবার মনে করিয়ে দিও তো ।
– হুম…

পুনরায় বিছানায় এসে শোবার সময় জানালার পর্দায় ফাঁকা অংশটার দিকে চোখ গেলো অনন্যার । ল্যাম্পপোস্টের আঁধো আলোটা ঠিকই জ্বলছে… ।

পর্বঃ ০৬

ডাইনিং টেবিলে তেমন কথা হলো না । দুজনে স্বাভাবিকভাবে মোলায়েম হাসি দিয়ে সি অফ করার সময় অনন্যা বললো,

– আজ একটু তাড়াতাড়ি এসো
– কোনো সমস্যা ?
– না এমনি… ভালো লাগছে না
– হুম, আসবো

রেজওয়ানকে বিদায় দিয়ে অনন্যা ম্যাগাজিনটা হাতে নিলো । লেখিকা খুব সুন্দরভাবে অল্প জিনিসপত্রে রুম সাজানোর নির্দেশনা দিয়েছেন । পড়তে পড়তে কেটে গেলো বেশ খানিকটা সময় । শুয়ে ম্যাগাজিনটা পড়ার সময় টেলিফোনটা চোখে পড়লো ।

পুরনো লাল টেলিফোন । এটা অবশ্য আগে থেকেই আছে । পাশে রাখা নোটবুক থেকে শর্মিলার নাম্বারটা বের করলো । ওর কলেজ লাইফের বান্ধবী । কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর কট করে ফোন রিসিভ হলো,

– হ্যালো শর্মি, আমি অনন্যা…
– অনন্যা ! কি রে, কতদিন পর, কেমন আছিস ?
– হ্যা রে ভালো আছি ।
– নতুন বাসা কেমন লাগছে ?
– আর বলিস না ! বাড়িটা অনেক পুরনো, এটা ওখানে, ওটা ওখানে, সে এক অস্তির অবস্থা
– আমি তো রাজশাহীতে আছি, নইলে তোকে কিছু হেল্প করতে পারতাম, আমার ছোট বোনের বাসা কাছাকাছিই
– না রে, দরকার হবে না, প্রায় সবকিছুই গুছিয়ে নিয়েছি…

টং করে কলিং বেল বাজলো । অনেকটা পিতলের ঘন্টার মত করে । এটাও পুরনো ।

– এই শর্মি, ও অফিস থেকে এসেছে মনে হয় । রাখি রে, তুই ঢাকায় এলে আসবি কিন্তু
– ঠিক আছে, ভালো থাকিস
– হ্যা, রাখি…

রিসিভারটা রেখে দরজা খুললো । কেউ নেই । গেট পর্যন্ত ভালো করে দেখলো । আসলেও কেউ নেই । রাস্তায় কোনো সিএনজিও চোখে পড়ছে না । ফিরে এসে সোফায় বসতেই আবার কলিং বেল । খুলতেই দেখলো রেজওয়ান দাঁড়িয়ে ।

– তুমি ! ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে তো
– মানে ?
– কিছু না, ফ্রেশ হও ভাত দিচ্ছি
– উহু, বসা যাবে না । আজ বাইরে খাবো, রেডি হয়ে নাও
– এত কিছু যে রান্না করলাম সেগুলোর কি হবে ?
– ফ্রিজে রেখে দাও, রাতে গরম করে খাওয়া যাবে
– তুমিও না ! আগে বললে কি হতো ?
– কি করে জানবো অফিস আগে ছুটি হবে আর বউটা এত রাজভোগের আয়োজন করে রাখবে !
– রাজভোগ না ছাই ! করল্লা ভাজির সাথে কৈ মাছ আর মসূরের ডাল করেছিলাম !
– তাদের দূর্ভোগ ! মিস্টার অ্‌যান্ড মিসেস এখন চাইনিজ আর স্যূপ খেতে যাবে
– আচ্ছা, আসছি…

অনন্যা তৈরি হতে গেলো । রেজওয়ান ও ড্রেস চেঞ্জ করতে রুমে ঢুকলো । ড্রয়িং রুমের ফ্যানটা পূর্ণ গতিবেগে ঘুরছে…

পর্বঃ ০৭

বাড়ির বয়স শত না হলেও পঞ্চাশের বেশি হবে ।
ছোট কিন্তু বেশ আধুনিকতার সাথে তৈরি । কিচেন ছাড়া অন্যান্য জানালাগুলো কাচলাগানো । দরজাগুলো এক পাল্লাবিশিষ্ট । নব ঘুরিয়ে খোলার সিস্টেম । হঠাত্‍ খট করে নবটা ঘুরে গেলো । সারাবিকেল পর রেজওয়ান আর অনন্যা বাসায় ঢুকলো…

– এত গরম… ফ্যানটা অন করো তো…
– অফিসে এসিতে কাজ করো তো, তাই গরমটা বেশি লাগছে
– প্রমোশনটা পেতে দাও, প্রথমেই বাসায় একটা এসি লাগাবো
– হয়েছে ! রেন্ট হোমে আর এসি লাগাতে হবে না… বসো, গরম চা করে আনছি…
– আবার গরম ! ঠান্ডা চা বানাতে পারো প্লিজ !

কিচেনে গেলো অনন্যা ।
প্রথমেই থমকে দাঁড়ালো ।
কাল যে জানালাটা খোলা ছিলো সেটা আজও খোলা ।
ওর স্পষ্ট মনে আছে যাওয়ার আগে ছিটকিনি আটকে দিয়েছিলো । শিকলটা একটু নড়ছে ও । মনে হচ্ছে এক্ষুণি কেউ জানালাটা খুলেছে । জানালার বাইরে ঝাউসহ কিছু বুনো গাছ আর ঘাসে ভর্তি । সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে চা বানানোতে মনযোগ দিলো ।

কেটলিটা চাপিয়ে দিয়ে অপেক্ষা । কিছু একটার অভাব মনে হচ্ছে । দুটো কাপ, চামচ, একটা জার… । ট্রে টা কোথায় রেখেছে মনে করতে পারলো না । নতুন ট্রে বের করতে হলো ।

অনন্যার চা বানানোর সময়টাতে টিভি অন করলো রেজওয়ান । চলমান সাদাকালো রশ্মিগুলো আবার স্পষ্ট হয়ে উঠলো । কেবল লাইনটা ঠিক করার কথা মনেই থাকে না । রিমোট চেপে বন্ধ করে দিলো টিভি । টেবিল থেকে অনন্যার ম্যাগাজিনটা হাতে নিলো । পড়তে একটু অসুবিধা হচ্ছে । সূর্যের আলো পর্দা অতিক্রম করে আসতে আসতে ক্ষীণ হয়ে যায় । হঠাত্‍ আলোটা বেড়ে গেলো । টিভিটা নিজে নিজেই অন হয়ে গিয়েছে । রিমোট চেপে কাজ হলো না । কয়েকটা চাপড় মারার পর অফ হলো । কি হচ্ছে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না রেজওয়ান । অবশ্য ইলেক্ট্রনিক্স জিনিসে মাঝে মাঝে ডিস্টার্ব দেয় ।

চা নিয়ে এলো অনন্যা । রাঙামাটি থেকে সদ্য আনা তাজা চায়ের ঘ্রাণ ক্লান্তির অবসান ঘটিয়ে সতেজ করে দিলো । কাপে চুমুক দিলো রেজওয়ান । দারুণ । আসলেই গরম চায়ের স্বাদ আলাদা বাইরের তাপমাত্রা যতই গরম হোক না কেন । জানালার পর্দা খুলে দিয়েছে অনন্যা । ঝকঝকে আলোয় আলোকিত হয়ে গেলো রেন্ট হোম ।

পর্বঃ ০৮

রাত তিনটার সময় রেজওয়ানের ঘুম ভেঙে গেলো । বিছানায় ডান পাশে হাত দিয়ে দেখলো অনন্যা নেই । লাইট জ্বালিয়ে ড্রয়িং রুম, ওয়াশরুম চেক করলো । নেই । উপরে যাওয়ার সিঁড়িতে উঠতেই দপ দপ করে লাইট ফিউজ হয়ে গেলো । চার্জারটা বালিশের পাশে । তবে প্রয়োজন হবে না । স্ট্রিটলাইটের আলোর আভা ব্যালকনিতে এসে পড়েছে । অনন্যা নিথর দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারের পানে চেয়ে ।

– অসময়ে ব্যালকনিতে কি করছো ? ঘুম আসছে না ?

কিছুক্ষণ নির্বিকার থেকে অনন্যার শুকনো গলায় উত্তর এলো…

– রেজওয়ান, আমাদের এ বাসাটা নেওয়া ঠিক হয়নি…
– হ্যা, একটু ছোট্ট আর পুরনো, একটু কষ্ট করলে দুজনের মাস ছয়েক দিব্যি চলে যাবে
– আমি সেটা বলছি না ।
– তাহলে ?
– জানো, এখানে এমন কিছু হচ্ছে যা আমি শুধু ফিল করতে পারি, কিন্তু… কিন্তু পরে দেখি কিছুই নেই
– কি হয়েছে বলো তো ?
– এ বাড়িতে কিছু একটা আছে
– মানে ?
– আমার সবসময় কেন জানি মনে হয় আমরা দুজন ছাড়াঐ তৃতীয় কিছু একটা ঘোরাফেরা করে
– কি সেটা ?
– আমি জানিনা, শুধু ফিল করতে পারি
– হ্যালুসিনেশন । নির্জন এলাকা, আশপাশটা নীরব তাই তোমার ভ্রম হতে পারে
– হ্যালুসিনেশন ? রাতে ট্যাপ থেকে পানি পড়তে শোনা, হঠাত্‍ লাইট চলে যাওয়া, খটখট শব্দে ঘুম ভাঙা, কিচেনের জানালা নিজে থেকে খুলে যাওয়া এটাকে তুমি ভ্রম বলবে ? আমি আর টলারেট করতে পাচ্ছি না রেজওয়ান

অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো অনন্যার চোখ । রেজওয়ানের বুকে আশ্রয় নিলো । গত কয়েক রাতের অভিজ্ঞতা বেশ জরাগ্রস্থ করে তুলেছে ওকে ।

– কাম ডাউন অনন্যা, কাম ডাউন । সব ঠিক হয়ে যাবে ।
– সব ঠিক হয়ে যাবে ? কিচ্ছু ঠিক হবে না, আমি তোমাকে দেখাচ্ছি

রেজওয়ানের হাত ধরে টেনে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেলো অনন্যা । আচমকা টানে দৃষ্টি ঘোরানোর সময় কেন যেন মনে হলো নষ্ট বাল্ব ওয়ালা একটা ল্যাম্পপোস্টের তলায় কেউ একজন দাঁড়ানো । মাথা ঘুরিয়ে দেখলো কেউ নেই । ভ্রম ।

রেজওয়ানকে স্টোররুমে টেনে নিয়ে এলো অনন্যা । ৪০ ওয়াটের আলোটা অন করে বললো, “দেখো” । কিছু চোখে পড়লো না । অনন্যা ফ্লোরে পয়েন্ট করছিলো । হঠাত্‍ একটা কিছু আবিস্কার করলো রেজওয়ান ।

লাল রক্তের ছাপ । রক্তের ছাপ মানে পায়ের ছাপ । রক্ত লাগানো পায়ে কেউ হেটে ঘোরাফেরা করলে যেরকম ফুটপ্রিন্ট পড়ে ঠিক তাই ।

– ফুটপ্রিন্ট ?
– ভালো করে দেখো । সব দরজা-জানালা আটকানো, লাইট নিভানো ছিলো, তাহলে এটা কিভাবে এলো ? তোমার কাছে কোনো ব্যাখ্যা আছে ?
– স্ট্রেঞ্জ…
– আমার আর কিছুই ভালো লাগছে না এবাড়ির । কিছু একটা করো প্লিজ
– হুম । তুমি টেনশন করো না । আমি দেখছি । সব ঠিক হয়ে যাবে

আশ্বাস পেয়ে মাথা নাড়লো শক্ত করে রেজওয়ানের হাতের আঙুল ধরে থাকা অনন্যা । পরপর তিনরাতের অভিজ্ঞতাগুলোই বলে দেয়ে কিছু একটা তো নিশ্চয়ই ঘটছে এ বাড়িতে । এখন সময় রহস্য উদঘাটনের… ।

পর্বঃ ০৯

দুইদিন পরের সকাল ।
অনন্যা বেডকভারটা পাল্টে দিচ্ছে ।
রেজওয়ান নিউজপেপার হাতে সোফায় । আজ ফ্রাইডে, অফিস নেই । গত দুইদিন তেমন কিছুই হয়নি বাড়িতে, সবকিছুই স্বাভাবিক । অনন্যা ও চিন্তাগুলো মন থেকে মুছে ফেলেছে । বেডকভার ঠিক করতে করতেই বললো,
“তোমার কোন বন্ধুকে ইনভাইট করবে বলছিলে না ?”
“হ্যা, ইফতেখার… চিঠি লিখে রেখেছি, বিকেলে পোস্ট করে আসবো”, পেপার থেকে চোখ না তুলেই উত্তর দিলো রেজওয়ান ।
“চিঠি কেন ? ফোন ইউজ করে না তোমার বন্ধু ?”
“ও আবার অন্যরকম । বনজঙ্গল, রহস্য এসব ভালবাসে । বেশিরভাগ সময়ই জনশূন্য পাহাড়ি এলাকায় কাটায়”
“আজব তো ! তোমার সাথে কোনো মিল নেই দেখছি !”
“হাহাহা ! কাজে মিল না থাকতে পারে, মনের মিল আছে, নইলে কি আর বেস্ট ফ্রেন্ড !”
“বিয়ে করেনি এখনো ?”
“না । করবে বলে মনে হয় না, হলেও অনেক পরে…”
“আশ্চর্য, তুমি করলে কেন ?”
“আমার ও করার ইচ্ছা ছিলো না । কিন্তু তোমাকে দেখে আর অপেক্ষা করতে পারলাম না, প্ল্যান চেঞ্জ করতে হলো !”

অনন্যা দাঁত কিটিমিটি করে পরোক্ষণেই স্নিগ্ধ একটা হাসি দিলো । আসলেই রেজওয়ান ওকে খুব ভালবাসে । বেডকভার পাল্টানো শেষ । বালিশদুটো জায়গামত রেখে আসতেই কলিংবেল । একবারই বাজলো । বোঝা গেলো কোনো জেন্টলম্যান এসেছে ।

রেজওয়ান পেপার রেখে উঠলো । দরজা খুলতেই দেখলো অনুমান সঠিক । তবে সাহেবী লম্বা কোট আর হ্যাটের মাঝে যাকে দেখলো সেটা অপ্রত্যাশিত তো বটেই, বেশ বিস্মিত করলো ওকে ।

“ইফতেখার !” বলেই ফ্রিজ হয়ে গেলো রেজওয়ান ।

“ক্যান আই কাম ইন প্লিজ ?”, বলে হাসিমুখে দাঁড়ানো সাহেব হ্যাট টা একটু উঁচু করে আবার জায়গাতে রাখলো ।

রেজওয়ান “হুম, সিওর !” বলার পর স্মার্ট ভয়েস আর সাহেবি পোশাকে পরিপাটি রেজওয়ানের বন্ধু ইফতেখার ব্রিফকেস সাইজের একটা স্যুটকেস নিয়ে ঢুকলো । একটু আগে এর কথাই হচ্ছিলো অনন্যার সাথে । সোফায় বসলো দুজন ।

“তারপর, কোথা থেকে এলি ?”
“মার্স, দ্য ফোর্থ প্ল্যানেট !”
“কি !”
“আমাকে দেখে যেভাবে চমকে গিয়েছিলি তাতে এটাই মনে হচ্ছে !”
“হাহাহা ! চমকে যাওয়ার কারণ ছিলো । তোকে এখানে আসার জন্য সকালে একটা চিঠি লিখছিলাম, এমনকি একটু আগেও ওর সাথে কথা হচ্ছিলো”
“রিয়্যালি ? দিস ইজ কলড টেলিপ্যাথি । কলেজে থাকতে তো বিশ্বাস করতি না, ইউ জাস্ট প্রুভড ইট !”
“মে বি ! অনেকদিন পর দেখা হলো তোর সাথে । দাঁড়া, ওকে ডাকি । অনন্যা… এই অনন্যা…”

কিচেন থেকে “আসছি” বলে এলো অনন্যা । জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ইফতেখারের দিকে তাকালো ।

“অনন্যা, ইফতেখার… ইফতেখার, অনন্যা, তোর ভাবী”
ইফতেখার দাঁড়িয়ে বললো, “হ্যালো ভাবী, কেমন আছেন ? আই অ্‌যাম স্যরি, ম্যারেজ ডে তে আসতে পারিনি”
“হ্যা, ভালো আছি, বসুন” বলে কিছুটা অবাক হয়ে রেজওয়ানের দিকে তাকালো অনন্যা যার অর্থ এটা কি সেই ইফতেখার ।

রেজওয়ানঃ ইফতেখারের কথাই বলছিলাম তোমাকে
অনন্যাঃ কি আশ্চর্য ! আপনাকে নিয়েই কথা হচ্ছিলো এতক্ষণ । একটা চিঠিও লিখেছিলো আপনার বন্ধু ।
ইফতেখারঃ দ্যটস সারপ্রাইজ । মনের মিল থাকলে এরকম হয়, উই আর বেস্ট ফ্রেন্ডস !
অনন্যাঃ তারপর, কি করছেন এখন ?
ইফতেখারঃ অনেক কিছুই । রিসেন্ট রাঙামাটিতে গিয়েছিলাম ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড ইন্সপেক্ট করতে । প্যারানর্ম্যাল এক্সিসটেন্স বলতে পারেন ।
অনন্যাঃ প্যারানর্মাল জিনিস ? মানে ভৌতিক কিছু ?

রেজওয়ানের দিকে তাকালো অনন্যা । সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর কথা মনে পড়ছে বুঝতে পারলো রেজওয়ান ।

ইফতেখারঃ ইয়েস । তবে আমি ভূত-আত্মা এগুলো বিশ্বাস করি না । যেটা করি সেটা হলো অবজার্ভেশন এবং সায়েন্টিফিক সল্যুশন খুঁজে বের করা ।
রেজওয়ানঃ ওর অবজার্ভেশনের কথা আর বলো না ! কলেজে থাকতে আমাকে নিয়ে প্ল্যানচেট ও করেছিলো !
অনন্যাঃ সিরিয়াসলি ! কোনো রেজাল্ট এসেছিলো ?
ইফতেখারঃ ওটা জাস্ট মজা নেওয়ার জন্য ছিলো !
অনন্যাঃ ইন্টারেস্টিং ! দুবন্ধু মিলে অনেক কিছুই করেছেন । এনিওয়ে, তোমরা গল্প করো, আমি চা নিয়ে আসি ।
রেজওয়ানঃ আর আমি ওর রুমটা দেখিয়ে দিচ্ছি ।
ইফতেখারঃ অফ কোর্স !

রেজওয়ানের সাথে উপরে উঠে গেলো ইফতেখার । ফ্রেশ হয়ে চা পর্বটা সেরে নেওয়া যাবে… ।

পর্বঃ ১০

বিকেলের প্রহর ।
অনন্যা কিচেন । অন্য দিনগুলোতে দুপুরে দুবেলার খাবার রান্না করে রাখে । ইফতেখার আসাতে কিছু স্পেশাল আইটেম থাকছে মেন্যুতে ।

ইফতেখার রেস্ট করছে । দোতলায় রেজওয়ান আর অনন্যার বেডরুম, তারপর স্টোররুম, তারপর গেস্টরুম যেখানে ইফতেখার থাকছে আর তারপরই নিচে নামার সিঁড়ি ।

রেজওয়ান কিচেনে এলো,

রেজওয়ানঃ কি হচ্ছে রাতে ?
অনন্যাঃ অনেক কিছুই… চিকেন, পোলাও, ডিমের কোর্মা, উচ্ছে ভাজি আরো অনেক কিছু…
রেজওয়ানঃ এতকিছু করছো, যার জন্য হচ্ছে সে খেলেই হয় !
অনন্যাঃ কেন, তোমার বন্ধুর খাবারে অরুচি নাকি ?
রেজওয়ানঃ অরুচি ঠিক নয়, ওর এক আইটেমেই হয়ে যায় ।
অনন্যাঃ দেখেই বুঝেছি ইফতেখার সাহেব তোমার মত ভোজনরসিক নয় ।
রেজওয়ানঃ রাধুনীর হাতে গুণ থাকলে পেটপুরে যাওয়ার পরও খাবার রুচি যায় না ! এক কাজ করো, চিংড়ির মালাইকারী ও করো । ওকে দিয়ে আজ সবরকম খাবার চেখে দেখাবো !
ইফতেখারঃ কখনোই না ভাবী ! আমার ওর মত ফ্যাট জমানোর শখ নেই ! (ইফতেখারের দিকে তাকিয়ে) এখন ঠিক আছে, কয়দিন পর বুঝবি খাবারের টেস্ট কি জিনিস !

ইফতেখার কিচেনে ঢুকেছে ।

রেজওয়ানঃ কি রে ! ঘুমাসনি ?
ইফতেখারঃ দিনে ঘুমোনোর অভ্যাস নেই । টিভি রুমে যাচ্ছিলাম, কানে এলো আমাকে ভুরিভোজ করানোর প্ল্যান হচ্ছে !
অনন্যাঃ আপনার বন্ধুর সেটা প্রতিদিনকার কাজ । পুরো সপ্তাহের বাজার একদিন করে আনে, তারপর শুধুই টেস্ট ! টেস্টের শেষ নেই…
রেজওয়ানঃ সেটাই ভালো ! ফ্রিজে রেখে পঁচানোর দরকার কি ?
অনন্যাঃ একদিনে একমাসের বাজার করার দরকারটাইবা কি শুনি !

ইফতেখার ছুরিটা হাতে নিয়ে চপিং বোর্ডটা টেনে নিলো ।

ইফতেখারঃ এটা আপনার হাতের গুণের জন্য ভাবী ! আগে দুটো রুটি আর এক কাপ চা খেয়েই সারাদিন কাটিয়ে দিতো !
অনন্যাঃ তার ও গুণ কম না । আপনার কথা বলুন, বিয়ে করছেন কবে ?
ইফতেখারঃ এটা নিয়ে কখনো ভাবিনি !
রেজওয়ানঃ কিভাবে করবে, বিয়ে করলে তো আর মাঝরাতে ভূত নিয়ে গবেষণা করতে পারবে না !
অনন্যাঃ আচ্ছা, আপনি কখনো ভূত-আত্মা এসব দেখেন নি ?
ইফতেখারঃ হ্যা, দেখেছি ! মিথেন ভূত !
অনন্যাঃ সেটা আবার কি ?
ইফতেখারঃ পাঁড়াগায়ে ডোবায় মিথেন গ্যাস জমে আগুন জ্বলে, লোকের ভাষায় সেটাই ভূত ! আরো আছে, ছাদের উপর বসে থাকা বিড়াল দূর থেকে হয়ে যায় শাড়ি পড়া মেয়ের আত্মা ! সবই হ্যালুসিনেশন ।
অনন্যাঃ কিন্তু আসলেও তো এরকম কিছু থাকতে পারে !
ইফতেখারঃ হয়তো !

ইফতেখারের রহস্য জড়ানো “হয়তো” এর মানে ধরতে পারলো না অনন্যা । হেসে উড়িয়ে দিচ্ছে ধরে নিলো । ভূত বলে আসলেই কিছু না থাকলে স্টোররুমে ফুটপ্রিন্টস কিভাবে এসেছে ? ওয়াশরুমে ট্যাপটাই বা কে ইউজ করে ? প্রশ্নগুলো ভাবিয়ে তুললো অনন্যাকে ।

রেজওয়ানঃ কি হলো, ভূত দেখছো নাকি ? পেয়াজ কাটা শেষ…
অনন্যাঃ দাও, চড়িয়ে দিই । ইফতেখার সাহেবকে এক কাপ চা দেবো ?
ইফতেখারঃ না ভাবী, থ্যংক ইউ । অলরেডি দু’কাপ হয়ে গিয়েছে, আজ আর নয় । নিন, আপনার স্যালাড রেডি !

কাটা শসা, টমেটো আর লেটুসপাতা ভর্তি চপিং বোর্ডটা এগিয়ে দিলো ইফতেখার ।

অনন্যাঃ রান্নার আগেই স্যালাড ! দারুণ !
রেজওয়ানঃ তোকে দিয়েই হবে !
ইফতেখারঃ হুম । ভাবী ক্যারি অন, আমি চলি । রিমোট টা কোথায় রেজওয়ান ?
রেজওয়ানঃ টিভির সামনে নেই ? টি টেবিলে দেখ, আমি আসছি । আর হ্যা, কেবল লাইনে প্রবলেম, ঠিক করে নিতে পারবি ?

রেজওয়ানকে চোখ টিপে ড্রয়িং রুমে এলো ইফতেখার । টিভিটা অন করলো । ছবি নেই । সাদাকালো ঝিরঝির পুরোটা পর্দা জুড়ে । অ্‌যান্টেলার কানেকশনটা চেক করলো । একটা অ্‌যাম্প্লিফায়ার থেকে তারটা আসার কথা । সেটা খুলে রাখা । জ্যাকটা লাগাতেই ইলেক্ট্রিক ফ্লেয়ার স্পার্ক করলো । প্রবলেমটা জ্যাক আর অ্‌যাম্প্লিফায়ারের কোনো একটাতে ।

রেজওয়ান এসে দাঁড়ালো,

– কি রে, হলো ?
– স্ক্রু-ড্রাইভার আছে তোর কাছে ?

পর্বঃ ১১

রেজওয়ানের কথাই ঠিক ছিলো ।
ডাইনিং টেবিলে অনন্যা এতগুলো আইটেমের দুয়েকটা ছাড়া আর কিছুই খাওয়াতে পারেনি ইফতেখারকে । ডিনার করে রাতের আড্ডা শেষে তিনজনই অবসন্ন । এখন ঘুমাতে যাওয়াই শ্রেয় ।

ওয়ার ড্রোব থেকে বেডশীট আর কম্বল দিয়ে আসার সময় অনন্যা বললো, “ইফতেখার সাহেব, খেলেন না তো কিছুই, রাতে ঘুম হবে তো ?” ।
“সেটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই !”
“অন্ধকারে সমস্যা হবে ? একটা ড্রিমলাইট আছে, লাগিয়ে দিতে পারি…”
“নো ভাবি, অন্ধকার রুমই ঘুমানোর জন্য মানানসই !”
“হুম । এমনিতেও অন্ধকারে থাকতে হবে…”
“কেন ? এদিকটায় ইলেক্ট্রিসিটির প্রবলেম হয় ?”
“না, কিছু না, নিজেই দেখতে পাবেন…”

অনন্যার কথাটা রহস্যজনক মনে হলো ইফতেখারের কাছে । এমনিতেও হঠাত্‍ অন্যমনস্ক লাগছে ওকে । নীরবতাটা অনন্যা নিজেই ভাঙলো, “আমি বরং একটা টর্চ লাইট দিয়ে যাই আপনাকে”
“দরকার পড়বে না ভাবী, আমি টর্চ সাথে নিয়েই এসেছি !”
“দারুণ ! ঘুমান তাহলে, গুড নাইট !”
“গুড নাইট !”

যাওয়ার সময় দরজাটা বাইরে থেকে টেনে দিয়ে গেলো অনন্যা । টিউবলাইট অফ করলো ইফতেখার । টেবিল ল্যাম্পের আলোতে কম্বলটা রেডি করে শুয়ে পড়লো । ইলেক্ট্রিক রোপ টেনে টুলে রাখা টেবিল ল্যাম্পটাও নেভালো ।

পরিবেশটা অনেক পরিচিত লাগছে । জঙ্গলের মতই সুনসান বাড়ি । শহর বলতে চোখে যে হিজিবিজি আর ভিড়ে ভর্তি দৃশ্যটা ভেসে ওঠে এই এলাকাটা সেরকম নয় । বাড়ির ২০০ মিটারের মধ্যে আর কোনো বাড়িই নেই । কয়েকটা একতলা, দোতলা ভবন আছে, উপজেলা অফিসগুলোর মত লম্বা লম্বা ভবন । মনে হয় পরিত্যক্ত । গলিটা যেখানে মেইনরোডে মিশেছে সেখান থেকেই নগরজীবনের ব্যস্ততা শুরু । সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ইফতেখার ঘুমিয়ে পড়লো ।

রেজওয়ান ও বিছানায় শুয়ে পড়েছে । অনন্যা আসতেই বললো, “টর্চটা জ্বলছে না ! আজকাল কোনো জিনিসই টেকসই নয় ! ইফতেখার ঘুমিয়ে পড়েছে ?”
“হ্যা… সমস্যা নেই, সে টর্চ নিয়েই এসেছে…”, বলে টিউবলাইট অফ করলো অনন্যা । কাল বাইরে যাওয়ার প্ল্যান আছে । তার আগে রেজওয়ানের অফিস ধরতে হবে । সকাল সকাল উঠতে পারলে ভালো ।

ঘড়ির কাঁটার টিক টিক শুনতে শুনতেই গভীর ঘুমে মগ্ন হয়ে পড়লো পুরো বাড়িটা । রাত বেড়ে চলেছে । সাথে শো শো করে একটা শব্দ । এই শব্দটা সাধারণত গ্রামে গেলে স্পষ্ট শোনা যায় । গাছগাছালি ঝোপঝাড়ে ঝিঁঝিঁপোকা ডাকার শব্দ । কিচেনের পাশে বাড়ির পিছনের দিকে কিছু ঝাউগাছ বুনো লতাপাতা আছে । জানালা খোলা থাকলে দেখা যায় । সেখান থেকেই আসছে হয়তো ।

মাঝরাতে “ক্যাচ” করে কিছু খোলার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো ইফতেখারের । ফ্ল্যাশ লাইট লাগানো ঘড়িটা বালিশের পাশে । টিপে দেখলো রাত তিনটা বাজতে পনেরো । একটা পেইন্টের গন্ধ আসছে কোথা থেকে যেন । রঙ করার জন্য বাড়িতে ব্যবহৃত হয় যে পেইন্ট ।

উঠে পড়লো ইফতেখার । টর্চটা সাথে নিলো কিন্তু জ্বাললো না । অতি স্বন্তর্পণে দরজাটা খুলে ডানে বায়ে দেখলো । রাস্তার লাইটগুলোর বিকিরিত আলো এদিকটায় এসে পড়ছে । সেই আলোতে কিছুই দেখা যাচ্ছে না ।

ইফতেখার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো । কিচেনের দিকে কিছু একটার নড়াচড়া অনুভব করলো যেন । কিচেনে গিয়ে দুটো ড্রাইসেল ব্যাটারির টর্চটা সামনে ধরলো । আলোক ঝটা গিয়ে পড়লো জানালা সোজা । জ্বলজ্বল করে উঠলো দুটো আগুনের বল । জানালার একটা পাল্লা খোলা । সেখানে বসে আছে একটা বিড়াল । মৃদুভাবে একবার মিয়াও ডেকেই লাফিয়ে নেমে গেলো বাইরে । অনন্যা জানালা আটকাতে ভূলে গিয়েছে নিশ্চয়ই । কাঠের পাল্লায় বিদ্ধ শিকল টেনে লাগানোর পর শো শো শব্দের পরিমাণ কমে গেলো ।

ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এলো ইফতেখার । ফিরে আসার সময় ট্যাপের নবটা ডানদিকে শক্ত করে ঘুরিয়ে আটকে দিলো । এটাও খোলা, টপটপ পানি পড়ছিলো ।

বালিশের পাশে রাখা ফ্ল্যাশওয়ালা ঘড়ি বলছে ৩টা বাজে । ৬টায় উঠে এক্সারসাইজ করতে হবে… ।

পর্বঃ ১২

প্রথম দিনের মতই একটা লম্বা কোট আর সেই হ্যাটটা মাথায় চাপিয়ে বের হলো ইফতেখার । রেজওয়ান ও তৈর হচ্ছে অফিসের জন্য । অনন্যা টাই টা টাইট করে দিলো । ইফতেখারকে দেখলো রেজওয়ান…

রেজওয়ানঃ কি রে, কোথাও যাচ্ছিস ?
ইফতেখারঃ হ্যা, একটু বের হচ্ছি
অনন্যাঃ বাইরে লাঞ্চ আছে ভূলে গেলে কিন্তু চলবে না ।
রেজওয়ানঃ হ্যা, আমি অফিসে বলে দু’ঘন্টার মধ্যে ফিরবো, রেডি থাকিস
ইফতেখারঃ ওকে, সি ইউ !

গেট খুলে রাস্তায় এলো ইফতেখার । শেষরাতের দিকে বৃষ্টি হয়েছে । রাস্তা ভেজা । গামব্যুটটা সাথে এনে ভালোই হয়েছে । মেইনরোড থেকে উল্টো দিকের পথ ধরলো । গলির ভিতরের দিকে ।

রেজওয়ানের বাসাটা ওয়াল দিয়ে ঘেরা । ময়লা স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে শ্যাওলামত পড়ে গিয়েছে যাকে বলে ব্রায়োফাইটা । বাড়ির সামনের ওয়ালটুকু পেরিয়ে ডানদিকের পথ ধরলো ইফতেখার । বাসার পিছনদিকটা এদিকে । আসলে ও সেখানেই যাচ্ছে । কালরাতে কিচেনের খোলা জানালা দিয়ে ঝাউগাছগুলো চোখে পড়েছিলো । বেশ মনোরম স্থান । আট ফুট ওয়ালের কোথাও কোথাও ইট বেরিয়ে আছে । সেগুলোর সাহায্যে সহজেই দেয়াল টপকে ভিতরে ঢুকলো ইফতেখার ।

মাটি ভেজা । ঝোপঝাড়ও আছে অনেক । সাবধানে পা ফেলে কিচেনের দিকটায় এগিয়ে গেলো । শুধু ঝাউগাছ নয়, বেগুনী রঙের ফুলভর্তি কিছু গাছ, অর্কিডের মত লতাপাতা ও আছে । কোটের পকেট থেকে ক্যামেরা বের করে কয়েকটা ছবি তুললো । এবার নজর দিলো অন্য জিনিসগুলোর দিকে । কয়েকটা ব্যবহার হওয়া কৌটা, কন্টেইনার ফেলে রাখা । বৃষ্টির পানি জমেছে তাতে । এই পানিতেই এডিস মশার উত্‍পত্তি হয় ।

পাঁ বাচিয়ে আরেকটু সামনে এগোলো ইফতেখার । বালুযুক্ত নরম মাটিতে পা ফেলামাত্রই ছাপ হয়ে যাচ্ছে । আরো কিছু একটার ছাপ রয়েছে যা বৃষ্টির পানিতে কিছু মুছে গিয়েছে । এটা সেই বিড়ালের ফুটপ্রিন্ট । জানালা থেকে লাফ দিয়ে এখানেই পড়েছিলো । কৌটা আর বিড়ালের পায়ের ছবিও তুললো । আঁকাশ গুড়গুড় করে উঠলো । মেঘ করেছে । বৃষ্টির পূর্বাভাস । আর থাকা ঠিক হবে না ।

পূর্বের মতই দেয়াল টপকে নামার সময় দেখলো রাস্তায় কয়েকটা বাচ্চা ছেলে স্থিরভাবে ওর দিকে তাকিয়ে আছে । হয়তো কোট-হ্যাট পরা কাউকে আগে দেয়াল টপকাতে দেখেনি । তাদের একজন কোলে রাতের সেই বিড়ালটা যার ফুটপ্রিন্টের ছবি ইফতেখারের কাছে আছে । হেসে হাত নাড়লো ইফতেখার । প্রত্যুত্তরে সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকলো বাচ্চাগুলো ।

বিভিন্ন কাজ সেরে ইফতেখার যখন ফিরলো পুরোদমে বৃষ্টি । ছাতাটা বন্ধ করে কলিং বেল টিপলো । কোটের ভিতরেই ছিলো ছাতাটা । ঘড়িতে ১২টার কাছাকাছি । রেজওয়ান দরজা খুললো, “কোথায় ছিলি, অনেক্ষণ করে অপেক্ষা করছি আমি আর অনন্যা”
“একটু মার্কেটে গিয়েছিলাম”
“বুঝলাম । কিন্তু যে বৃষ্টি, বাইরে যাওয়া যাবে কিনা কে জানে”
“না বেরোনোই ঠিক হবে”
“তাইতো মনে হচ্ছে”
“ভাবীকে বলে দে তাহলে, মিছেমিছি তৈরি হয়ে কাজ নেই, কই সে ?”
“হ্যা । অনন্যা…”

…অনন্যার কথা বলতে যেতেই স্টোররুম থেকে একটা চিত্‍কার ভেসে এলো । অনন্যার ভয়েস । ইফতেখার আর রেজওয়ান একবার পরোস্পরের দিকে তাকিয়েই ছুটলো স্টোররুমের দিকে…

পর্বঃ ১৩

অনন্যার কথা বলতেই স্টোররুম থেকে একটা চিত্‍কার ভেসে এলো । ইফতেখার আর রেজওয়ান একবার পরোস্পরের দিকে তাকিয়েই ছুটলো স্টোররুমের দিকে । সিঁড়ি দিয়ে উঠে পরপর তিনটা রুমের মাঝখানের রুম । প্রথমে ইফতেখার তারপর রেজওয়ান ঢুকলো । দেখা গেলো অনন্যা মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । ও যে খুব ভয় পেয়েছে তার রেশটা চোখেমুখে রয়ে গিয়েছে স্পষ্ট ।

রেজওয়ান গিয়ে ধরলো অনন্যাকে । “কি হয়েছে অনন্যা, কি হয়েছে বলো ?”, দ্রুততার সাথে বললো রেজওয়ান । চোখেমুখে ভয় রেখেই ধীর গতিতে রেজওয়ানের দিকে ঘুরে তাকালো অনন্যা । পরমুহুর্তেই মাথাটা সামনে একটু উপরের দিকে উঠালো । ইফতেখার অনন্যার দৃষ্টি অনুসরণ করে উপরে ছাদের দিকে গিয়ে থামলো । “রেজওয়ান…” বলে সিলিংয়ে আঙুল দিয়ে পয়েন্ট করলো সেখানে । যেটা পয়েন্ট করলো সেটা দেখে চমকে উঠলো রেজওয়ান । একই সাথে অনন্যার চিত্‍কারের কারণটাও বুঝলো । সিলিংয়ে হিজিবিজি কিন্তু বড় লাল অক্ষরে লেখা, “এটা আমার বাড়ি, আমাকে কেউ এখান থেকে সরাতে পারবে না”… ।

লাল অক্ষরগুলো নিশ্চয়ই লাল রক্ত দিয়ে লেখা । রেজওয়ানের বুকে গিয়ে কিছুটা সম্ভিত ফিরে পেলো অনন্যা । ফুপায়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো, “আমি… আমি বলেছিলাম এই বাড়িতে কিছু একটা আছে, আমার কথা বিশ্বাস করোনি…” ।
“ঠিক আছে… আমিতো আছি… আমি দেখেছি… তুমি নিচে চলো”
“আমি এখানে থাকবো না রেজওয়ান, আমি এখানে থাকবো না…”
“হ্যা ঠিক আছে, আমরা এখানে থাকবো না, তুমি নিচে চলো প্লিজ”

ইফতেখার আঁচ করতে পারলো আগে থেকেই কিছু একটা হয়েছে । এ ব্যাপারে কথা বলতে হবে । কিন্তু সবার আগে অনন্যাকে সুস্থ করে তোলা দরকার । বললো, “রেজওয়ান, নিচে নয়, ভাবীকে তার রুমে নিয়ে চল, আমি গ্লুকোজ নিয়ে আসছি” ।

অনন্যাকে বেডরুমে নিয়ে এলো রেজওয়ান । সে তখনও কাঁদছে আর বার বার বলছে “আমি এখানে থাকবো না…” । ফ্যানটা ছেড়ে রেজওয়ান ভেজা টাওয়েল দিয়ে অনন্যার মুখ মুছিয়ে দিলো । ইফতেখার গ্লুকোজ আর একটা ঘুমের ট্যাবলেট নিয়ে আসার পর রেজওয়ান সেটাও খাইয়ে দিলো । দেখতে দেখতে ঘুমে ঢলে পড়লো অনন্যা ।

দরজা টেনে দিয়ে নিচে ড্রয়িং রুমে এলো রেজওয়ান আর ইফতেখার । সোফায় বসতেই ইফতেখার বললো, “কি হয়েছে ঠিক করে বল তো ?”
“আমিও বুঝতে পাচ্ছি না কি হচ্ছে…”, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাত দুটো মাথার পিছনে চাপা দিয়ে ঘুরতে থাকা ফ্যানটা দেখতে দেখতে বললো রেজওয়ান । ইফতেখার ওর কাঁধ চাপড়ে দিলো ।
“প্রথম থেকে বলতো সমস্যাটা কি”
“ব্যাপারটা কিভাবে ডিসক্রাইব করবো জানিনা । আমরা এবাসায় আসার পর থেকে কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে । আমি কিছু টের পাইনি, কিন্তু ও বলতো কিছু একটা আছে এ বাড়িতে, ও ফিল ও করে । প্রথমে বিশ্বাস করিনি, ভেবেছি ওর হ্যালুসিনেশন হবে, কিন্তু যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, না পাচ্ছি কিছু বুঝতে, না কিছু করতে…”
“কি ফিল করতে পারে সেটা বলেছিলো ? ভয় পাওয়ার মত কিছু দেখা ?”
“দেখেছে কিনা জানিনা, তবে কিছু ঘটনা বলেছিলো । কিচেনের জানালাটা মাঝরাতে নিজে থেকে খুলে যায়, ট্যাপ থেকে পানি পড়ে । এগুলো আমিও দেখেছি, আমল দিইনি । ওর ধারণা অশরীরী কিছু একটা আছে এ বাড়িতে…”
“অচেনা নির্জন পরিবেশে হ্যালুসিনেশন হওয়া স্বাভাবিক”
“আমিও সেটাই ভাবতাম । কিন্তু তুই আসার একরাত আগে এমন একটা ঘটনা হয় যেটা আসলেই অস্বস্তিকর”
“কি হয়েছিলো ?”
“রাতে উঠে দেখি অনন্যা কাঁদছে । কথা বলে বুঝলাম বেশ অতীষ্ট হয়ে গিয়েছে । আমি কিছু বলার আগেই স্টোররুমে নিযে কিছু একটা দেখালো, লাল রক্তমাখানো পায়ের ছাপ টাইপ কিছু, অথচ অন্য কোনো রুমে সেটা নেই ! তারপর আজ তো দেখলি ই…”

আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো রেজওয়ান ।
“ইন্টারেস্টিং !” বলে কিছুক্ষণ চোখ কুঁচকে ভাবলো ইফতেখার । দু-তিন মিনিট পর রেজওয়ানকে বললো, “স্টোররুমের ফ্লোরে ছাপগুলো দেখলাম না, মুছে ফেলা হয়েছে ?”
“ওটা আমি নিজেই মুছে ফেলি, আবার দেখলে অনন্যা ভয় পেতে পারে ভেবে । কিন্তু এখন তো তার চেয়েও বেশি কিছু হলো, আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না…”
“আচ্ছা, আমি দেখছি ব্যাপারটা , কি করা যায়”
“ইফতেখার, এমন কি হতে পারে না অনন্যা অবচেতন মনে নিজেই এগুলো করেছে ?”
“সেটা মনে হওয়া স্বাভাবিক, এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না । তাছাড়া আমার মনে একটা খটকা আছে… দেখছি ব্যাপারটা”, বলে উঠলো ইফতেখার । উপরে নিজের রুমে চলে গেলো ।

রেজওয়ান কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকার পর বেডরুমে গেলো । গাড় ঘুমে আচ্ছন্ন অনন্যা । কোমল মুখখানিতে কোনো ভয়ের চিহ্ন নেই । ঠোঁটের কোণায় একটু হাসি ও ফুটে রয়েছে । অথচ ঘুম ভাঙলে আবারও মলিন হয়ে যাবে এই সুন্দর মুখ । তবে তেমন টেনশন ফিল করছে না রেজওয়ান, ইফতেখার যখন আছে, বড় কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হয় না… ।

পর্বঃ ১৪
সন্ধ্যা প্রায় হয়ে গিয়েছে ।
অনন্যা সম্পূর্ণ সুস্থ । ডাক্তার ডাকার প্রয়োজন হয়নি । ও নিজেই নিষেধ করেছিলো । ইফতেখার,রেজওয়ান আর অনন্যা তিনজনই এখন ড্রয়িং রুমে বসে আছে । ইফতেখার অনন্যার মুখে থেকেই সবকিছু শুনেছে । এখন উত্তরের অপেক্ষা করছে অনন্যা ।
“প্রত্যেকটা সমস্যারই সল্যুশন থাকে ।
প্রত্যেকটা ঘটনার কারণ ও । হয়তো আমরা বাসায়
না থাকাকালীন কেউ ঢুকে ভয় দেখানোর
চেষ্টা করেছে”, ইফতেখার বললো ।
“বাসায় কেউ আসবে কোথা থেকে ?
দরজা জানালা যেভাবে আটকে গিয়েছিলাম
সেভাবেই পেয়েছি… ইফতেখার সাহেব,
আমি আপনাকে আর আপনার বন্ধুকে বলে দিচ্ছি, আজ
রাতটা এবাড়িতে কোনোরকমে থাকবো, কাল অন্য
ব্যবস্থা করতে হবে…”
রেজওয়ান বললো,”তুমি শান্ত হও তো প্লিজ,
ধরে নিচ্ছি এবাড়িতে অদ্ভুত কিছু আছে, আমাদের
তো কোনো ক্ষতি করছে না”
“কি বলতে চাইছো তুমি ?”,
কান্না কান্না ভাবটা আবারও
আসতে চাইছে অনন্যার চোখে মুখে, “ছাদের
লেখাটার মানে বুঝতে পাচ্ছো ? এখান
থেকে তাকে কেউ সরাতে পারবে না ।
আমরা এখানে থাকা মানে তার জায়গা দখল করা,
আজ হোক কাল হোক কারো কিছু
একটা হয়ে গেলে কি বলার থাকবে তোমার ?”
“ভাবী কুল ডাউন । আমি আপনাকে বলছি, আমার
কাছে সবকিছুর ব্যাখ্যা আছে ।
আমরা যদি বিচলিত হয়ে পড়ি আমার
পক্ষে সেটা দেওয়া সম্ভব হবে না”, ইফতেখার
বললো ।
রেজওয়ান জিজ্ঞাসা করলো, “ব্যাখা মানে ?
কিসের কথা বলছিস তুই ?”
“আছে… সব সকালের মধ্যেই জানতে পারবি,
নাথিং টু ও’রি”
“ইফতেখার সাহেব, আমি জানিনা আপনার
কাছে কি ব্যাখ্যা আছে,
তবে আমি অপেক্ষা করবো সকাল হওয়া পর্যন্ত…
আপনার ব্যাখ্যা শুনতে নয়,
এবাসা থেকে চলে যাওয়ার জন্য…”,
বলে গটগটিয়ে উপরে উঠে গেলো অনন্যা ।
রেজওয়ান নড়েচড়ে উঠলো, “অনন্যা…”
বলে অনন্যার পথ ধরলো ।
ড্রয়িং রুমেই বসে রইলো ইফতেখার । অনন্যার
বলা কিছু জিনিস ও নিজেই এক্সপেরিয়েন্স
করেছে গত রাতে । তবে বিচলিত হওয়ার লোক
ইফতেখার নয় । বেশ কিছু খটকা আছে । এর জন্য
প্রয়োজন সময় নিয়ে চিন্তা করা । কিছুক্ষণ পর
ড্রয়িং রুম থেকে উপরে নিজের রুমে চলে এলো ।
কোটের পকেট থেকে ছবিগুলো বের করলো ও ।
সকালে বাড়ির পিছন
থেকে যে ছবিগুলো তুলেছিলো ।
বাড়িতে এখনো কম্পিউটার আনেনি রেজওয়ান ।
তাই সোজা মার্কেট থেকে এনলার্জমেন্ট প্রিন্ট
করিয়ে এনেছিলো রেজওয়ান । নতুন
ক্যামেরাটা চেক করাই মূল উদ্দেশ্য ছিলো, এখন
মনে হয় আরো কাজে লাগবে ছবিগুলো ।
ফুলগুলোর আউটপুট ভালোই এসেছে ।
ওগুলো রেখে কন্টেইনার আর বিড়ালের
ফুটপ্রিন্টে মনোযোগ দিলো । কন্টেইনারটা রঙের
। কি রঙ পানি মিশে হালকা হওয়ার
ফলে বোঝা যাচ্ছে না । বিড়ালের
ফুটপ্রিন্টগুলো দেখলো এবার । অস্পষ্ট ।
পানিতে ভেজা বালি কিছুটা মুছে গিয়েছে ।
আচ্ছা,
বিড়ালটা যেখানে লাফিয়ে পড়েছিলো সেটা তো সানশেডের
নিচে । এতদূর পানি গড়িয়ে গেলো কিভাবে ?
ছিঁচকে বৃষ্টির ফোঁটায় কি সহজে কোনো চিহ্ন
মুছে যায় যেখানে কনস্ট্রাকশনের জমাট
বাঁধা বালু রয়েছে ।
ঘড়িটা দেখলো রেজওয়ান । ৬ টার কাঁটা অতিক্রম
করছে । সন্ধ্যা হলেও আলো সম্পূর্ণটা যায়নি ।
বাড়ির পিছনটায় আরেকবার গেলে খারাপ
হতো না । বাইরে যাবে ঠিক করলো ও । রেজওয়ান
আর অনন্যাকে ডেকে তোলার মানে হয় না ।
সেখানে যাওয়ার সহজ ওয়ে আছে । হ্যা, ওই
জানালাটা ই !
টর্চটা হাতে নিয়ে কিচেনে গেলো ইফতেখার ।
দরজা টেনে আটকে দিলো ।
গামব্যুটটা হাতে করে নিয়ে এসেছে ।
পায়ে পরে নিলো ।
সাবধানে জানালাটা খুলে লাফিয়ে পড়লো বিড়াল
যেখানে পড়েছিলো তার পাশে । আঁধো অন্ধকারেও
খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়নি । কারণ
সকালে ডেডবডি পাওয়া জায়গাতে যেরকম মার্ক
দেয় আগ্রহের বশে সেরকম একটা মার্ক
দিয়ে রেখেছিলো ও, এক্স মার্ক দ্য স্পট !
সেটা সারাদিধ বৃষ্টির পর এখনো অক্ষত আছে… !

পর্বঃ ১৫

কিচেনে কেউ আসার আগেই ইফতেখার তার কাজ শেষ করে চলে এসেছিলো । বাড়ির পরিস্থিতা অনেকটা স্বাভাবিক । প্রথমদিনের মতই আন্তরিকভাবে ডাইনিংয়ে পরিবেশন করলো অনন্যা । ডিনারের পর তিনজনে বসলে কিছুক্ষণ গল্প করতে । রেজওয়ান চাইছিলো ভূত কিংবা বাড়ি ছাড়ার টপিকটা যতটা সম্ভভ এড়িয়ে থাকা যায় । বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার পর অনন্যা রুমে কয়েল দিয়ে আসার কথা বলে উঠে গেলো । রেজওয়ান ভাবছিলো ভয়ের কারণে অনন্যা উপরেই উঠতে পারবে না । সকালের প্রতিক্রিয়া সেরকমই ছিলো । এখন নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে দেখে হাপ ছাড়লো রেজওয়ান । জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ইফতেখারের দিকে তাকালো । অনন্যা রান্না করার সময় রেজওয়ানের কাছ থেকে একটা গামের কৌটা নিয়েছিলো ইফতেখার । কি করতে সেটা বলেনি । রেজওয়ানের মনের কথাটা বুঝতে পেরে ইফতেখার বললো, “আজ রাতটা অপেক্ষা করতে পারলে সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে”
“কোনো সমস্যা হবে না তো ?”
“নট অ্‌যা বিট”
“ঠিক কি করতে চাইছিস বলতো”
“সবকিছু ঠিকঠাক হলে কাল সকালের আগেই জানতে পাবি”

ইফতেখারের রহস্যজনক কথাটার প্রত্যুত্তর দিতে গিয়ে দেখলো অনন্যা দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছে । কিছু হয়নি এরকমভাবেই বললো, “কয়েল দিয়ে এসেছি, এবার ঘুমাতে গেলে হয়”
“হ্যা চলো, তোমার ঘুমের প্রয়োজন”, বলে অনন্যার হাত ধরে চলে গেলো রেজওয়ান । আজ রাতেই হয়তো সকল রহস্য উম্মোচন হবে ।

তাড়াতাড়ি লাইট অফ করে ফেলাই ভালো হবে । ১০টা বাজতে বাজতেই নিথর হয়ে গেলো সারা বাড়ি । রেজওয়ান আর অনন্যা ঘুমিয়ে গিয়েছে । রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো ও ঝিমিয়ে পড়েছে । পরিবেশটা বেশ ভূতুড়ে । দেয়াল ঘড়িটার টিক টিক শুনছে জাগ্রত ইফতেখার । রাত তখন দেড়টার কাছাকাছি । ক্যাচ করে হওয়া সামান্য আওয়াজটা ইফতেখারের কান এড়াতে পারলো না । চোখের থেকে ঘুমের ভাবটা সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেলো । কিচেনের জানালাটা নিশ্চয়ই খুলে গিয়েছে । বৃষ্টিতে ভিজলে কাঠের দরজা জানালা খুলতে ক্যাচ করে আওয়াজ হয় ।

ইফতেখার আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলো । চটপট উঠে বালিশগুলো রেখে কম্বল চাপা দিলো । টর্চটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে সিঁড়ির নিচের ফাঁকা জায়গাতে অপেক্ষা করতে লাগলো । কিচেনের দরজার খানিকটা দেখা যাচ্ছে । মনে হয় খুলে গেলো । একটা ছায়ামূর্তি বের হলো যেন । ঘরের এদিক ওদিকে দেখে সিঁড়ি অতিক্রম করলো । পাপ টিপে টিপে ইফতেখারের রুমের সামনে গেলো । রুমে কেউ নেই নিশ্চিত হতে পারলো না মনে হয় । হালকা নীলচে আলোর একটা লাইট ফেললো খাটের উপর । সেই আলোতেই রুমের বাইরে থেকে ইফতেখার দেখলো ছায়ামূর্তিটা একটা মুখোশ পরিহিত । দেখতে বেশ ভয়ংকর একটা মুখোশ ।

একটুও না দমে সোজা গিয়ে মুখোশপরিহিত মূর্তির ঘাড় ধরে সামনে ঘুরিয়েই একটা ঘুষি দিলো ইফতেখার ! চাপা চিত্‍কারের সাথে খাটের পাশে রাখা টুলসহ নিচে পড়ে গেলো ছায়ামূর্তি । সম্ভবত দাঁতে লেগেছে ঘুষিটা, তবে ফোমের মুখোশ থাকায় ধরাশায়ী হলো না সে । উঠে ইফতেখারকে ঠেলে এক লাফে ঘর থেকে বের হলো, ছুটে চললো সিঁড়ির দিকে । একদম শেষ স্টেপে যেতেই সিড়ির পাশে রাখা ফুলদানিটা নিয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়লো !

শব্দ আর চিত্‍কারে ঘুম ভেঙে গিয়েছে রেজওয়ান আর অনন্যার । টর্চটা নিয়ে কোনোরকম দুজন দুজনে ধরে হাতড়ে নিচে চলে এলো । ততক্ষণে ড্রয়িং রুমের লাইট অন করে দিয়েছে ইফতেখার । সিঁড়ির নিচের এসে দুজনেই থমকে দাঁড়ালো । যে দৃশ্য দেখলো তাতে থ হয়ে যাওয়ারই কথা । নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে… ।

শেষ পর্ব

ড্রয়িং রুমে এসে দুজনেই থমকে দাঁড়ালো । নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে । যেন কিছু হয়নি এরকমভাবেই দাঁড়িয়ে আছে ইফতেখার । আর তার সামনেই অদ্ভুত টাইপ একটা লোক ফ্লোরে পড়ে কাতরাচ্ছে । অদ্ভুত একারণেই যে তার মুখে একটা ভূতের মুখোশ খুলে পড়বে পড়বে করছে, গায়ে মলিন একটা চাদর জড়ানো আর এক পা জুতোসহ একটা কন্টেইনারের ভিতরে আটকে আছে !

অনন্যা নিজের হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে বিস্ময় আর ভয় মেশানো চিত্‍কারটা চেপে রাখলো । রেজওয়ানের উত্তেজিত কন্ঠ প্রশ্ন ছুড়ে দিলো ইফতেখারের উদ্দেশ্যে, “এটা কে ? কি করছে এখানে ?”
“তোদের খুব পরিচিত একজন !”, ইফতেখার বললো ।
“মানে”, এবারের প্রশ্ন অনন্যার, কাঁপা কাঁপা গলায় ।
“সব বলছি, ওয়েট”

অদ্ভুত লোকটাকে ঘরের মধ্যখানে নিয়ে এলো ইফতেখার । সিঁড়ি থেকে পড়ে বেশ অচেতন হয়ে গিয়েছে । পরে যাতে পালিয়ে যেতে না পারে তার জন্য একটা কাপড় দিয়ে হাত দুটো বেঁধে সিঙ্গল সোফায বসিয়ে দিলো । এবার ওরা বসলো তাকে ঘিরে, চেয়ার আর সোফাগুলোতে ।

অনন্যার ঈষত্‍ কাঁপুনি তার হার্টবিট বেড়ে যাওয়ার ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে বুঝতে পারলো ইফতেখার । রেজওয়ান কিছু না বুঝে ভ্রু কুচকে রয়েছে, তার দৃষ্টি একবার ইফতেখারের দিকে একবার আগন্তুকের দিকে ওঠানামা করছে । ইফতেখার উঠে ভৌতিক মুখোশটা একটানে খুলে নিলো । বেরিয়ে পড়লো মুখোশঢাকা আগন্তুকের আসল চেহারা । খোঁচা খোঁচা দাঁড়িওয়ালা এক নিরীহ লোক ।

“আরে ! এই লোকটাকে তো রাতে রাস্তায় হাটতে দেখতাম ! রেজওয়ান চিনতে পাচ্ছো ?”, অনন্যা উত্তেজিতভাবে বললো ।
“হ্যা, কিন্তু এ বাসায় এভাবে ঢুকলো কিভাবে ? চুরতি করতে ?”, রেজওয়ান জিজ্ঞাসা করলো । আজ সব প্রশ্নের উত্তরদাতা ইফতেখার ।
“প্রথম থেকে শুরু করা যাক । আমরা বাসায় যে সমস্যাটা দেখতে পাই তা হলো রাতে কিচেনের জানালা খুলে যাওয়া, মনে হতো অদৃশ্য কেউ এ বাড়িতে আছে, ঘোরাফেরা করে । ব্যাপারটা আরো সন্দেহজনক হলো যখন স্টোররুমে কিছু পায়ের ছাপ পাওয়া গেলো যেটা ভাবী অবজার্ভ করে । প্রশ্ন হলো পায়ের ছাপ কিভাবে এলো ?”
“হ্যা” বলে মাথা নাড়লো অনন্যা ।
“অশরীরির সন্দেহটা বেড়ে আতংকে পরিণত হলো যখন সিলিংয়ে লেখা ভৌতিক হুমকি পাওয়া যায় । প্রথমদিনের কথাই ধরা যাক, স্টোররুমে রক্তলাগানো ফুটপ্রিন্ট কিভাবে এলো ?,”রেজওয়ান আর অনন্যা মনযোগ দিয়ে শুনছে দেখে বিরতি নিয়ে শুরু করলো, “আসলে ফুটপ্রিন্ট কোথাও থেকে আসেনি, বরং এই রুম থেকেই সেটার উত্‍পত্তি”
রেজওয়ান বললো, “ঠিক বুঝলাম না”
“আমরা যেটাকে রক্তমাখা ফুটপ্রিন্ট বলছি সেটা আসলে রক্ত নয়… রং, পেইন্ট । স্টোররুমের কোনো এক কোণে ছিলো । এই ভদ্রলোক…”, সোফায় বসা আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে বললো ইফতেখার, “তিনি অন্ধকারে এটায়ে পা ফেলে বসেন, ঠিক ওইভাবে ! তার পায়ে রং লেগে যায়, যেটা রুমের ফ্লোরজুড়ে ফুটপ্রিন্ট আকারে পড়ে । পরে কিচেনে গিয়ে কিছু একটা দিয়ে তিনি পা থেকে রং মুছেন । এক পায়ে দাঁড়ানোতে কিছু একটা নাড়া লেগে পড়ে যায়, দ্বিতীয় রাতে ভাবী সেটা শুনেছিলেন । তারপর তিনি জানালা দিয়ে বেরিয়ে যান ! আমি ঠিক বলছি তো মিস্টার ?” ।

অদ্ভুত লোকটার ইতিমধ্যে জ্ঞান ফিরেছে । আর সেও ইফতেখারের কথা শুনছে । ঠোঁটের কোন বেয়ে রক্ত ঝরছে যেটা ইফতেখারের ঘুষির ফলে হয়েছে ! কাঁপা কাঁপাভাবে মাথা নেড়ে সায় দিলো ।

রেজওয়ান “কিন্তু এ বাড়িতে ও চায় কি ?” বলার পর ইফতেখার আবার শুরু করলো, “ভাবী উঠে চেক করার সময় কিচেনে যায়, এর সন্দেহ হয় দেখে ফেলেছে কিনা, কারণ আগের রাতেও ভাবীকে চেক করতে দেখেছিলো । তাই সে পরিকল্পনা করে এটাকে ভূতের কান্ডে রূপ দিতে ! এ ই কাল আবার এসেছিলো সিলিংয়ে হুমকি লিখতে । রাতে আমি পেইন্টের গন্ধ পাই । তারপর উঠে দেখি কিচেনের জানালা খোলা । তখন কিছুই বুঝতে পারিনি, শুধু একটা খটকা ছিলো । পরদিন, মানে আজ সকালে বাইরে গিয়েছিলাম মূলত বাড়ির পিছনটা দেখতে, সেখানে ওই রঙের কন্টেইনারটা পাই । সন্দেহ পাকাপোক্ত হলো যখন দেখি সেখানে একটা প্রায় মুছে যাওয়া বিড়ালের ফুটপ্রিন্ট । ছবি এনলার্জমেন্ট করার পর খেয়াল করি সেখানে জুতোর ছাপ ও রয়েছে । থখন থেকে একে হাতেনাতে পাকড়াও করার প্ল্যান করি ।”

ইফতেখারের হঠাত্‍ গাম নেওয়ার কারণ বুঝতে পারলো রেজওয়ান । জিজ্ঞেস করলো, “রাতে পানির ট্যাপ এ খুলে রাখতো নাকি ?”
“সেটা কো-ইনসিডেন্স । পুরনো বাড়িতে পাইপ ফেটে পানির চাপ বেড়ে যায়, তাই এমনিতেই পানি পড়ে । লাইটের ওয়্যারিংয়েও সমস্যা দেখা দেয়” ।
অনন্যা বললো, “ওকে এখন পুলিশে দেবে ?”
“সেটা পরে দেখা যাবে, আগে জানা দরকার ও ঠিক কি করতে প্রতিরাতে এবাড়ির প্রত্যেকটা কোণা তল্লাশি করে । কি মিস্টার ? অনুগ্রহ করে বলবেন কি !”

ভাঙা কলের রেকর্ডের মত কন্ঠ বের হলো আগন্তুকের মুখ থেকে, “আমি এবাড়ির ড্রাইভার ছিলাম… । বাড়ির মালিক রায়হান চৌধুরী আমার কয়েকমাসের বেতন পরিশোধ না করেই বিদেশে চলে যায় এর আগে বেতন চাইতে গিয়েও পাইনি, এত হীনমন্যতা কারো হতে পারে ভাবিনি আগে… এদিকে আমার ছেলেটা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে । ওর চেক আপের জন্যই হাজার ত্রিশেক টাকা লাগবে । ঠিক করি যে যেমন তার সাথে সেরকম কাজ করা উচিত । ওনার আরেক বাড়িতে অনেক লোক… যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই… । ভাবলাম এটাতে ওনার মেয়ের আর স্ত্রীর কোনো গয়নাগাটি পাই কিনা । জানতাম না আপনারা রেন্ট নিয়েছেন… আলমারিতে আপনাদের টাকা পয়সা প্রথম রাতেই পেয়েছিলাম, কিন্তু আমি তা ছুয়েও দেখিনি । তাই স্টোররুমে যাই… । আমাকে আপনারা পুলিশে দেবেন, জানি না আমার ছেলের কি হবে…”, অশ্রুসিক্ত চোখে দ্বীর্ঘশ্বাস ফেললো আগন্তুক ।

সব রহস্য উদঘাটন শেষে কিছুক্ষণ নীরবতার পর রেজওয়ান বললো, “কি করা যায় এখন ?”
“কিছুই না, এভরিথিং অলরাইট”, বলে বাঁধন খুলে দিলো ইফতেখার ।
অনন্যা কিছুক্ষণ ভেবে বললো, “আমি জানি কি করতে হবে…”

. . . . . . . . . .
. . . . . . . . . .
(তিন মাস পর)

আলিশান বাংলো টাইপ বাড়িটায় একটা গাড়ি ঢুকলো । শপিং করে এসেছে রেজওয়ান আর অনন্যা । একটা ছেলে ছুটে এলো হাসিমুখে । এটা সেই ছেলে যাকে বিড়াল কোলে আগের বাড়ির পিছনে দেখেছিলো ইফতেখার । গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে দিলো ড্রাইভার ফয়সাল । ছেলেটা তার । আর ফয়সাল হচ্ছে সেই রাতের আগন্তুক ।

রেজওয়ানের প্ল্যানমাফিক ওদের কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে অবস্থান করায় ও এখন জেনারেল ম্যানেজার, স্পন্সর আর কোম্পানির তরফ থেকে গিফট হিসেবে একটা পুরো বাড়ি আর গাড়ি পায় । ফয়সালকে ড্রাইভার হিসেবে রেখে দিয়েছে ।

গাড়ি থেকে নেমে ছেলেটার হাতে শপিং ব্যাগগুলোর একটা ধরিয়ে দিলো অনন্যা । হাসিমুখে সেটা নিলো ছেলেটা । তার ট্রিটমেন্টের ভার ও রেজওয়ান আর অনন্যা নিয়েছিলো ।

রেজওয়ান গাড়ি থেকে নামতেই একটা মেসেজ এলো সেলফোনে,

“আমি আসছি… যেকোনো দিনর, যেকোনো সময় !”

 

সমাপ্ত

 

 

 
“ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪- ঈদ সংখ্যা ২০১৫” এ প্রকাশিত । পাঠকের অনুরোধে আবারো পুনঃপ্রকাশ করা হলো ।