• আজ বৃহস্পতিবার, ১৫ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং ; ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৬ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী
  • শিক্ষকদের দাবি আদায়ের মানদণ্ড কি?

    জামিল আহম্মেদ মুকুল ●  এটিএন বাংলার হেড অব নিউজ আমার পছন্দের তালিকায় উপরের সারির মানুষ প্রভাষ আমিন সম্প্রতি তার এক লেখায় মানুষের ক্ষমতার মানদণ্ড পরিমাপ করার একটা প্রয়াস চালিয়েছেন। ক্ষমতার উৎস খুজতে যেয়ে প্রভাষ আমিন যে স্কেল ব্যবহার করেছেন তা হচ্ছে, ‘ যে যত বেশি মানুষকে জিম্মি করতে পারবে তার ক্ষমতা তত বেশি ‘। অর্থাৎ এদেশে জোর যার মুল্লুকটা তার।যার ব্লাকমেইল করার ক্ষমতা যত বেশি সে তত বেশি ন্যায় সঙ্গত বা অন্যায় দাবি সরকারের নিকট থেকে আদায় করে নিতে পারে। সরকারও তাদের প্রতি নমনীয় থাকে, সমীহ করে চলে। প্রভাষ আমিনের ক্ষমতা পরিমাপের স্কেল নিয়ে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে তবে আমার নিকট বিষয়টি বাস্তব সম্মত বলেই মনে হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন যে,সড়ক পরিবহন আইন সংশোধন সহ ৮ দফা দাবিতে ৪৮ ঘন্টার ধর্মঘট ডেকে কিভাবে ১৭ কোটি মানুষকে শ্রমিকরা জিম্মি তো করেছেই উপরন্তু ধর্মঘট চলাকালে তাদের ঔদ্ধত্য সীমা ছড়ালেও প্রশাসন কেমন করে নীরব ভূমিকা পালন করতে পারে। মানুষের মুখে, স্কুল ড্রেসে,জাতীয় পতাকাতে পোড়া মবিল লেপে দিয়েও প্রশাসনের ভূমিকা ছিল ‘ কানে দিয়েছি তুলা, পিঠে বেঁধেছি কুলা’র মতোই।
    এর আগে আমরা কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীদের দেখেছি ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টসহ দেশ অচল করে দিয়ে দাবি আদায় করে নিতে। আমার প্লাটফর্ম হচ্ছে শিক্ষকদের নিয়ে, সেটাও আবার নন এমপিও। খাস বাংলায় বলতে গেলে ‘ পাতে নেওয়া যায় না ‘ এমন একটি সংগঠন। বেতনের দাবিতে এপর্যন্ত ২৮ বার আন্দোলন করেছি এই সংগঠনের ব্যানারে। এদেশের প্রথিতযশা শিক্ষক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবি, এমপি-মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী, মহামান্য রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত কেউ একটি বারের জন্যও বলেননি যে, ‘এদের দাবি অযৌক্তিক/অন্যায্য। প্রত্যেকেই বলেছেন, ‘ দাবিটি যৌক্তিক এবং মানবিক। বাস্তবতা হচ্ছে, এখনো পর্যন্ত নন এমপিও শিক্ষকরা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন। কথা দিয়েছিলেন অনেকেই তবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কবিতার মত ‘কেউ কথা রাখেননি’। কেন ননএমপিও শিক্ষকদেরকে বারবার রাজপথে দাঁড়াতে হয়, শ্লোগান দিতে হয় ন্যায্য পাওনা আদায়ে তার গুমোর ফাঁস করেছেন সাংবাদিক প্রভাষ আমিন।
    নন এমপিও শিক্ষকদের দেশের জনগনকে জিম্মি করার নৈতিক কোনো ক্ষমতা নেই। বাস্তবিক ক্ষমতা আছে কি নেই তা পরে আলোচনায় আসছি। একজন শিক্ষক তার নৈতিক অবস্থানে থেকে কখনোই জনগনকে জিম্মি করে কিছু আদায় করার কথা ভাবতে পারে না শিক্ষকদের ( তা সে এমপিওভূক্তই হোক আর নন এমপিও) নৈতিক শক্তি অনেক বেশি। তারা রোদে পুড়ে-বৃষ্টিতে ভিজে, কাঁদুনে গ্যাস বা লাঠি পেটা উপেক্ষা করেই বারবার নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে রাজপথেই ফিরে আসে। সে পিপার স্প্রে’র শিকার হয়েও হাতে আইন তুলে নেয় না। জনগনকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের অনৈতিক পথে সে কখনো হাঁটে না। এমনটা চিন্তা করলে ২৮ বার তাকে রাজপথে আসার প্রয়োজন হতো না। কোটা বিরোধী আন্দোলন বা সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা শহর অচল করে দেওয়া শ্রমিক আন্দোলনের মতো ফসল ঘরে তোলা যেত কিন্তু শিক্ষকরা তা করেননি। সরকারি কোনো সংস্থা বা মিডিয়া একথা বলতে পারবে না যে পিপার স্প্রে’র শিকার হয়ে শিক্ষকরা লাঠি হাতে নিয়েছে। আমার স্পষ্টই মনে আছে বিগত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে একবার প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্বারকলিপি দিতে যাওয়ার পথে আমাদের সামনে মহিলা পুলিশ দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একই কৌশল যদি কোটা বিরোধী আন্দোলন, রাজনৈতিক সমাবেশ বা পরিবহন শ্রমিকদের সম্মুখে দাঁড় করালে কি ঘটবে তা দেশবাসি ভাল করেই জানে। নন এমপিও শিক্ষকরা বঞ্চিত হয়েছে, হয়েছে প্রবঞ্চণার শিকার এরপরও তারা বারবার নিয়মতান্ত্রিক পথেই আন্দোলনের গতি পরিচালনা করেছে।
    ২০১৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর আন্দোলনের (২৭ তম) এক পর্যায়ে ০৬ জানুয়ারি ২০১৮ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি পিএস-১, মাননীয় শিক্ষা সচিব অনশন স্থলে এসে দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অনশন ভঙ্গ করান। আমাদের প্রথম থেকেই দাবি ছিল ‘ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সকল নন এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও দিতে হবে ‘ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিধি মারফত জানালেন দাবি মেনে নিলাম। অর্থাৎ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সকল নন এমপিও প্রতিষ্ঠান এমপিও’র দাবি তিনি মেনে নিলেন। এদেশে যেহেতু বাঁশের চেয়ে কঞ্চি সব সময় মোটা হয় তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মেনে নেওয়া দাবিটি বাস্তোবায়নে শুরু হলো নানান তাল বাহানা। উর্দ্ধোতন কর্তার মেনে নেওয়া দাবি বাস্তোবায়ন অধনস্তের জন্য ফরজ হয়ে যায়। কিন্তু এখানে হয়েছে উল্টো। এমপিও দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলো অথচ পরবর্তী বাজেটে বরাদ্দ নেই একটি টাকাও। বাধ্য হয়ে পবিত্র রমযান মাসেই শিক্ষকরা আবার রাজপথে এসে দাঁড়ালো। এই বারের আন্দোলনের বিশেষত্ব ছিল দাবি মেনে নেওয়ার আহব্বান নয়, মেনে নেওয়া দাবি বাস্তোবায়নের। টানা ৩২ দিনের আন্দোলনে পর্দার আড়ালে কতো যে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে তার খবর কে রাখে ? দেশবাসির চাপে এক পর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের নিকট স্বীকার করলেন ‘ এবারই প্রথম তিনি অর্থমন্ত্রীর নিকট এমপিও খাতে অর্থ বরাদ্দ চেয়েছেন ‘। প্রশ্ন উঠলো ‘ কতোদিনের মধ্যে এমপিও’র ঘোষনা হবে? ‘ অর্থমন্ত্রী বললেন, ‘ এমপিও’র ঘোষনা যে দিনই হোক বেতন গননা করা হবে জুলাই মাসের ০১ তারিখ থেকে ‘।  তার আলামত আমরা দেখছি না। নানান অসঙ্গতিতে ভরা এমপিও নীতিমালার কারণে আবেদনের সময় সীমা বেড়েছে। সরকারের সকল শর্ত মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা-স্বীকৃতি পেলেও এমপিও’র জন্য দেওয়া হচ্ছে কঠিন শর্ত।
    মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর দীর্ঘদিনের অবহেলা চলমান এমপিওভূক্তি কার্যক্রমকে স্থবির করে রেখেছে। এখন আর তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া সমাধানের সম্ভবনা ক্ষীণ। এ লেখা যখন লিখছি তখন দেখা মেলেনি বহুল কাঙ্খিত এমপিও’র। নন এমপিও সংগঠনের লিয়াজোঁ কমিটি প্রায় প্রতিদিন মন্ত্রী-এমপি-সচিব সহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের দরজায় কড়া নেড়েই চলেছেন। দেখা মিলছে না সেই ‘ সোনার হরিণ’এর। যে দেশে ক্ষমতার পরিমাপক ‘ স্কেল ‘ হচ্ছে জনগনকে জিম্মি করতে পারা সেই দেশে নৈতিক কোনো আন্দোলনে বিজয়ী হওয়া হিমালয়ের চড়াই-উৎরাই পার হওয়ার মতোই। তবুও আমরা নন এমপিও শিক্ষকরা আমাদের এই ‘ন্যায্যতার’ আন্দেলন চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। নন এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের অনাহারি পরিবার পরিজন নিয়ে ঢাকার শাহবাগ-পল্টন মোড়,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যায়ের সামনের মহাসড়ক আর চট্টগ্রাম-কুমিল্লা মহাড়সকে বেতনের দাবিতে দাঁড়ালেই দেশের সিংগভাগ অচল হয়ে পড়বে। এরকম কর্মসূচী বাস্তোবায়ন খুব একটা কঠিন নয়। এতে করে জাতিকে জিম্মি করে হলেও দাবি আদায় হবে যা শিক্ষকরা করতে চায় না। আমরা আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছি। আশা করছি তিনি নিজেই একটা ঐতিহাসিক ঘোষনা দিয়ে সকল নন এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের এই সমস্যার স্হায়ী সমাধান করবেন। আমরা বিশ্বাস করতে চাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে ওয়াদা করেন তা তিনি বাস্তোবায়নও করেন। সেই ভরসাতেই আশায় দিন গুনছে দেশের সোয়া একলক্ষ নন এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীর পরিবার।
    লেখক ● সম্পাদক ফাস্ট বিডি নিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম
    jamilmukul365@gmail.com
    Close