• আজ বৃহস্পতিবার, ২১শে মার্চ, ২০১৯ ইং ; ৭ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ১৩ই রজব, ১৪৪০ হিজরী
  • শিশু শ্রম : দরিদ্র্যতাই প্রধান কারণ

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ● আহমাদ আবসার হুসাইন মাদানী ●
    সারা বিশ্বের এখন ভয়ংকার পেশার নাম শিশু শ্রম। দিনে দিনে এই শ্রমের শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে, তারা আসহায় হচ্ছে কিন্তু প্রতিকারে কিছুই হচ্ছে না। বিশ্বের বিভিন্ন এনজিও সংস্থা, সরকারসহ বিভিন্ন সংস্থা এর বিরুদ্ধে আলাপ, আলোচনা, পরিসংখ্যান তুলে ধরলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। প্রতিদিনই জীবন ধারণ আর দু’বেলা আর দু’মুঠো অন্নের জন্য তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতেই দ্বিধাবোধ করছে না। মূলত তাদের নিজেদের খাওয়া আর পরিবারের খাওয়ার জন্য শিশুরা লেখাপড়ার পরিবর্তে পেশার কঠিন আবর্তে জন্মের পরেই চলে যাচ্ছে। অথচ আমাদের দেশের একটি শ্রেণী তাদের ব্যবহার করে সুবিধা ভোগ করছে।
    সারা দেশে প্রায় ৪৫ লাখ শিশু নিষিদ্ধ শিশু শ্রমের শিকার। এদের সোনালী ভবিষ্যত অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। যে বয়সে তাদের খাতা কলম নিয়ে স্কুলে যাবার কথা ছিলো, ঠিক সেই বয়সে শুধুমাত্র দারিদ্র্যের কারণে আজ ওরা শিশু শ্রমিক। গত চার বছরে এই শ্রমিক বেড়েছে ১০ লাখ।
    ২০১১ সালের সরকারি একটি জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শিশু শ্রমিকদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃদ্ধি এমন এক পর্যায়ে এসে গেছে যে পরিস্থিতি দিনের পর দিন বেড়্ইে চলেছে। দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা এখন প্রায় ৭৯ লাখ।
    শহর অঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে শিশু শ্রমের প্রবণতা অনেক বেশি। শিশু শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ১৫ লাখ শিশু শ্রমিক শহরে এবং ৬৪ লাখ রয়েছে গ্রামাঞ্চলে। এই শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ৪৫ লাখ শিশু শ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত। ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমে নিয়োজিত প্রায় ১৩ লাখ শিশু এক সপ্তাহে ১শ ৬৮ ঘণ্টার মধ্যে কাজ করছে প্রায় ৯০ ঘণ্টা।
    বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আইএলও’র জরিপ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে ৪৫ ধরনের। আর এর মধ্যে ৪১ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করছে শিশুরা। শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ৭৩ দশমিক ৫০ ভাগ পুরুষ শিশু এবং ২৬ দশমিক ৫০ ভাগ নারী শিশু। শিশু শ্রমিকের ৬ দশমিক ৭০ ভাগ আনুষ্ঠানিক খাতে এবং ৯৩ দশমিক ৭০ ভাগ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে মোটর ওয়ার্কসপে কাজ করা, ওয়েল্ডিং, গ্যাস কারখানা, বেলুন কারখানা, লেদ মেশিন, রিকশা চালানো, মাদক বাহক, বিড়ি শ্রমিক, বাস-ট্রাকের হেলপার, লেগুনার হেলপার, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহ শিশু শ্রমিক, এমব্রয়ডারি, জাহাজ শিল্প, চিংড়ি হ্যাচারি, শুঁটকি তৈরি, লবণ কারখানা, বেডিং স্টোরের শ্রমিক, ইট ভাঙা, ইট ভাটা শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, ট্যানারি এবং রঙ মিস্ত্রিসহ আরো বিভিন্ন ধরনের কাজ।
    বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর(বিবিএস) ২০০৮ সালের হিসেবে অনুযায়ী দেশে শূন্য থেকে ১৭ বছর বয়সের শিশুর সংখ্যা ৬ কোটি ৭৭ লাখের বেশী। এদের মধ্যে প্রায় ৩৫ লাখ শিশু নানা ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত। মোট শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ১৩ লাখ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। ২০০৮ সালের হিসেবে থেকে ২০১২ সালের হিসেবে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সরকারি প্রকল্পগুলো তেমন একটা কাজে আসেনি। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে ১০ লাখ। শুধু তাই নয় আগের চেয়ে নির্যাতনের মাত্রা কমেনি, বরং বেড়েছে। শিশু শ্রমিকদের কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের মালিকরা স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক কোন আইনের তোয়াক্কা করছে না কেউ। এমনকি মজুরি কম দিয়ে প্রতিনিয়তই তাদের ঠকাচ্ছে। সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদ উপেক্ষা করে শিশুদের দিয়ে জোর করে কাজ করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অথচ এখন পর্যন্ত শিশু শ্রমের দায়ে বাংলাদেশে একজনকে শাস্তি পেতে হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় না।
    শিশুর বয়স নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। কত বছর বয়স পর্যন্ত শিশু হিসেবে ধরা হবে তা সুনির্দিষ্ট একটি আইনে বলা নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা(আইএলও) শিশু আইনের বিভিন্ন ধারায় কাজের ধরনের ক্ষেত্রে শিশুর বয়স নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ১৬ থেকে ১৮ বছরের শিশুরা এই কাজ করতে পারবে। ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সের শিশুরা হালকা পরিশ্রমের কাজ করতে পারবে।
    অন্য দিকে বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের শিশু আইনে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত একজনকে শিশু হিসেবে ধরা হয়েছে। আবার জাতীয় শিশু নীতিতে ১৪ বছর বয়সের কাউকে শিশু হিসেবে চিত্রিত করার বিধান দেওয়া আছে। ভিন্ন ভিন্ন বয়সের সুযোগ নিয়ে শিশুদের বিভিন্ন ধরনের কাজে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। আইনে শূন্য থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের সবধরনের শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ৫ বছর বয়সের শিশুকেও জোর করে নানা ধরনের কাজে নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে।
    জানা গেছে, সরকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধে আইএলও’র ১৮২ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আইন অনুযায়ী শিশু বিক্রি, পাচার, ভুমি দাসত্ব, বেশ্যাবৃত্তি, অশ্লীল দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য শিশুর ব্যবহার, মাদক দ্রব্য উৎপাদন, মাদক পাচারে শিশুর ব্যবহার করাকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
    এভাবে আর কতদিন কষ্টের বোঝা বইবে আমাদের ছোট ভাই বোনগুলো, কেউ কি নাই তাদের পাশে দাঁড়াবে।
    লেখক,গবেষক,আলেম
    You can share