স্টোন

স্টোন

শুভ্র হাসান

এক.

ক্লান্ত সবাই , শুধু দলপতি বাদে। তিনি ফুরফুরে মেজাজে। চামড়ার মশক হাতে তার। পানি পান করাচ্ছেন সবাইকে। এক বিজন প্রান্তে এসে তাঁবু ফেলা হয়েছে। বিশ্রাম এখন পুরো কাফেলা। দলপতি হেঁটে হেঁটে যাকওয়ানের সামনে এসে দাঁড়ালো। যাকওয়ান এ কাফেলার সর্ব কনিষ্ঠ । ‘পানি পান করো যাকওয়ান। প্রশান্তি লাভ করো।’ অমায়িক সুর দলপতির। ‘আমি রোযা জনাব। প্রশান্তিতেই আছি।’ শান্ত কন্ঠে যাকওয়ান। ‘জানা ছিলো না হে। খুশি হলাম। তবে যাত্রা পথে রোযা না রাখার নির্দেশ ছিলো আমার।’ এবার কিছুটা ক্রুদ্ধ দলপতি। ‘সে আদেশ আমার মস্তিষ্কে গাঁথা। তবে আমি মহান খোদার আর্চনার ক্ষেত্রে পারোওয়া করি না।’ বলিষ্ঠতার সাথে শান্ত কণ্ঠে যাকওয়ান। দলিপতি একদলা থুথু নিক্ষেপ করলে যাকওয়ানের মুখে। কাফেলার সবার চেহারায় আতংক । শুধু শান্ত যাকওয়ান। চৌগার কোনা দিয়ে মুখ মুছে নিচে তাকিয়ে সে। দলপতি গটগট আওয়াজে প্রস্থান করলেন। নিজের তাঁবুতে এসে বসে পড়লেন। ওই প্রথম কেউ তাঁর বিপক্ষে। ভাবা যায় ! ছোট্ট ঐ ছেলেটা তাঁর আদেশ অমান্য করলো। ‘আহমদ’। গলা ছাড়েন দলপতি। আহমদ তাঁবুর বাইরেই ছিলো। সে দলপতির বিশ্বস্ত অনুচর। ‘জ্বি হুজুর’। আহমদের নুয়ে পড়া স্বর। ‘যাকওয়ান যেন আমাদের সাথে রওনা না হয়। আগামীকাল আমরা দক্ষিণে ঘোড়া ছুটাবো। এটাই আমাদের শেষ যাত্রা। আশাকরি বুঝতে পেরেছো। আমি এখন বিশ্রাম নেবো। যাত্রা শুরুর পূর্বে কেউ যেন আমার তাঁবুতে না আসে।’ আহমদ বেরিয়ে যায় দলপতির তাঁবু থেকে। চেহারায় তাঁর নগ্ন আনন্দ। যাকওয়ানের উচিত শাস্তি হচ্ছে।

দুই.

আকাশের চাঁদটাকে খুব বড় মনে হচ্ছে । অনেক বড়। আজকে মনটা খুব ভালো নিতির । মন ভালো থাকলেই চাঁদটাকে বড় মনে হয়। এটা নিতান্তই নিতির লজিক না। নিতির বান্ধবী মোহনাও এ কথা জানিয়েছে নিতিকে। নিতি চাঁদ দেখতে বসেছে ছাদে। ছাদে একটা শীতলপাটি সব সময় বিছিয়ে রাখে নিতির বাবা। সকাল-বিকাল বসে চা খান। নিতি চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। বড় চশমাটা ডান হাতে ধরা। খালি চোখে চাঁদ দেখতে সুন্দর। নিতিদের পাশের বাড়ীর ছাদে দাঁড়িয়ে আছে তন্ময়। তন্ময় প্রতিদিন এ সময়ে ছাদে ওঠে সিগারেট পোড়াতে। আজকেও উঠেছিল সে জন্যই। নিতিকে দেখে কখন যে সিগারেট হাত থেকে পড়ে গেছে সেটা তন্ময় জানে না। নিতি চন্দ্রগ্রস্থ। তন্ময় নিতিগ্রস্থ।

দুই.

তন্ময় আর নিতি বসে আছে রেস্টুরেন্টে। এই ১৫ দিনে তারা একে অপরের খুব কাছে চলে এসেছে। এখন প্রতি রাতে তন্ময় ছাদে ওঠে নিতিকে দেখার জন্য। নিতিও ছাদে ওঠে তন্ময়কে দেখার জন্য। মাঝেমাঝে দুজন মিলে চাঁদ দেখে সময় পার করে। আবার কখনও টুকরো টুকরো চিরকুট বিনিময়ে চলে যায় সময়। নিতি ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার আর তন্ময় অনার্স থ্রার্ড ইয়ারে। তন্ময়ের বাবা ইঞ্জিনিয়ার। নিতির বাবা অবসর প্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা নিতি তন্ময়ের হাত ধরে বসে আছে। মাত্র এ ক’দিন এতটা ভালোবেসে ফেলেছি তন্ময়কে সেটা সে নিজেও বলতে পারবে না। নিতি কাঁদছে। তন্ময় নিতির দিকে তাকিয়ে আছে। একটু একটু ঘুম পাচ্ছে তার। অধিক শোকে পাথর হওয়ার মতো অবস্থা তন্ময়ের। নিতি কাঁদা থামানোর চেষ্টা করছে। রেস্টুরেন্ট ভর্তি মানুষের সামনে তার কাঁদতে তার খুব লজ্জা লাগছে। কিন্তু সে কাঁদা থামাতে পারছে না। তন্ময়ও সান্তনা দিচ্ছে না। নিতির মনে হচ্ছে তন্ময় তাকে সান্তনা দিলে তাঁর কাঁদা থেমে যাবে। ওদের সামনের টেবিলে বসে থাকা মাঝবয়সী ভদ্রলোক সেই কখন থেকে নিতির দিকে তাকিয়ে আছে। তিনির মনে হচ্ছে ঐ ভদ্রলোক উঠে আসবে তাকে সান্তনা দিতে। এবার হেঁচকি উঠে গেলো নিতির। তন্ময় কিছুটা নড়েচড়ে বসলো। মনে হচ্ছে এতক্ষণ সে কোন ঘোরের মধ্যে ছিলো। নিতির হেঁচকির শব্দে ঘোর কেটে যাচ্ছে। নিতির ধারণার সঠিক হলো। ভদ্রলোক নিজের চেয়ার ছেড়ে নিতিদের টেবিলে চেয়ার টেনে বসলো। ততক্ষণে তন্ময়ের ঘোর কেটে গেছে। এখন সে যথেষ্ট বিব্রত । ‘ আম্মাজান কান্তাছেন ক্যান? আপনার অজান্তেই কি কনসেপ্ট হয়ে গেছে? ‘ ভদ্রলোক রিনরিন কণ্ঠে বললেন। একদম থেমে গেলো নিতির কান্না। তারপর চিত্‍কার দিয়ে বলে উঠলো ‘ আপনাকে এখানে কে ডেকেছে? আর আমি কনসেপ্ট করবো কেন ? কালকে আমার বিয়ে । আজ সন্ধ্যায় হলুদ। আপনি এখান থেকে যান।”

তিন.

বুড়ো ফাতাহ শয়তানের পূজারী। শয়তানকে খুশি করতেই তার জীবনের ধ্যান। হিন্দুস্তানে কিছু দূর্লভ পাথর আছে যেগুলোতে শকুনের রক্ত মাখিয়ে গলায় ঝুলিয়ে রাখতে পারলেই শয়তানের প্রিয় হওয়া যাবে । বুড়ো ফাতাহের অনেক অনুচর-সহচর আছে। তাদের থেকে বাছাই করে কিছু সংখ্যককে সাথে নিয়ে তিনি হিন্দুস্তান সফরে এসেছিলেন। সম্রাট ভাতিজির অনুরোধে আনতে বাধ্য হয়েছিলেন তার স্বামী যাকওয়ানকে। সম্রাট জেনে গেলেই সমস্যা । যেহেতু মায়মূনা জেনে গিয়েছিলো তাই যাকওয়ানকে না আনলে সম্রাট জেনে যাওয়ার ভয় ছিলো। তাই অপরাগ হয়েই যাকওয়ানকে আনতে হয়েছিলো তার। তবে যাকওয়ানকে জানতে দেওয়া হয়নি কেন পাথর সংগ্রহে যাচ্ছে তারা। যাকওয়ানকে কাফেলা থেকে বের করে দেওয়ার পরদিনই বুড়ো ফাতাহ পেয়ে যায় পাথর। দেশের পথে ফিরছিলো কাফেলা। কিন্তু এখন পুরো কাফেলা নবাব আলিবর্দি খানের সৈন্যদের হাতে বন্দি হয়ে আলিবর্দি খানের রাজ দরবারে দাঁড়িয়ে আছে। নবাব খুব রেগে আছেন। সিংহাসন থেকে উঠে পায়চারি করছেন পুরো দরবার। ‘তুমি কি অস্বীকার করছো তুমি গুপ্তচর নও , তোমার সঙ্গীরা গুপ্তচর নয় ? ” সম্রাটের প্রশ্নে বিচলিত হয়ে ফাতাহ বললো ” মালিকে বাঙলা , কসম স্রষ্টার আমি বা আমরা গুপ্তচর নই।” কথাটা বলতেই চোখ দিয়ে পানি পড়লো ফাতাহের। ” দুররান সম্রাটের কি এতটাই সাহস বেড়ে গেছে , সে আমার রাজ্যে গুপ্তচর পাঠায়। জন্মভূমি দাক্ষিণাত্যের কসম আমি তোমাদের কাছ থেকে সত্য কথা বের করবোই ।”

তিন.

এতটা সহজে বের হয়ে আসতে পারবে বাসা থেকে সেটা চিন্তাও করতে পারেনি নিতি। মোহনা না থাকলে কিছুই সম্ভব হতো না।

-পরিশিষ্ট-
‘তন্ময় তোমার আম্মা কী আমাদের প্রণয়ে খুশি হবেন ?’ নিতির প্রশ্নে মুখ অন্ধকার হয়ে গেল তন্ময়ের। ‘আমার মা বেঁচে নেই। জন্মের পর মাত্র এক বছর মাকে পেয়েছি। মা’এর কোন স্মৃতিই মনে নেই।’ আবেগী হয়ে উঠলো তন্ময় । নিতির খুব খারাপ লাগলো। নিজেকে অপরাধী মনে করতে শুরু করলো সে। এই বিশেষ রাতে এরকম কথা উঠানো ঠিক হয়নি। ”আমার মা কে দেখবা ?” তন্ময়ের প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো নিতি। “কীভাবে?” নিতির কৌতূহলী প্রশ্ন। পকেট থেকে একটা পাথর বের করলো তন্ময়। কালো রংয়ের ছোট্ট একটা পাথর । ”এটা আমার মার গলার লকেটে ছিলো। আমি সবসময় এটা সাথে রাখি।” পাথরটা হাতে নিলো নিতি। ঝকঝক করছে। ”মনে হচ্ছে খুব দামি পাথর?” নিতির প্রশ্ন। ‘হুম, খুব দামি। নবাবি আমলের পাথর। শুনেছি আম্মা পেয়েছিলো তার নানীর কাছ থেকে। একটা বিষয় কি জানো ? আমার মার মতো মার নানীরও মৃত্যু হয়েছিলো এই পাথর সাথে নিয়ে। ” ”তোমার মা মৃত্যুবরণ করেছেন কীভাবে ?” “এক্সিডেন্ট ছিলো। গলার ভিতর লকেট ঢুকে গিয়েছিলো ঘুমের ভিতর। পাথরটা তোমার কাছেই থাক।”
পুনশ্চ –
রাত একটায় প্রচন্ড শব্দে রুমের ফ্যানটা খুলে পড়ে নিতি তন্ময়ের শরীরের উপর।