রিক্ত প্রত্যাশা

রিক্ত প্রত্যাশা

——————-সায়ফুল আলম

অনাথ নামটা বোধ হয় তার মাতা-পিতার দেওয়া নাম নয়। হওয়াটাও অস্বাভাবিক। এতিম অনাথ তার দুরের আত্মীয় নিঃসন্তান খালার সাথে থাকে। ঢাকা শহরে আপনজন বলতে অনাথের একঘরে এই একজনই।
অভাবের তাড়নায় অনেকের মত একটু সুখের আশায় অনাথের মা-বাবা যখন গ্রাম ছেড়েছিল তখন অনাথ মাতৃগর্ভে। রিকসাওয়ালা বাবা মারা গেলেন ট্রাকের ধাক্কায় রিকসা চালানোর সময়। আর মা অনাথকে জন্ম দিতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে বিনা চিকিৎসায় না ফেরা জগতে চলে গেলেন।
গ্রামের সাথে অনাথের কোন যোগাযোগ নেই। অনাথ বারোতে সবে পা দিয়েছে। তার কোন স্বপ্ন নেই। তবে ছেড়া কাগজ ও উচ্ছিষ্ট খাবার খোটার সময় কিছু রঙিন আকাঙ্খা তার মনে উষ্কানি দেয়। খাদ্য খোঁজার অসি’রতায় মনের অজান্তেই সেগুলো আবার জন্মস’ানে ফিরে হারিয়ে যায়। কিন’ একটা প্রত্যাশা শত চেষ্টায় জ্যান্ত রেখেছে। তীব্র আবেগে সযত্নে লালন করে আসছে অনেক দিন ধরে।
আসছে ১লা বৈশাখে ইলিশ মাছ আর পান্তাভাত সে খাবেই খাবে। ইলিশমাছ সে কবে খেয়েছে বা আদৌ খেয়েছে কিনা তার মনে পড়েনা। তবে ইলিশের ভূবনাকুল স্বাদ গন্ধের কথা লোকমুখে শুনে তার নাকের ছিদ্রজোড়া সজাগ রাখে কোথাও কোন সুযোগে চুরি করে একটু আধটু ইলিশের গন্ধ প্রবেশ করানো যায় কিনা।
অনাথের অধির আগ্রহের পাট শেষ। এলো বাংলা নববর্ষ। ১লা বৈশাখ। মুখরিত উৎসবী আনন্দের মহাপ্লাবন সারা শহরজুড়ে।
উৎফুল্ল অনাথ খোশ মেজাজে তার একমাত্র পরার বস্ত্র ইংলিশ প্যান্টটা পরে রাস্তা ধরলো ইলিশমাছের সন্ধানে।
আবহাওয় বিরুপ থাকায় অসময়ে শীত পড়েছে গতরাতে। তাতে অনাথে আবার ভীষণ ব্যাঙসর্দি হয়েছে। রাস্তায় নেমে সে তা অনুভব করলো। বৈশাখের অনুষ্ঠানসূচি সে লোকমুখে শুনেছে। তাইতো প্রথমে রওনা হলো রমনা বটমূলের উদ্দেশ্যে। রাস্তা চলতে ভাবি পান্তা ইলিশের আনন্দে মাঝে মধ্যে অনাথ নিজের পেটটা দুহাতে চাপড়িয়ে বাজাতে লাগলো। নিজ আনন্দে স্বরচিত কয় লাইন ছড়া কাটলো-

প্যাটরে তুই মহাজন
করিসনা আর জ্বালাতন
ইলিশমাছ আর পান্তাভাত
খাইতে দিমু চুপ থাক।

অনেক পথ হেঁটে অনাথ রমনা বটমূলে এলো। দেখে পান্তা ইলিশের মহা আয়োজন।
রাজ্য জয়ের স্বপ্ন নিয়ে অনাথ অন্যদের সাথে খাদকের সারিতে বসে পড়লো। পাজামা পাঞ্জাবিতে বাজখাই গোঁফওয়ালা পরিবেশক ওর দিকে কঠিন চোখে তাকালো।
এই ব্যাডা ওঠ। ইংলিশ প্যান্ট পরে বাঙালি অনুষ্ঠান! য়্যা শখ কত !
পরিবেশকের মারমুখি দেহভাব অনাথকে রীতিমত ভয় পাইয়ে দিল। ও উঠে দাঁড়ালো। অনুষ্ঠান পরিচালকের এক সহকারীর একটা জব্দ তাড়া খেয়ে ইলিশ খাওয়ার কথা ভুলে অনাথ স’ান ত্যাগ করতে মনসি’র করলো।
অনাথ নাছড় বান্দা। গন্ধে অর্ধেক ভোজন- সে শুনেছে। নিজ মনে বলে উঠলো, নাকের তো আর ইংলিশ প্যান্ট পরা নেই। ব্যাডা আমারে ঠগাইবা!
অনাথ নাক স্বল্প উঁচু করে বাতাস থেকে ইলিশ ভাজির তাজা গন্ধ নেওয়ার চেষ্টা করলো।
একি গন্ধ পাচ্ছিনা কেন? পরক্ষণে তার সর্দির কথা মনে পড়লো। অনাথের ইলিশগন্ধ জুটলো না।
এবার আনাথ শিল্পকলার দিকে রওনা দিল। এখানে সে সবাইকে লুঙ্গি পরা দেখলো। মাথায় লাল কাপড় বাঁধা।
অনাথ কালক্ষেপন না করে প্যান্ট খুলে মাথায় বাঁধলো। লাল ফিতা তো আর নেই তাই। এখানে ল্যাংটা থাকার দরুন তার বরং আরেকটা বাড়তি গলাধাক্কা জুটলো।
অসহায় অনাথ শিমুলতলীতে পেীছলো। এখানে সবাই লুঙ্গি পরে লোকগীতিতে নেচে খেলে তাল দিচ্ছে। অনাথ এদের সাথে সামিল হওয়ার চেষ্টা করলো। এলোপাথাড়ি অঙ্গছোড়াছুড়ির মধ্য দিয়ে শেষ হলো এদলের নৃত্যপর্ব। দেশীয় ধারার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে বটপাতায় পরিবেশিত হলো পান্তাভাতে ইলিশভাজি।
এবার আমাকে আটকায় কে? মহামেহমান হয়ে অনাথ বসে পড়লো প্রথম সারিতে।
কিন’ আয়োজকদের নজর খুব সজাগ। অনাথকে ফকির ভেবে তারা তাড়িয়ে দিল।
কেউ ঢং করে বললো-হামকো তাবৎ বোকা ভাবতা হ্যায়,,,,। কেউ আবার বিকৃত বাংলা-ইংরেজিতে অনাথকে বেশ রসিকতা করলো যার অধিকাংশ সে বুঝলো না। আর অতসব অনাথের বুঝবার দরকারও নেই। অবস্থা বেগতিক দেখে অনাথ ইলিশের প্রত্যাশা এযাত্রা ত্যাগ করলো।
অনাথ অগত্যা নিজ বস্তিবাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। পথ চলতে আশাহতের সান্তনা খুঁজতে লাগলো। অল্পতে পেয়েও গেল। মনে মনে এই ভেবে সন্তনা পেল- ইলিশমাছ মরা মাছ। তারপরও নাকি বদহজমের ওস্তাদ। ইতোমধ্যে বেলা গড়িয়ে গেছে। ক্ষুধার্ত অনাথের ঘরে পৌছে খালার স্বভাবী বকুনীপ্রাপ্তি ঘটলো। হাড়ির পান্তাভাত অতি গরমে পানিসহ পঁচে খাবারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়েছে।
এবেলা অনাথের অনাহারে থাকতে হলো।