• আজ সোমবার, ২৮শে মে, ২০১৮ ইং ; ১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ১২ই রমজান, ১৪৩৯ হিজরী
  • ঐতিহ্যের সন্ধানে জাবির চারুশিল্পীরা

    mohasthangorসাগর কর্মকার:
    শিক্ষা ও প্রকৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। আর প্রকৃত শিক্ষা শুধুমাত্র বইয়ের পাতাই নয় বরং থাকে প্রকৃতির মাঝেও। এই চেতনা ধারণ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্য অন্বেষণে ছুটছে নবরত্ন মন্দির, মহাস্থানগড়, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি বগুড়া, পাহাড়পুরের মত ঐতিহাসিক স্থানে। ২০আগষ্ট ২০১৬  চারুকলা বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক ময়েজ উদ্দিন লিটন, বিভাগের শিক্ষক শামিম রেজা, তরুন কুমার সরকার, রত্নেশ্বর সূত্রধর, শাশ্বতী মজুমদারসহ ৩৫জন শিক্ষার্থী শুরু করে তাদের যাত্রা। গন্তব্য সিরাজগঞ্জের নবরত্ন মন্দির।
    প্রায় পাঁচ ঘন্টার বাসে ভ্রমণের পরে জ্ঞান পিপাসু শিক্ষার্থীরা পৌছল সিরাজগঞ্জের সলঙ্গার হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দিরে। কালের সাক্ষী হয়ে তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে ঐতিহাসিক শিল্পশৈলী এবং স্থাপত্যকলার নিদর্শন। ছায়া সুনিবিড় সবুজে ঘেঁরা প্রায় ৫শ বছরের পুরনো অতীত সভ্যতার এক অপরূপ নিদর্শন। এ মন্দির নির্মাণ নিয়ে মতভেদও রয়েছে অনেক। আনুমানিক ১৭০৪ থেকে ১৭২৮ সালের মধ্যে নবাব মুর্শিদকুলি খানের শাসনামলে তার জনৈক নায়েব রামনাথ ভাদুরী এই মন্দির স্থাপন করেন। লোক মুখে শোনা যায়, মথুরার রাজা প্রাণনাথের অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন জমিদার রামনাথ ভাদুরী। বিভিন্ন ঘটনাক্রমে এই মন্দির নির্মাণ করেন তিনি।

    mohasthangor

    বিশাল চত্বরে বিক্ষিপ্তভাবে রয়েছে আরও ৩টি মন্দির । নবরত্ন মন্দিরের উত্তর পাশেই শিব- পার্বতী মন্দির, তার পাশেই রয়েছে দোচালা চণ্ডি মন্দির, দক্ষিন পাশে পুকুরের পাড় ঘেঁষে রয়েছে পোড়ামাটির টেরাকোটা কারুকার্যখচিত শিবমন্দির। বহুকাল ধরে মহা ধুমধামে এ ৪টি মন্দিরেই হতো পূঁজা অর্চনা। হিন্দু স্থাপত্যের উজ্জ্বল নিদর্শন ৩ তলা বিশিষ্ট কারুকার্যমণ্ডিত নবরত্ন মন্দিরে ছিল পোড়ামাটির ফলক সমৃদ্ধ ৯টি চূড়া। আর এজন্যই এটিকে বলা হত নবরত্ন মন্দির । অনেকে এটাকে আখ্যায়িত করে থাকেন দোল মন্দির হিসেবেও । এক সময় মন্দিরটির আয়তন ছিল ১৫ দশমিক ৪ বর্গমিটার। দেয়াল ও স্তম্ভের ওপর পোড়ামাটির ফলকে রয়েছে কারুকার্য খচিত লতা-পাতা ও দেব-দেবীর মূর্তি। ধ্বংসাবশেষ দেখে মন্দিরের চারপাশের বারান্দার অস্তিত্ব এখনো লক্ষ্য করা যায়। আঁচ করা যায় মন্দিরের মধ্যস্থলের উপাসনা কক্ষের অস্তিত্বও।
    দুপুরেরদিকে আবার গিয়ে হাজির হলাম বগুড়ার মহাস্থানগড়। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হতে জানা যায়, কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত এবং পাল শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ছিল। পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত ছিল রাজাদের রাজধানী। এই দুর্গনগরীর বাইরে উত্তর, পশ্চিম, দক্ষিন ও দক্ষিন-পশ্চিমের সাত-আট কিলোমিটারের মধ্যে এখনও রয়েছে বিভিন্ন ধরণের প্রাচীন নিদর্শন৷ মহাস্থানগড় প্রথম খনন কাজ শুরু করেন আলেকজান্ডার কানিংহাম নামের একজন প্রত্নত্ত্ববিদ। তিনি ছিলেন ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের প্রতষ্ঠাতা। শুরুটা কানিংহাম করলেও মহাস্থানগড় ভালভাবে খননকাজ শুরু হয় ১৯৯১ সালে। সে সময় ফ্রান্সের কয়েকজন প্রত্নতাত্ত্বিক বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিকদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করে। ‘‘তাঁদের গবেষণায় আবিষ্কৃত হয়েছে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। যেমন ভাস্কর্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন যুগের মুদ্রা, মাটির তৈজসপত্র, পুঁতি ইত্যাদি। পাওয়া গেছে প্রাক মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও মুসলিম যুগের কাঁচাপাকা ঘরবাড়ি, রাস্তা, নর্দমা, কূপ, মন্দির, মসজিদ, তোরণ, বুরুজ ইত্যাদি। এসব ছাড়াও পাওয়া গেছে সে সময়কার নগরজীবনে ব্যবহৃত রৌপ্য ও তাম্র মুদ্রা, কালো মসৃণ মৃৎপাত্র, পোড়ামাটির ফলক, মূর্তি সহ মাটি ও ধাতব দ্রব্যাদি। এখানে রয়েছে মুসলিম শাসনামলেরও বেশ কিছু নিদর্শন। সুলতান বলখীর মাজার ও জাদুঘরের মাঝামাঝি গড়ের ওপর রয়েছে জিউৎকুন্ড নামে একটি বড় কূঁপ। কথিত আছে, এ কূপের পানি পান করে পরশুরামের আহত সৈন্যরা সুস্থ হয়ে যেত। সুলতান বলখী একটি চিলের মাধ্যমে ওই কূপের মধ্যে এক টুকরো গরুর গোস্ত ফেলে দিলে শেষ হয়ে যায় পানির আরোগ্যদানের ক্ষমতা । এই কূপের পানি দিয়ে মরা মানুষ জীবিত করা হতো তাই এর নাম হয়েছে জিউৎকুন্ড। এখানে আরো রয়েছে মৌর্য শাসনামলের নান্দাইল দীঘি, গুপ্ত আমলের ওঝা ধনন্তরীর বাড়ি,গোবিন্দ ভিটা,কালিদহ সাগর, চাঁদ সওদাগরের বাড়ি, নরপতির ধাপ সহ অসংখ্য  প্রত্নস্থল।

    mohasthangor মহাস্থান গড়ের ২ কি. মি. দক্ষিনের রয়েছে বেহুলা-লক্ষ্মীমন্দীরের বাসর ঘর। এর পরে রাতের নিদ্রার জন্য আমরা যাত্রা করি বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে। রাতে সবাই এক সাথে আহারে পরে পুকুর পাড়ে বসে শুরু হয় আড্ডা-গান। যারা গানের আসর মাতিয়েছে  তার হল সঞ্জু, মাসুদ, জয়দ্বীপ,মাহাবুব,সবুজ,সাইফুল, সেলিম, শান্ত, রানা, তুবা, মুমু,আশা, দিনা, লিজা,তন্নী, মাধবী, রূপশ্রী, মাহা,যারিন আরও অনেকে । আর এসব মুহুর্ত গুলোকে ক্যামেরা বন্দি করতে ব্যাস্ত ফোরকান,সাকিল,অর্থ।  পরের দিন সকালের খাবারের পরে আমাদের জন্য আয়োজন করা হয় সেমিনার। সেমিনারে পল্লী উন্নয়ন একাডেমির  এখানে দায়িত্বরত জাবির মেহেদি  ভাই।
    একাডেমী থেকে সকাল ১০টায় যাত্রা শুরু করি নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের দিকে । পাহাড়পুরে মধ্যাহ্ন ভোঁজের পর শুরু হলো ঘোরাঘুরি।
    নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিমি উত্তরে অবস্থিত ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বা সোমপুর বিহার। এটি  প্রায় ৬৮ একর জমির ওপর অবস্থিত এই ভুমির স্থানীয় নাম ছিল গোপাল চিতার পাহাড়।  সেই থেকেই এর নাম হয়েছে পাহাড়পুর, যদিও এর প্রকৃত নাম সোমপুর বিহার। মহাবিহারটি পাল বংশীয় দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল (৭৭০-৮১০ খ্রিঃ) কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। প্রায় ৩০০ বছর ধওে বৌদ্ধদের বিখ্যাত ধর্মচর্চা কেন্দ্র ছিল। এটি ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায় ৩২২তম ঐতিহ্য হিসেবে। যুগযুগ ধরে ধ্বংসাবশেষে ধুলাবালি জমে পরিণত হয়েছে এক বিশালা উঁচু ঢিবিতে । সম্ভবত এভাবেই স্থানের নাম হয় পাহাড়পুর। ১৮৭৯ সালে স্যার কানিংহাম এই বিশাল কীর্তি আবিষ্কারের পর ১৯২৩ হতে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত সময়ের খননের ফলে বিভিন্ন প্রস্তর লিপি, ভাস্কর্য, পোড়ামাটির ফলক, ইট, বিভিন্ন ধাতব দ্রবাদি, রৌপ্য মুদ্রা, মাটির বিভিন্ন পাত্রসহ প্রচুর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদশর্ন পাওয়া যায় যা বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে সোমপুর বিহারের যাদুঘরে ।
    লিপিযুক্ত মাটির সিলের পাঠোদ্ধার হতে জানা যায়, বিহারের প্রকৃত নাম ছিল সোমপুর মহাবিহার। বিহারের উত্তর দিকে মূল প্রবেশপথ। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ৯২২ ফুট এবং পূর্ব ও পশ্চিমে ৯১৯ফুট বিস্তৃত। নবম শতাব্দীর শেষে কতিপয় বিদেশি রাজাগণ কর্তৃক বারবার আক্রান্ত হয় পাল সাম্রাজ্য । এভাবে পুনঃ পুনঃ আক্রমণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সোমপুর বিহার । সোমপুর বিহার দেখার মধ্যদিয়েশেষ হয় আমাদের ঐতিহ্য যাত্রার।
    এই সকল আয়জনের স্থান হিসেবে মহাস্থানগড়কে বেছে নেয়ার কারণ সর্ম্পকে  প্রশ্ন করলে চারুকলা বিভাগের চেয়ারম্যান ময়েজউদ্দিন লিটন স্যার বলেন, শিল্পী হতে গেলে নিজের দেশকে ভালভাবে জানতে হবে। জানতে হয় দেশের ঐতিহাসিক নিদর্শন সম্পর্কে,দেশকে উপস্থাপনা করা এক জন শিল্পীর প্রধান কাজ তাই বুঝাতে হবে দেশের পূর্বপুরুষদের চিন্তা চেতনাকেও।
    বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীর মধ্যে যে বিচ্যুতির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীরা নিজের দেশের ঐতিহ্য সম্পর্কে কম জানার কারনে ইন্টানেটে নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে তারা বাধা পড়ছে ফলে ঘটছে নানা ধরনের অপ্রতাশিত ঘটনা।
    এ যাত্রা ছিল নান্দনিক, র্দীঘ কিন্তু ক্লান্তিবিহীন,বিশাল প্রাপ্তির।আমাদের এই ছোট আয়তনের দেশেও যে কত প্রাচীন ঐতিহ্য,পূরাকীর্তি প্রত্নসম্পদ প্রচীন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান রয়েছে তারই যেন অতি ক্ষুদ্র অংশ দেখা। তাই মন বল ছিল আরও কেন নয়,সবাই ছিল পুলকে পরিতৃপ্ত।
    লেখক:
    শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

    Close