• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • ঈদুল ফিতর : তাঁহাদের আমাদের তোমাদের || সাইফ সিরাজ

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●
    Saif Shiraj eid 2017
    সাইফ সিরাজ ● উপমহাদেশের মুসলমানদের কাছে ঈদ উৎসব এখন একটি সার্বজনীন উৎসব। অথচ গত শতকের গোড়ার দিকেও এটা এতটা সার্বজনীন ছিলনা। কারণ হিসেবে বলা যায়, গ্রামীন এই অঞ্চলে ইসলামের মৌলিক বিধিবিধান সম্পর্কে ভাল জানা মানুষের অভাবটা ছিল প্রকট। ফলে মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবগুলোতেও ছিল হিন্দু ধর্মের প্রভাব। ঈদ উৎসবের থেকেও মহররমের তাজিয়ায় ছিল ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা। ফরায়েজী আন্দোলনের পর থেকেই মূলত এদেশে সহীহ ইসলামের চর্চা শুরু হয়। আগেও সহীহ ইসলামের চর্চা ছিলনা তেমন নয়; তবে এটা খুবই সীমিত অঞ্চলে হতো। ফলে মুসলমানদের বৃহৎ উৎসবের সার্বজনীনতা ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু কালের আবর্তনে এই ঈদ উৎসবই এখন মুসলমানদের প্রধান উৎসব। সাধারন মুসলমানদের ইসলামী জ্ঞানের একটি উদাহরণ দিলেই বুঝা যাবে যে এটা কতটা হাস্যকর ছিল আজকের সময়ের তুলনায়। বাবা চাচাদের কাছ থেকে শুনা – সে সময় রমজান মাসে রোজা রেখে পানি ও তামাক খাওয়াটা দূষনীয় ছিলনা! তবে এর জন্য একটা কাজ করতো তারা। রোজাটাকে একটা বাঁশের চোঙ্গায় রেখে দিত! কিন্তু কীভাবে? সেটা হল তারা একটা বাঁশে চোঙ্গে দীর্ঘ দম দিত তারপর বাঁশের চোঙটার মুখটা গামছা বা অন্য কিছু দিয়ে বেঁধে রাখতো। এর পর প্রয়োজন মত তামাক পানি খেয়ে সেই চোঙ্গের মুখে নিজের মুখ নিয়ে জোড়ে দম নিত। আর সেই দমটা গিলে ফেলত। এই ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায় মুনতাসির মামুনের লেখায়ও।

    সাতচল্লিশের ভারত বিভাগের আগে এদেশের মানুষ ঈদ পালন করতো কেবল ঈদের জামাত আদায় করে। একটু সচ্ছল পরিবার হলে ভাল রান্না-বান্না হতো। এরপর আর তেমন জমজমাট কোন আয়োজন চোখে পড়তোনা। তবে শহর অঞ্চলে কিছুটা আড়ম্বরতা ছিল। সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে পাকিস্তান হল। মানুষের মাঝে এল একটা নব জাগরণ। মুসলমানদের মাঝে নিজেদের নিয়ে বাড়তে থাকে আত্মমর্যাদা বোধ। আবার বৃটিশদের সময়ে ঈদ উৎসবের সার্বজনীনতা না থাকার আরেকটি কারণ দেখা যায় যে সেসময় ঈদকে কেন্দ্র করে সরকারি কোন ছুটিও ছিলনা। ছুটি দেয়া হতো বড়দিনে। ফলে ঈদ উৎসব সেসময় ততটা রং ছড়াতে পারেনি। যখন ভারত বিভাগ হয়ে মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাস ভূমি হল মূলত তখন থেকেই এদেশে ঈদ উৎসবের ক্রমবিবর্তনের শুরু। এরপর এল ঈদের জন্য সরকারি ছুটি। শুরু হল ঈদ কেন্দ্রিক বাজার ব্যাবস্থাপনা। মানুষের মাঝে এল নতুন উদ্দ্যম। রং লাগল ঈদের উৎসবে।

    যদিও সাম্প্রতিক সময়ে একদল আত্মপরিচয়হীনকে দেখা যায় ঈদ উৎসবকে গৌণ করে নববর্ষকে মূখ্য করে তোলার
    অন্তহীন ব্যর্থ প্রয়াসে ঘুমহীন প্রচেষ্টায় রত। কালে এরা হারিয়ে যাবে যদি আমরা আমাদের আদর্শে অটল থাকি। অন্যথায় আমাদের ফিরে যেতে হতে পারে সেই পুরনো সময়ে। যে সময়ে আমাদের নিজস্বতা বলতে কিছু ছিলনা। যাক আমরা আশাবাদী চামচিকারা সূর্যোদয় দেখে চেচামেচি করে কিন্তু সূর্য তার আপন গতিতেই ওঠে-অস্ত যায়। ওরাও চেচাবে এবং ইসলাম আপন গতিতেই এগিয়ে যাবে।

    এরপর বাবা-দাদাদের যুগ শেষ হয়ে গেল। ঈদ উৎসব তখন তার কৈশোরে। গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে তখন ঈদ মানেই আনন্দ। শিশুকিশোর সবাই ঈদের দিনের অপেক্ষায় থাকে। শুরু হল ঈদ মানেই নয়া কাপড়। এমন ট্রেডিশান। গায়ের বধুরাও রমজানের সাতাশ তারিখ থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকে। বাড়ির উঠোন ভরে যায় রকমারি নকশী পিঠা আর পাপড়ে। মেহেদী বাঁটা আর নানা নকশায় মেহেদী দেয়ার প্রচলনে কেউ কেউ হয়ে ওঠেন সবার আপন। কারণ তারা মেহেদী নকশায় বিশেষ পারদর্শীতা দেখিয়েছেন।

    চলতে থাকে সময় চলতে থাকে মানুষের জীবন। কিন্তু এ দুটো সবসময় একই সমান্তরালে চলেনা। মাঝে মাঝে বেঁকে বসে জীবন চলার পথের চাকা। এমনিভাবেই একদিন পূর্ব বাংলার মানুষের জীবনের সুখের চাকায় লাগে দিক বদলের হাওয়া। রুখে দাড়ান আপামর জনসাধারণ সব রকরমর শোষনের বিরুদ্ধে। শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। জীবনের গতি পথ যায় বদলে।
    নয় মাসের স্বাধীনতা সংগ্রামের অস্থির সময়ের ঈদ উৎসব তো এক উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার নাম। তবে সেই সংগ্রাম-উত্থাল সময়েও শিশু-কিশোরদের উৎসব এতটুকোও মলিন হয়নি এটা সত্য। সাংবাদিক জিয়াউদ্দিন সাইমুম বলেন, ‘আমাদের কাছে তখন উৎসবটাই মুখ্য ছিল। বড়দের প্রতিক্রিয়াটা আমরা অনুভব করিনি।’ নেমে আসে এই সবুজ অরণ্যনীর বুকে স্বাধীনতার মুক্ত আশীর্বাদ। পথ চলা শুরু হয় নব উদ্যমে। আবারও জীবন-সময় চলতে থাকে মহাকালের মহা পথে।

    পৃথিবীর আলোয় তখন আমাদের পদচারণা। কৈশোরে আমাদের কাছে ঈদ ছিল একটা নতুন লুঙ্গী আর এক জোড়া ¯পঞ্জের চপ্পল। কখনও কখনও একটা নতুন জামা। তবে আমাদের আশপাশে অনেকেই এমন ছিল যে যাদের ঈদ উৎসবটা ছিল আমাদের চেয়ে বর্ণিল। কিন্তু অধিকাংশের জন্য আমাদেরটাই প্রযোজ্য। আর ঈদের দিন সকালে নকশী পিঠা, হাতে তৈরি সেমাই নারকেল দিয়ে, কখনও বা ফিরণি-পায়েশ। ঈদগাহ্ থেকে ফেরার পর গোশত-পোলাউ খেয়ে এক দৌড়ে মাঠে। হয় ফুটবল নয় মার্বেল খেলা। এ এক আজব আনন্দ আয়োজন। সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা বাবা বা মায়ের শাসনের আশংকা মনে নিয়ে। কিন্তু কেউই কোন ঈদের দিন বকা-ঝকা করতেন না। নানা বাড়ির ঈদে আবার আরেকটা মজা ছিল। সেখানে একটা মেলা হতো। সেই ঈদ মেলায় নানা রকম খেলনা পাওয়া যেত। কালের বিবর্তনে সেই মেলা আজ আর নেই। অবাধ জুয়া খেলার কারণে সেই মেলা আজ বন্ধ।

    আমরা আমাদের শহুরে আত্মীয়দের কাছে শহুরে ঈদের কথা শুনে আফসোষ করতাম। তারা নাকি ঈদের কেনা-কাটা করে সব একটা আলমিরায় রাখে। কেউ কারো কাপড় কাউকে দেখায়না। ঈদের দিন সকালে সবাই সবার কাপড় বের করে সবাইকে চমকে দেয়। আমিও ভাবতাম আহ্ যদি আমার ঈদটাও হতো এমন আনন্দময়। কিন্তু সত্য হল এখনো শহুরে ঈদ দেখার ভাগ্য হয়নি।

    আর এখন তো তোমাদের সময়। কর্পোরেট কালচার। ফ্যাশনেবল ঈদ মার্কেট। মিডিয়ার চমক। সিনেমার দাপট। চ্যানেলে চ্যানেলে ঈদের আয়োজন। মার্কেটে মার্কেটে রকমারি ঈদ শপিং। কেউ আবার শপিংয়ের জন্য উড়ে যায় বিদেশ। একটা দুটা নয় একাধিক ড্রেস সেট কেনা হয়। গ্রামেও লেগেছে সেই শহুরে হাওয়া। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। বেড়েছে মানুষের বোধের সীমানা। সেই পথ ধরে আড়ম্বরতার গায়ে লেগেছে উত্তর আধুনিকতার পরশ। সময় এখন তোমাদের। ঈদের আনন্দ এখন তোমাদের। এখন আর নেই সেই মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ানো আর ধুকধুক বুকে ঘরে ফেরা। এখন বিনোদন সব বাক্সবন্দী। মনিটরের পৃথিবীতে আটকে গেছে তোমাদের শৈশব আর কৈশোর। বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় ঈদের উৎসবেও তোমাদের নজর রাখতে হয় সিলেবাসে। তবে ঈদ উৎসবে লেগেছে রকমারি রংয়ের হাওয়া। চলুক ঈদের আনন্দ ননস্টপ। একটি ছড়া দিয়ে শেষ করছি আজকের ঈদ কাহন…

    আজকে জীবনস্বপ্ন ভরা
    এইতো জীবন কষ্ট ছাড়া
    বন্ধুতা আজ আকাশ ভরা
    খুশির ঝিলিক বাঁধন হারা

    শূন্যতায় আজ লাগুক মড়ক
    এই কামনায় ঈদ মুবারক…

    Close