• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • খুনের পরে || শেখ আনিচুর রহমান

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●Anisur Rahman eid 2017

    শেখ আনিচুর রহমান  ●

    এক
    চাকরিটা পেয়েছি বেশিদিন হয়নি। সামান্য বিএ পাশ ছোকরা আমি, চাচাশ্বশুরের তদবির না থাকলে নিশ্চিতভাবেই এ চাকরি আমি পেতাম না। থাকার মধ্যে আছে কেবল উত্তম কুমারের মতো চেহারা। তা আজকাল উত্তম কুমারে চলেনা। যুগ এখন স্টার প্লাসের ঝকমকে চেহারার চকলেট বয় নায়কদের। ক্লিন শেভড, পরনে বুক খোলা শার্ট কিংবা টিশার্ট, ব্যাকব্রাশ চুল, গা থেকে ভুরভুর করে দামি সুগন্ধীর গন্ধ বের হওয়া- এগুলো আল্ট্রা মডার্ন ছেলেদের স্পেসিফিকেশন। দামি বাইক, ডিএসএলআর থাকলে তো কথাই নেই! মেয়েরা সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়বে, পড়েও। আর আমার ইস্ত্রি না করা শার্ট-প্যান্ট, পায়ে সস্তা জুতো, গালে দাড়ির জঙ্গল আর চোখে উদাসীন দৃষ্টি দেখলে কোনো মেয়েরই আমাকে পছন্দ করার কথা না। কেউ অবশ্য করেওনি। অন্তত গতবছরের তেসরা শ্রাবণ পর্যন্ত। মেহজাবীনের সাথে দেখা হওয়ার আগপর্যন্ত।

    গ্রামের আলোবাতাসে বেড়ে ওঠা সহজ-সরল ছেলে আমি। নিজে বলে বলছিনা, আমার বন্ধুরা-ও আমাকে গোবেচারা বলেই জানে। কারো সাতেও নাই, পাঁচেও নাই। ঢাকা কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক আমি, এইটুকু বলার পরে আমার যাচ্ছেতাই ফলাফল নিয়ে কিছু বলিনা। কীইবা করবো! পড়াশুনায় কখনোই আহামরি রেজাল্ট ছিলোনা আমার। শুধু বই পড়তাম সারাদিন, পাঠ্যপুস্তকের বাইরে যত যা আছে। ঢাকা কলেজে কোনোমতে ভর্তি হলাম, তা-ও ভালো সাবজেক্টে। লেখালিখির বিশ্রী অভ্যাসটা ছোটকাল থেকেই ছিলো। কিশোর ম্যাগাজিন বাদেও আমার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলাম বন্ধুদের জন্য লেখা প্রেমপত্রে। আমার লেখা প্রেমপত্রের গুণে বন্ধুরা দু-চারটা প্রেম করে ফেলতো। কিন্তু আমার মতো হতভাগার জন্য কোনো বরুণা কিংবা নার্গিস ছিলোনা। অবশ্য এসব নিয়ে তেমন ভাবতাম-ও না। ঢাকায় এসে আজিমপুরে মেসে ওঠার পরে মাথায় ভূত চাপলো- আমি লেখক হবো! বাংলাবাজারে ঘুরে ঘুরে আর প্রকাশকদের খিস্তি শুনে সে ভূত পালালো, তবে বড্ড দেরিতে। এক উদার প্রকাশক দুই লাখ টাকার বিনিময়ে যেকোনো ধরণের বই প্রকাশের প্রস্তাব দিলেন। আমার প্রাইমারির স্কুলমাস্টার বাবার বেতনের কথা চিন্তা করে সেই প্রকাশকের উদারতাকে মধ্যাঙ্গুলি দেখিয়ে চলে আসলাম। তখন আমি তৃতীয় বর্ষে। ক্লাস ফাঁকি দিতে দিতে রেজাল্টের বারোটা বাজিয়েছি আগেই। কোনোমতে পাস করে বেরিয়ে চাকরি খুঁজতে খুঁজতে জুতোর শুঁকতলা  ক্ষয় করে ফেলেছি, তবুও চাকরি নামক সোনার হরিণের দেখা পাইনি। এমন সময়ে আমার বিয়ের প্রস্তাব আসলো!
    বেকার ছেলের জন্য বিয়ের প্রস্তাব! তাজ্জব ব্যাপারই বটে। বাড়িতে লজ্জায় বহুদিন যাবত যাইনি, কথা-ও হয়নি তেমন। মাথায় রোখ চেপে গিয়েছিলো চাকরি জুটিয়েই বাড়িতে যাবার। মা একদিন কল করে বললেন আমার জন্য ভালো একটা চাকরির সন্ধান পেয়েছেন, আমি যেন বাড়িতে যাই। লজ্জার মাথা খেয়ে গেলাম। অবশ্য তার জন্য ছোট বোনটার কল করে কান্না দায়ী। তাছাড়া মা-বাবাকে দেখার জন্য-ও মনটা কেমন কেমন করছিলো। যাইহোক, বাড়িতে যাবার দুদিন পরে আসল রহস্য ফাঁস হলো। আমার জন্য নাকি ভালো এক মেয়ের খোঁজ পেয়েছেন তাঁরা। প্রথমে প্র্যাকটিক্যাল জোক ভেবে উড়িয়ে দিতে চাইলাম। বেকার ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দেবার জন্য মেয়ের বাবা-মায়ের প্রকৃতিস্থতা সম্পর্কে সন্দেহ ঘনীভূত হলো। সে সন্দেহ গগনচুম্বী হলো পাত্রীর বাড়ি, পরিবার ও পাত্রীকে দেখে। আর ভয় হলো যেকোনো মুহূর্তে তাঁরা প্রস্তাব ফিরিয়ে নিবেন ভেবে। মেহজাবীনের চেহারা কোনো অংশেই মডেল-অভিনেত্রী মেহজাবীনের চেয়ে কম না। উচ্চতা-ও বেশ, পাঁচ ফুট চার। ওদের পরিবার বেশ বনেদী, এলাকায় প্রভাব আছে। আমাকে দেখেশুনে তাদের-ও পছন্দ হয়ে গেলো। তারপরে বিয়ে, চাকরির সন্ধান, ঢাকায় আসা। চাকরির খোঁজ মেহজাবীনের চাচা দিয়েছেন এটা অবশ্য আগে জানা ছিলো না। তবুও খুশিমনেই চাকরিতে যোগদান করলাম, স্রষ্টার আরেক অনুগ্রহ ভেবে।
    বিয়ের আগে এবং পরেও মেহজাবীনকে ঘিরে কিছু কানাঘুষো শোনা গেলো। মেহজাবীনের সাথে কোন রাজপুত্রের মতো ছেলের নাকি বেশ আবেগঘন প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। আমি বা আমার পরিবার তাতে বিশেষ আমল দেইনি। আজকাল এগুলো খুব স্বাভাবিক। তবে ও আমার বাড়িতে আসার পরে ফিসফিসানি বাড়তেই লাগলো। এক শ্রেণির তথাকথিত আত্মীয়-স্বজন আছে যাদের কাজই হলো আত্মীয়দের মধ্যে কেউ একটু উন্নতির মুখ দেখলে তার পিছনে উঠেপড়ে লাগা। প্রয়োজনে কুৎসা রটাতেও দ্বিধা করেনা তারা। কিছুদিন বাদেই শুনলাম মেহজাবীনের এলাকার কে কে নাকি বলেছে ও সেই ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছিলো, তিনদিন পরে নাকি বাসায় ফিরেছে একা। ছেলে লাপাত্তা না হলে মুখ বাঁচাতে তার সাথেই বিয়ে দিতো ওর। তড়িঘড়ি করে এবং আমার পরিবারকে বোকা বানিয়ে আমার হাতে গছিয়ে দিয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি।  এসব শোনা আমার পক্ষে সহ্য করা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। তাই কিছুটা তাড়াহুড়ো করেই ঢাকাতে আসা।

    দুই
    দীর্ঘকাল আজিমপুরের মেসে থাকার কারণে কিনা জানিনা, বাসাটা-ও আজিমপুরেই নিলাম। আমার অফিস মতিঝিলে। প্রতিদিন বেশ ঝক্কি করে যেতে হয়। আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড বা লালবাগের কেল্লার কাছ থেকে লেগুনায় উঠি, তারপরে গুলিস্তানে গিয়ে সেখান থেকে মতিঝিল। সকাল ৯টার মধ্যেই অফিসে হাজির হতে হয়। তাই খুব সকালেই ঘুম থেকে উঠি। সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যার পরে বাসায় ফিরি। দুপুরের খাবার মাঝে মাঝে বাসা থেকে নিয়ে যাই, মাঝে মাঝে বাইরে খাই। বাসায় ফেরার সময়ে শাহবাগ হয়ে আসি। প্রায়ই জ্যাম থাকে, তখন মৎস্য ভবনের ওখানে নেমে রমনা পার্কে ঢুকে বসে থাকি কিছুক্ষণ। গাছপালার সান্নিধ্যে সময়টা খারাপ কাটেনা। পাখির ডাক শুনি, ফুলের ঘ্রাণ নেই, বিচিত্র রকমের মানুষ দেখি।
    বাসায় মেহজাবীন একাই থাকে। সারাদিন রান্না, ঘর গুছানো আর টিভি দেখা-বই পড়া। ওর বই পড়ার অভ্যাসটা খুব ভালো লাগে আমার। আমি জানি, ওর একা বাসায় থাকতে খারাপ লাগে, হাঁপিয়ে ওঠে। সামনে ভাবছি বেতন বাড়ালে ছোট বোনটাকে নিয়ে আসবো। মা-বাবা শহুরে হাঙ্গামো পছন্দ করেন না।
    একদিন মেহজাবীন টিভি দেখছিলো, আমি পাশে বসা। আমি সাধারণত বাংলাদেশের খেলা ছাড়া তেমন কিছু দেখিনা। ও হিন্দি একটা সিরিয়াল দেখছিলো, আর নায়কের স্মার্ট লুকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছিলো। আমি হিন্দি সিরিয়াল নিয়ে আমার বিরক্তির কথা ওকে জানাতে ও বললো ও শুধু এটাই দেখে। কাহিনী জিজ্ঞেস করাতে বললো এক মেয়ে এক ছেলেকে পছন্দ করে, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে মেয়েটার বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু মেয়েটা স্বামীর সংসারে গিয়ে সুখী হয়না, পুরনো প্রেমের কথাই মনে পড়ে বার বার। তারপরে একদিন সেই প্রেমিকের সাথে দেখা, তাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া।
    এটুকু শুনেই রাগে আমার গা রি রি করে উঠলো। আগে কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি, এবার ওকে ওর প্রেমিকের কথা জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু ও কিছু বলতে নারাজ। আমি টিভি অফ করে দিলাম। ও কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলো, তারপরে বললো সিরিয়ালের নায়কটার চেহারা অনেকটা ওর পুরনো প্রেমিকের মতো! আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম, আর ও উঠে বেডরুমে চলে গেলো।
    মেয়েরা নাকি কখনোই প্রথম প্রেম ভুলতে পারেনা। শত চেষ্টা করলেও না। আর অনেকে প্রথম প্রেমেই সব খুইয়ে বসে। মেহজাবীনের কথা আমার আমার মাথায় ঘুরতে লাগলো। অফিসে মন বসাতে পারলাম না। সারাদিন মনে হতে লাগলো ও এখনো সবসময় ওর প্রেমিকের কথা ভাবে, ওর প্রেমিককেই ভালোবাসে, সুযোগ পেলে তার সাথেই পালিয়ে যাবে!
    আমি দরিদ্র পরিবারের ছেলে। লেখাপড়া করেছি বেশ কষ্ট করে। কখনো কাউকে ভালো লাগেনি তা না। কিন্তু প্রেমটা কখনোই করা হয়ে ওঠেনি। বিয়ের পরে বউয়ের সাথে চুটিয়ে প্রেম করবো ভেবেছিলাম। চাকরির ঝামেলায় বউকে সময়-ই দিতে পারছিনা। আর সে বউ যদি তার পুরনো প্রেমিকের কথা ভাবে! মনটা বিষিয়ে উঠতে লাগলো আমার। মেহজাবীনকে সন্দেহ করা শুরু করলাম। ও কি ওর পুরনো প্রেমিকের সাথে যোগাযোগ রাখে? খোদা মালুম!
    ব্যাপারটা এমন দাঁড়ালো যে আমি বাসায় ফেরার পরেও চোখমুখ গম্ভীর, মেহজাবীনের সাথে কথাই বলিনা। ওকে লুকিয়ে ওর মোবাইল ঘেঁটে দেখি, ফেসবুকেও ঢুকি।
    একদিন বৃষ্টি হলো খুব। ছাতা নিয়ে অফিসে যাইনি। আসার সময়ে কাকভেজা হয়ে বাসায় ফিরলাম। পথে ড্রেনের নোংরা পানি মাড়িয়ে এসেছি, গা ঘিন ঘিন করছিলো। ঘরে ঢুকে দেখি বাতি নেভানো। মেহজাবীনকে ডাক দিলাম, ও শুয়ে ছিলো। শরীর খারাপ কিনা জিজ্ঞেস করাতেও কিছু বললোনা। গোসল সেরে খেতে এসে দেখি খাবার নেই, রান্না করা হয়নি কিছু। চুপচাপ অভুক্ত শরীরটা এলিয়ে দিলাম বিছানায়। মেহজাবীন অন্য দিকে ফিরে শোয়া। তন্দ্রায় একটু চোখ লেগে আছে এমন সময়ে ওর ফোন বেজে উঠলো। আমি ধরতে যেতেই ও তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ফোনের দিকে হাত বাড়ালো। কেমন সন্দেহ হতে আমি জোর করে ফোনটা টেনে নিলাম। এক অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এসেছে দেখলাম। রিসিভ করার পরে আমি ‘হ্যালো‘ বলতেই ওদিকে কোনো শব্দ নেই। পাক্কা দুই মিনিট ফোন কানের কাছে ধরে রাখলাম, অনেকবার ‘হ্যালো, হ্যালো‘ করার পরেও টু-শব্দটা নেই। কে কল করেছে জিজ্ঞেস করাতে ও কিছু না বলে চুপ করে বসে রইলো। মেসেজ ফোল্ডারে গিয়ে দেখি আগের সব মেসেজ মুছে দেয়া হয়েছে। ফেসবুকে গেলাম, ইনবক্সে কিছু পেলাম না। কী মনে হতে ‘আদার্স ফোল্ডার‘-এ গিয়ে দেখি ফেইক একটা আইডি থেকে মেসেজ এসেছে, বেশ আবেগঘন মেসেজ। ওকে ছাড়া বাঁচবেনা, ওকে এখনো পেতে চায়, যেভাবেই হোক ওকে যোগাযোগ করতে বলেছে। তারপরে দেখি যে নম্বর থেকে কল এসেছে সেই নম্বর দেয়া!
    বুঝতে আর কিছু বাকি রইলোনা। নিশ্চিতভাবেই মেহজাবীন ওই নম্বরে কল দিয়ে কথা বলেছে। মেসেজ মুছে দেয়নি কেনো সেটাই অবাক করলো আমায়। হয়তো তাড়াহুড়ো ছিলো।
    আস্তে করে ডাক দিলাম, ‘মেহজাবীন!‘
    -বলুন।
    -তুমি কী চাচ্ছো? আমায় ছেড়ে চলে যাবে?
    কোনো জবাব নেই।
    একটু বাদে ও নিজে থেকেই বললো, ‘আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। সেটা ঠিক করতে হলে ওর সাথে দেখা করতেই হবে।‘
    মুখে এক টুকরো তিক্ত হাসি ফুটে উঠলো আমার।
    ‘কী ভুল? বিয়ের আগে প্রেম করলে অনেক মেয়ে যে ভুল করে সেটা? ভিডিও করেছিলো নাকি?‘
    -প্লিজ, নোংরাভাবে বলবেন না। ওর সাথে দেখা করতেই হবে আমার। আপনার দেখা করতে দিতেই হবে।
    -যদি না দেই? কী কারণে দেখা করার এত প্রয়োজন?
    -কারণটা বলা যাবেনা। তবে আপনি না দিলেও দেখা আমার করতেই হবে। যেভাবেই হোক।
    -এত প্রেম! স্বামী থাকতেও পুরনো প্রেমিককে নিয়ে এতকিছু!
    -দেখুন, আমি ওকে অনেক ভালোবাসতাম, এখনো যে একদম বাসিনা তা না। আপনি প্লিজ আমায় খারাপ কিছু করতে বাধ্য করবেন না।
    সেদিন প্রথমবারের মতো আমি আর ও আলাদা বিছানায় শুইলাম। ওর ফোন-ও আমি নিয়ে নিলাম।

    তিন
    চারদিন কেটে গেছে।
    প্রথম দুইদিন একটু ঝামেলার পরে ও স্বাভাবিক অবস্থায় চলে এসেছে। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
    নিজের উপরেই রাগ হলো। নতুন বউকে ততটা সময় দিতে পারছি কই! আর পুরনো প্রেম থাকলে এগুলো স্বাভাবিক, সময়েই ঠিক হয়ে যাবে। বরং আমিই ছোটলোকিপনা করেছি। ওকে নরমভাবে বুঝানো দরকার ছিলো। যাইহোক, ওর মোবাইল ওকে ফিরিয়ে দিলাম।
    দুইদিন পরে শরীর খারাপ লাগাতে দুপুরেই বাসায় চলে আসলাম। আমাদের বাসার দরজায় দু‘দিক থেকেই লক খোলা যায়। ঘরে ঢুকে মেহজাবীনকে ডাক দিলাম। বেডরুমের দরজা আটকানো দেখে কী এক অমঙ্গলের চিন্তায় বুক কেঁপে উঠলো। বার কয়েক ধাক্কা দেয়ার পরে মেহজাবীন দরজা খুললো, পিছনে ওর সুদর্শন সাবেক প্রেমিক।
    ধাতস্থ হতে অনেক সময় লেগেছে আমার। কিন্তু দুজনকে বেঁধে ফেলে মুখে টেপ এঁটে দিতে কষ্ট হয়নি। মেহজাবীন অবশ্য কান্নাভেজা গলায় বলেছে যে ওর ছোটবোন মানে আমার শ্যালিকার পিছনে ওর পুরনো প্রেমিক লেগেছে এই খবর পেয়ে ওকে বুঝাতে চেয়েছিলো, এজন্যই যোগাযোগ করেছে। বাসায় অবশ্য নাকি আনাতে চায়নি, কিন্তু নরপশুটা বলেছে ও আগের সব ভুলে গেছে, এখন মেহজাবীনের ছোটবোনকে ভালোবাসে। কিন্তু ঘরে ঢুকতেই সব পালটে গেছে, জোরপ্রয়োগ করেছে। আমি অবশ্য আর কিছু শুনিনি। কমন সেন্স বলতে কিছু থাকলে ও এই কাজ কখনোই করতোনা, এক্ষেত্রে ও সমান দোষী।
    স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে কিনে আনা মেক্সিকান ছুরিটা এনে মেহজাবীনের চোখের সামনে ধরলাম। ও শিউরে উঠলো, ছটফট করতে লাগলো। একটু আগেই ওর প্রেমিক প্রবরকে এটা দিয়েই খুন করেছি, ওর চোখের সামনেই। আশ্চর্যের ব্যাপার, যেই আমার মুরগী জবাই করতেও হাত কাঁপতো সেই আমিই একজন লোক খুন করে ফেলেছি। আরেকজনকেও করবো। আমাকে এত ঠকিয়েছে ও! রাগে কাঁপছি আমি, হার্ট এটাক-ও হয়ে যেতে পারে। আর কিছু চিন্তা না করেই ছুরিটা সেঁধিয়ে দিলাম ওর বুকের বাম পাশে, যেখানে আমার জন্য ওর ভালোবাসা সঞ্চিত আছে বলে ভাবতাম আমি!

    চার
    ‘এই যে মশাই, নাক ডাকিয়ে ঘুমানো হচ্ছে খুব! উঠুন, দশটা বাজে। বাব্বা, কী ঘুম!‘
    জোরে জোরে ধাক্কা দেয়াতে ঘুম ভেঙ্গে গেছে আমার। বেড়ার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো আসছে, চোখ কুঁচকে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপরে ভালো করে তাকালাম। মেহজাবীন সদ্য গোসল করে এসেছে, পিঠের উপরে বিছানো লম্বা চুল বেয়ে বেয়ে পানি ঝরে পড়ছে এখনো। সকালে দূর্বায় জমা শিশিরের মতোই কয়েক ফোঁটা পানি জমে আছে নাকেমুখে। স্নিগ্ধ সকালের মতোই অপূর্ব লাগছে ওকে।
    আমার কেমন তালগোল পাকিয়ে গেলো। মেহজাবীন, ওর প্রেমিক, খুন!
    ‘বাহ, বাসর রাতে খুব পরিশ্রম গেছে মনে হয়!‘ ওদিক থেকে পাশের বাসার ভাবী এসে উঁকি মেরে, ঠোঁটে অশ্লীল হাসি ঝুলিয়ে বললেন। মেহজাবীন লজ্জায় আরক্ত হয়ে গেলো।
    মা চলে এসেছেন ইতোমধ্যে। ‘ইশ, সারাডা রাইত পোলাডার জ্বরে হুঁশ নাই, জ্বরের ঘোরে খালি বিলিছিলি কইছে! আর সারাডা রাইত আমার বউডা জাইগ্যা আছিলো অর পাশে।‘
    মা আর ভাবী চলে যাবার পরে মেহজাবীনকে কাছে ডাকলাম।
    ‘এত কী বলেছিলেন সারা রাত, বলুন তো!‘
    -ওগুলো বাদ। আমি কিছু জিজ্ঞেস করবো, উত্তর দিবে?
    -বলুন।
    -আমি শুনেছিলাম তুমি নাকি প্রেম করতে। এখনো কী তাকে ভালোবাসো?
    ও থমকে গেলো। তারপরে একটু চুপ থেকে বললো, ‘দেখুন, প্রেম বলতে তেমন কিছু ছিলোনা আমাদের মধ্যে। সে আমায় পছন্দ করতো, আমিও। আর সে এখন বিয়ে করেছে, এজন্যই আমি যাতে মানসিক চাপে না পড়ি তাই আমাকেও তড়িঘড়ি করে বিয়ে দিয়েছে।‘
    -সে কখনো এসে বললে তুমি যাবে?
    -আজব! তার সংসার আছে। আর সে বিয়ে না করলেও এটা কখনোই হতো না। আপনাকে দেখে পছন্দ হয়েছে বলেই বিয়েতে মত দিয়েছি আমি। আর বিয়েটা আজীবনের জন্য একটা পবিত্র বন্ধন, তার অমর্যাদা করবোনা আমি।
    ওর একটা হাত আমি আমার হাতে তুলে নিলাম। তারপরে আস্তে করে বললাম, ‘সারাজীবন পাশেই থেকো আজীবন, ভালোবেসো একটু।‘
    -থাকবো, বাসবো।
    এরপরে আমি কিছু বলার আগেই ওর নরম ঠোঁট নেমে এলো আমার ঠোঁটে।
    কোথাও হয়তো বেজে উঠছে ‘ভালোবাসি, ভালোবাসি…।‘
    সেটা আমার ভ্রম-ও হতে পারে।
    তা ভ্রম-ই হোকনা এখন!

    Close