• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • অপরাধবোধ || মনি হায়দার

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●

    Moni Haydar eid 2017

    মনি হায়দার ● খালেক মাস্টার ঘুমিয়েছো নাকি? হাতের হারিকেনটার আলোটাকে আরও একটু উসকে দিয়ে নেয়ামত আলী আবার ডাকে– খালেক, ও খালেক মাস্টার।
    রাত প্রায় ন’টা। গ্রামের রাত। অধিকাংশ মানুষ খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে গেছে। খালেক মাস্টারের বয়স প্রায় নব্বই বছর। কিন্তু দেখলে অতটা বয়সী মানুষ মনে হয় না। চমৎকার স্বাস্থ্য, মুখের সারিবদ্ধ দাঁত অটুট। শ্যামবর্ণ শরীর। একই গ্রামের মানুষ নেয়ামত আলী। নেয়ামত আলীও সমান বয়সী মানুষ। দু’জনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সাধারণত তারা দু’জন বিকালে বোথলা বাজারে জাকিরের চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়। আজকেও দিয়েছিল। সন্ধ্যার আগে আগে দু’জন ঘরে ফিরেছে। ঘরে ফিরেই নেয়ামত আলী একটি অদ্ভুত চিঠি পায়। চিঠির ঠিকানা লেখা ইংরেজিতে। খাম খুলে ভেতরে পায় একটি দীর্ঘ চিঠি। চিঠিটি লেখা উর্দু ভাষায়। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার, চিঠিটি এসেছে নেয়ামত আলীর মেয়ে– পারভীন বানুর নামে। পারভীনের বিয়ে হয়েছে আরও দশ বছর আগে। সে দু’টো ছেলেমেয়ের মা। পাকিস্তানে বা ভারতে তাদের কোনো আত্মীয়স্বজন, এমনকি পরিচিত জন কেউ নেই। চিঠিটা পাওয়ায় তাজ্জব বনে গেছে নেয়ামত আলী এবং তার পরিবার। এটা কী কোনো ষড়যন্ত্র! উর্দু ভাষার কিছুই জানে না সে। চিঠিটা লোকসম্মুখে প্রকাশ করা ঠিক করা হবে কী হবে না সেটা নিয়েও অনেক ভেবেছে নেয়ামত ও তার স্ত্রী। শেষে বন্ধু খালেক মাস্টারের কথা মনে পড়ে। খালেক মাস্টার জীবনের শুরুতে অনেক বছর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে চাকরি করেছে। ভালো উর্দু জানে। এইসব কারণে রাতে, নেয়ামত এবং তার বড় ছেলে জয়নালকে নিয়ে এসেছে খালেক মাস্টারের কাছে।

    নেয়ামত আলীর ডাকে কোনো সাড়া পাওয়া যায় না খালেক মাস্টরের। গ্রামে রাত ন’টা মানে অনেক রাত। কাজ থাকে না মানুষজনের। সন্ধ্যার পর খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়ে অধিকাংশ মানুষ। খালেক মাস্টারের সংসারে তেমন কেউ নেই। স্ত্রী মারা গেছে বছর পাঁচেক আগে। দু’টো ছেলে শহরে চাকরি করে। গ্রামে খুব একটা আসে না তারা। বিধবা ছোট বোন তার দু’টি বাচ্চা নিয়ে সংসারে আছে। বোনটিই তার যতœ নেয়।
    ভালোই আছে খালেক মাস্টার। এলাকার লোকজন তাকে সম্মান করে। গত স্থানীয় পরিষদ নির্বাচনে এলাকার লোকজন এসেছিল খালেক মাস্টারের কাছে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য। রাজি হয় নি সে।

    আবার শরীরের শক্তি দিয়ে ডাকে নেয়ামত আলী– ও খালেক মাস্টার। খালেক মাস্টার।
    কে?– ঘুম জড়ানো কণ্ঠে খালেক মাস্টারের কষ্ঠ শোনা যায়।
    আমি। আমি নেয়ামত।
    এত রাতে।
    কাজ আছে। ঘুম থেকে ওঠ– খুব জরুরি কাজ।
    আচ্ছা।’
    খালেক মাস্টার ঘুম থেকে ওঠে। দরজা খোলে। চোখেমুখে পানি দিয়ে বারান্দায় চেয়ারে বসে। নেয়ামত আলী এবং ছেলে জয়নালও বসে অন্য চেয়ারে।
    কি হয়েছে, বলো।

    বলব কী? এই দেখো– নেয়ামত আলী খালেক মাস্টারের হাতে খামটা দেয়। খালেক মাস্টার চিঠির খাম দেখে সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করে।– তোমার আক্কেলটা কী রকম নেয়ামত? জয়নাল তো ভার্সিটিতে পড়ে। ও কি চিঠি পড়তে পারে না? এত রাতে তুমি এসেছো–
    মাস্টার, রাগারাগি পরে করো। আগে চিঠির ভেতরের কাগজটা বের করে চোখের সামনে হারিকেনের আলোয় মেলে ধরে এবং চিঠিটির প্রতি চোখ পড়তেই খালেক মাস্টারের চোখে বিস্ময়বোধের ঢেউ আছড়ে পড়ে।
    আরে! এ যে দেখিছি উর্দু ভাষায় লেখা চিঠি!

    সে কারণেই তো তোমার কাছে আসা। বলে নেয়ামত আলী– রাতে ঘরে যাওয়ার পর তোমার ভাবী চিঠিটা দিলো। বললো, ডাক পিওন দিয়ে গেছে।
    আচ্ছা একটু অপেক্ষা করো। আমি চিঠিটা পড়ি। খালেক মাস্টার গভীর কৌতুহলে চিঠিটা পড়তে আরম্ভ কর। পড়তে পড়তে খালেক মাস্টার কখনও উত্তেজনায়, কখনও আবেগে, কখনও আর্তনাদে কেঁপে ওঠেন। চিঠিটা পড়া শেষ হওয়ার পর অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন। খালেক মাস্টারের স্তব্ধতায় বিপন্নবোধে আক্রান্ত নেয়ামত আলী এবং জয়নাল। চিঠিটা কী অশুভ সংকেতের বার্তা নিয়ে এসেছে? নাকি–
    নেয়ামত? অনেকক্ষণ পর খালেক মাস্টার কথা বলেন।
    বলো।

    আমি চিঠিটার অর্থ কাল বিকেলে স্কুলের মাঠে এলাকার লোকজন জড়ো করে পড়ে শোনাতে চাই।
    কেন? পিতা এবং পুত্রের মিলিত কণ্ঠস্বর।
    কারণ আছে। যদিও চিঠিটা এসেছে তোমার মেয়ে পারভীনের কাছে, সঠিক ঠিকানায়, সঠিক জায়গায় আর এই চিঠিটার মালিক তুমি একা নও।
    আমি নই? তাহলে কারা?

    পুরো গ্রামবাসী। আর একটু ভালো করে বললে– পুরো দেশবাসী।
    কী বলছো খালেক মাস্টার– মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।
    কালকে বিকালে স্কুলের মাঠে এস, চিঠিটা পড়লে বুঝতে পারবে। এখন বাড়ি যাও।
    কিন্তু আমার চোখে আর ঘুম আসবে না।
    কেন?
    আবেগে-উত্তেজনায়। অজানা আশংকায়–
    যাও, তোমরা যাও বাড়ি। খালেকের তাড়াহুড়োয় নেয়ামত আলী এবং জয়নাল হারিকেনের মিটমিটে আলোয় বাড়ি ফিরে আসে এক অস্থির কল্পনায় এবং যন্ত্রণায় কাঁপতে কাঁপতে।

    বোথলা হাই স্কুল। বিকেলে প্রচুর লোক জমা হয়েছে অপরিসীম কৌতূহলে। খালেক মাস্টার এলাকায় মাইকিং করিয়েছে। ছোট একটা মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে স্কুলের সামনে। স্কুলের মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ। কী এমন একটা চিঠি। যেটা পড়ে শোনাবে খালেক মাস্টার। আজগুবি সব কাণ্ডকারখানা। সকালে মাইকিং করার পর অনেকে মন্তব্য করেছে বুড়ো বয়সে লোকটাকে ভীমরতিতে পেয়েছে। কেউ বলেছে– পাগল হয়েছে। যে যাই বলুক– বোথলা স্কুলের মাঠে লোকে লোকারণ্য।

    মঞ্চের নিচে একপাশে হতবুদ্ধি নেয়ামত আলী বেঞ্চে বসা। নেয়ামত যত ব্যাপারটা জানতে চায় খালেকের কাছে, খালেক তত চেপে যায়।
    বলে– জানবে তো স্কুলের মাঠে। শোনো নেয়ামত– আমাকে বিশ্বাস করো। আমি তোমার বন্ধু, আমার দ্বারা তোমার কোনো ক্ষতি হবে না।
    খালেক মাস্টার এমন কোনো কাজ যে করবে না সে ব্যাপারে নেয়ামত নিশ্চিত। তারপরও পুরো ঘটনাটায় কেমন যেন একটা টান টান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। কী আছে চিঠিতে, কে লিখেছে, অজস্র লোকজন এসেছে নেয়ামতের কাছে, নেয়ামত কোনো উত্তর দিতে পারছে না।

    মাঠে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। একটি চিঠির মর্মার্থ শোনার জন্য একটি মাঠে এত লোক জমায়েত হতে পারে– কেউ কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু খালেক মাস্টার সেটা বাস্তবে রূপ দিয়েছে। নির্বাচনী জনসভার চেয়েও লোক সমাগম বেশি হয়েছে। লোকজন অসম্ভব এক সুশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে খালেক মাস্টারের অপেক্ষা করছে। এবং এক সময়ে সমস্ত অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে খালেক মাস্টার মঞ্চে উঠে দাঁড়ায় মাইক্রোফোনের সামনে।

    দু’টো কাশি দিয়ে খালেক মাস্টার বলে– বোথলা হাই স্কুলের মাঠে সমবেত জনতা, আজ আমি আপনাদের এই চিঠিটি পাঠ করিয়ে শোনানোর আগে, আপনাদের নিয়ে যেতে চাই তিরিশ বছর পিছনে, একটি দিনের কাছে। এখানে সমবেতদের মধ্যে অনেকেই সেই দিনটির স্মৃতির সাক্ষী হয়ে আছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে এক পাকিস্তানি আর্মি, যার নাম কাশিম রাজা, লম্বা চওড়া তাগড়া স্বাস্থ্য, গায়ের রং উজ্জ্বল, সে এসে পড়েছিল আমাদের গ্রামে। তারা সারা শরীরে ছিল কাদা মাখা, গায়ে ছিল জখম, হাঁটতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা তাকে প্রথমে পাগল মনে করে ঢিল ছুঁড়তে থাকে। ক্রমে ক্রমে লোকজন জমা হলে তাকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রকাশিত হয়ে যায়– সে পাকিস্তান আর্মির সদস্য। গ্রামের লোকজন তার বিচার করতে চেয়েছিল। সেই বিচার অনুষ্ঠানের কেউ কেউ এখানে উপস্থিত আছেন।

    খালেক মাস্টার এইখানে সূত্রধরের দায়িত্ব পালন করে। সে কেবল গ্রামবাসীর মাঝে সূত্রটা, যে সূত্র, যে অসাধারণ অসামান্য ছবিটা প্রায় ভুলে গিয়েছিল, সেটা মনে করিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বোথলা হাইস্কুলের সামনে উপস্থিত কয়েক হাজার মানুষ নিপুণ নৈপুণ্যে গাঁথা গ্রামীণ নকশিকাঁথায় সুইয়ের ফোঁড়ের মতোন গাঁথতে থাকে। স্মৃতির জানালা খুলে যায়– হ্যাঁ, তাইতো! সে তো অনেক কাল আগের কথা। মানুষের মুখে মুখে সমুদ্র সফেন ঢেউ স্মৃতির নাচন নাচে। কেউ কেউ বলে– সেই বিচারসভায় আমিও ছিলাম। কেউ বলে– আমি ছিলাম অন্যতম বিচারক। কেউ বলে আমি তখন ছোট ছিলাম, আমার মনে নেই। তবে বড় হয়ে ঘটনাটা বাবার মুখে শুনেছিলাম। একজন বলে– পারভীন ঘটনাটা বড় হয়ে আমাকে বলেছিল– কারণ আমরা স্কুলে একই ক্লাসে পড়তাম।

    কাশিম রাজা তার ব্যাটেলিয়ন সৈন্যদের সঙ্গে বোথলা গ্রাম থেকে পাঁচ মাইল দূরে, থানা ডান্ডারিয়ার ক্যাম্পে ঘুমিয়ে ছিল রাতে। রাত যখন ঠিক তিনটে, ঠিক তখনই মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়। আক্রমণে দিশেহারা পাকিস্তানী-বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। হাঁটুতে আঘাত নিয়ে দিগি¦দিক ছুটতে থাকে কাশিম রাজা। ছুটতে ছুটতে আহত ক্লান্ত আহত কাশিম রাজা বোথলা বাজারে আসে ঠিক সকালে। পথঘাট কিছু জানে না, চেনে না।

    বাজারে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর সে গ্রামের কাঁচা রাস্তায় হাঁটতে আরম্ভ করে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে। হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের মাঝখানে, বোথলা হাই স্কুলের কাছে এলে স্কুলের ছাত্ররা তাকে ঢিল ছুঁড়তে থাকে। ঢিলের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য কাশিম রাজা যখন ছুটতে আরম্ভ করে তখন গ্রামবাসীর হাতে ধরা পড়ে। বিচারে পাকিস্তানি সৈন্য হিসাবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দেয় কে কাশিম রাজাকে মারবে? কীভাবে মারবে? এই সিদ্ধান্তহীনতার পটভূমিতে উপস্থিত হয় খালেক মাস্টার। তাকে গ্রামবাসী কাশিম রাজাকে দেখিয়ে তাদের বিচারের সিদ্ধান্ত জানায়। এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি নিয়ে পরামর্শ চায়। খালেক মাস্টার বটগাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরামর্শ দেয়। সবার পছন্দ হয়ে যায় খালেক মাস্টারের পরামর্শ। সে অনুযায়ী কাজ করবার জন্য দড়ির প্রয়োজন। দড়ি নিয়ে আসে খালেক মাস্টারের ছেলে বাড়ি থেকে।

    গ্রামের সবচেয়ে শক্ত সমর্থ কয়েকজন মানুষ দড়ি নিয়ে এগিয়ে যায় কাশিম রাজার দিকে। কাশিম রাজা স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল উপস্থিত জনতার মাঝখানে, বটবৃক্ষের নিচে। এগিয়ে আসা দড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ কাশিম রাজা সামান্য দূরে হাফপ্যান্ট পরা উদোম গায়ের চার বছরের মেয়ে পারভীনকে ছোঁ মেরে কোলে তুলে নেয় এবং পারভীনের দু’গালে চুমুর পর চুমু খায়। কাশিম রাজা পারভীনকে আদর করছে আর কাঁদছে, তার চোখে জলের গভীর ধারা প্রবহমান। ঘটনার আকস্মিকতায় গ্রামবাসী বিমূঢ়। পারভীনের বাবা নেয়ামত আলী চেষ্টা করছে পারভীনকে ছাড়িয়ে নিতে। কিন্তু কাশিম রাজা ভেসে যাওয়া খড়কুটোর মতো দু’হাতে বুকের সঙ্গে জাপটে ধরে পাগলের মতো আদর করছে আর বলছে মেরী বেটি, মেরী বেটি…। জনতার মধ্যে একটা গুঞ্জন ওঠে। সবাইকে থামিয়ে খালেক মাস্টার এগিয়ে যায় কাশিম রাজার দিকে।

    খালেক মাস্টার উর্দু জানে ভালোই। সে হাত ধরে কাশিম রাজার। কথা বলে তার সঙ্গে, নিয়ে যায় একটু দূরে। কাশিম রাজা তার কথা বলে খালেক মাস্টারের কাছে। কিছুক্ষণ পর কাশিম রাজাকে সঙ্গে নিয়ে আজকের মতোই বটবৃক্ষের নিচে সমবেত জনতার সামনে দাঁড়ায় এবং বলে– প্রিয় গ্রামবাসী, নেয়ামত আলীর কন্যা পারভীন বানুকে কোলে নিয়েছে কাশিম রাজা পিতার গভীর স্নেহের অভিব্যক্তিতে। দেশে, পাকিস্তানের বেলুচিন্তান প্রদেশের গাজীপুর গ্রামে তার বাড়িতে এই পারভীন বানুর মতো একটি মেয়ে রয়েছে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে কাশিম রাজার সেই রেখে আসা মেয়েটি, যার নাম আতীয়া বানু তাকে মনে হয়েছে এবং কাশিম রাজা আমাকে বলেছে আমাদের গ্রামের মেয়ে পারভীনের চেহারার সঙ্গে নাকি আতীয়া বানুর রয়েছে অদ্ভুত মিল।

    পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য হিসাবে কাশিম রাজাকে হাতের কাছে পেয়ে গ্রামবাসীর মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহার অনল জ্বলে উঠেছিল, খালেক মাস্টারের কথায় সেখানে অপার মমতার স্রোত বইতে আরম্ভ করে। সবার মধ্যে দেড় হাজার মাইল দুরের অন্য ভাষার এই পাশবিক মানুষটির প্রতি এক ধরনের নিরুপম করুণা জন্ম হয়।

    প্রিয় গ্রামবাসী, খালেক মাস্টার কিছুক্ষণ পর আবার বলে– এই পরিস্থিতিতে আমার মনে হয় আমাদের অনেক কিছু ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। আসুন, বিচারকের মহান দায়িত্ব যাঁরা পালন করছেন, তাঁরা আবার বসুন এবং ব্যাপারটা পর্যালোচনা করুন।
    খালেক মাস্টারের কথায় বিচারকগণ আবার আলোচনায় বসে এবং গ্রামের মেয়ে পারভীন বানুর কারণে, পিতার স্নেহের গভীর প্রকাশের বিমূর্ত কষ্টকে তারাও পিতা হিসাবে অনুভব করতে পারে। শেষে গ্রামবাসী এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় কাশিম রাজাকে মারা হবে না আপাতত। সে থাকবে খালেক মাস্টারের বাড়ি। মুক্তিযোদ্ধাদের খবর দেওয়া হবে এবং তাদের হাতে কাশিম রাজাকে তুলে দেবে। ঘটনাটা ঘটেছিল যুদ্ধের প্রায় শেষের দিকে, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে।

    কাশিম রাজা খালেক মাস্টারের বাড়িতে থাকে আন্তরিক পরিবেশে। সে আপন গুণে গ্রামবাসীর সঙ্গে মিশে যায়। পারভীনকে কাঁধে নিয়ে সে মাঠে, নদীর তীরে বেড়াতে যায়। আশ্চর্য পারভীন কাশিম রাজাকে বড়বাবা বলে ডাকে। যদিও গ্রামের সব মানুষ ব্যাপারটাকে মেনে নেয় নি, ভেতরে ভেতরে নানা প্রশ্ন উঠেছে, খালেক মাস্টারকে পাকিস্তানের দালাল বলেছে, কিন্তু খালেক মাস্টার সব অতিক্রম করে একজন পিতার বুকের ভেতরে নিঃসারিত স্নেহের ধারাপাতের কাছে হেরে যায়। খালেক মাস্টারও তো পিতা।

    ইতোমধ্যে দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। গ্রামবাসী স্বাধীনতার পায়রা উড়িয়ে আনন্দ করে, উৎসব করে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় কাশিম রাজাও। আরও কয়েকদিন যাওয়ার পর কাশিম রাজাকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পৌঁছে দিয়ে গ্রামবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। যাবার সময়ে কাশিম রাজা মুক্ত মানুষ হয়েও, বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া এক আসামীর মতো পারভীনকে জড়িয়ে কেঁদেছিল। অজস্রবার সে বলেছিল– মেরী বেটি। মেরী বেটি। তোমার জন্য আমি জীবনে বেঁচে যেতে পারলাম।

    বোথলা হাই স্কুলের সামনে সমবেত জনতা স্মৃতির সমুদ্রবন্দর থেকে ফিরে আসার পর খালেক মাস্টার বলে– সেই কাশিম রাজা পারভীন বানুকে একটি চিঠি লিখেছে। আমি চিঠিটি পড়ে মনে করেছি, এই চিঠিটির মালিক আমাদের গ্রামের পারভীন বানু একা নয়, আমরা গ্রামবাসী, সর্বোপরি বাংলাদেশের প্রতিটি সুস্থ মানুষ। সে কারণে চিঠিটি পড়ে শোনাতে চাই। আর হ্যাঁ– পারভীন বানুকে চিঠিটি পরে পাঠিয়ে দেবো। সে আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় বিশ মাইল দূরে, স্বামীর বাড়িতে আছে। তো ভাই সকল, চিঠিটা কী পাঠ করব?

    হ্যাঁ হ্যাঁ– করুন– সমবেত জনতার সম্মতি পেয়ে যায় খালেক মাস্টার। আমার মা পারভীন বানু,

    দীর্ঘ তিরিশ বছরে তুমি নিশ্চয়ই আমাকে ভুলে গেছো। কিন্তু মা, আমি তোমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ থেকে নিজের জন্মভূমিতে ফিরে আসার পর এক মুহূর্তের জন্যও তোমাকে ভুলতে পারি নি। ভুলতে পারি নি সবুজ শোভিত তোমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে। তোমার পিতা, আত্মীয়স্বজন, খালেক মাস্টার, গ্রামবাসী, কাউকে ভুলতে পারি নি। চোখ বুজলেই ছবির মতোন তোমাদের অবারিত হাসি, মানবিক ব্যবহার মনে পড়ে। আমি তোমাদের কাছে দ্বিতীয় মানুষ হওয়ার সম্মান পেয়েছি। মা পারভীন বানু, প্রশ্ন করতে পারো এতদিন পর কেন চিঠি লিখছি? কেন আগে লিখি নি?

    প্রশ্নটা সঙ্গত। আমি অনেক কষ্টে দেশে, আমার জন্মভূমি পাকিস্তানে ফিরে আসি। তোমাদের গ্রামবাসী আমাকে বরিশাল জেলা প্রশাসকের হাতে তুলে দিলে, জেলা প্রশাসক আমাকে নিরাপত্তা কারাগায়ে পাঠায়। সেখানে পুরো পাঁচ মাস অমানুষিক মানবেতর জীবনযাপন করেছি। কোনো বাঙালি জেলখানায় আমার সঙ্গে কথা বলতো না। খাবার ঠিকমতো পেতাম না। আমার ভাষাটাও কেউ বুঝতো না। পাঁচ মাস এইভাবে জেলখানার নির্জন পরিবেশে কাটার পর কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে এবং আমাকে দেশে পাঠাবার ব্যবস্থা করে। দেশে আসার জন্য আমাকে কর্তৃপক্ষ তোমাদের দেশে বন্দী প্রায় নব্বই হাজার সৈন্যের মধ্যে ভিড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ থেকে বন্দী হিসাবে চলে যাই ভারতে। সেখানেও বন্দী শিবিরে থাকতে হয় প্রায় বছরখানেক। যখন দেশের মাটিতে, নিজের গ্রামে এসে পৌঁছাই তখন শারীরিক ও মানসিকভাবে আমি প্রায় পঙ্গু। আতীয়া বানু, আমার মেয়ে প্রথমে আমাকে চিনতে পারে নি। যখন আতীয়া বানু আমার বুকে এসে মাথা রাখলো আমি বন্দী শিবিরের যাবতীয় যন্ত্রণা ভুলে গেলাম এক নিমিষে। আতীয়া বানু এবং তার মা তোমার জন্য, তোমাদের গ্রামবাসীর জন্য এখনও প্রার্থনা করে নিরাকার ঐ মহাপ্রভুর কাছে। মা পারভীন বানু, চিঠি তোমাকে লিখব কী লিখব না– সেই সিদ্ধান্ত নিতেই আমার এত বছর লাগলো। হয়তো তোমার কাছে বিষয়টি ভালো লাগল না– একটি চিঠি লেখার সিদ্ধান্ত নিতে এত বছর সময় লাগে? মাগো, এইটা তো কেবল একটি চিঠি নয়– এটি একটি দলিলে রূপান্তরিত হবে তোমাদের কাছে, আমি জানি।

    একাত্তর সালে যুদ্ধের সময় ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে জানিয়েছিল যে, পূর্ব পাকিস্তান প্রতিবেশী দেশ কর্তৃক আক্রান্ত। হিন্দু সম্প্রদায় মুসলমানদের মেরে ফেলছে। এবং পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানদের সংখ্যা খুবই কম। তা ছাড়া আজ তাদের খুব দুর্দিন। এই দুঃসময়ে একজন মুসলমান সৈনিক হিসাবে তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। সে কারণে আমরা তোমাদের দেশে গিয়েছিলাম। তোমাদের দেশে না গেলে বুঝতে পারতাম না যে আমরা পাকিস্তানিরা সামরিক রঙের বাহারে, চাকচিক্যে কতটা অন্ধকারে বাস করি।

    তোমাদের দেশটাকে দেখেই আমার ভালো লাগে। এত সবুজ আমি আর কোথাও দেখি নি। যাই হোক, আমরা শহরে বন্দরে গ্রামে দেখতে পেলাম মোড়ে মোড়ে পাড়ায় মসজিদ। অধিকাংশ মানুষ মুসলমান। অন্য ধর্মাবলম্বী যারা আছে তারাও তাদের দায়িত্ববোধ নিয়ে পাশাপাশি পূর্ণ মর্যাদায় বাস করছে। বুঝতে পারলাম আমি এবং আমার মতো অনেক সাধারণ সৈনিক, ঊর্ধ্বতন সামরিক ও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিলাভকারীদের কর্তৃক বাঁধা পড়েছি। কিন্তু মা, এখানে আমি আজ একটি কথা তোমাকে, তোমার মাধ্যমে তোমাদের দেশবাসীকে জানাতে চাই, আমরা সাধারণ সৈনিকরা ছিলাম অসহায়। আমি অনেককে দেখেছি, তোমাদের উপর অত্যাচার করে এসে পরে কাঁদত। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো মানুষকে মারি নি। কারণ বুঝতে পেরেছিলাম শুরু থেকেই তোমার দেশ কোনো অন্যায় করে নি।

    আমার মেয়ে আতীয়া বানু এখন দু’সন্তানের জননী। তোমার নিশ্চয়ই বিয়ে হয়েছে? নিশ্চয়ই তুমি মা হয়েছো। অনেক দূরের দেশ থেকে আমি তোমাকে, তোমার সন্তান এবং দেশবাসীকে অভিবাদন জানাই। আমার বয়স হয়েছে, আমি অসুস্থ। চোখে তেমন দেখি না। অনেক কষ্টে, অনেক সময় নিয়ে চিঠিটা লিখছি। হয়তো বেশিদিন বাঁচব না। চিঠি লিখতে এত বছর দেরি হলো আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে। তা হলো আমি অপেক্ষায় ছিলাম, আমার দেশ দখলদার সামরিক বাহিনীর নির্মম কৃতকর্মের জন্য, তাদের অপরাধের জন্য অনুশোচনা করবে, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইবে, তারপর আমি চিঠি লিখব। তোমাদের দেশে তোমাকে দেখতে আসব। কিন্তু আমার ধারণা ভুল! আমার দেশ হয়তো কোনোদিন ক্ষমা চাইবে না। আমার ব্যক্তিগত একটা দায়িত্ববোধ, অপরাধবোধ থেকে আজ আমি পাকিস্তানের সকল যুদ্ধাপরাধীর পক্ষ থেকে তোমার এবং তোমাদের দেশবাসীর কাছে আনত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। ক্ষমা করে দিও মা। নইলে মরেও শান্তি পাব না।
    ইতি
    পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাবেক সৈনিক, কাশিম রাজা।

    Close