• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • বিশ্বজিৎ হত্যার বিচার : প্রশ্নবিদ্ধ মানবতা !

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ● 
    jamil-ahmmed-mukul-1
     
    জামিল আহম্মেদ মুকুল ●

    পুরাতন ঢাকার দর্জি শ্রমিক বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় দিয়েছে হাই কোর্ট ০৬ আগস্ট। বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় সন্তুষ্ট যেমন করতে পারেনি দেশবাসিকে তেমনি ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে হত্যার শিকার বিশ্বজিতের পরিবার। রায় ঘোষণার পর পরিবারের প্রতিক্রিয়া এবংসমগ্র রায় নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে।

    ২০১২ সালের ০৯ ডিসেম্বর বিএনপি-জামাতের অবরোধ চলাকালে পুরাতন ঢাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে পৈচাশিক কায়দায় কুপিয়ে কুপিয়ে দর্জি শ্রমিক বিশ্বজিৎ কে হত্যা করে একদল হায়েনা। এই হায়েনারা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক জোটের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগের সহযোগি ছাত্র সংগঠনের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাকর্মী। পৈচাশিক হত্যাকান্ডের ভিডিও ফুটেজ এদেশ সহ বিশ্ববাসি দেখে শিউরে উঠেছিল সেই সময়। ভিডিওটি দেখলে মানুষ মাত্রই শিউরে উঠবে কত হিংস্র হলে মানুষ এমন কাজ করতে পারে। স্বভাবতই প্রথম থেকেই আশংকা ছিল বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা হতে পারে। হয়েছেও তাই। রায় ঘোষণার পর নিহতের পরিবার ক্ষেভে- দুঃখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে।
    তারা বলেছে ‘ এবিচার তারা মানেন না ‘। পুরো মামলাটি যে শক্তিশালী মহল কর্তৃক প্রভাবিত তা দেশবাসী নিকট স্পষ্ট ; বিচারিক আদালতও কিছু বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন। মামলাটি বহুল আলোচিত। এর ভিডিও ফুটেজ সমগ্র বিশ্ববাসি দেখেছে। দেখেছে কিভাবে পিচাশরা একজন মানুষকে হত্যা করছে। আমারদের আশার -ভরসার জায়গা ছিল মামলার প্রমাণ হিসাবে এই ফুটেজ সবথেকে বড় ভূমিকা রাখবে। বিশ্বজিৎ হত্যার বিস্তারিত বিবরণ ০৯ আগস্ট ২০১২ থেকে পত্র-পত্রিকা এবং বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনের কল্যাণে দেশবাসি অবগত।
    bissojit
    আমি নতুন করে তা উল্লেখ করে পাঠকের ধৈর্য্য চ্যুতি ঘটাতে চাই না। এই রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের কর্ণধারদের নিকট আমার জিঞ্জাসা এই খুনি চক্র আপনাদের নিকট কত মূল্যবান যে, নিজেদের ইমেজ ক্ষুন্ন করে হলেও এদেরকে রক্ষা করতে হবে ? খুনি চক্র ছাড়া কি আওয়ামী লীগ অচল ? জনগনের উপর ভরসা কি একটুও নেই ? জনগনের উপর নূন্যতম ভরসা থাকলে খুনি চক্রের উপযুক্ত শাস্তির পরিবেশ যেন বিঘ্নিত না হয় তা নিশ্চিত করা ছিল সরকারের প্রধানতম কর্তব্য।
    হাই কোর্টের বিচারকদ্বয়কে নির্দেশনা দিতে হতো না এ ব্যাপারে। বিচার মানেই তো শুধু কোর্ট নয়।মামলা নথিভূক্ত হওয়ার সাথে সাথেই অপরাধ এলাকা চিহ্নিতকরণ, আসামি গ্রেফতার, সাক্ষী, ভূক্তভূগীদের জবানবন্দী গ্রহণ, তদন্ত, আইনজীবি নিয়োগ প্রতিবেন দাখিল, যুক্তিতর্ক উপস্হাপন ইত্যাদির উপর বিচারক ভিক্তি করে বিচারক তার রায় প্রদান করেন। আদালতে বেঞ্চ এবং বারের সমন্বয়ে বিচারিক কার্যক্রম চলে। বিচারপতি তথ্য প্রমানেকে ভিত্তি করে রায় প্রদান করেন।
    উপরোক্ত ধাপ সমূহে দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গ নিষ্ঠার সাথে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করলেই ন্যায় বিচার নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। প্রশ্ন হচ্ছে, এই খুনের তথ্য সংগ্রহে যে সংস্হা দায়িত্ব পালন করেছেন তারা যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছে কি না ? তারা কোনো রকম অর্থ প্রলোভন বা উপর মহলের চাপে প্রভাবিত হয়েছেন কি না ? রায় ঘোষণার সময় সম্মানিত বিচারপতিদ্বয় সেই প্রশ্ন রেখে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। ” বিশ্বজিতের লাশের সুরতহাল করার ক্ষেত্রে সূত্রাপুর থানার এস আই জাহিদুল হকের দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না সে বিষয়ে তদন্ত করে পুলিশের মহাপরিদর্শককে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাই কোর্ট। একই সাথে ময়না তদন্ত করার ক্ষেত্রে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডা. মাহফুজুর রহমানের কোনো গাফেলতি ছিল কি না তা তদন্ত করে স্বাস্হ্য সচিব, স্বাস্হ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলকে প্রতিবেদন দিতে হাই কোর্ট নির্দেশ দিয়েছেন। এই আদেশ ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না সে বিষয়ে সময়ে সময়ে প্রতিবেদন দিতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোনজিল মোরসেদকে দায়িত্ব দিয়েছেন হাই কোর্ট।
    ঘটনার বিবরণ পড়া মাত্রই পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বিচারপতি মোঃ রুহুল কুদ্দুস এবং বিচারপতি ভীস্মদেব চক্রবর্তী সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চেরও সন্দেহ রয়েছে প্রাথমিক অথচ মামলার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো কিছু একটা থাকতে পারে। আমরা যারা ভিডিও ফুটেজ দেখেছি তারাও বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি এই রায়ে। ফুটেজটিতে স্পষ্ট ভাবেই হত্যাকারীদেরকে সনাক্ত করা যাচ্ছে। আক্রমণ যে হত্যার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা।
    বিশ্বজিতের বাবা ও মা

    বিশ্বজিতের বাবা ও মা

    মামলার প্রাথমিক থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত কিরকম প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে যে গুরু পাপের জন্য লঘু দন্ডেরর রায় দিতে বাধ্য হয়েছেন বিচারকদ্বয়। বিশ্বজিৎ পেশাগত জীবনে দর্জি শ্রমিক ছিল। আমাদের দেশে দর্জিদের শ্রমিক ইউনিয়ন আছে কিন্তু বিশ্বজিতের হত্যার বিচার চেয়ে স্বোচ্চার হতে তাদেরকে দেখিনি। শ্রমিকদেরকে নিয়েও অনেক রাজনীতি হয় কিন্তু কোনো শ্রমিক সংগঠন এই পরিবারটার পাশে এসে দাঁড়াইনি। ইসলামী সমাজ ব্যবস্হা কায়েম করার রাজনীতি করেন টুপি-দাড়ি- জোব্বা পরিহিত একশ্রেণীর মানুষ। এরা ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কথা বলে, ন্যায় বিচার করার কথা বলে, কল্যাণের কথা বলে। তারাও কেউ বলেনি যে, এই পরিবারের উপর জুলুম হচ্ছে, এদের প্রতি ন্যায় বিচার করা হোক। এমন কি মহাজোটের শরীক এবং প্রধান দল যারা কিনা এই কিছু দিন আগে ছাত্রলীগের ক্যাডার বদরুল কর্তৃক খাদিজা নাম তার সাবেক প্রেমিক
    আক্রান্ত হলে যেভাবে খাদিজার পাশে দাঁড়িয়েছিল তারাও বিশ্বজিতের বেলায় নিঃস্ক্রিয়, নীরব থাকলো। সেদিন খাদিজার ঘটনার পরিণতিও এমনই হতো যদি না ক্ষমতাসীন দল আর সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ স্বোচ্চার না হতেন। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিশ্বজিতের বেলায় এমনটা ঘটেনি। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হতাম যদি কি না মনুষ্যত্বের যে শক্তি তা জাগ্রত হতো। তাহলে আমরা হয়তোবা স্বপ্ন দেখতাম অচিরেই সমাজ থেকে পশুত্বের বিনাশ ঘটবে। একটি রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের চালিকা শক্তি সরকার-বিরোধী দল,বুদ্ধিজীবি মহল, সুশীল সমাজ, টকশো শিল্পী সবাই যখন বোবা-কালা – অন্ধ হয়ে যায় তখন মনে হয় এমনই ঘটে।
    বিশ্বজিৎ কার ভাই, কোন্ ধর্মের অনুসারি, এ প্রশ্নের চেয়েও বড় হলো সে একজন মানুষ।একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের নাগরিক। একটি সভ্য রাষ্ট্রের নাগরিক তার উপর অন্যায় হলে ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করতে পারে। এই প্রত্যাশা করুণা থেকে উত্থিত নয়, এটা নেয্য। বিশ্বজিতের মা-বাবা রাষ্ট্রের নিকট অনুকম্পা চাইনি, চেয়েছিল ন্যায় বিচার। চেয়েছিল সেই সব নর পিচাশদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি যারা ভাইকে ভাইহারা, মা-বাবকে সন্তান হারা করেছে। এই পরিবারের চাওয়াটা খুব বেশি ছিল না; আমরা খুব সহজেই এদের পূরণ করতে পারতাম।
    কিছু সন্ত্রাসী টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে হত্যা করেছে, সুযোগ পেলে, পৃষ্টপোষকতা পেলে এরা আমাকে-আপনাকেও হত্যা করতে দ্বিধা করবেনা একথা নিশ্চিত করেই বলতে পারি। বিশ্বজিৎ কে হত্যার সময় টিভি ক্যামরায় সেই দৃশ্য ধারনের কথা হচ্ছে জেনেও ওরা ভীত হয়নি। সুযোগ পেলে আমাকে-আপনাকে হত্যার সময়ও এরা ভীত হবে না। কারণ এরা জানে ক্ষমতার মগডালে বসা মানুষগুলো কিভাবে যেন সব ম্যানেজ করে নেয়। ক্ষমকার পালা বদল হলে এরা প্রয়োজনে রং বদলাবে। পাঠক, পাঠক তখন কি করবেন ? আজ আমরা তামাশা দেখছি, কাল সেই তামাশার শিকার আমরাও যে হব না তার নিশ্চয়তা কোথায় ? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক বন্ধু দেখলাম লিখেছে, “বিশ্বজিতের কোপানোর দৃশ্য যখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে তখন কি খুনিদের ঘুম হয় ? ” বন্ধু, যেখানে জাতির সমগ্র বিবেক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন এসব প্রশ্ন করে কি লাভ ! ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে কর্মীর কি এতোই অভাব দেখা দিয়েছে যে, যেন তেন করেই হোক খুনিদেরকে রক্ষা করতে হবে ? বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার হাই কোর্টের দেওয়া রায় এবং নির্দেশনা পড়ে আমার সে রকমই মনে হয়েছে।
    লেখক  সম্পাদক, ফাস্ট বিডি নিউজ ২৪.কম
    jamilmukul365@gmail.com
    http://fastbdnews24.com
    Close