• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • ভৈরব এখন নিরব!!

    ভৈরব এখন নিরব!!

                                            ————–খালেদ সাইফুল্লাহ

    IMG_20160727_105121

    ”আমাদের বাংলাদেশে ৫৭ টি আন্তর্জতিক নদী প্রবেশ করেছে। যার মধ্যে ৫৪ টি আন্তঃনদীর ই উৎপত্তি ভারতে। এই ৫৭ টি নদী আবার ২৩০ টি নদীতে বিভক্ত হয়েছে। তবে আশ্চর্যজনক হলেও দুঃখের বিষয় এই যে, ভারত বাংলাদেশে প্রবেশকৃত ৫৪ টি আন্তঃনদীর মধ্যে ৪৭ টি নদীতেই ইতিমধ্যে বাঁধ দিয়ে ফেলেছে।” লিখেছেন-  খালেদ সাইফুল্লাহ

    নদীমাতৃক বাংলাদেশ। বাঙালিদেরকে বলা হয়ে থাকে মাছে ভাতে বাঙালি। কিন্তু দিন দিন ভাতের পরিমান বৃদ্ধি পেলেও বাঙালিরা ভুলে যেতে শুরু করেছে অনেক মাছের অস্তিত্বের কথাও। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়ত অনেক মাছের নামও জানবে না। কারন একে একে যেভাবে বিলুপ্ত হতে চলেছে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো তাতে এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। দেশের নদ নদীগুলো বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে যেসব কারন আমরা দেখতে পাই তার ভেতরে প্রধান ও অন্যতম কারনগুলোর মধ্যে প্রথম ও প্রধান কারন হিসেবে আমরা দেখতে পাই ভারতের একচেটিয়াভাবে নদীতে বাঁধ দেওয়ার নীতি। বলা হয়ে থাকে প্রাকৃতিক নদীর গতিরোধ পরিবেশের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। কিভাবে প্রভাব ফেলে তা জানতে চাইলে আমরা দেখতে পাই যে, যখনি কোনো নদীতে বাঁধ দিয়ে বা অন্য কোনো ভাবে তার গতিরোধ করা হয়ে থাকে তখন সেখানে নদীর স্রোত বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে নদীর পানির গতি কমে যাওয়ায় সেখান দিয়ে পানি পার হতে পারলেও পার হয় না পানির সাথে মিশ্রিত ময়লা আবর্জনা, বর্জ্র পদার্থ আর পলিসমূহ। ফলে সেখানেই পলি জমে গিয়ে একসময় নদী যায় ভরাট হয়ে। ফলে সেখানকার জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব বিলীন হতে শুরু করে। এরপর এসে জমা হয় যতরকমের সব ময়লা আবর্জনা। যা একসময় পচে-গলে দূর্গন্ধ হয়ে দূষিত করে ফেলে সমস্ত এলাকার পরিবেশ। এবং তা একসময় ছড়িয়ে পড়ে মাইলের পর মাইল।
    তবে আমরা জানি যে, বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর অধিকাংশেরই উৎপত্তি ভারতে। আমাদের বাংলাদেশে ৫৭ টি আন্তর্জতিক নদী প্রবেশ করেছে। যার মধ্যে ৫৪ টি আন্তঃ নদীর ই উৎপত্তি ভারতে। এই ৫৭ টি নদী আবার ২৩০ টি নদীতে বিভক্ত হয়েছে। তবে আশ্চর্যজনক হলেও দুঃখের বিষয় এই যে, ভারত বাংলাদেশে প্রবেশকৃত ৫৪ টি আন্তঃনদীর মধ্যে ৪৭ টি নদীতেই ইতিমধ্যে বাঁধ দিয়ে ফেলেছে। এসব নদী থেকে ভারত একচেটিয়াভাবে পানি প্রত্যাহার করে নিতে শুরু করেছে। ফলে দেশের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সহ সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষিকাজসহ বিঘ্নিত হচ্ছে যাতায়াত ব্যাবস্থাও। এর প্রভাব প্রতিফলিত হচ্ছে দেশের অর্থনীতির উপর। কারন দেশের অর্থনীতি বলতে গেলে প্রায় সম্পূর্ণরূপেই কৃষির উপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে শিল্প-বানিজ্যের অগ্রসরে যাতায়াত ব্যাবস’া অত্যন্ত গুরূত্বপূর্ণ। আর নদীপথে পণ্যপরিবহনে ব্যায় যেহেতু অনেক কম সুতরাং মালামাল পরিবহনে নদীপথের ব্যাবহার বাড়াতে পারলে শিল্পক্ষেত্রে ব্যায় অনেক কমে আসবে। তাই বলা যায় নদী শুকিয়ে যাওয়ার ফলে একদিকে যেমন কৃষিকাজ বিঘ্নিত হওয়ায় কৃষিক্ষেত্র হতে প্রাপ্ত আয়ের পরিমান কমে যাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি যাতায়াত ব্যাবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার ফলে শিল্প ক্ষেত্রেও আমাদের আয় অনেক কমে যাচ্ছে। ফলে উভয় দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা। বাংলাদেশের এসব ক্ষয়ক্ষতির কথা জেনেও থেমে নেই ভারতের বাঁধ দেওয়ার প্রবনতা। গঙ্গা, বহ্মপুত্র, তিস্তা, দুধকুমার, ধরলা ও মহানন্দাসহ হিমালয় অঞ্চলের বিভিন্ন নদী ও উপনদীতেই ভারত ইতিমধ্যে ৫০০ টির মত বাঁধ তৈরী করেছে। ভারতের আলোড়ন সৃষ্টিকারি কয়েকটি বাঁধের নাম সকলেরই জানা। তিস্তা ব্যারাজ, টিপাইমুখ বাঁধ, ফারাক্কা বাঁধ প্রভৃতি সব নাম শুনলেই এখন বাংলাদেশের মানুষ আতকে উঠে। যাই হোক ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়াটা অপ্রাসঙ্গিক। এখন দেখা যাক কি কারনে এতক্ষন যাবত অপ্রয়োজনীয় কথা বলা।
    খুব বেশি দূরে যেতে হবে না একবার তাকিয়ে দেখুন ভৈরবের দিকে। ফারাক্কা বাঁধ দ্বারা ভারতের একতরফা পানি শোষণ নীতির কারনে ভৈরব নদের অবস্থা করুন আকার ধারন করেছে। ভৈরব দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান, বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ নদী । নদী নয় নদ। বাংলাদেশের মোট চারটি নদের মধ্যে অন্যতম একটি ভৈরব। যশোরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদ দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ও তীর্থ নদ যার তীরে এক সময় আর্য সভ্যতা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। যদিও এখনকার সময়ে তা বিশ্বাস করে ওঠা খুবই কঠিন ব্যাপার। দুর থেকে নয় কাছ থেকে দেখলেও মনে হয় যেন কোন বিস্তির্ণ খেলার মাঠ। বিভিন্ন কলকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে বদলে গেছে নদের আসল রূপ। ক্রমাগত দখল হচ্ছে নদের দুই পাড়ও। ভৈরব তীরবর্তী জনপদগুলো হল মেহেরপুর, দামুড়হুদা, চুয়াডাঙ্গা, কোটচাঁদপুর, চৌগাছা, বারবাজার, যশোর, বসুন্দিয়া, নওয়াপাড়া, ফুলতলা, দৌলতপুর, খুলনা ও বাগেরহাট। এসকল স্থানের মধ্যে যশোরের বসুন্ধিয়া থেকে শুরু করে নওয়াপাড়া, খুলনা ও বাগেরহাটের মধ্যে নদের অস্তিত্ব কিছুটা উপলব্ধি করা যায়। এসব জায়গাগুলোতে এখনো ছোটখাটো নৌযান চলাচল করতে পারে। খুলনা থেকে নওয়াপাড়া পর্যন্ত মালামাল পরিবহনে এখনো ভৈরব নদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে থাকে। তবুও নওয়াপাড়া অঞ্চলে দিন দিন কলকারখানার ক্রমবিকাশ হওয়ার কারনে এখানকার নদ দখল হতে হতে অনেকটা সংকুচিত হয়ে এসেছে। এছাড়াও এসব কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্র নদের ভেতরে ফেলার কারনে নদের গভীরতাও অনেক কমে এসেছে। ফলে আগের তুলনায় এখন আর ভৈরব নদকে ব্যাবহার করে পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।
    এখন দেখা যাক ভৈরবের উৎপত্তি নিয়ে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য।দক্ষিণ বঙ্গের বড় নদীগুলো অধিকাংশই দক্ষিণমুখী কিন্তু ভৈরবের ক্ষেত্রে ভিন্ন। সুতরাং ভৈরব নদের সম্মেলন হয়েছে বহু নদীর সাথে। ফলে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নদীতে আত্মবিসর্জন দিতে দিতে ভৈরব নিজেই সংকুচিত হয়ে যায়। এটা গঙ্গানদী থেকে উৎপন্ন হয়ে বৃহত্তর যশোর জেলার মাঝামাঝি এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খুলনার বালেশ্বর নদীতে পতিত হয়েছে। নদীটি মালদহের মধ্য দিয়ে এসে শ্রুতকীর্তি-মাহানন্দা যেখানে পদ্মায় পড়েছে তার অপরদিকের নদীই ভৈরব নাম ধারণ করে বের হয়েছে। অনেকদূর অতিক্রম করে এটা পদ্মার অন্য একটা দক্ষিণবাহী শাখা মাথাভাঙ্গার সাথে মিশে যায়। পরে ভৈরব মাথাভাঙ্গা হতে বিচ্যুত হয়ে যশোরে প্রবেশ করে। এটা কোটচাঁদপুর পর্যন্ত এসে দক্ষিণমুখী হয়েছে। ৫/৭ মাইল এসে চৌগাছার উত্তরে তাহিরপুর নমক স্থানে ভৈরব দক্ষিণ দিকে কপোতাক্ষ নদের শাখা ত্যাগ করে নিজে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে। উভয় নদ এ স্থান থেকে অগ্রসর হয়ে ক্রমশ প্রবল আকার ধারণ করেছিল। মেহেরপুর থেকে কালীগঞ্জ হয়ে যশোর ও অভয়নগর অংশে এই নদ ভৈরব নাম ধারণ করলেও নওয়াপাড়া-বাগেরহাট পার হয়ে খুলনা অংশে রূপসা নাম ধারণ করেছে এবং বঙ্গোপসাগরে মিলিত হবার আগে এর নাম হয়েছে শিবসা। একসময় ভৈরবের কোথাও কোথাও প্রশস্ততা ছিল প্রায় এক কিলোমিটার থেকে দেড় কিলোমিটার। তবে বর্তমানে তা মাত্র ১৫/২০ ফুটে এসে ঠেকেছে। ভৈরব এক সময় বৃহত্তর যশোরের প্রধান নদী হিসাবে পরিগনিত হতো। কিন’ বিগত শতাব্দীর বেশী সময় ধরে নদটির ক্রমাবনতি হতে থাকে। পলি জমার কারণে ১৭৯০ সালের দিকে এর প্রধান গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে তাহিরপুরের কাছে কপোতাক্ষ নদের সাথে মিশে যায়। ১৭৯৪ সালে জেলার কালেক্টর প্রণীত প্রতিবেদনে তাহিরপুরের কাছে চর সৃষ্টির উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ ছিল যে, শুকনো মৌসুমে নদটিতে পানির অভাবের করণে যশোর জেলার উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হয়। মূলত অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে তাহিরপুর থেকে যশোর শহর পর্যস্ত নদীতে পলি জমে মুখ বন্ধ হতে থাকে। গ্রীষ্মকালে এটা কয়েকটি সারিবদ্ধ জলাশয়ে পরিনত হয়। কিন্তু তখনো ভৈরবে স্রোত প্রবাহিত হতো। তবে নদের নব্যতা একেবারেই কমে গিয়েছিল। একারনে নদীতে কচুরিপনা আর নানা প্রকার জলজ আগাছা জন্মে নদের পরিবেশ একেবারেই বিনষ্ট করে দেয়। জলজ আগাছার ভেতর দিয়ে তখনো অতিকষ্টে দুই-একটি নৌকা কোনমতে যাতায়াত করতো। ব্রিটিশ সরকার ১৮৭২ সালে ভৈরব নদের উৎসমুখ তাহিরপুরে চিনিকল নির্মাণ করে বর্জ্য নিষ্কাশন এবং পানি সরবরাহের জন্য ভৈরব নদ ব্যবহার করতো। ভৈরবের উৎসমুখে বাঁধ নির্মানের ফলে ভৈরব ক্রমে একটি মরা নদীতে পরিনত হয়।এরপর থেকে শুরু হয় ভৈরব নদ দখলের প্রতিযোগিতা। ৭১ সালে স্বাধীনতার পূর্বে যদিও ভৈরব নদ শুকিয়ে গিয়েছিল তবুও তখন নদ দখলের তেমন কোন প্রবনতা ছিল না। স্‌্বাধীনতার পর থেকেই শুরু হয় একচেটিয়াভাবে ভৈরব নদ দখলের প্রতিযোগিতা। দিন দিন মেহেরপুর, যশোর, নোওয়াপাড়া, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চল শিল্প-কারখানায় সমৃদ্ধ হতে থাকে সেই সাথে বাড়তে থাকে ভৈরব নদের উপর অত্যাচার। একদিকে নদের নাব্যতা হ্রাস অন্যদিকে দখলের ফলে নদের প্রশস্ততার সংকোচন। প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে নদ দখল করে নির্মান করেছে বিশাল বিশাল ইমারত, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ব্যবসাকেন্দ্র। নদের স্বাভাবিক পানি প্রবাহের পরবিশে একেবারেই নইে । সমস্ত জায়গাতেই ভরে গেছে আগাছা আর কচুরিপনা। ফলে ভৈরব নদকে দেখলেই মনে হয় যেন বিরাট কোন প্লেগ্রাউন্ড। তবে অন্যান্য স্থানের থেকে নওয়াপাড়ার চিত্র একটু ভিন্ন। কারন, নওয়াপাড়া থেকে খুলনা পর্যন্ত এখনো কিছুটা হলেও ভৈরব নদ যাতায়াতের উপযোগী রয়েছে। তাই এখানে নদ দখলের পদ্ধতিটা একটু ভিন্ন রকমের। ভৈরবের দুই তীর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ছোট-বড় শতাধিক কারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। এসব কারখারনার বর্জ্য সরাসরি পড়ছে নদে। এতে নদের পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি মাছ বিলুপ্ত হতে চলেছে। দূষণের কারণে গত ৩৫ বছরে নদের প্রায় ১৫ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এছাড়ার যশোর অঞ্চলে নদ থেকে প্রায় ৫০ প্রজাতির মাছ হারিয়ে গেছে। ১৯৭৯ সালে নওয়াপাড়া উপজেলার তালতলায় ভৈরবের তীরে এসএফ ইন্ডাস্ট্রিজ নামে একটি ট্যানারি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে ট্যানারিটি প্রতিদিন ৬০০ লিটার ক্ষতিকর ধাতু ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়াম মিশ্রিত বর্জ্য সরাসরি ভৈরব নদে ফেলছে। এছাড়া খুলনার ফুলতলা উপজেলার উত্তর ডিহি গ্রামে ভৈরব নদের তীরে আরেকটি ট্যানারি নির্মানের কাজ চলছে। তবে শহর ও শিল্পাঞ্চলে বিশাল আকৃতির বহুতল ভবন, ক্লিনিক, রেস্তরা, শপিং মল, ব্যবসাকেন্দ্র এবং কলকারখানা নির্মানের মাধ্যমে নদ দখল করা হলেও গ্রামাঞ্চলে নদ দখলের চিত্র সম্পূর্ন ভিন্ন রকমের। গ্রামাঞ্চলে প্রভাবশালী মহল প্রশাসনের নাম ভাঙ্গিয়ে নদের ভেতরে বাধ দিয়ে পুকুর তৈরী করে সেখানে চাষ করছে নানান প্রজাতির মাছ। ফলে বর্ষাকালে নদীতে যে সামান্য নব্যতা ফিরে আসার কথা তাও আর আসছে না। এছাড়াও নদের দুই তীরে চলছে বোরো ধান সহ বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ। প্রশাসনের চোখের সামনে এধরনের দখল প্রতিযোগিতা চললেও প্রশাসন সব ক্ষেত্রেই নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংগঠন ও সচেতন মহলের প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে প্রশাসন এর বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহন করলেও তা শুধুমাত্র উদ্যোগের ভেতরেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এর বাইরে কোনো ধরনের বাস্তবায়ন প্রশাসন আজও দেখাতে পারেনি বললেই চলে।IMG_20160725_111959
    এদিকে ভৈরব নদ শুকিয়ে ডাস্টবিনে পরিনত হওয়ায় দূষিত হচ্ছে যশোর শহরের স্বাভাবিক পরিবেশ। শহরের সমস্ত ময়লা আবর্জনা এসে ভৈরবের ভেতরে পড়ায় ভৈরবের পরিবেশ এখন পঁচা নর্দমার চাইতেও জঘন্য আকার ধারন করেছে। যশোর শহর এবং ভৈরব নদ তীরবর্তী এলাকাসমূহকে দূষন এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে হলে এখন প্রয়োজন নদ সংস্কার ও পুনঃখনন করা। শুধু এখন নয় বিগত কয়েক দশক ধরেই দক্ষিনাঞ্চলবাসীরা এর তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। তবে সরকার ও প্রশাসন এ ব্যাপারে সম্পূর্ন অনড় ভুমিকা পালন করছে। এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনসহ সচেতন মহলে নানা ধরনের দাবি-দাওয়া উত্থাপিত হয়েছে বহুসময়, বহুবার। এর প্রেক্ষিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিবারই উদ্যোগ গ্রহনের আশা এবং সঙ্গে অভয় দিয়ে সকলকে ঠান্ডা করে রাখা হয়েছে। তবে আজও পর্যন্ত এ উদ্যোগ শুধু উদ্যোগই থেকে গিয়েছে। কখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখতে সক্ষম হয়নি। প্রশাসনের ধীরগতির ফলেই আজকের ভৈরব নদ বিলুপ্তির পথে চলেছে বললে ভুল হবে না। তাই ভৈরব নদ ধ্বংসের জন্য আমাদের প্রতিবেশী এবং বন্ধুবেশী রাষ্ট্র ভারতের সাথে সাথে আমাদের সরকার ও প্রশাসনকে অনেকাংশেই দায়ী করা চলে। প্রশাসন যথাযথ উদ্যোগ গ্রহন করলে ভৈরবের প্রবাহ কিছুটা হলেও ধরে রাখা যেত। যশোর সদর, চৌগাছা ও ঝিানাইদহ জেলার কালীগঞ্জসহ উজান এলাকার ৫০ হাজার ৫শ ২০ হেক্টর জমির পানি নিষ্কাশনের একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে ভৈরব নদ।
    কিন’ খননের অভাবে ভৈরবের পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা একেবারেই লোপ পাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে এসব অঞ্চলে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। যা বর্ষা মৌসুমের ফসল উৎপাদন ব্যাহত করছে। একদিকে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা অন্যদিকে শুকনা মৌসুমে কৃষিকাজের জন্য পানির তীব্র সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। যা ভৈরব তীরবর্তী এলাকাসমূহের শস্য উৎপাদনের উপর এক ভয়াবহ সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। ভৈরব পুনঃখননের অভাবে শুধু যশোর অংশেই ৫০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। যার ফলে এ অঞ্চলের কৃষকরা প্রতি বছর প্রায় পঞ্চাশ হাজার মেট্রিক টনের বেশি খাদ্যশষ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য অন্তঃত ৬০ কোটি টাকা। ভৈরব নদ পুনঃখনন করতে পারলে এতদঃঅঞ্চলের অন্ততঃ ৫০ হাজার হক্টের জমরি ফসল উৎপাদনরে পথ সুগম হবে। এছাড়াও নদ ভরাট হওয়ার কারনে বেকার হয়ে যাওয়া প্রায় পঞ্চাশ হাজার জেলে পরিবারের কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা হবে ভৈরব নদ খনন করতে পারলে।
    যশোরের প্রাণকেন্দ্র দিয়ে বয়ে চলা ভৈরব নদকে সামান্যতম হলেও প্রবহমান রেখে এর চারিদিকের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে পারলে যশোর শহরের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রাকৃতিক আরও সুন্দর ও স্বাস’কর হয়ে উঠবে। আমরা একটু লক্ষ করলেই দেখতে পাই লন্ডনের মত শহরের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ এবং উন্নতি সবই হয়েছে টেমস নদীকে কেন্দ্র করেই। ওয়াশিংটন ডি.সি.’র মত শহর উন্নত হয়েছে পোটোম্যাক নদীকে কেন্দ্র করে। এছাড়াও পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত শহর উন্নতি লাভ করেছে কোনো না কোনো নদীর কল্যানে। এমনকি আমাদের ঢাকাও উন্নত হয়েছে বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে। তেমনিভাবে যশোরেরও উৎপত্তি হয়েছিল ভৈরবকে কেন্দ্র করে। কিন্তু আমাদের দোষেই ভৈরব যশোরকে পঁচা দুর্গন্ধ আর নোংরা পরিবেশ ছাড়া কিছুই দিতে পারিনি। ভৈরব নদকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে যশোরও হয়ত একসময় উন্নত থেকে উন্নততর শহরে পরিনত হত। তাই ভৈরবকে দখল আর দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে সবার আগে প্রয়োজন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ। প্রথমেই সকল অবৈধ দখলকারীকে ভৈরবের বুক থেকে হঠাতে হবে। এরপর কলকারখানার সকল বর্জ্য ব্যাবস্থাপনা নিয়ন্ত্রনে আনতে হবে। অতঃপর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ খননের ব্যাবস্থা গ্রহন করতে হবে। তবেই মৃত ভৈরবের বুকে আবারও শুরু হবে পানির প্রবাহ। আবারও জীবিকা অর্জনের পথ খুজে পাবে ৫০ হাজারেরও বেশি জেলে পরিবার। রক্ষা হবে যশোর অঞ্চলের জীব বৈচিত্র। ভৈরবের বুকে চলতে শুরু করবে ছোট ছোট নৌকা। নিয়মিত আসবে জোয়ার ভাটা। যা যশোর শহরকে এক অন্যরকম চিত্রে চিত্রায়িত করবে। সেইসাথে আশপাশের এলাকাগুলোর কৃষিকাজে আবারও প্রান ফিরে আসবে। ভৈরবের স্রোতে ভেসে চলে যাবে যশোরবাসীর সকল দুঃখ দূর্দশা। নতুন স্রোতের সাথে আবারও যশোরবাসী ফিরে পাবে নতুন প্রানচাঞ্চল্য।

                                                                                   লেখক: ছাত্র, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪. কম

    ksjewelkhan@gmail.com

    Close