• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • মৌনতা || সুরাইয়া হেনা

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●

    Suraia Hena eid 2017

    সুরাইয়া হেনা ● আজ জয়িতার বিয়ে| সারা বাড়ি জুরে হইচই | শান্তিতে দুদন্ড কোথাও দাড়ানোর সময় নেই কারো|তবে ব্যস্ততা নেই শুধু পুলকের|গত তিনদিন যাবৎ বিছানায় পড়ে আছে বেচারা|জ্বর বাঁধিয়েছে|জয়িতা সুযোগ পেলেই সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে দৌড়ে যায় পুলকের ঘরে| জলপট্টির কাপড়টা নতুন করে ভিজিয়ে আবার কপালের উপর রেখে দেয়| বুকে হাত রেখে শরীরের উত্তাপ মাপে|ওর দুহাতের মুঠোয় পুলকের হাত চেপে কেঁদে বুক ভাসায়|কেমন ছোট্ট শিশুটির মত ঠোঁট উল্টে কাঁদো স্বরে বলে “আমি গেলে তোর একটুও বুঝি কষ্ট লাগবে নারে! আমি চলে যাচ্ছি আর তোর কোনো দিক নেই|চুপচাপ পরে আছিস বিছানায়| জ্বর তো সব বাহানা|আমি যেনো কিচ্ছুটি বুঝিনা |বাবাকে বলনা আমায় ওতোদূরে না পাঠাক|”

    পুলক নিরবে শোনে, কিছু বলেনা| হাসার চেষ্টা করে|ওই মরা হাসিতে ওকে আরো বেশি রোগা লাগে|জয়িতার অভিমান গাঢ় হয় |আঁচলে মুখ চেপে বলে “তুই কথা না বললে আসবো না তোর ঘরে|এমনিতেই তো আর দেখতে পাবিনা”|পুলক উঠে বসে| খাটের পাশেই রাখা বেত নিয়ে বারি লাগায় জয়িতার হাতে|জয়িতা প্রতিবারের মত আজ আর চেঁচায় না|শুধু মুখের ওপর থেকে আঁচল সরিয়ে তাকায়|পুলক একটা নীল রংয়া শাড়ি বাড়িয়ে দেয় জয়িতার দিকে|

    নিষ্প্রাণ কন্ঠে বলে “কিছুই তো আর দেয়ার সামর্থ্য নেই,এটাই রেখে দে|” জয়িতা অবাক চোখে তাকায় শাড়িটার দিকে|মাস তিনেক আগেই মেলা থেকে দুজনে মিলে কিনেছিলো শাড়িটা,শঙ্খীর জন্য|পুলক কত যত্নে রেখেছিলো শাড়িটা!কতদিন আড়াল থেকে দেখেছে পুলক শাড়িটা বুকে জরিয়ে ঘুমায়|নদীর পাড়ে কতবার শাড়িটা নিয়ে ওরা অপেক্ষা করেছে শঙ্খীর জন্য!শঙ্খী আসেনি কখনো |তবুও পুলক যত্ন করে রেখেছে শাড়িটা |

    আর আজ এটা দিয়ে দিচ্ছে ওকে!পুলক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে- “শঙ্খী তো আসেনা কখনো, হয়তো আর আসবেও না|এতো কষ্টে জমানো টাকা!পরে পরে নষ্ট হবে শাড়িটা|তার থেকে তুই রেখে দে|মাঝে মাঝে পড়বি,জামাইমশাই আদর করে তখন নীল পরী ডাকবে তোকে|” পুলকের কথা শেষ হতেই শাড়ি হাতে ছুটে পালায় জয়িতা|পুলক চেয়ে থাকে দরজার দিকে|নিঃশব্দে আরো কিছু দীর্ঘশ্বাস মিশে যায় বাতাসে| . . জয়িতা এ বাড়ি নিস্তব্ধতার আঁধারে পূর্ণ করে আলো করতে গেছে অন্য এক ঘর,অন্য এক পরিবার|

    এখন এ বাড়ির কোথাও আর নূপুরের রুনঝুন শব্দ শোনা যায় না|কারো চুড়ির রিনরিনে শব্দ আর বাজে না কানের কাছে|অট্টহাসিতে কেউ আর ঘর কাঁপায় না|অস্বস্তি লাগে পুলকের|এতো নিরবতা সহ্য করার ক্ষমতা নেই যে!নিজের অন্ধকার ভরা ছোট্ট ঘরটায় বসে ভাবতে থাকে ও| শুরু থেকে|ঠিক সেদিন থেকে যেদিন বাবার চিঠি হাতে প্রথম এ বাড়িতে আসে,ভালো কলেজে পড়বে বলে|বড় কাকু আর কাকীমা কি অসাধারণ মানুষ!ভেবে ভেবে মুগ্ধ হওয়াটা দিন দিন শুধু বেড়েছেই|আর তাদের একমাত্র কন্যা জয়িতা!স্রষ্টা কোনো অজানা কারণে এক আকাশসম চঞ্চলতা দিয়ে পাঠিয়েছে মেয়েটাকে|বাবা,মা,দিদি আর পুরনো সব বন্ধুদের থেকে দূরে থাকার কষ্টটা কত বেশি হতো এ মেয়েটা না থাকলে তা ভাবতেও পারে না ও|

    সেরা বন্ধুটি হয়ে সবসময়ই ওর পাশে ছিলো জয়িতা|হইহই রইরই করে মাতিয়ে রাখতো বাড়িটা|আর আজ!চারিদিকে শুধু নিরবতা আর নিরবতা |দু ঘর পরে কাকু- কাকীমার ঘর|ওখানে ফেলা তাদের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ যেনো এখান থেকেই স্পষ্ট শোনে পুলক|আর ভাবে ওর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ তারা শুনে ফেলে নাতো! . . স্বামী,শ্বশুর, শ্বাশুড়ী আরো একদল নতুন সদস্যদের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে খুব বেশি কষ্ট হয়না জয়িতার| খুব সহজেই সবার প্রিয় মানুষটি হয়ে ওঠার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে মেয়েটার|এ বাড়ির সবার মুখে মুখে এখন শুধু ছোট বউ আর ছোট বউ|জয়িতাও মেতে থাকে এ ব্যস্ততায় হাসি মুখে|তবে,তাতো সবার চোখে|আড়ালের গল্পগুলো বোঝে,কার সাধ্য আছে!খুব যত্নে যে লুকিয়ে রেখেছে ও|যেমনি খুব যত্নে তুলে রেখেছে পুলকের দেয়া নীল রংয়া শাড়িটা! .

    মাঝে মাঝেই ভাবে জয়িতা,প্রথম প্রেমে পড়ার সবটা নিয়ে|পুলক!কি অদ্ভুত এক ছেলে!ওমন শক্ত চাহুনীর কারো মনে প্রেম থাকতে পারে! অবাকই লাগে ওর ভাবলে|চাহুনীর মতই শক্ত কথা বলে|মায়ার বালাই নেই ভেতরে|তবুও কেমন এক স্বচ্ছ জলের মায়া পুকুর ঠেকতো জয়িতার কাছে ওকে|যে পুকুরের জলে ঢুবে ঢুবে প্রায় মরণ হাল ওর|তবে পুলকের সবটা জুরে ছিলো শঙ্খী| ওর সেই কবিতা মানবী|ওমন আবেগী শব্দে জড়ানো কবিতা কি করে লিখতো ছেলেটা!কি দারুন কৌশলে শব্দে ছুঁয়ে দিতো শঙ্খীকে ও|জয়িতা পড়তো আর অবাক হতো |ঈর্ষার সবটুকু হৃদয়ের কোণেই পড়ে রইতো|এক হাতে কবিতায় ঠাসা খাতা আর আরেক হাতে পুলকের গাল টেনে ডানে বায়ে নাড়িয়ে বলতো- “এতো প্রেম তোর কোনখানে লুকিয়ে রাখিস বলতো?”

    পুলক কোনো কথা বলতো না,মুচকি হাসতো|ওমন শক্ত চাহুনীর মানুষ হাসলে বড় অদ্ভুত লাগে|সুখ,দুঃখের গুলিয়ে যাওয়া মিশ্র অনুভূতির মতন| জয়িতা প্রতিবারই পুলকের সাথে নদীর পাড়ে যেতো শঙ্খীকে দেখবে বলে|”যদি ও আমার থেকে খুব বেশি সুন্দর হয়!” এই ভেবে লজ্জা পেতো|যদিও চোখে মুখে একঝাঁক উচ্ছলতা ছড়িয়ে রাখতো|পুলক বরাবরের মতই ভাবলেশহীন ভাবে বসে রইতো|যেনো ও খুব ভালো করেই জানে এ অপেক্ষা ফুরাবার নয়| ‘একটা মেয়ের আসলেই কি এতোটা অভিমানী হওয়ার ক্ষমতা থাকে!’-এই নিয়েও ভাবনার শেষ থাকতো না জয়িতার|

    ওরা অপেক্ষা করেই যেতো,দিনের পর পর দিন|শঙ্খী আসতো না|পুলক একের পর এক সিগারেট পোড়াতো| জয়িতা দীর্ঘশ্বাস ফেলতো|নদীর বুকে হালকা ঢেউয়ে ভেসে থাকা দুজনের ছায়া দেখে ভাবতো – জলের বুকের ওই ছায়ামানবীই যদি শঙ্খী হতো!! . . শঙ্খীর অনুপস্থিতি যেমন পুলকের জীবন থামায়নি,তেমনি পুলকের অনুপস্থিতি থামায়নি জয়িতার জীবন| জীবন স্রষ্টার লিখে দেয়া নিয়মেই চলেছে রোজ|এক এক করে ওদের পৃথিবীতে কাটানো দিনের সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে হতাশা আর দীর্ঘশ্বাসের পরিমাণ| -বাড়িতে এসেই দীর্ঘশ্বাস পড়লো জয়িতার|

    আজ এতো দিন পর ও এ বাড়িতে আসছে জেনেও পুলক কোথায় গিয়ে পড়ে আছে?এ বাড়িতে থাকাকালীন ওর কাছের কেউ,বন্ধু,আত্মার আত্মীয় সবই তো ছিলো ও|এ কয়েক দিনের দূরে থাকাতেই ভুলে গেলো এতো সহজেই! অভিমানের ঝোলা তুলে জয়িতা বাড়ির বাহিরে পা ছোটায় পুলককে খুঁজতে | . পুলক নদীর পাড়ে বসে আছে| শঙ্খীর সাথে দেখা হবে আজ|কতদিন পর!ওর ভাবলেশহীন চাহুনী দেখে বোঝার উপায় নেই আজ ও কতটা খুশি |

    যেমনটা শঙ্খী কাছে থেকেও বুঝতে পারেনি কখনো ওকে|শুধু অভিমান করেছে|অভিমানী মেয়েটার অভিমান যে আজ আকাশ ছোঁবে তা খুব ভালো করেই জানে ও|ভাবতে ভাবতেই নদীর জলে ওর ছায়ার পাশে সঙ্গ দেয় এক ছায়ামানবী|গাঢ় নীল শাড়ি গায়ে জড়ানো |মাথায় আলতো করে ঘোমটা টানা |ওর সামনে আসতে ঘোমটা দিতে হবে কেন শঙ্খীকে? একি অভিমান তুলে ধরার নতুন কোনো উপায় নাকি!খোলা চুলে কি দারুনই না লাগে ওকে|যদিও ভালোই হয়েছে |বেহায়া বাতাস আজ আর ওর চুল ছোঁয়ার সুযোগ পাবেনা |এসব ভেবে হাসির রেখা ফোঁটে ওর ঠোঁটের কোণে | জলের ছায়া চুপ করে রইলেও মানবী কথার তীর ছোড়ে -“শঙ্ক্খীর আজ আসার কথা বুঝি!এই জন্যই আমি আসলাম এই নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তোর!কি আছে ওই মেয়েতে? আজ আমি দেখেই যাবো|”

    পুলক কিছু বলে না,মুচকি হাসে|ওই ম্লান হাসিতে ওকে বড় বেশি বিষণ্ণ লাগে| জয়িতার দিকে মুখ ফেরানোর সাহস পায় না ও|জলের দিকে তাকিয়ে আনমনে ভেবে যায়- “বোকা মেয়ে|এতবার শঙ্খীকে দেখতে এলি|নদীর জলে আমার পাশের ছায়া মানবীকে দেখলে কি এমন ক্ষতি হয়ে যেতো! দিনে বহুবার শোনানো ওই কবিতার লাইন দুখানির অর্থ কি খুব বেশি কঠিন ছিলো! . জয়িতা অভিমান করে বসে পরে পুলকের পাশে|চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে ওর|চিকচিক করে ওঠে পুলকেরও চোখের কোণও| কেউ কারো খবর রাখে না|জয়িতা নদীতে ঢিল ছোড়ে, পুলক সুর করে গাইতে থাকে কবিতার সেই লাইন…… . মৌন ওষ্ঠ দুইজনারই,চিত্তে বড় ত্রাস দেখেনা কণ্যা নদীর ছায়ায় শঙ্খীপরীর বাস

    Close