• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • অশ্রু || যায়েদ মুহাম্মদ

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●Jayed Muhammad eid 2017

    যায়েদ মুহাম্মদ ● ঘুম থেকে উঠে দেখি এগারোটা বেজে গেছে। জানালা দিয়ে আসা তীব্র খরখরে রোদের তাপে অস্বস্তি লাগছে। পুরো শরীর ঘেমে একাকার। জামা ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। মাথার উপর ঘটর ঘটর শব্দে পাখা ঘুরলেও লাভ হচ্ছে না। গরম আমার কোনকালেই সহ্য হয় না। সামান্য গরমে হাঁপিয়ে উঠি। হৈ হৈ করতে করতে পাশের রুম থেকে একদল ছেলেমেয়ে আমার রুমে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। গভীর অরণ্যে অচেনা পথিক দেখে হরিণের দল অকস্মাৎ থমকে গিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেমন দাঁড়িয়ে থাকে ঠিক তেমনি। পরক্ষণে ছেলেমেয়েগুলো পরস্পর ফিসফিস করে একদৌড়ে কোথায় হারিয়ে গেলো। ওদের ভীত চেহারার কথা স্মরণ করে আমার হাসি পেয়ে গেলো। শিশুরা কত সহজে ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু এত ছেলেমেয়ে কোত্থেকে এলো? ছেলেমেয়েগুলোর প্রস্থানের পরই প্রশ্নটা উঁকি দিলো। একটু ভাবতেই মনে পড়ে গেলো আজ আপুর বিয়ে। মুহূর্তেই মনটা অদ্ভুত করুণ বিষাদে ভরে গেলো। শেষরাতের কোকিলের নিঃসঙ্গ ডাকের মতো শূন্যতায় বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো। ছোটবেলাকার সমস্ত স্মৃতি মস্তিষ্কে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। এক এক করে স্মৃতির পাতা উল্টাতে লাগলাম। সেই কত আগে – যখন ছয় কি সাত বছর বয়স – আমি আর আপু কি দুর্দান্ত সময় না কাটিয়েছি। পিঠাপিঠি ভাইবোনের বিচিত্র বর্ণীল রূপময় মুহূর্তগুলো আশ্চর্য দীপ্তিতে স্মৃতির পাতায় ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠে। তখন সবে আমরা মকতবে ভর্তি হয়েছি। সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল ভোরে ঘুমঘুম চোখে হুড়োহুড়ি করে মকতবে ছুটে যেতাম। তারস্বরে চেঁচিয়ে কত কি পড়তাম। আম্মু প্রায় সময় নানুবাড়ি যেতেন। মকতব থেকে এসে দিনভর আমি আর আপু পুরো বাড়িতে একাই থাকতাম। ঘরের সামনের ঝাঁকড়া আমগাছটায় মাঝেমাঝে বিচিত্র রকমের অচেনা সব পাখী আসতো। সুন্দর মায়াবী পাখীগুলোকে বশে আনার জন্য আপুর কি যে উদগ্র আকাঙ্ক্ষা ছিলো। স্বপ্নালু চোখে পাখীগুলোর দিকে মোহগ্রস্ত হয়ে তাকিয়ে থাকতো। ঢিল ছুঁড়ে পাখোগুলোকে তাড়িয়ে দিতাম। প্রচণ্ড খেপে যেতো আপু। রাগে ক্ষোভে ফুঁসে উঠে পিঠে ধুমধুম কিল বসিয়ে দিতো। সবকিছু পরিপাটি করে রাখা ছিলো আপুর স্বভাব। ঘরদোর স্নিগ্ধ পবিত্রতায় ঝকঝক করতো। আব্বু ফজরের পর পরই অফিসে চলে যেতেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে চারপাশ নিঝ্ঝুম নিস্তন্ধতায় ঢেকে গেলে আমরা তখন বইখাতা নিয়ে বসতাম। অমনি পুরো বাড়ি অসীম শূন্যতায় হা হা করে উঠতো। কান্না উথলে উঠতো বুকের ভেতর থেকে। আম্মুর কথা মনে পড়তেই সশব্দে কান্না করে উঠতাম। আপুও কেঁদে দিতো। প্রবল প্রতাপে সারাদিন গৃহিণীপনা করলেও এই বিমর্ষ সন্ধ্যায় আপু কেমন ছোট্টটি হয়ে যেতো। সে কি কান্না! কান্নার সাথেসাথে আম্মুর বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগ। টপটপ করে অশ্রু ঝরে কপোল ভিজ যেত। আম্মুর এইরকম নিষ্ঠুরতায় প্রচণ্ড অভিমান হতো। মাঝেমাঝে আব্বু দোকান ফেলে সন্ধ্যাবেলায় আমাদের দেখতে আসতেন। আব্বুর পায়ের আওয়াজ পেলেই চোখমুখ মুছে পড়াশোনায় ডুবে যেতাম। আব্বু প্যাকেট বিরিয়ানি বা এই জাতীয় লোভনীয় খাবার নিয়ে আসতেন। খাবারের ঘ্রাণে আমরা কিছুক্ষণের জন্য হলেও আম্মুর কথা ভুলে যেতাম। পেটের ভেতর গুড়ুম গুড়ুম শব্দ শুরু হয়ে যেতো। আম্মু বাড়িতে থাকলে সাধারণত বাইরের খাবার কপালে জুটতো না। আমাদের কান্নার ব্যাপারটা আব্বু টের পেতেন। বুঝতে দিতেন না। আকারে ইজ্ঞিতে সান্ত্বনা দতেন। আব্বু নানান রকমের গল্প করতেন। গল্প শুনে বিষণ্ণভাবটা উবে গিয়ে মুক্ত পাখীর কলকলে স্বরের মতো মনপ্রাণ ফুরফুরে হয়ে যেতো। অল্পকিছুক্ষণ থেকে আব্বু চলে যেতেন। আমি আর আপু গুটুর গুটুর করে গল্প করতাম। আপু কত যে গল্প বলত। তার গল্প বলার মুহূর্তের নাটকীয়তা তীব্রভাবে মুগ্ধ করতো। একের পর এক গল্প শুনেও তৃপ্তি মিটত না। তারপর দীর্ঘকাল কেটে গেলো। কত উত্থান পতন ঘটলো। আপু একটু বড় হওয়ার পর সেই সুদূর ঢাকা শহরে চলে গিয়েছিল পড়াশোনার জন্য। তারপর থেকে মেজাজটা ভারী রুক্ষ হয়ে গেছে। কিছু হলেই ঠাসঠাস করে চড় বসিয়ে দেয়। বইয়ের ভাষায় কথা বলে। আর কত রকমের ভদ্রতা যে শেখায় তার ইয়ত্তা নেই। তীক্ষ্ণ আওয়াজে অজস্র উপদেশ দিয়ে কান ঝালাপালা করে দেয়। কানের কাছে এইরকম অনবরত ঘ্যানঘ্যান কার ভাল লাগে! উপরন্তু এখন যথেষ্ট বড় হওয়ায় উপদেশ আর গায়ে লাগে না। আশ্চর্য! ঢাকায় গিয়ে এ ক’বছরে আপুর কত পরিবর্তন হয়ে গেছে। ছোটবেলাকার হাউমাউ করে কান্না করা আপুটি আর নেই। গম্ভীর স্থির অন্য এক আপু যেন। আগের চঞ্চল আবেগপ্রবণ আপু কোথায় হারিয়ে গেছে। ভাবতেই বুকটা ফেটে যায় কি এক হাহাকারে। আব্বুর হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে। একমাত্র মেয়ের বিয়ে। চারদিক অস্বাভাবিক ব্যস্তমুখর। উঠোনজুড়ে প্যান্ডেল। আকদ আগেই হয়ে গেছে। এখন শুধু কনে উঠিয়ে নেয়া। প্যান্ডেলের উত্তর পাশে রান্নাবান্নার আয়োজন। ঘুর্ণায়মান কালো ধোঁয়া চারপাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলছে। সুখাদ্যের ঘ্রাণ ভেসে আসছে। ঘুম থেকে উঠার পর কেবল কাজ করেই যাচ্ছি। বিরক্তি ধরে গেছে। এত কাজ করতে কার ইচ্ছে হয়! তারউপর মনটাও ভারী খারাপ। সকাল থেকে একবারও আপুর সাথে দেখা হয় নি। অন্দরমহলে যাবো সে সুযোগটুকুও নেই। একদল বান্ধবী আপুকে ঘিরে কিচিরমিচির করছে। এদেরকে ডিঙিয়ে আপুর কাছে যাওয়া মুশকিল। আপুরও বোধকরি কথা বলার মতো অবস্থা নেই। বরপক্ষের গাড়ি আসার কথা বেলা একটায়। এলো দু’টায়। দীর্ঘক্ষণ উদ্বেগ উৎকন্ঠায় কাটাতে হয়েছে। কথা ছিলো – বরপক্ষের গাড়ি আসামাত্র ছেলেপেলেরা ‘বর এসেছে বর এসেছে’ বলে চিৎকার করে পাড়া কাঁপিয়ে তুলবে। সবাইকে বরের আগমনের কথা জানিয়ে দিবে। কিন্তু অতিবিলম্বে বরের গাড়ি আসা – এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বড়দের গুরুগম্ভীর ব্যস্তভাব আমাদের প্রবল উৎসাহ চাঞ্চল্যকে স্তিমিত করে দিয়েছে। আতিথেয়তা আর মেহমানদারি খুব নিরবেই হয়ে গেলো। সূর্যের আলো নরম হয়ে এলে হঠাৎ করেই হৈহল্লা চেঁচামেচি বেড়ে গেলো। সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো। বরপক্ষকে বিদায় দেয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। এবং যথারীতি তারা কনেকেও সাথে করে নিয়ে যাবে। এই ব্যাপারটার গভীরতা এতক্ষণে যেন আমি টের পেলাম। আপু চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছে ভাবতে বুকের ভেতরটা ডুকরে কেঁদে উঠলো। অনন্ত শূন্যতায় মনটা বিমর্ষ হয়ে গেলো। সমস্ত পরিবেশ অখন্ড নিস্তব্ধতায় নিথর হয়ে থমকে গেছে। সকলের চোখমুখে করুণ বিদায়ের ছাপ। নিদারুণ বিষণ্ণতায় বাড়ির পরিবেশ কেমন মনমরা গেছে।

    Close