• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • হারিয়ে যাওয়া অন্তিকা || শাদমান ইবনে শহীদ

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●

    Shadman ibn eid 2017

    শাদমান ইবনে শহীদ   আজ তাড়াহুড়ো করেই বের হতে হলো। স্কুলের টাইম পেরিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন এই শীতের সকালে ঘুমটা ভাঙতেই চায়না আর আম্মুর ডাকাডাকিও বন্ধ হয়না।
    যাই হোক,বের হয়ে দৌড়ে রাস্তায় চলে এলাম। কিন্তু চোখ ফেরাতে না পারা এক বালিকায় আটকে গেলাম। এ কী! নীলপরী নাকি! আজই প্রথম কারোও প্রতি এক নজরে তাকালাম। তাকানোটা দীর্ঘস্থায়ী হলোনা। নীলপরী শুভ্রদের বাসার গেটে ঢুকে গেল। তারমানে নীলপরী শুভ্রদের বাসার নতুন ভাড়াটিয়া।
    হায়হায়,আমার স্কুলের সময় তো গেল।

    বিকেলে আমরা শুভ্রদের ছাদেই খেলি। আজকে আমার কেমন জানি অমনোযোগিতা কাজ করছে। নীলপরী কী ছাদে আসতে পারে?এলে আমার অবস্থা কি হবে? নাহ,তা আর হলোনা। কারো দেখা নেই। সন্ধা হয়ে মাগরিবের আজান। ব্যস খেলা অফ।
    রাতে শুয়ে শুয়েও নীলপরীর কথাই ভাবছিলাম। ওর নাম কি হতে পারে, নীলা, নাকি নীলিমা? ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম….।
    ঘুমে বিভোর। স্বপ্ন দেখছি, মায়াবী চেহারার একটা মেয়ে নীল জামা পরে বসে আছে ছাদের কিনারে, আমি এগিয়ে গেলাম, বসলাম মেয়েটির পাশে। এ কী! এ তো সেই নীলপরী! কিন্তু এটা তো শুভ্রদের ছাদ না। আমি প্রথমেই জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা নীলপরী,তোমার নাম কী?
    -বলল মায়া।
    অমনি আমার ঘুম ভেঙে গেল। চিন্তা করতে লাগলাম সত্যিই কী মায়া না নীলা।
    আম্মু ডাকতে লাগল তন্ময় বাবা এখনও ঘুমাওনি?
    হ্যাঁ আম্মু একটু বাথরুমে যাবার জন্য উঠেছি।

    এখন আমি বের হই একটা চেহারা দেখার জন্য। এখন আমার দিন কাটে একটা চেহারার কথা ভেবে।
    ক’দিন পরের কথা। আমরা শুভ্রদের ছাদে খেলছি। হঠাৎ নীলপরী ছাদে এলো। চলে গেল সিঁড়িকোঠা’র ওপাশে । আমি ব্যাটিং করছিলাম, ওকে দেখতে যেয়ে আউট হয়ে গেলাম। রাকিব বলল, কিরে তন্ময়, কী করলি এটা? আউট হয়ে গেলি! তখনও আমি অন্যমনষ্ক। ঐ দিনের মত দ্বিতীয়বার দেখি নীলপরীকে।

    এ ক’দিনে নীলপরী সম্পর্কে জানা হয়েছে ভালই। জানতে পেরেছি ওর নাম নীলাও না মায়াও না। নাম অন্তিকা। আর শুভ্রদের বাসা মূলত অন্তিকার খালামনিরা ভাড়া নিয়েছে। অন্তিকা খালামনির বাসায়ই বেশি থাকে । এখান থেকে স্কুল কাছে। অন্তিকার সমবয়সি যে মেয়েটা, ওর খালাতবোন তানিয়া। অন্তিকা এবার ক্লাস সেভেনে। অন্তিকারা কয় ভাইবোন, বাবা কি করেন এসব জানা হয়নি, আর এসব না জানলেও চলবে।

    আর আমি আমার আব্বু আম্মুর একমাত্র সন্তান। আব্বু রাগী মানুষ। তবে আলাপ জমলে রসিকতাও কম করেন না। আমার ভয় সব আব্বুকে নিয়ে। আবদার বায়নার দায় ভার আম্মুর কাছে। আম্মুর সাথে আমি অনেক ফ্রি। সহজেই আম্মুকে অনেককিছু বলতে পারি, কিন্তু আব্বুকে পারিনা। আমি ক্লাস নাইনে। পড়াশোনার এত চাপ, প্রাইভেট,কোচিং এসব করতে করতে দিন পার। তবু বারবার অন্তিকার কথা মনে হয়।
    অন্তিকার কথামনে হলেই ভাল হয়ে যায় মনটা।

    দেখতে দেখতে পাঁচ ছ’মাস কেটে গেছে অন্তিকাদের এ মহল্লায় আসা। এর মধ্যে আমাদের ভাব জমেছে বেশ। তবে কথা হয়নি কখনো। একদিন একে এপরের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। তিন চার মিনিট তো হবেই। নাহিদ এসে ডাক না দিলে হয়তো আরো কতক্ষণ তাকিয়ে থাকতাম। নিচ থেকে বল আনতে যেয়ে ছাদে উঠছিলাম আর অন্তিকা দরজায় দাড়িয়েছিল তখনই চোখাচোখি। আমার জীবনে ভাললাগা মূহুর্তগুলোর মধ্যে একটি।
    অন্তিকা ছাদে গেলে আমিও যেতাম। দূর থেকে ওকে দেখতাম। অন্তিকাও আমার দিকে তাকিয়ে হাসতো। আমরা কথা বলতে পারতামনা। হয়তো অন্তিকাও ভিতরে ভিতরে টান অনুভব করতো। প্রকাশ করতে পারতোনা। আমিও তো কত সুযোগ খুঁজতাম কথা বলার, কাছে যাওয়ার কিন্তু হয়নি কখনো সে সুযোগ।

    কালকে অন্তিকাকে মনের কথাটা বলবো। বলবো দীর্ঘ নয় দশ’মাস একটা ছেলে একটা মেয়েকে মনে মনে ভালবেসে যাওয়ার গল্প। অন্তিকা কি চুপচাপ আমার কথা শুনবে? হাসবে?এসব ভেবে রাতে আর ঘুম হলোনা।
    সকাল সকাল বের হয়ে অপেক্ষায় রইলাম অন্তিকার। স্কুলে যাবার জন্য বের হবে। অনেকক্ষণ গেল তবু অন্তিকার দেখা নেই। আমার ভেতরটা কেমন জানি করছে। তাহলে কী বলা হবেনা মনের কথাটা।
    অন্তিকা ওর খালামনির সাথে বের হল। ওর মন খারাপ কেন! রিক্সা করে আমার সামনে দিয়েই গেল। অন্তিকা টলমল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। আমি দাড়িয়ে রইলাম।
    নাহিদ বলল, অন্তিকারা বাসা ছেড়ে চলে গেছে। আমি শুনে আর থাকতে পারলামনা। চোখে পানি চলে এলো। অন্তিকারা কোথায় বাসা নিয়েছে, পুরান বাসা কোথায়, এসব জানার অনেক চেষ্টা করলাম। কিন্তু কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারলোনা।
    আমি প্রতিদিন সকালে সাইকেল নিয়ে বের হতাম। খুঁজতাম। কিন্তু পাইনি। এখনো খু্ঁজি।
    আমাকে এভাবে ফেলে গেল কেন? একটু তো বলে যেতে পারতে।আমি অপেক্ষায় থাকবো আজীবন। তুমিও কী অপেক্ষা করবে আমার জন্য, নাকি ভুলে যাবে?

    সময় বসে থাকেনি। আমিও অন্তিকাকে খুঁজতে খুঁজতে পড়াশোনা শেষ করেছি। এখন ভাল একটা চাকরি করছি। অন্তিকাও হয়তো শেষ করবে পড়াশোনা, নাকি বিয়ে করে সংসার পেতেছে।
    অনেকদিন ধরেই আম্মু আমার জন্য মেয়ে দেখছিল। আমি না করেছি। বলে দিয়েছি আমি অন্তিকাকেই বিয়ে করবো। আম্মু জানতো আমার বিষয়টা। কিন্তু আম্মু বসে ছিলনা। ভাল একটা মেয়ে পেয়েছে। আম্মুর মনের মত। সবারই পছন্দ হয়েছে। আমি মেয়ে দেখতে যাইনি। আম্মুকে বলেছি তোমার পছন্দই আমার পছন্দ।
    সবার পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে আমি বিয়েটা করে ফেলি। অপেক্ষার শেষ করিনি।

    এই রাতটা নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল। অন্তিকা থাকবে পাশে। কিন্তু নিয়তির খেলায় আমি আজ অন্য এক রমনীর স্বামী। আমাদের আজ বাসর রাত। রাতটা সত্যিই খুব সুন্দর ছিল। অপূর্ব।
    ঘরে ঢুকেই চমকে গেলাম। মেয়েটা হাসছে। খুব চেনা চেনাও লাগছে মেয়েটাকে। অন্তিকা না তো! অন্তিকা হবে কিভাবে! ও তো আমার স্ত্রী আনিক জাহান। আনিকা আমার সামনে এসে বলল, কী তন্ময়, প্রথমবারেই নাম ধরে, তুমি করে বলছি দেখে লজ্জা পাচ্ছো? জানি চিনতে পারোনি আমাকে। কারণ তুমি আমারদিকে ভাল করে তাকাওনি। এই, তাকাও আমারদিকে। আমি আনিকা জাহান অন্তিকা। তাকাও,ভাল করে দ্যাখো,হুম আমি তোমার হারিয়ে যাওয়া অন্তিকা।

    Close