• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • কী খেইল তুমি খ্যাললা ওগো || যিয়াদ বিন সাঈদ

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●

    Ziad eid 2017

    যিয়াদ বিন সাঈদ ● জবেদ আলী কাশেমুল উলুম হাফেজিয়া মাদরাসা। সাভারের কলমাকান্দায় টিনের ভাঙা আর ফুটাঅলা চালা নিয়া এই বেহেশতের বাগানটি বহুদিন যাবৎ ঘেরান ছড়াইতেছে জগতে। কেবলই খুশবুদার পরিবেশের সৃষ্টি সেখানে হয়। আর সেখানে থাকেন জগতের সব ধান্ধা চিন্তা ছাড়া মহান লোকেরা। মেশক এ আম্বারের খুশবু গায়ে মাইখা তারা দিনরাত মাওলার কাজবাজ করে যান।

    কাউখালীর নছিমন বিবির একমাত্র সন্তান আব্দুল করিম। ছেলে তার পেটে ধরা মাত্রই বাপ আব্দুল জব্বার পরবাসে চইলা যান। মরার মুহূর্তে বাপ জব্বার বুকভরা আশা লইয়া পেটে বাচ্চা ধরা নছিমনরে বইলা গেছিলেন, পোলাটারে মাদ্রাশায় দিয়ো। মরাবাপের লেগা ইছালে ছাওয়াব পাঠাইবার তরে এরে তুমি জান্নাতি বাগানে ঢুকাই দিয়ো।
    নছিমন বিবি স্বমী জব্বারের সেই বুকভরা আশার কথা স্মরিয়া জবেদ আলী আশরাফুল উলুম হাফেজিয়া মাদরাসায় ছেলে আব্দুল করিমরে ভর্তি করায় দেন। দিনকাল তো গ্যাতেছিলো ভালোই। ছেলেবেটা তার পড়ে খুব মনোযোগ দিয়া। কায়দা ছেপারা শেষতক পইড়া কোরানহাকিমও নিয়া লয় বুকে। রেহালে কোরান থুইয়া ঢুলতে ঢুলতে সে মনে পায় স্বর্গের শান্তি। আরাম। কম পয়সার আয় রোজগার মা পোলার এই ছোটো ফ্যামিলিটার। মা কাম করেন পাড়ায় পাড়ায়। বুয়া কয়ে লোকে ডাকে। তবুও ছেলেটার নূরানি চেহেরাটার দিকে তাকাইয়া নছিমন বিবি প্রতি সকালে শাড়িতে কাছান মারেন। বিরাট খাটাখাটনি হইলেও পোলা যেন তার মানুষ হয়। জান্নাতি হয়।

    আব্দুল করিম মাদরাসায় বাৎসল্যরস আরামে চুষতে পারে। বন্ধু হয় তার অনেক। পাড়ায় পাড়ায় খেলে তারা ছুটিরঘণ্টা পড়লে। হাসিতে হাসিতে অগোছালো জীবনে তারা আনে শান্তির আবাসভূমি। একদিন তাগো মনে ধরে ঘুরতে বেরোইবে। কই যাবে কই যাবে কইতে কইতে তারা ছুইটা যায়। জোহরের আযান হইতেই নামাজ পইড়া তারা শীতের অতিথি পাখি দেখতে ছুইটা যায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা আসে নাই এর আগে। কত কিছু আছে এইখানে তারা আগে জানতোইনা। অথচ তারা এর পাশেই থাকে বহুকাল।
    বটতলা তে বইসা তারা কম টাকার ভর্তাভাত খায়া নেয়। তৃপ্তি কইরাই খায়া নেয়। এ জীবনে আর কি আসা হবে? যেইসব প্রতিবন্ধকতা তাগোর জীবনে নির্মম ভাবে মিশা আছে সেসব কি কখনও তাগোরে ছাইড়া চইলা যাবে? করিমদের সে আর মনে হয়না। আসরের আজান হইলেই তারা ফিরা আসে মাদ্রাসায়। বুকে ফুঁক দিয়া তারে ঘরে ঢুকে। হুজুরগের ডর তাগের মনে জাগে। কম্পন সৃষ্টি করে। অথচ স্রষ্টা তাদেরকে শিখাইছেন ‘এক আল্লাহ ছাড়া আর কাওরে নাহি করো ভয়”
    কিন্তু তবুও তো তারা এইসব উস্তাদের ভয়ডর মনে লইয়া দিনরাত পার করতেছে।

    মাগরিবের নামাজের পর অফিসকক্ষ থেকা শব্দ আসে গরুছাগল পেটানোর প্রচণ্ডতম শব্দ। করিম ভয় পায়া যায়। সাথে তার অন্য বন্ধুরাও। এতক্ষণে সে জাইনা যায় না বইলা মাদরাসা থুইয়া ঘুরতে যাইবার অপরাধে তারও দাঁড়াইতে হবে ওস্তাদের ব্যাতের ডগায়। জীবনটারে করিমের সে সময় অতিক্ষুদ্র মনে হয়। মানেমতলব খুঁজতে খুঁজতে একসময় সম্বিত ফিরা পাইলে সে দেখে তার পিঠেকপালে ঝড় বইতেছে। কেবলই ঝড়। উথালপাতাল। ঢেউ উত্তাল। বাজ পড়তেছে বারবার। মাঝেমাঝে বিদ্যুৎও চিলিক দিয়া উঠতেছে।
    করিমদেরকে পিটাইয়া বিরাট দেহের ওস্তাদ নঈম মণ্ডলের হাত পা ধইরা যায়। অবশ হইতে চায়। চিৎপটাং হইয়া শুইতা পড়েন এই দজ্জাল। পোলাপান সকলেরে তিনি চ্যাত কইরা ঝাড়তে থাকেন, হাত পা তোরা টিইপা দ্যাছ না ক্যান হারামির বাচ্চাগুলা?

    করিম মাইরপিট খাইয়া বেহুশ হইবার তরে মনে মনে কয় কোন অধিকারে তেনারা আমাদের পেটান? কী বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। আমাগোরে মারা হইলো আরামে। মনের জৌলুশ সহকারে। ছ্যাতা ছ্যাতা করলো বুকপিঠ। অথচ মুখ খোলা করণ অপরাধ বইলা চ্যাঁচামেচি হইতেছে চারপাশে। এ কেমন জগতে বসবাস আমাগোর।
    রাগেগরগর করিমেরা আর সইতে পারেনা। তারা পালায়া যায় মাদ্রাসা থেইকা। এইসব জেলজুলুম তাগো সহ্য হইবার নয়। সামান্য অপরাধে এমন মাইর খাইবার জন্যেও তারা আসে নাই এইখানে। তারা এখানে আল্লাহ রাসুল শিখতে আসছিলো। আর রাসুল তো তাদেরে শিখাইছে স্নেহের কথা। আদরের কথা। রাসুল কখনো মারপিট শিক্ষা দেয় নাই উম্মতেরে। কিন্তু সে উম্মতই রাসুলের কথারে ধাক্কা মাইরা সরায় দিয়া বসাইতেছে স্বৈরাচার। রাসুলের কথারে পাত্তা না দেয়া এইসব মানুষই কি প্রকৃত ওয়ারিছে নবী?

    করিমেরা পলায় গেছে দুইদিন হইয়া গেছে। তারা এখানে সেখানে ঘুরঘুর করতেছে। খাওন দাওন পেটে নাই। ভুখামুখে তারা লোকেদের কাছে হাত পাততেছে। তালেবে এলেম বইলা লোকে তাদেরে ভালোবাসতেও আছে। অথচ মাদরাসায় থাকতেকালীন ওস্তাদেরা তাগোরে ভালোবাসে নাই। পিটাইছে। ওরা চইলা গেছে বইলা ওস্তাদ নঈম মণ্ডল আরামকেদারায় বইসা পায়ে ঠ্যাং তুইলা পান চিবাইতেছে। করিমরা এসব ভাবতে ভাবতে অন্য জগতে হারায়া যায়। যেখানে কেবলি শান্তির পাঠ করা যায়। আরামে আনন্দে সুখের পরিবেশে শুইতা থাকা যায়।

    করিমেরা যেহেতু অসহায়, এই অসহায়ত্ব বুকে নিয়া তারা খোঁজে আশ্রয়। আশ্রয়হীন আর কতদিন? ঢাকায় আসে তারা। কামকাজের সন্ধানে। কামকাজ না পাইয়া তারা পায় নরকের ঠিকানা। বদরুল নামের চ্যাংড়া টাইপ পোলা ওগোরে আটকায়া লয়। তশকিল কইরা ওগোরে বশ কইরা ফালায় বদরুল। বদরুল ওগোরে শোনায় আশার বাণী। থাকন খাওনের ম্যালা সুযোগ সুবিধা দিয়া করিমগোরে হাতের মুঠোয় নিয়া নেয়। তারা হাঁটে বদরুলের সঙ্গে। বদরুল তাগোরে কই নিয়া যাইতেছে হ্যাঁ?
    করিমেরা একমাত্র আশ্রয় পাইবার লাগি বদরদের সব কথাই মাইনা নেয়। যেন তারা নতুন জীবনের সূচনা করতেছে।

    ছাপড়া টাইপের একটা ছোট্ট ঘর। এইখানে অনেক লোক থাকে। অন্ধকারে ভরা। ঘটরমটর কইরা সবাই কী যেন প্রস্তুত করতেছে। করিমেরা হতভম্ব হয়। চাওয়াচাওয়ি করে একজন অন্যজনের দিকে। তবুও তারা হাসিখুশী থাকতে চায়। বদর গ্রুপের বস হইতেছে নাসিফ খান। সে সবাইরে যেই দিক নির্দেশনা দেয় সেগুলাই সবাই মানে। হাড়ে হাড়ে মানে।
    নাসিফ করিমগোরে আদর করে। যত্ন করে। একফাঁকে বইলা নেয় নাসিফ, পিস্তল কাঁধে লইতে প্রস্তুত আছো তো তোমরা? আঠারো বছরের করিমেরা এদিকওদিক তাকায়া ভয়ে ভয়ে বলে ‘আছি’

    বদর গ্রুপরে পুলিশ খুজতেছে ম্যালা দিন। হঠাৎ হঠাৎ তারা শহরের এদিকে ওদিকে হামলা কইরা বসে। লোকে এই হামলারে বলে জঙ্গি হামলা। কিন্তু ক্যানো তারা এইসব করে? কোন উদ্দেশ্যে করে? মানুষ মাইরা কি তারা জান্নাতে চইলা যাবে? বদররা নিজেও জানেনা।
    আজকে তাদের অপারেশন বনশ্রী তে। এক রেস্টুরেন্টে। ক্যাফে আমেরিকানো। করিমদেরও সঙ্গে যাইতে হবে। এতদিনে করিম সব শিখা গেছে। সঙ্গে ওর বন্ধুরাও। অতর্কিতভাবে তারা ধিপধাপ বোম টোম ফুটায়া কাইটা পড়ে ঘটনাস্থল থেকা। অপারেশন সাকসেসফুল। এক ঘটনা ঘটায়াই করিমের চোখেমুখে আনন্দের ছাপ। যেন সে আরাম পাইয়া গেছে। নেশারঝোঁক তারে আকড়ায়া ধরে।

    এদিকে করিমের মা নছিমন বিবি একমাত্র সন্তানের খোজ করতে মাদ্রাসায় আসলে ওস্তাদ নঈম মণ্ডল তারে ঘাড় ধইরা বার কইরা দেয়। খারাপ আচরণ করে। খুবই খারাপ। মা মনে মনে কয়, ছেলেরে তবে আল্লাহর রাস্তায় দেয়াটাই কি ভুল ছিল আমার?

    করিমেরও মনে পড়ে মায়ের কথা। কিন্তু সে ঘরে ফিরবেনা। প্রতিশোধ নিয়াই যাবে সেই মারপিটের। সরাসরি ওস্তাদ নঈম মণ্ডলের কিছু সে করতে পারবোনা তা জানে।।কিন্তু সে হারামীর ইমেজ সে জগতে নষ্ট কইরা দিবে। পাঞ্জাবী পইরা সে লোকেরে খুন করবে। লোকে বলবে এই তবে শিক্ষা দিছে এই মোল্লা মৌলভী রা? করিম হিংস্র হয় আরও বেশী। মানুষ মারে দিনে রাতে। বোমা ছুড়ে। নঈমের সেই চেহেরা মনে আসলে সে আরও মারে। শুধুই মারে।

    Close