• আজ সোমবার, ২৫শে জুন, ২০১৮ ইং ; ১১ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ১০ই শাওয়াল, ১৪৩৯ হিজরী
  • সব পাখি ঘরে আসে || সাব্বির জাদিদ

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●Sabbir jadid eid 2017
    সাব্বির জাদিদ ● বদুর আসল নাম যে বাদল, তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই। বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক বাংলা অভিধান বলে– বাদল মানে বৃষ্টি, বর্ষা, মেঘ। যার নামের ভেতর মিশে আছে বৃষ্টির মতো কোমল পবিত্র জিনিস, সে ক্যামনে নিরীহ মানুষের মাথা ফাটায়– বোধগম্য নয়। হতে পারে বন্ধুরা তাকে বাদল না ডেকে বদু ডাকে বলে নামের প্রভাবে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করবার মতো বদ সে হয়ে উঠেছে। আবার নাও হতে পারে। এ নিছক সম্ভাবনা। সে যখন রাস্তায় চলে, একলা চলে না। চার পাঁচটা ছেলে সব সময়ই তাকে সঙ্গ দেয়। অন্যভাবে বললে, এই ছেলেগুলো তার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে মানসিক ও শারীরিক শান্তি অর্জন করে। এরা বদুর এক সময়ের বন্ধু। একসাথে ছোট থেকে বড় হয়েছে। কাছাকাছি সময়ে মুসলমানি নিয়েছে। সেভেনে থাকতে ক্লাসমেট বিউটিকে প্রেমপত্র দেয়া নিয়ে হাতাহাতি করেছে। তারপর বদুর বাবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হল আর বদুও কেমন বদলে গেল। সবাই একসাথে সিঁড়ি ভেঙে ধাপকে ধাপ উঠতে উঠতে বদু যেন হঠাৎ একবারে তিনধাপ এগিয়ে গেল। আর বন্ধুরা রয়ে গেল তিনধাপ নিচে। বন্ধুত্ব এমন জিনিস, মানসিকতায় সবাইকে একই ধাপে থাকতে হয়। নয়তো বন্ধুত্ব টেকানো মুশকিল। বদুদের বেলায় যেহেতু একধাপ ব্যাপারটা নেই, তাই তাদের মধ্যে যে সম্পর্ক, তাকে আর বন্ধুত্ব বলা চলে না। বদু যেন গুরু আর বাকিরা তার চ্যালা। বন্ধুত্বের মতোই সহজ স্বাভাবিক আর সবকিছু ভাগাভাগি করার মতো সম্পর্ক সবার, তবু কোথায় যেন একটুখানি সুর কেটে আছে। সেই কর্তিত সুরের কারণেই বোধহয় বদুর পিঠে বা বাহুতে সজোরে হাত চাপড়ে ওরা বলতে পারে না– কী খবর দোস্ত! প্রথমবারের পাশের পর দ্বিতীয়বার ফেল করে বদুর বাবা এখন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। সাবেক, তবে এখনো তাকে চেয়ারম্যান সম্বোধনেই ডাকা হয়। আর এই সম্বোধনের গুণেই হয়ত বদুর চলাফেরায় এখনো চেয়ারম্যানপুত্রের অহং। বদুকে ভয় পায় না অথবা বদুর রাগের সামনে পড়ে গেলে বিব্রত হয় না, এমন মানুষ এলাকায় নেই। তবে গোপন কথা, চ্যালারা ছাড়া আর কেউ জানে না বলেই গোপন– একজন আছে এলাকায়, বদুকে সে মোটেও ডরায় না। বরং বদুই যে তার সামনের পড়লে ঘাবড়ে যায়, তা বুঝতে পারা যায় সেই মানুষটার সামনে বদুর ঘেমে ওঠা দেখে। সে ফাতেমা। সুন্দরী ফাতেমা। লম্বা ফাতেমা। পড়াশোনায় ভালো ফাতেমা। চটরপটর কথা বলিয়ে ফাতেমা। ফতেমার সবচে’ বড় গুণ– বদুকে যা সবচে’ বেশি আকর্ষণ করে– ফাতেমার কোনো চারিত্রিক দাগ নেই। ঘরসংসরের জন্য খুঁতহীন পরিপাটি এমন একটা মেয়েই বদুর দরকার। ফাতেমাকে বদু প্রথম দেখে আজ থেকে সাড়ে ছয় বছর আগে, বদুর বাবার জিতে যাওয়া ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের দিনে। ফাতেমা তখন এইটে পড়ে। প্রেম-অনুভূতির পালক গজাবে গজাবে করছে। সেদিন ভোর থেকেই অস্থির বদু। কারণ, তার বাবা প্রথমবারের মতো চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী। সখীপুর হাইস্কুলে ভোটগ্রহণ চলছে। বদুর বাবার নিজের এলাকা সখীপুর। অস্থির বদু তার অস্থির বাবার সাথে ঘোরাঘুরি করছে কেন্দ্রের সামনে। শেষ মুহূর্তের ভোট চাওয়াচাওয়ি চলছে। বেশ একটা উৎসবের আমেজ। এই উৎসবমুখর পরিবেশকে বদুর মনে হচ্ছে হাশরের মাঠ। সে যেন দাঁড়িয়ে আছে লাইনে, আমলনামা হাতে পাওয়ার অপেক্ষায়। একটু পরেই চূড়ান্ত হয়ে যাবে তার চিরস্থায়ী আবাস– জান্নাত অথবা জাহান্নাম। এই ভোটে তার বাবার হেরে যাওয়া মানেই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়া। সেই দমবন্ধ পরিবেশে অস্থির পায়চারির ভেতর বদুর চোখ হঠাৎ আটকে যায় ফরসা ডাগর চোখের এক মেয়ের উপর। মেয়েটার গায়ে কলাপাতা রঙের জামা। পরনেও কলাপাতা। খয়েরি ওড়নায় চুলের অর্ধেকটা ঢাকা। মুখজুড়ে গ্রামের সতেজ প্রকৃতির ছাপ। মাঝ বয়সী এক মহিলার সাথে এসেছে ভোটকেন্দ্রে। মহিলা হয়ত তার মা। মা এসেছে ভোট দিতে আর সে এসেছে ভোট দেখতে। মায়ের সাথে সে হেসে হেসে কথা বলছে আর ডানগালে সামান্য টোল পড়ছে। মেয়েটার চেহারায় কী যে ছিল, ভোটের দিনের অস্থিরতা কিছুক্ষণের জন্য মুছে যায় বদুর মন থেকে। নতুন কিছু আবিষ্কারের উত্তেজনায় বুকের ভেতর সম্পূর্ণ অচেনা কম্পন তৈরি হয়। কতক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মেয়েটাকে। চমক ভাঙে টিটুলের ধাক্কায়– কই থাকিস! ম্যালা সুমায় ধরে খুঁজছি তোরে। অপ্রস্তুত ভাব সামলে নিয়ে বদু জিজ্ঞেস করে– মিয়াডা কিডা রে! —কোন মিয়া? বদু হাত ইশারা করে– ওই যে সবুজ মতো জামা। —ও তো ফাতেমা। আজগর চাচার মিয়া। —কোন আজগগর? —উত্তরপাড়ার। বাজারে কসমেটিকির দুকান আছে। —চিনছি চিনছি। বাপ সুনু-পাউডার বেচে বলেই কি মিয়া এতো সুন্দর! —নারে! সুনু মাখা চিহারা ইডা না। এই চিহারা আল্লার দান। কথা আর এগোয় না। বদুর বাবা দূর থেকে হাত ইশারায় ডাকে বদুকে। বদু ভোটের হাঙ্গামায় জড়িয়ে যায়। কিন্তু ফাতেমা মুছে যায় না মন থেকে। লালচাঁদ ডিগ্রী কলেজে ফাতেমা এখন ডিগ্রী পড়ে। এর ভেতর অনেক কিছুই ঘটে গেছে সখীপুরে। বদু দুইবার ইন্টার ফেল করে বইখাতার উপর বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দিয়েছে পড়াশোনা। বদুর চেয়ারম্যান বাবার দ্বিতীয়বারের নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে। সখীপুরে তিনশ ঘর হিন্দু আছে। বদুর বাবার ফেলের সম্ভাব্য কারণ– এই হিন্দু পরিবারগুলোর মুনাফেকি। গ্রামের প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে তারা ভোট দিয়েছে নিশ্চিন্তপুরের গনেশকে। এই নিয়ে বদু আর বদুর বাবা হিন্দুদের উপর ক্ষ্যাপা। তবে বাবার চেয়ারাম্যানি যুগের পাঁচটা বছর বদুর জীবনের সোনালি অধ্যায়। যা সে হতে চেয়েছিল মনে মনে, এই পাঁচ বছর তাকে তা-ই বানিয়ে দিয়েছে। চেহারায় না চিনুক, আশপাশের পাঁচ গ্রাম তার বদু নামটা জানে। লোকেরা মনের ভেতর যা-ই রাখুক, উপর উপর খুব সমীহ করে চলে। হয়তো যুবকদের দুটো দলের মধ্যে ক্যাচাল লেগেছে, মীমাংসার জন্য ডাক পড়ে বদুর। মেয়েদেরকে কোনো ছেলে উত্যক্ত করছে পথেঘাটে, তাকে ঠ্যাঙাতে হবে, ঠ্যাঙানোর দায়িত্ব বদুর। এই যে এতো প্রভাব বদুর, তার এলাকায়, শুধু একটা মানুষকেই সে বশে আনতে পারেনি। সে ফাতেমা। ফাতেমা বদুর জীবনে এক আশ্চর্য প্রদীপের নাম। এই প্রদীপ সে বারাবর জ্বালাতে গেছে। পারেনি। তার হাতে ফাতেমা জ্বলে ওঠেনি। সেই কবে, সাড়ে ছয় বছর আগে, ভোটের মাঠে, প্রথম সে দেখেছিল ফাতেমাকে। প্রথম দেখাতেই জন্মেছিল অনুরাগ। তারপর কতদিন কতরাত বিছানায় শুয়ে, বন্ধ চোখে সে কামনা করেছে ফাতেমাকে। ফাতেমা ধরা দেয়নি। তবে হ্যাঁ, ফাতেমার সাথে তার দেখা হয়, কথা হয়, একসঙ্গেও চলাও হয় কখনো। একবার তো মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে কলেজে পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। সেদিন ঝড়বৃষ্টির দিন ছিল আর ফাতেমার ছিল কলেজের পরীক্ষার দিন। আবহাওয়ার বৈরিতায় কোনো ভ্যানই সেদিন ছিল না স্ট্যান্ডে। ফাতেমা অস্থির চোখে বারবার ঘড়ি দেখছিল আর তাকাচ্ছিল রাস্তার দিকে। একটা ভ্যান যদি আসে! ভ্যান আসে না। ভ্যান আসে না। আসে মোটরসাইকেল। পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চড়ে রাজপুতত্রই যেন চলে আসে এই বিপদকালে। না, বদুর পঙ্খীরাজে উঠতে দ্বিধা করেনি ফাতেমা। কারণ, এতদিনে সে জেনে গেছে, এই লোকটা মানুষ খুন করতে পারে, কিন্তু ফাতেমার অসন্তুষ্টিতে ফুলের একটা টোকাও সে দিতে পারে না ফাতেমার গায়ে। আর তাই বদুর স্পর্শ বাঁচিয়ে বাইকের পেছনে বসতে বসতে সে শুধু বলে, আমি এখানে, আপনি কিভাবে জানেন বদু ভাই! গিয়ার চেঞ্জ করে ছুটতে ছুটতে বদু বলে, আমার ছেলেরা বলল। হ্যাঁ, ভালোলাগার সেই প্রথম দিন থেকে বদুর ছেলেরা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রেখেছে ফাতেমাকে, বদুরই নির্দেশে। পথেঘাটে, ভ্যানেবাসে, শিক্ষালয়ে– কোথাও যেন ফাতেমার কোনো ভোগান্তি না হয়, কোনো বদ ছেলে যেনো নোংরা কথার তীর ছুড়ে দিতে না পারে ফাতেমার উদ্দেশ্য– বদুর ছেলেরা সব সময়ই সজাগ। এই যে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা ফাতেমাকে ঘিরে, টের পায় ফাতেমাও। তার ভালোই লাগে। আজকের দিনে পথেঘাটে চলতে গিয়ে একটা মেয়ের অনেক প্রতিকূলতা। বিশেষ করে সেই মেয়েটা যদি হয় সুন্দরী, তবে তো কথাই নেই। সুন্দরী ফাতেমা তার জীবনের এই ঝুঁকিপূর্ণ দিনগুলি পার করে দিচ্ছে নিরাপদে। নির্বিঘ্নে। বদু ভাই দূরে থেকেও যেন সর্বক্ষণের দেহরক্ষী ফাতেমার। একবার কলেজ থেকে ফিরতে চায়ের দোকানে দুটো ছেলের ফিসফাস তার কানে এসেছিল। এক ছেলে তার সঙ্গীকে ফিসফিসিয়ে বলছিল– তাকাইস নে। তাকাইস নে। বদু ভাইয়ের জিনিস। চোখ তুলে নেবে। এমন অনেক কথাই তার কানে আসে। মায়ের সাথে এই নিয়ে হাসাহাসিও চলে– বিনা পয়সা এমন পাহারা কয়জনের কপালে জোটে, মা! মা-ও হাসে। তবে ভবিষ্যৎ-শঙ্কাটা তার থেকেই যায়।

    Waliullah

    ফাতেমার এতো কাছাকাছি গিয়েও ভালোবাসি কথাটা বলতে পারেনি বদু। সাহসে কুলোয়নি। যখনই বলতে গেছে, দ্বিধা-জড়তা নাছোড়বান্দা লতার মতো জড়িয়ে ধরেছে তার কণ্ঠ। সবশুনে যদি ‘না’ বলে দেয় ফাতেমা! এমনই তবে হয়! পৃথিবীর প্রতিটা প্রতাপশালী মানুষেরই কি তবে দুর্বলতার একটা জায়গা থাকে সঙ্গোপনে! যেখানে সে শিশুর মতো সরল, অসহায়! বলবার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর বদু ঠিক করে, পড়াশোনা শেষে ফাতেমার যখন বিয়ের কথা উঠবে, সরাসরি সে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হবে আজগর আলির বাড়ি। হোক না পড়াশোনায় ফাতেমার চেয়ে পিছিয়ে বদু। তবে সমাজে তাদের যে প্রতিপত্তি, আজগর আলির রাজি না হয়ে উপায় নেই। প্রবল উত্তেজনা নিয়ে বদু তাই ফাতেমার পড়ালেখা শেষ হওয়ার প্রহর গোণে। হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকে পড়ালেখা শেষের প্রহর গোণা বদুর ছেলেদের পছন্দ হয় না। এতে শরীরের কব্জায় মরিচা ধরে যাবে যে! তারা ওস্তাদকে ধরে– ওস্তাদ, খালি পারমিশন দেও, তুমার হয়ে সপ কতা আমরা ফাতেমারে কয়ে আসি। সূর্যাস্তের ঠিক আগ মুহূর্তে পশ্চিম আকাশ যেভাবে লাল হয়ে ওঠে, চ্যালাদের প্রস্তাবে বদুর চেহারাটা অমন লাল হয়ে ওঠে লজ্জায়। কাচুমাচু ভঙ্গিতে হাত কচলাতে কচলাতে সে বলে, আরে নাহ, তোদের কওয়া লাগবে না। আমার কাজ আমিই পারব। বদুর এই লাজুক হাসি, হাত কচলানো, চেহারায় লাল রঙ ধরা– চ্যালাদের কাছে নতুন। চিরকালের রুক্ষ্ম-কঠিন স্বভাবের ওস্তাদের ভেতর সম্পূর্ণ নতুন, বিপরীতধর্মী এক প্রতিকৃতি আবিষ্কার করে তারা অবাক হয়ে যায়। নতুন করে তারা তাদের ওস্তাদকে পড়তে শুরু করে। এই পড়াপড়ির ভেতরে সখীপুরে ভয়ঙ্কর এক ঘটনা ঘটে যায়। কোরআনের উপর মানুষের পায়ের পাড়া– এমন একটা ছবি ফেসবুকে আপলোড দেয় হিন্দুপাড়ার রমেশ। সখীপুরের যতো মানুষ ফেসবুক চালায়, প্রায় সবারই এ্যাড আছে রমেশের সাথে। মুহূর্তে জানাজানি হয়ে যায় ঘটনা। প্রথমে সখীপুর, তারপর পুরো দেশ, এরপর পৃথিবী। মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। চেয়ারম্যানি ভোট নিয়ে হিন্দুদের উপর আগে থেকেই রাগ ছিল বদুর। এবার এই কোরআন অবমাননা সেই আগুনে ঘি ঢালে। কোরআনের মর্যাদা পুনরুদ্ধারে হাতে হকিস্টিক তুলে নেয় দুই ঈদ ছাড়া কোনোদিন সেজদা না দেয়া বদু। বদু তার চ্যালাদের নিয়ে হিন্দুপাড়ায় ছোটে। রমেশের মাথা না ফাটিয়ে শান্তি পাবে না সে। কিন্তু রমেশ তখন বাড়ি নেই। পলাতক। রমেশের নিরাপদে সরে যাওয়া ক্ষুব্ধ বদুর ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে দেয়। চ্যালাদের সহযোগে সে হামলে পড়ে টিনেঘেরা রমেশদের একখানা ঘরের উপর। মাথাগোঁজার ঠাঁই শীলাবৃষ্টির কবলে পড়া কচুর পাতার মতো ফালা ফালা হতে দেখে ছুটে আসে রমেশের বাবা-মা। হাতেপায়ে ধরে হামলাকারীদের। বিনিময়ে মায়ের মাথা ফাটা রক্ত মিশে যায় সিঁথির সিুঁদুরের সাথে। বাবা অজ্ঞান। একলা রমেশের উপর জন্ম নেয়া রাগ ধীরে ধীরে প্রসারিত হয় পুরো হিন্দুজাতির উপর। রমেশদের বাড়ির মতো ছিন্নকচুর পাতা হয়ে যায় নারায়ণ, হরিপদ, মালতীদের বাড়ি। সুবাসের মুদিদোকানে দাউ দাউ জ্বলে ওঠে আগুন। অল্প সময়ে অনেক কাজ করে হাঁপিয়ে ওঠে বদুরা। ফেরার পথে হঠাৎ তাদের মনে পড়ে মন্দিরের কথা। এতক্ষণ যা হলো, সেরেফ ভয় দেখানো। প্রতিশোধ নয়। কোরআন অবমাননার প্রতিশোধ তো তখনই হবে যখন মন্দিরের প্রতিমা ভাঙা পড়বে। জিহ্বায় আনন্দময় ধ্বনি তুলে লাঠি উঁচিয়ে বদুরা তখন মন্দিরের দিকে ছোটে। এদিকে দুর্বল হিন্দুরা যে যার বিধ্বস্ত ঘরের শোকে কাতর। মন্দির রক্ষার চিন্তা কারো মাথায় আসে না। দেবতার ঘর দেবতার হাতে সঁপে দিয়ে তারা আপন ঘর নিয়ে মাতম করে। বদুরা লাথি মেরে ভেঙে ফেলে মন্দিরের দুর্বল কপাট। কে কার আগে ঢুকবে, প্রতিমা ভাঙবে, রীতিমতো প্রতিযোগিতা লেগে যায়। ক্লান্ত বদু খানিকটা পিছিয়ে পড়ে কাজে। তার ঢোকার আগেই অনেকে ঢুকে পড়ে ভেতরে। দরজার চৌকাঠে পা দিয়েই বদুর নজর পড়ে সরাসরি প্রতিমার উপর। হাতখানেক উঁচু বেদির উপর দাঁড়ানো প্রতিমা বদুর দিকে তাকিয়ে যেন হাসছে। মায়া মায়া সেই হাসিতে ডানগালে সামান্য টোল। পটে আঁকা মুখ। ডাগর চোখ। লাল টুকটুকে ঠোঁট। আপলের ত্বকের মতো মসৃণ গাল। কাশের বনের মতো ফোলানো কৃত্রিম চুল। প্রতিমার চেহারাটা কেমন চেনা চেনা লাগে বদুর। আপন মনে হয়। অল্পক্ষণের তাকিয়ে থাকায় তার মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে। শীতের সকালের ধূসর কুয়াশার মতো আবরণ পড়ে তার মস্তিষ্কে। হকিস্টিক হাতে পল্টু ততক্ষণে পৌঁছে গেছে বেদির কাছে। এক বাড়িতে প্রতিমার মাথা গুড়িয়ে দেয়ার অপেক্ষা শুধু। বদুর দুচোখ টকটকা লাল হয়ে ওঠে হঠাৎ। দৌড়ে গিয়ে সে পেছন থেকে জাপটে ধরে পল্টুকে। এক ঝটকায় স্টিক কেড়ে নিয়ে বলে– শুয়োরের বাচ্চা, এতবড় সাহস তোর, আমার ফাতেমার গায় হাত তুলতি যাইস!

     

    Close