• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • নিমিদের তেতলা || হাসান ইনাম

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●Hasan Inam eid 2017

    হাসান ইনাম ‘আজ আমি গল্প বলবই’ এরকম একটা প্রতিজ্ঞা করেই প্রতিদিন চা চক্রে বসি। হাসেম সাহেবের বিশাল বারান্দাওয়ালা বাসায় বসে আমাদের চা চক্র। বনেদী আমলের বাসাবাড়ী। তিনতলা বাড়ী হাসেম সাহেবের। নিচ তলায় পুরনো কাঠ কয়লার স্তুপ। নড়বড়ে সিঁড়িপথ মাড়িয়ে দু তলায় উঠতেই একটা বসারঘর চোখে পড়ে। বসারঘর লাগোয়া বিশাল বারান্দা। এই বসার ঘর আর বারান্দা নিয়েই দ্বিতল। তৃতীয় তলায় বোধকরি কয়েকটা শোবার ঘর আর রন্ধনাগার রয়েছে। ১৯ বছরের কোনদিন হাসেম সাহেবের বাড়ীর তেতলায় উঠিনি। উঠেনি এর কারণ উঠতে চাইনি এমন না। সুযোগ হয়নি। একজন ভদ্রলোকের বাড়ী গিয়ে যদি যেচে পড়ে বলি ‘ভাই! আপনার বাড়ীর তেতলাটা দেখার না খুউউব শখ আমার। একটু দেখাবেন! ‘ ব্যাপারটা কী ভালো দেখায়? একবার অবশ্য সুযোগ আসার পরেও উঠা হয়নি নিজের দোষেই। সে কথায় পরে আসছি আমার রুমের জানালা থেকে দিব্যি দেখা যায় হাসেম সাহবের বাড়ীর তেতলা। তিনটে বারান্দা। ছ’টা জানালা। রন্ধনাগারের চুল্লি। সবকিছুই আমি দেখতে পাই এবং দেখি। দেখতে দেখতেই চিন্তা করি ‘আজ আমি গল্প বলবই’। সন্ধ্যে নামতে এখনও ঢের বাকি। বিকেল হলো মাত্র। পাড়ার ছেলেরা হুল্লোড় করছে রাস্তায়। পাশের পাড়ার সাথে ক্রিকেট ম্যাচ ছিলো ওদের। বোধহয় জিতে এসেছে। গতরাতে ওরা এসেছিলো চাঁদা নিতে। ব্যাট কিনবে বলে। চায়ে চুমুক দিয়ে জানালার কাছে আসলাম। ওদের মধ্যে যে ছেলেটা একটু বড়। মোচ উঠেছে রেশমি সুতোর মতো, ও খুব চেচাচ্ছে। গলা ফাটিয়ে বলছে ‘ভিক্টরি ক্লাব ইজ উইন দ্যা ম্যাচ’। ছোকড়ার বিজয়উল্লাসে কেমন যেন খাদ দেখতে পেলাম। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে ওর উচ্ছাস ম্যাচ জেতার জন্য ঠিকরে পড়ছে না বরং হাসেম সাহেবের ১৯ বছরের কন্যা মারিয়ার জন্যই ছোকড়া ওমন করছে। মুচকি হাসলাম। গোফের নিচের কিয়দংশে চা লেপ্টে গেলো। আজকে কেন যেন সময় ফুরচ্ছে না। ফ্লাক্সের মধ্যে যেমন চা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গরম থাকে তারপর কোল্ডি টি হয়ে যায় তেমনি করে মন হচ্ছে যে আমার ভিতর নড়াচড়া করা গল্পগুলো একটা নির্দিষ্ট সময পর্যন্তই থাকবে। তারপর হয়তো হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো চুপসে যাবো। আর এমনটাই হয়ে আসছে প্রতিদিন। চা চক্রে এসে থাকেন নিয়মিত তারা আমার এই অভ্যাসটার বা রোগটার কথা ভালো করেি জানে। বিশেষ করে হাসেম সাহেব। প্রথমে যেয়েই আমি প্রথমে যেয়েই হাসেম সাহেবের কানে কানে বলি ‘ ভাই! আজ কিন্তু চমৎকার একটা গল্প বলবো। একদম শিওর।’ হাসেম সাহেব আমার কথা শুনে ফিজ ফিচ করে হাসেন। পানের পিক ফেলে রায়হান সাহেবের দিকে তাকিয়ে একটা চোখ টিপি দেন। সমস্যা হলো হাসেম সাহেব যদি মাইন্ড করেন। উনি কি আমাকে পাড়া থেকে বের করে দেবেন? না.. এমন কিছু হয়তো করবেন না। আমাদের সবারই তো বয়স হয়েছে। এসব নিয়ে কেউ কিছু মনেই করবে না হয়তো। আর আমি কীনা এখনও ওসব মনে করেই বেঁচে আছি। অবশ্য বেঁচে থাকার জন্যই মনে রেখেছি। যেদিন প্রথম এসেছিলাম এই পাড়ায় সেদিন থেকে এখনও সব মনে আছে। সকালে পোস্ট অফিসের সামনে যখন দাঁড়িয়েছিলাম, একদম প্রথম দিন। রিকশা পাচ্ছিলাম না। নতুন বাসায় উঠবো। মালপত্র সব উঠে গেছে। আমি পোস্ট অফিসে এসেছি চিঠি পোস্ট করতে। মাকে চিঠি পোস্ট করে বাইরো বেরুতেই বৃষ্টি শুরু হলো। ঝুম বৃষ্টি। পোস্ট অফিসের সামনে গোটা বিশেক লোক। রিকশা নেই একটাও। একটা রিকশা এলো। এগিয়ে গিয়ে দেখি রিকশায় এক যুবতী বসে আছে। ডাগর ডাগর চোখে আমাকে ইশারায় রিকশায় উঠে বসতে বললো বলে মনে হলো। আমি বিশ্বজয়ি হাসি দিয়ে রিকশায় উঠতে গিয়েই বিপত্তি ঘটলো। রিকশারোহী রি-রি করে উঠলো। কন্ঠটা এখনও কানে বাজে। মিহি চাপা মৃদ কন্ঠস্বর। ভিমড়ি খেয়ে বুঝলাম উনি আমাকে উঠতে বলেননি। রিকশা রেখে মেয়েটা পোস্ট অফিসে ঢুকলো। কাহিনীর অকম্মিকতায় আমি কখন চুপসে গেছি। লজ্জা আর ক্ষোভে ফোঁৎ ফোঁৎ করছি। আনমনেই রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম ‘কোত্থেকে আনছেন ভাড়া? ‘ রিকশাওয়ালা বললো ‘গোলাপবাগ’। আরে আমিও তো গোলাপ বাগেই যাবো। মেয়েটার পিছু পিছু যেয়ে ঠিকানা জেনে আসা উচিত। শিক্ষা আমি দিয়ে ছাড়বই। ওই মেয়েটাই ছিলো নিমি। আমার জীবনের একমাত্র নারী। সেই থেকে নিমির সাথে আমার পরিচয়। নিমি সেদিন পোস্ট অফিস থেকে বেরিয়ে আমাকে রিকশায় তুলে নিয়েছিলো। রিকশায় বসেই পরিচয় হয়েছিলো আমাদের। জানতে পারলাম নিমির একজন পত্রবন্ধু আছে। তাকে প্রতি সপ্তাহে চিঠি পাঠায়। আমার তখনও টনক নড়েনি। হঠাৎ বদলি হয়ে নতুন শহরে এসেছি মাত্র। সবকিছু তখনও গুছিয়ে উঠিনি। গুছিয়ে আসিনি পুরনো শহরে। গল্পগুলো আমার বলতেই হবে। আমি তো এতদিন সব না বলে থাকলাম। এবার বলা উচিত। বলা উচিত হাসেম সাহেবের জন্য। সন্ধ্যে নেমে গেছে প্রায়। আমি হাসেম সাহেবের বাড়ীর দ্বিতীয় তলায় বসে আছি। আমার পাশে মাশকুর সাহেব। মাশকুর সাহেব অধ্যাপনা করেছেন সারা জীবন। চা চক্রে এসেও লেকচার মারা শুরু করেন। মোটামুটি সবাই এসে গেছে। আমি হাসেম সাহেবের দিকে তাকালাম। যথারীতি আজকেও উনি কেঁদেছেন খুব। আমি বিশ্বাস করি আজকের গল্পটা শোনার পর থেকে হাসেম সাহেব আর কাঁদবজেন না। কেউ কিছু বলে উঠার আগেই হাসেম সাহেব বললেন ‘আমি একটা গল্প বলবো।’ আমরা চমকে উঠলাম না। এটা উনার স্বভাববিরোধী না । উনি সবসময় গল্প বলতে চান। আমরা মতামত দেওয়ার আগেই হাসেম সাহেব সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলা শুরু করলেন ” একটা মেয়ের গল্প। অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় নিজের অমতে এক টাক পড়া উকিলের সাথে। মেয়েটা মাত্র মেট্রিক দিয়েছে। রেজাল্ট পেলো উকিলের বাড়ি বসে। উকিল সারাদিন কোর্টে থাকে। স্ত্রী কে সময় কম দেয়। স্ত্রীর সাথে মেলামেশাও কম করে। বলা যেতে পারে সেই কম বয়সী মেয়েটা অনেক দুঃখী” নিশ্বাস নিলেন হাসেম সাহেব। গল্প থামাতেই মাশকুর সাহেব খিক খিক করে হেসে উঠে বললেনন ” আজকেও এই গল্প!! জমবে না মনে হচ্ছে। প্রথমেই সেই সস্তা হিউমার কপচানো কাহিনী । এ গল্পের পরিণতি আমরা বুঝে নিছি দুই বছর আগেই। নতুন কিছু বলেন — হাসেম সাহেব কথার তোয়াক্কা না করে আবার বলা শুরু করলেন – “তখন ছিলো পত্রমিতালীর সময়। পত্রসূচি পত্রিকা থেকে এক যুবককে বন্ধু বানালো মেয়েটা। যুবক সবে লেখাপড়া শেষ করেছে। চাকরি খুজঁছে। দুজনের ভাব জমলো প্রচুর। উকিলের অগোচরেই সেই যুবকের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়লো মেয়েটা। এভাবেই চলতে থাকলো। একদিন মেয়েটা প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়লো। উকিলের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। কারণ বিয়ের তখন দুবছর চললেও… ” ফাহিম সাহেব জোরে হেসে উঠলেন। বুঝে গেছে সবাই গল্পের শেষটা। আমি চুপটি করে বসে আছি দেখে পাশ থেকে যিয়াদ সাহেব বললেন – ‘ কীভাবে সেই পত্রবন্ধু যুবকের সাথে মেয়েটার বেড শো হয়েছিলে সেটাই কিন্তু আজকে বলার কথানছিলো। দুজনের দেখা হলো কি করে? ‘ ” কি গো হাসান ভাই! আপনি এখনও শুরু করেননি? ” আমি খানিকটা চা মুখে দিয়ে চিরচেনা ভঙ্গিমায় প্রতিদিনকার মতো বললাম ‘গল্পটায় অনেক অস্পষ্টতা আছে। আমি আরেকটু জুড়ে দিতে চাই। ” হাসেম সাহেবও পা দুলিয়ে বললেন ‘বেশ… বেশ” আমি শুরু করলাম ” ইবু নামে একটা দারোওয়ান ছিলো মেয়েটা যে বাড়ী থাকতো সে বাড়ীতে। ওই দারোয়ানের ভাষ্যমতে উকিল রাতে যখন বাগী ফিরতো তখন মাতাল হয়ে ফিরতো। মাঝে মাঝে রাতে নিজের বাড়ীতে বন্ধু বান্ধব নিয়ে বার বসাতো। সারারাত চলতো মাতলামী। মেয়েটা তখন…… ” হাসেম সাহেবের হাত থেকে কাপ পড়ড়ে গেলো। সবার হো হো করে হেসে উঠলো। আমি জানি গল্পটা হাসেম সাহেবের মতো ধুরন্ধর উকিল আমাকে কখনই বলতে দেবেন না। তারপরেও আমি নিজের মুখে একবার স্বীকার করতে চাই আমিই মারিয়ার বাবা। ” এই নিয়ে একশো বিরানব্বুইটা ” হো হো করে হেসে উঠে একসাথে সবাই বলে উঠলো। আমিও মনের খাতায় যোগ করে নিলাম সংখ্যাটা। একশো বিরানব্বইতম বার আমি ব্যর্থ হলাম আমার গল্প বলতে। হাসেম সাহেব মুচকি হেসে ভাঙা কাপটার দিকে পা ছুড়ে বললেন “আজকেও পারলাম না… ধরে রাখতে আর কি? ‘ আমিও বলতে পারলাম না যে, নিমি সেই পত্রবন্ধুর সাথে নয় আমার সাথেই…… তেতলার সিঁড়ি দেখা যায় বারান্দা থেকে। একটানা কিছু সময় তাকিয়ে থাকলাম। নিমি যে রুমে আত্মহত্যা করেছিলো সে রুমটা দেখা গেলো না। রুমটা দেখার জন্যই কেবল ১৯ টা বছর কাটিয়ে দিলাম।

    Close