• আজ রবিবার, ২৭শে মে, ২০১৮ ইং ; ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ১১ই রমজান, ১৪৩৯ হিজরী
  • বাসাবোতে বউয়ের সঙ্গে বসবাস || সাদ রহমান

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●

    সাদ রহমান

    সাদ রহমান ● রোহান নামের একটা পার্ট মারা ছেলের সঙ্গে পরিচয় হইছিল আমার, বাসাবোর কোন একটা মেসে, কয়েকবছর আগে। আমি প্রথমদিন তারে জিগেস করলাম, ‘তোমার নাম কিভাবে রোহান হইলো একটু বলবা?’ আমার এমন জিজ্ঞাসায় সেই ছেলে ক্ষাণিক সময় চমকিত হইয়া ছিলো, এবং পরক্ষণেই সামলায়ে নিতে নিতে বলছিলো, ‘নিজেই রাখছি। বাবা রাখছিলো রফিকুল ইসলাম, আমার পছন্দ হচ্ছিলো না।’ ঘটনা যে এমন হবে তা আমি আগেই ধরতে পারছিলাম, তাই রোহানের এই উত্তর শুইনা ভালো লাগছিলো। বলছিলাম, ‘ও আচ্ছা।’

    রোহান যে একটা পুরাদস্তোর শহরের নাম, আর রোহানরে যে দেখতে সম্পূর্ণই অ-শহরের লাগে, এই ব্যাপারটা সে টের পাইতো না। আর বোধ করি এই টের না পাওয়ার স্বাভাবিক সেন্স না থাকার দোষেই সে আজকে এই গোয়ামারাটা খাইলো। একটু আগে আমি সেই আদাবরে গিয়া ওর সঙ্গে দেখা কইরা আসছি, বলা যায় মায়া হেতুতে। দেইখা আসছি ওর একটি হাত ভাঙ্গা, হাতটি গলাতে ঝুলতেছে, আর ওর চোখের দিকে তাকাইলেই লজ্জায় ওর চোখ দুইটি নত হয়ে আসতেছে। ভাবতেছিলাম এই নত হয়ে আসায় যত না লজ্জা আছে, তার অধিক যেনো আছে দুঃখ। বাট কিছুই করার নাই।

    আমি রোহানের সঙ্গে অল্পক্ষণ হাসাহাসি কইরা বাসায় চইলা আসলাম। বউ জিগাইলো, আদাবর ক্যানো গেছিলাম। বললাম, ‘এক পোলা আছে, মাইর খাইছে গুন্ডাদের হাতে। ওরে দেখতে গেলাম একটু।’ এই কথা বইলা আমি পানি চাইলাম বউয়ের কাছে। বোধকরি এতে আমাকে একজন ক্লান্ত আর অফিস ফেরত স্বামীর মতোই দেখাইলো, যেইরকম আমি হইতে চাই না কোনদিন। এইরকম ক্লান্ত এক স্বামীর মতো কইরা পানি আমি কখনো চাই-ও না। আমার বউ আমাকে যথেষ্টই চিন্তিত মুখে পানি আইনা দিলো। আমার ধারণা, আমার এই ক্লান্ত মুখের দিকে তাকায়ে যতো চিন্তা তার হইলো, তার চাইতেও বেশি চিন্তিত সে করলো অন্য কারণে। আমার আজকের এই রোগী দেখতে যাওয়ার ঘটনারে সে মোটেই বিশ্বাস করতে পারলো না।

    বউ ব্যাপারটারে একটু ঘাটানোর পরকিল্পনা থেকেই বোধহয় জিগ্যেস করলো, ‘ভয়ঙ্কর কিছু কি?’ আমি বললাম, ‘নাহ’। বইলা আমি বাথরুমের দিকে যাইবার মনোস্থ করলাম। কিন্তু অদ্ভুত কারণে, হয়তো বা বউয়ের এমন এক তীক্ষ্ম দৃষ্টির ভিতরে আমাকে ঢুকতে হবার কারণেই আমি হালকা হালকা ইতস্তত করতে লাগলাম। এমনও হতে পারে যে, মনে মনে আমি ভাবতে লাগলাম ওই পোলার কথা, যার নাম রোহান কিন্তু আমি ডাকি রফিক, পোলাটা আজকে মাইর খাইলো। বউ আমারে বাথরুমে যাওয়ার সুযোগ কইরা দিয়া বারান্দার দিকে গেলো। দুঃখের ব্যাপার, একটা সত্য ঘটনাই আপন বউকে বিশ্বাস করানো গেলো না। অবিশ্বাস কইরা বসছে সে। আশঙ্কা হইলো মনে, অনেকদিন পর আজকেও কি সে অল্পসল্প কান্নাকাটি করবে? ফলে আমার উপর ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করার দায় ফরজ হয়ে পড়বে? এক পর্যায়ে, বউয়ের কান্নাকাটির অবসান হইলে পরে ভাত খেয়ে আলগা আনন্দ সহ, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়বার তাড়নাও পোহাইতে হবে?

    বউয়ের সঙ্গে এমন একটা সাজানো নাটকের মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছি ভেবে ভেবে গোছল করলাম। গুনগুন কইরা গানও বুঝি গাইলাম। বউয়ের ব্যাপারে পজেটিভ থাকবার কিছুটা মিথ্যা প্রচেষ্টাও নিলাম। যেমন ভাবলাম, সব কিছুর পরেও বউ তো ভালোই বাসে আমাকে। ফলেই না এতোসব সন্দেহ আর আপত্তি। ভাবলাম, আমাদের বিয়া হইছে প্রেম কইরা নিজেরা নিজেরা, ফলে একটু তো প্রেম-প্রেম ভাব থাকতেই হবে আমাদের।

    অবশ্য একথাও ঠিক যে, কখনো কখনো আমি চরম রকম বিলাও খাইয়া যাই। মনে মনে ভাবি, কি এক ফ্যাসাদে তুমি আমারে ফলাইলা গো আল্লা! আমার বখাইটা সেই জীবনটারে সংসারের পানিতে ভিজাইয়া ভিজাইয়া এমনই পোতাইয়া দিলা! আজকাল দোকানদারও আমারে দাঁড় করাইয়া রাখে। সদাই দিতে বিলম্ব করে। আমার এই পাওয়ারলেস জীবনের জন্য আমি সম্পূর্ণভাবেই আমার বউরেই দায়ী করি। এই বউয়ের সঙ্গে আমার প্রথম যেদিন হঠাৎ দেখা হয়, সেইদিনের কথা ভাবি। আর এতোই যে ভালো লেগে যায় সেদিন মেয়েটাকে, ভাবি এইজন্যই এইসকল যাতনা আমাকে বহন করতে হয়। বউরে আমি মাঝে মাঝে এইসব দুঃখের কথা বলি, বউ কিছু বলে না, মিটমিট কইরা হাসে।

    এই বাসাবো এলাকাতে আমাদের বাস করা পৈত্রিক ব্যাপার। কিন্তু ওইভাবে এইখানে আমাদের ক্লাসিক কোন বাগড়ম্বর দেখানোর চান্স ছিলো না। চাইলেও আমার বাপের পক্ষে মসজিদের কমিটির একজন হর্তা হয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নাই। কেননা আমার বাপের ছিলো রিকশার ব্যবসা, রিকশার গ্যারেজ। সেই গ্যারেজ ছিলো তার নিজের জায়গায়। সেইখানে তিনি রাতের বেলাতে কাঠের টেবিল নিয়া মদ খাইতে বসতেন, চিল্লাচিল্লি করতেন। আমার বাপের চিল্লাচিল্লি এখনো ফুরায় নাই। বাট রিকশার গ্যারেজটা আর নাই। আমার বাপের সেই জায়গায় এখন আছে সারি সারি মুদির দোকান। ওইগুলা উনিই দেখাশোনা করেন।

    আর আমি করি অফিস। আমার বউয়ের সঙ্গে আমার প্রেম হইবার অনেকদিন পরে সে একদিন আমারে একটি চাকরির ব্যাপারে বললো। আমি আন্দাজে মান্দাজে অনার্স পাশ কইরা পরে ব্যবসার ফন্দি ফিকির করতেছিলাম। দুই একটা এই সেই ব্যবসা আমার আগে থিকাই ছিলো বটে। বউ বললো, ঢুকো এই কোম্পানিটাতে, আমার ফ্রেন্ডরা আছে। তাই আমি ঢুকলাম কিছু পারা না পারার হিসেব না কইরাই। এবং কোনভাবে কাজের হিসেব বুইঝা ফেইলা ওইটাই আমি কন্টিনিউ করলাম। সর্বপরি ভাইবা দেখলাম, ব্যবসা বাণিজ্য কইরা চললে আমার এই শুদ্ধ ভাষার একমাত্র বউটার সঙ্গে ঝামেলা পাকায় যাবে। আমাদের যে পোলা কিম্বা মাইয়া হবে, তার উপরেও এর প্রভাব পড়বে। বরং আমি আর আমার বউ ভেবেচিন্তে বাপ-মার কাছ থিকা হাসিমুখে পৃথক হইয়া গেলাম। বাপের লম্বা একতলা বাসাটা রাইখা এই এপার্টমেন্টের ছয়তলায় উইঠা যাওয়াতে বেশ ভালোই হইলো। আমার কেবল এইটাই কষ্ট যে, অফিস করতে যাইতে হয় বাংলা মোটর।

    অফিস থেকে ফিরে কোন কোন দিন দুর্ভাগ্যবশত দেখা যায় বউয়ের নাকে মুখে নিকনিক কান্না ঝুলতেছে। সেইদিন সেই কান্না আমাকে থামাইতে হয়। আজকেও তেমন একটি দিন, এই কথা ভাবতে ভাবতে বাথরুম থিকা গোছল কইরা বের হয়ে আসলাম। মনে হচ্ছিলো বউ এখনো বারান্দায়, দেখলাম সে রান্নাঘরের দিকে যাইতেছে। আমি শোয়ার ঘরে ঢুইকা টেবিলের উপর রাখা মোবাইলটাকে দেখলাম, আগের জায়গা থেকে সরে মোবাইলটা উল্টায় আছে, বুঝলাম বউ সেইটা ঘাটাইছে। আমি বউকে ডাকলাম, জিগেস করলাম, ‘খাবার কি হইছে?’ বউ কোন উত্তর না দিয়া কাজের বেটিকে ডাকলো। আমাদের কাজের বেটির নাম রিনা। আর আমার বউয়ের নাম টিনা, আমার বউ টিনা সেই কারণে কাজের বেটিরে নাম ধইরা ডাকে না, ডাকতে সময় এঁই ঊঁই করে। এখনোও তাই করলো।

    আমি রফিককে একটা ফোন করলাম, বললাম, ‘তুই থানায় জিডি না কইরা থাকলে কইরা ফেল।’ রফিক বললো, ‘এখন জিডি কইরে কি বাল হবে ভাই? জিডি করলে অগোরে আর রডের পিডা দেওয়া যাইবো না।’ বললাম, ‘তুইও কি মারবি নাকি? জানতাম না তো! তাইলে বাদ দে ওই জিডিফিডি।’ এই বইলা ফোন রাখলাম। এতক্ষোনে বউ এসে ঘরে ঢুকছিলো বলেই আমি মাইরের পক্ষাবলম্বনে শেষ দুই বাক্য আওড়াইলাম। একটু পরেই রফিককে আমার ফোন করে মাইরের ব্যাপারে পুনরায় শোধরায়ে দিতে হবে। কিন্তু অবাক করা বিষয়, আমার শান্ত চোখের শান্ত মনের শিক্ষিত বউ, মাইর দেওয়ার পক্ষে এমন একটা নিকৃষ্ট সাফাই শুইনাও বিচলিত হইলো না, আমার প্রতি তার অবিশ্বাস আগের মতোই বলবৎ রইলো। সে ব্যস্ত ভঙ্গিতে আয়নার টেবিল হতে একটা ক্লিপ চুলে জড়াইতে জড়াইতে রান্নাঘরের দিকে চইলা গেলো। আমি আবার বউকে ডাকলাম।

    বললাম, ‘এই হলো ঘটনা।’ বউ বললো, ‘কি হলো ঘটনা?’ বললাম, ‘তোমার তো রফিকরে চেনার কথা।’ সে বললো, ‘না রফিককে আমি চিনি না।‘ বউ তার কপাল মুছলো ওড়না দিয়ে, আর ভরাট দুইটি বুকের ওপর ওড়নাটিকে পুনরায় ভেজাইয়া রাখলো। আমি এই ফাঁকে প্রেমের ভঙ্গিতে বউয়ের বুকের দিকে তাকাইলাম, কিন্তু এতে আরো উলটা হইলো। সে খাবার বাড়ার ব্যস্ততা সহ আবার চইলা গেলো। একটা চিন্তা খেলে গেলো আমার মাথায়, আচ্ছা! বউয়ের কি এই কথা ভাববার সুযোগ আছে যে, আমি আদাবরে তার ছোট বোন শাওনের বাসায় যাইতে পারি?

    খাবার খাইতে সময় নিজ থিকাই আমি বললাম, ‘তুমি কি ভাবছো নাকি আমি শাওনের বাসায় গেছিলাম?’ এমন ক্যাবলা একটা প্রশ্ন করছি বউকে, প্রশ্নটারে জাতে তোলার জন্য প্রশ্নের পিঠে একটা শয়তানি হাসিও হাসলাম। এতে বোধকরি কাজে দিলো। বউ তার নিজের খাবারের পাত হতে চোখ উঠায়ে হালকা মোটা চশমার ফাক দিয়া জানাইলো, তেমন কিছু সে ভাবছে না। বরং আমি যদি কোন অপরাধ কইরা থাকি, সেই অপরাধের ক্ষতেই আমি জ্বলতেছি। খিক কইরা হাইসা উইঠা যথেষ্ঠ সহজ ভঙ্গিতে বউয়ের এই কথা ডিফেন্স করতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু না, হাসতে গিয়া নাকে মুখে ভাত উঠলো আমার। বউ গ্লাসে পানি ঢেলে দিলো।
    বিয়ার শুরুর দিকে একবার এমন হইছিলো, এইরকমের একটা ঘটনারে কেন্দ্র কইরা ভাত খাইতে খাইতে হঠাৎ করে বউ তার কাঁচের পাত মাটিতে ছুঁইড়া ফেলছিলো। তখন অবশ্য আমরা একতলার বাসায় থাকতাম। মায়ের কারণে টিনা সেবার রেহাই পাইছিলো। বাট আজকে যদি এমন কিছু করে ওই, কে তাকে বাঁচাবে আমার হাত থেকে? মনে মনে আমি মিলাচ্ছিলাম, আজকের সঙ্গে ওই দিনের কি এমন মিল আছে, যা আজকেও বউয়ের ওই প্লেট ছুঁইড়া মারার ঘটনা আমাকে মনে করায় দিলো। মিলটা কি এমন যে, দুইদিনই সম্পূর্ণ মিথ্যা এক সন্দেহ ছিলো বউয়ের মনে, এবং দুইদিনই সন্দেহের তোড় ছিলো তার ছোটবোনের দিকে। দ্বিতীয় মিলটাকে বেশ যৌক্তিক মনে হইলো। শাওনেরে নিয়া তার সন্দেহ তৈরি হইলে সে বেশি বেশি রিএক্ট করতে পারে, বোন বইলা কথা। কিন্তু সবচে বড় কথা, তার বোনের ব্যাপারে সে ক্যানো এমন সন্দেহ করবে?

    খাবারের পরে আমি বউকে বললাম, ‘শুনো আমি রফিকের কাছেই গেছিলাম। নট শাওন, আমি তোমার ওই মোটা বোনের ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী না।’ এই কথায় বউ তার হাতের ক্লিপ ছুঁড়ে মারলো, এবং এর ভিতর দিয়া সে আলাপে ঢুকলো। আমি ছুঁড়ে মারা ক্লিপটি হতে নিজেকে বাঁচিয়ে যথাসম্ভব মাথা ঠাণ্ডা রাখলাম। আবারও বললাম, ‘শুনো, ঘটনা সত্যই ওইরকম না।’ বউ প্রায় চিৎকার কইরা উঠলো, বললো, ‘এতোই যখন চাও ওকে, ওকেই বিয়াটা করতা।’ বউয়ের এই যুক্তিহীন চিল্লাচিল্লির পিছে কিছু অবশ্য যুক্তিও আছে। যেহেতু শাওনের সঙ্গেই আমার আগে পরিচয়, শাওনের সূত্রে টিনার সঙ্গে। আর আমার বউ টিনা এখনো বুইঝা ওঠে নাই, শাওনের সঙ্গে আমার পরিচয়ের সূত্র কি।

    এইক্ষেত্রে শাওনের সঙ্গে আমার সহজ সম্পর্কের ব্যাপারটা বইলা ফেলা যাক। শাওনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেকটাই বন্ধুতাপুর্ণ। শাওন একবার এক পোলারে নিয়া আইসা কেচকি খাইছিলো বাসাবোতে, তথা কট খাইছিলো, ঝামেলায় পড়ছিলো এলাকার পোলাপানের হাতে। সন্ধ্যার পরে কারেন্ট চলে গেছিলো, এই সময়ে শাওন ওই পোলার সঙ্গে গলির ভিতর দিয়া রিকশার হুট তুইলা দিয়া যাইতেছিলো। এলাকার পোলাপান সাধারণতই এইধরনের কেস থিকা বিরত থাকে, কারণ ভিকটিমের চেহারা না দেখে ধরলে চেনা লোক পইড়া যাতে পারে। তাও এই কেস ওরা ক্লোজ কইরা দিতে পারলো না। উত্তেজনায় শাওনদেরকে রিকশা থিকা নামাইয়া এলাকার পোলাপান টাকাপয়সা চাইতে আরম্ভ করলো। শাওনের বক্তব্য ছিলো, একজন কিনা তার পাছাতে টিপও মারছে অন্ধকারের মধ্যে। আমি যখন ঘটনাস্থলে গেলাম, শাওন এই পাছা টিপ মারার গল্প বইলা আমাকে কনভিন্সড কইরা ফেললো। মাইয়া মানুষের শরীরে হাত! এইরকম একটা প্রশ্ন তুইলা আমি সেইদিন শাওনদেরকে বাঁচাইয়া দিলাম, চইলা যাইতে বললাম ওদেরকে। শাওন আমাকে ‘ধন্যবাদ ভাইয়া’ বইলা মোটা পাছা দুলাইয়া রিকশায় উঠতে নিলো। ঠিক এই ফাঁকেই আমি নিচু স্বরে ওকে জানাইলাম, প্রায় সন্ধ্যায় আমারে তালতলা মার্কেটে পাইবেন, আমরা ওইখানে আড্ডা মারি।

    এই থিকা আর কি শাওনের সঙ্গে পরিচয়, আর এই পরিচয়ের সূত্র স্বভাবতই আমাকে গোপন করে যাইতে হইছে বউয়ের কাছে। ফলে বউয়ের মনে আমার আর শাওনের ব্যাপার স্যাপার ক্যামন একটা ঘোট পাকাইছে। আমি বিছানায় বইসা লেপটপের পিঠ খুইলা ফেসবুকে লগ ইন করলাম। মেজাজ এবার খারাপ হইতেছিলো, গলায় গম্ভীরতা আইনা বললাম, ‘তুমি শাওনকে ফোন দাও।’ সে অস্বীকৃতি জানাইলো, কারণ এতে কইরা তার মুখ থাকে না। বললাম, ‘খোঁজ নেওয়ার জন্যও তো তুমি ফোন করতে পারো। আমি গেছিলাম নাকি তার জামাইয়ের বাসায়, এই কথা তারে নাই জিগাস করলা।’ বউকে এইসব বলতে বলতে ফেসবুকে ঢুকলাম, পরক্ষণেই দেখলাম রফিক তার গলায় ঝোলানো সাদা হাতের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করছে। একটি নয়, তিনটি। ছবিগুলোর উপরে লেখা, ‘ছেড়ে দিবো না, সুস্থ হতে দে!’ গুন গুন কইরা বললাম, শালা মগার বাচ্চা মগা!

    আমার এইটাইপ গুনগুনানিতে বউ তার চোখ বড় বড় কইরা ফেললো, ‘কি বললা?’ আমি লেপটপটা তার দিকে ঘুরায় দিলাম, বললাম, ‘মগায় নাকি পিটাবে।’ বউ হালকা একটু হাসলো বোধহয়। আমারও প্রেমিক স্বামীর মন, একটু যেনো স্বস্তি পাইলো। মন থিকা ইগোও সইরা গেলো কিছুটা। ফলে এই স্বস্তি থিকা আমি শাওনকে কল দিয়া ফেললাম। শাওন কল ধইরাই গুনর গুনর করতে করতে, দুলাভাই দুলাভাই ডাকতে ডাকতে, একসময় আবদার করলো, আমরা যেনো কাল মায়ের বাসায় চইলা যাই রামপুরায়। সে আজকে দুপুরেই মায়ের বাড়িতে গেছে। আমি কণ্ঠে আনন্দ যোগ করে জানতে চাইলাম, ‘জামাই সহ গেলা নাকি?’ শাওন বললো, ‘হু!’ ফোনালাপের এমন পরিস্থিতিতে বউ উইঠা আইসা আমার কান হতে ভদ্র ভঙ্গিতে মোবাইলটা নিয়া নিজের কানে রাখলো।

    আমি আড়মোড়া ভাঙলাম। বউ তার বোনকে বললো, ‘মা কে দে তো!’ এরপরে সে মায়ের সঙ্গে ক্ষাণিকখন বিভিন্ন ওষুধ-পত্র আর নানামাত্রার থেরাপি নিয়া আলাপ করলো। ফোন রাখবার আগমুহূর্তে জিগ্যেস করতে শুনলাম, ‘শাওনরা কবে আসছে মা?’ সহজভাবেই বুঝলাম ওর মা ওকে জানাইছেন যে, দুপুরে। ফোন রাইখা বউ লেপটপের দিকে তাকাইয়া চিন্তিত হইলো। বললো, ‘দেখি তোমার রফিককে। কারা মারছে?’ আমি রফিককে দেখাইলাম আর কাহিনীটাও বললাম। কাহিনী শুনে আমার বউয়ের ভিতর থেকে যেনো একটি মায়াবি ডাক বের হয়ে এলো। সে আমার কাছে রফিকের ফেসবুক আইডিটা চাইলো, পরক্ষণে হাসলো।

    Close