• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • মুদ্রার দুই পাশ || নবনী আহমেদ

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●

    Nabani Ahmed eid 2017

    নবনী আহমেদযোহর এর নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে তাড়াহুড়ো করে বের হতে গিয়ে হোঁচট খেলেন রফিকউদ্দিন। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। যদিও এগুলো কুসংস্কার,তবুও কেন জানি খুব খারাপ লাগছে। বড় মেয়ের এস.এস.সি এর রেজাল্ট হয়তো ইতোমধ্যেই দিয়ে দিয়েছে। মেয়েটাকে নিয়ে অনেক আশা তার। টেনশনে গা ঘেমে একাকার।

    তিনি দ্রুত বাড়ির দিকে রওনা হলেন। মাঝ রাস্তায় যেতে না যেতেই দেখেন তার ছোট মেয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে এদিকেই আসছে।
    “কিরে মা, কি খবর?”
    “ভালো বাবা।আপা ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছে!”
    ” আলহামদুলিল্লাহ!”

    রফিকউদ্দিন মেয়ের হাত ধরে হাঁটা শুরু করলেন।পিতা কন্যা দুই জনেরই চোখে অশ্রু।এই অশ্রু সুখের,আত্মতৃপ্তির আর স্বপ্ন টাকে বাস্তবে রূপায়িত হতে দেখার আনন্দের অশ্রু।
    রফিকউদ্দিন ছোট একটা চাকরি করেন।তার বয়স অনেক।আর মাত্র ২ বছর এর মাঝেই রিটায়ার্ড করবেন তিনি।পিতার সংসার টানতে গিয়ে নিজের সংসার শুরু করতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিলো। অজানা কারনে প্রথম সন্তান ঘরে আসতে দেরি হয় ৫ বছর। সব মিলিয়ে তিনি জীবনে শুধু পিছিয়েই গিয়েছেন। তার দুটি মেয়ে-রিমা আর রিমু।নিজে স্বল্প শিক্ষিত হওয়ার কারণে মেয়েদের কে সাধ্য অনুযায়ী পড়াশোনা শিখানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
    বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই বড় মেয়েটা এসে জড়িয়ে ধরল।
    “কিরে মা, কাঁদিস কেন?”
    “খুশিতে বাবা।”
    ” আরে ধুর পাগলি কাঁদতে নেই।আর শোন তোর পছন্দের কলেজের নাম কিজানি মা।ভর্তি কবে খোঁজ রাখিস।”
    “কেন বাবা?”
    “সেকি ভর্তি হতে হবে না?”
    ” আমাকে শহরের কলেজে ভর্তি করবে?”
    ” আমার অতি মেধাবী মেয়েটার পড়ার মত ভাল কলেজ কি এই গ্রামে আছে নাকি?”
    “কিন্তু বাবা!ওসব কলেজে পড়ার জন্য অনেক টাকা লাগবে।আমাদের তো এত টাকা নেই বাবা।”
    “আরে তুই এসব নিয়ে ভাবিস না।শুধু কলেজ এর খোঁজ রাখ।জানিসই তো মা আমি মূর্খ মানুষ,এসব ঠিক বুঝি না।”
    “কী যে বলো বাবা।তুমিই আমার আদর্শ।”
    ” সে কি রিমার মা মিষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে না??বসে আছো যে!”

    রফিকউদ্দিন এর স্ত্রী খুব সাধারণ একজন মহিলা।এই সাধারণ মহিলার অসাধারণ দিক হলো ক্লাস সেভেন পাশ এই মানুষটির পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ বড় বড় ডিগ্রী ধারী শিক্ষিত লোক কেও হার মানায়।মেয়ে দুইটি মায়ের মতই মেধাবী হয়েছে।

    কয়েক দিন এর মাঝেই মেয়ের পছন্দের কলেজে ভর্তি করে আসলেন।কলেজ এর হোস্টেলে থেকে পড়ছে রিমা।নিজে খেয়ে না খেয়ে মেয়েকে ঠিক মতই টাকা দেন তিনি।
    দেখতে দেখতে রিমার এইচ.এস.সি পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল।ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে রিমা।এর মাঝে রফিকউদ্দিন রিটায়ার্ড করেছেন।খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।তবুও থেমে যান নি।রিমার রেজাল্ট হয়ে গেল।সে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) এ চান্স পেয়েছে।রফিকউদ্দিন এর বুকটা গর্বে ভরে যাচ্ছে।সার্থক আজ তার ত্যাগ।

    রিমা ভর্তি হলো বুয়েটে।নতুন জীবন শুরু হল তার।এদিকে রফিকউদ্দিন অনেক বার মেয়ের কাছে যেতে চেয়েছেন।রিমা মানা করেছে বারবার।বলেছে,বাবা আমি বড় হয়েছি।তোমরা এসে কি করবে এখানে?তিনি আর জোর করেন নি।ছোট মেয়ে এস.এস.সি তে অনেক ভাল ফল করলেও বাইরের কলেজে ভর্তি করতে পারেননি।এলাকারই এক কলেজে পড়ছে।মেয়েটা কোন প্রতিবাদ বা আবদারও করেনি কেন জানি।

    রিমা এবার তৃতীয় বর্ষে। ছোট বোন রিমু এইচ.এস.সি শেষ করেছে।রিমার ইচ্ছে বোন ডাক্তারি পড়ুক।নিজের পরিবার নিয়ে খুব আফসোস রিমার।বাবা মা শিক্ষিত না,আধুনিক না।পরিচয় দিতে লজ্জা লাগে।এই জন্য কখনো ক্যাম্পাসে আনেনি বাবা মা কে।রিমু যদি ডাক্তার হয় তাহলে মানুষ এর কাছে মাথা উঁচু করে পরিচয় দিতে পারবে।
    কিন্তু রিমু ডাক্তারি পড়বে না।সে জানে মেডিকেলে পড়ানোর সামর্থ্য তার বাবার নেই।

    সে ভর্তি হল এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে।বাবা মা অনেক খুশি।কিন্তু বড় আপা বাদে।
    সব বাধার মাঝেই রিমু ক্যাম্পাস লাইফ শুরু করলো।টিউশনি করায় সে।মাঝে মাঝে বাবা মা কে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসে।রিকশা করে ঘুরে এক সাথে।সেই সময় টাতে বাবা মার মুখে যে তৃপ্তি আর মুগ্ধতা সে দেখেছে তার জন্য সব করতে রাজি সে।

    “জানো বাবা এইটা আমাদের গ্রন্থাগার।আমরা বই পড়ি এখানে।কত্ত যে বই বাবা!!!”
    রফিকউদ্দিন মুগ্ধ হয়ে যান।নিজেকে বড্ড সুখি মনে হয়।

    “মা….এইটা আমাদের ক্লাসরুম।”
    “সে কি এত্ত বড়!!!!কিন্তু তোদের ব্ল্যাকবোর্ড নাই কেন রে।মাস্টার কোথায় লিখে?”
    “এই যে মা।এর নাম হোয়াইট বোর্ড।এতে লিখে।চক দিয়ে না।কালো এক ধরনের কলম দিয়ে।”
    ছোট শিশুর মতই মুগ্ধ হয় বাবা মা মেয়ের কথা শুনে।

    রিমু ফাইনাল ইয়ারে উঠে গেল।বড় আপা পাশ করে বের হয়েছে।বিয়ে হয়েছে অনেক বড় ঘরে।অনেক খানি দূরত্ব রেখেই চলে রিমুদের সাথে।
    রিমুও কখনো বেশি কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেনি।রিমুর ক্যাম্পাসে বড় আপা আসতে চেয়েছে। রিমু আসতে না করে।আপা বারবার কারণ জানতে চায়।রাগারাগিও করে।

    আজও করেছে।আপার মুখের ওপর কথা রিমু কখনোই বলেনি।শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে রিমু আজ বোনকে একটা মেসেজ সেন্ড করলো,
    “আপা আমি কেন তোমায় আমার কাছে আসতে দিই না,এই প্রশ্নের জবাব তুমি নিজেই বোঝার কথা।তুমি কেন কখনো বাবা মা কে তোমার কাছে নিতে না?বাবা-মা না বুঝলেও আমি কিন্তু বুঝেছিলাম।তোমার পরিচয় দিতে লজ্জা লাগতো।আমিও একই কারণে তোমায় আসতে দিই না।না না তোমার যোগ্যতা নেই সেই কারণে না।আমার লজ্জা লাগে তোমার অধিক যোগ্যতার কারণে।তোমার পরিচয় দেয়ার মত যোগ্যতাই তো আমার নেই……”

    মেসেজটা পাঠিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সময় বেশি নেই।টিউশনে যেতে হবে।সে তাড়াতাড়ি তৈরী হতে লাগল। টিউশনি শেষে বাজার এ যাবে আজ।বাবার জন্য পাঞ্জাবি,মায়ের জন্য শাড়ি কিনতে হবে,ঈদের তো বেশি দেরি নেই……

    Close