• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • পাঁচটি কচুরী ফুলের ঈদ || তৌহিদুজ্জামান সিফাত

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●

    Touhidujjaman Sifat eid 2017

    তৌহিদুজ্জামান সিফাত ● রিংকির পায়ের উপর একটা মোটা কালো রাবারের মত জিনিস। গ্রামে আসার আগে রিংকির ভাই রিংকিকে বলেছিলো,গ্রাম‌ের মাঠ‌ে , ঝোপ-ঝাড়ে কালো অজগরের ছোট ছোট বাচ্চা থাকে।

    বড় অজগরগুলো মানুষকে পেঁচিয়ে দম বন্ধ করে মারে আর ছোটগুলো মানুষের রক্ত খেয়ে ঢোল হয়ে পড়ে থাকে।

    র‌িংকির বুঝতে অসুবিধা হলো না যে পায়ের উপরের বস্তুটা ১টা অজগরের বাচ্চা।

    ব্যাটা পিচ্চ‌ি অজগর ক‌েমন রক্ত খ‌েয়ে ফুল‌ে গ‌েছ‌ে । এখন নড়‌েও না চড়‌েও না । র‌িংক‌ি বুঝত‌ে পারছ‌ে না কী করবে,সে কি চ‌িৎকার দ‌িবে । না , তার মত সাহসী ম‌েয়ের মুখ‌ে স‌েটা মানায় না । গ্রাম‌ের বাচ্চাদ‌ের কাছ‌ে মানসম্মান‌েরও একটা ব্যাপার আছ‌ে ।

    র‌িংক‌ি কী করব‌ে না করব‌ে এসব ভাবত‌ে ভাবত‌ে‌ই দেখলো তার আশেপাশে গোটা পাঁচেক বাচ্চা চলে এসেছে। র‌িংক‌ির বাচ্চা ভক্ত‌ের সংখ্যা পাঁচ।

    পাঁচজন‌ের মধ্য থ‌েকে‌ দলন‌েতা মনু এস‌ে‌ই রিংকির পা থেকে অজগরের বাচ্চাটা তুলে নিলো।আরেকজন ছুটে গিয়ে বাড়ি থেকে লবন নিয়ে আসলো। এরপর অজগরটার গায়ে লবন মাখিয়ে দেয়া হলো।কিছুক্ষনের মাঝে মোটা অজগরটার গা থেকে সব রক্ত বের হয়ে সেটা চিমসে গেলো।ব্যাপার দেখে রিংকি অভিভূত। সে এতটাই অবাক যে,অজগরের কামড়ের জায়গাতে যে চুলকাচ্ছে তাই ভুলে গেছে।

    মনু রিংকির মুখের অবস্থা দেখে বলল,”আপুমনি, এইডারে কয় ম্যাজিক।আরেকটা ভয়ানক ম্যাজিক আছে। দ্যাখবেন?

    রিংকির চোখ মুখ কৌতুহলে ভরা।সে আরো ম্যাজিক দেখবে বলে মাথা নাড়ল।মনুর নির্দেশে তৎক্ষনাৎ দুজন ছুটে গেলো কিছু একটা আনতে। ওরা ফিরে এলো কিছু খেঁজুর কাঁটা নিয়ে। এরপর অজগর টাকে রাবারের মত করে টেনে ধরা হলো একটা কলা গাছের সাথে আর অজগরের দুই মাথায় দুটি খেঁজুর কাঁটা লাগিয়ে কলা গাছের সাথে আঁটকে দেয়া হলো। ব্যস,হয়ে গেলো আরেকটা গুরুতর ম্যাজিক। ম্যাজিক দেখে রিংকি তো থ। কী করে ঐটুকু একটা জিনিস এত লম্বা হয়ে গেলো! মনু বীরের হাসি নিয়ে রিংকির দিকে তাকিয়ে রইলো।

    র‌িংকি শুন‌েছিলো গ্রাম ছবির মত সুন্দর হয়। ওদের গ্রামটাও তাই। তবে সে ছবিটা ওদের ক্লাসের টুসির আঁকা ছবির মত। টুসি সারাক্ষন গ্রামের ছবি আঁকে।সেই ছবির সবকিছুর রঙ সবুজ,আর নদীর পানির রঙ নীল। টুসি এতো যত্ন করে আঁকে অথচ ওর ছবি দেখলেই কেন যেন হাড় জিরজিরে গরুর কথা মনে পরে যায়। রিংকিদের গ্রামটারও একই অবস্থা।ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি আর হতদরিদ্র মানুষে ভরা গ্রাম।

    যদিও ওর ভাই সাব্বির বলেছে ওদের গ্রামটাও খুব সুন্দর।রিংকির পর্যবেক্ষন শক্তি খারাপ তাই এমন মনে হয়। কিন্তু রিংকি এটা মানতে পারে না। ওর চোখে তো কোনো সমস্যা নেই। ওদের ক্লাসের সিনথির মত তো ওকে চশমা পড়তে হয় না।তাহলে ওর দেখার শক্তি খারাপ হয় কিভাবে! আর ভাইয়া নিজেই তো সারাদিন নিজের ঘরে বসে থাকে।শহরের বাড়িতে যেমন এখানেও তেমন।

    ভাইয়া কখনো কোথাও ঘুরতেও যায় না।ও বলে,কবিগুরু নাকি দূরের সৌন্দর্য দেখার আগে আশপাশের গুলো দেখতে বলেছেন। আর ওর এখনও ওর রুমের আলমারির পিছনে কী আছে তা দেখা হয়নি।ওটা দেখা হয়ে গেলেই সে দূরদূরান্তের সৌন্দর্য দেখতে ছুটবে।

    সন্ধ্যার দিকে রিংকিদের বাড়িতে গ্রামের কিছু গণ্যমান্য লোক আসতে দেখা গেলো।তাদের কথা শুনে রিংকি বুঝতে পারলো ওনারা এসেছেন চাঁদা চাইতে। আগামীকাল শবে বরাত,তাই মসজিদে মিষ্টির ব্যবস্থা করা হবে,ইতিকাফে বসা লোকটাকে টাকা দিতে হবে।আবার সেহেরীর সময় গ্রামের পথেপথে হেঁটে গ্রামবাসীকে ঘুম থেকে তুলে দেয় এমন একটা দল আছে। তাদের জন্যও কিছু দিতে হবে। সব মিলিয়ে রিংকির বাবা আজিজ সাহেবের জন্য চাঁদা ধরা হয়েছে দুই হাজার টাকা। আজিজ সাহেব বিনা বাক্যব্যয়ে টাকাটা দিয়ে দিলেন।

    কিন্তু ঝামেলা বাঁধল পাশের বাসার মতি মিয়ার সাথে।মতি মিয়ার জন্য চাঁদা ধরা হয়েছে এক হাজার টাকা।একটু কিপ্টে টাইপের মতি মিয়া কিছুতেই একশ টাকার বেশি দিবেন না। কিন্তু অন্যরাও টাকা না নিয়ে যাবেন না। দুইদলে মারামারি লেগে যায় প্রায়।তখন আজিজ সাহেব উপায় না দেখে দুই দলকে থামালেন।শেষ পর্যন্ত মতি মিয়াকে হাজার টাকাই দিতে হলো। বাড়ির বাকিদের কাছে যা চাওয়া হলো সবাই তাই দিলো।প্রয়োজনে ধার করে দিলো। এসব অনেক সওয়াব এর কাজ। কিন্তু জোর করে নিলে কী সওয়াব হবে? রিংকিদের ক্লাসের ম্যাম যখন রাগারাগি জোরাজুরি করে তখন তো কেউই ভালো পড়া দিতে পারেনা।কিন্তু ভালো করে বললে তো সবাই পড়া দেয়।

    রিংকি বুঝতে পারেনা।ওগুলো বড়দের ব্যাপার!
    রাতে রিংকি সাব্বিরকে বাবার ঘরে দেখতে পেলো।আজিজ সাহেব রাগিরাগি মুখে খাটে বসে আছেন,তার মুখোমখি হয়ে সাব্বির বসা। সব শুনে বুঝা গেল,সাব্বির গতমাসের হাত খরচের টাকার হিসেব দিতে পারছে না।প্রতিমাসে আজিজ সাহেব ছেলের হাত খরচের হিসেব নেন। প্রতিবার সবকিছুর ঠিকঠাক হিসেব দিতে পারলেও সাব্বির এবার এক হাজার টাকার হিসেব কোনো ভাবেই দিতে পারছে না।আজিজ সাহেব এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে,ছেলে তার নেশা-টেশা ধরেছে কিংবা কোনো মেয়ের পাল্লায় পড়েছে। কিন্তু যে ছেলে ঘর থেকে বের হয়না সে এতসব কী করে করবে?

    আজিজ সাহেব গলাটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে কঠিন করে সাব্বিরকে প্রশ্ন করলেন,

    -কী ব্যাপার, কথা বলো না কেন?টাকাটা কী করছো?

    গলা থেকে শব্দ বের হয়না এমন স্বরে সাব্বির বলল,

    -ঐতো,খরচ হয়ে গেছে।

    -কীভাবে খরচ হলো সেটা জানতে চাচ্ছি।

    -এমনিতেই হয়ে গেছে,ঐ একটু কাজে আরকি।

    -কাজটা কী?

    -একটা সংঘটনে দিয়েছি। গরীব বাচ্চাদের নতুন জামা-কাপড় দিবে আরকি।

    -এখানে গরীবদের দ‌িচ্ছি না? তারপর আবার ফালতু খরচ করতে গেলে কেন?টাকা বেশি হইছে?তাও তো বাপের টাকা। অনেক হিসেবের টাকা।এই টাকা ফাও খরচের জন্য না।টাকা না লাগলে দিয়ে দিবা। পরের মাস থেকে হাত খরচ এক হাজার কম।এই টাকাটা তো তোমার লাগেই না। আর শুনো,কথায় কথায় আরকি বলা বন্ধ করবা।

    -আচ্ছা।

    কিছু হয়নি এমন মুখ করে সাব্বির ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।

    একটু পরই রিংকি সাব্বিরের ঢুকলো।

    সাব্বিরকে কিছু করতে না দেখে জিজ্ঞেস করলো,

    -ভাইয়া, মন খারাপ করছো?

    -টাকা তো দিয়েই দিছি। এখন আর মন খারাপের কী? বাবা তো আর টাকাটা আনতে পারবে না।

    -তবু

    -শোন,কচু পাতা হতে শেখ। গায়ে পানি আটকাতে দিবি না,ফেলে দিবি,ভিজবি না। ভিজলেই শেষ।চুপসে যাবি।

    -কী বলো এসব?কিছুই তো বুঝি না।

    -তোর বুঝতে হবেনা।চুপ করে বসে থাক।ঈদের দিন কী করবি?

    -বৃষ্টি না থাকলে শুকনা ঘুরবো,বৃষ্টি থাকলে ভিজে ঘুরবো।

    -যদি বাচ্চা অজগর ধরে?

    -মনু আছে তো।ম্যাজিক দেখাবে।

    -অজগর দিয়ে আবার কেমন ম্যাজিক?

    -লবন আর কাঁটা দিয়ে।

    -ভালো তো।

    -আচ্ছা ভাইয়া,বাবা যে ওতোগুলো লুঙ্গি আর শাড়ি আনলো,ওগুলো দিয়ে কী হবে?

    -জাকাত দিবে।

    -জাকাত দিলে কী হয়?

    -এভাবে দিলে কিছু হবে না।কিন্তু বেশি করে অল্প কয়েকজনকে দিলে অনেক কিছু হবে।

    -তা দেয় না কেন?

    -মানুষ কম জানবে বলে।বড়লোকী দেখানো হবেনা বলে। বাবা তো তাও কাজের কিছু দিবে।অনেকে তো পাঁচ-দশ টাকা করে দিবে।

    -এদের ভালো ভাবে বুঝানো যায় না?

    -শুনলে তো? এরা বড় বড় ব্যক্তি। ডাবল-ট্রিপল হাজি।মসজিদ,মাদরাসায় এনারা বড় বড় দান করেন।এদের পাচাটা লোকের অভাব নেই।

    -পাচাটা? ইয়াক!!!

    -হাহাহা

    -বাচ্চাদের কেউ কিছু দিবে না?

    -মনে হয় না।

    -ওরা ঈদে নতুন কিছু পড়বে না?

    -না কিনলে কিভাবে পড়বে?

    -তুমি তো শহরের বাচ্চাদের দিয়েছো।গ্রামের বাচ্চাদের দিতে পারো না?

    -আমার হাতে টাকা থাকেনা।বাবা নিয়ে নেয়।

    -ওহ।

    -মন খারাপ করিস না।দেখি কী করা যায়।
    ঈদের আগেরদিন দেখা গেল মনু তার সাগরেদ দের নিয়ে রিংকিদের বাড়ি ঘোরাঘুরি করছে। আর জাকাতের লুঙ্গি,শাড়ি কেউ একবারের বেশি নিলো কিনা তা দেখছে। এরমধ্যে তারা তিনজনকে ধরেছে যারা দুবার করে লুঙ্গি আনতে যাচ্ছিলো। ফলস্বরূপ তারা ত্রিশ টাকা পুরস্কার পেয়েছে। মনুরা এখন উত্তেজনায় টইটুম্বুর। যত বেশি ধরতে পারবে তত টাকা।

    রিংকি মন খারাপ করে ঘুরছে। মনুদের জন্য নতুন জামার ব্যবস্থা এখনও হয়নি। ভাইয়াও বাড়িতে নেই।কই যেন গেছে।

    সাব্বির ফিরলো বিকেলে।তার হাতে একটা প্যাকেট। রিংকি প্যাকেট খুলে তিনটা শার্ট আর দুইটা মেয়েদের জামা পেল। সে বুঝতে পারলো এগুলো মনুদের জন্য।রিংকি আরো বুঝতে পারলো,জামাগুলো যাকাতের শাড়ি কেটে বানানো। সবগুলো একই রঙ এর।

    রিংকি জামা নিয়ে ছুটলো মনুদের কাছে।নতুন জামা পেয়ে ওরা কী করবে না করবে বুঝতে পারলো না। ওরা তখনি ঈদের জামা পড়ে নিলো। জামা পড়ার পর দেখা গেল ছেলেদের কারো শার্টেই কলার নেই।

    কিন্তু সেদিকে কারো কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।

    আনন্দের আতিশয্যে মনু ঘোষনা দিলো এখন অজগরের ম্যাজিক হবে। মনুর নির্দেশে কেউ গেল কাঁটা আনতে,কেউ গেল লবন আনতে,মনু গেল অজগর ধরতে আর রিংকি গেলো ভাইয়াকে ডাকতে। কিন্তু অনেক ডাকাডাকির পরও সাব্বির তো ম্যাজিক দেখতে এলোই না।এমনকি চাঁদ দেখতেও বের হলো না। কোনো মানে হয়? ভাইয়াই তো রিংকিকে বলেছিলো,আজকে চাঁদ বড় একটা ঘুম দিয়ে একটা বাঁকা রেখার মত হয়ে পশ্চিম আকাশে উঠবে।তারপর অন্ধকার খেয়ে খেয়ে চাঁদের পেট বড় হতে থাকবে সাথে সাথে পশ্চিম থেকে পূর্ব আকাশে চলে যাবে। আর যখন পেট পুরোটা ভরে যাবে তখন টুপ করে ঘুমাতে চলে যাবে।

    যে চাঁদ সম্পর্কে এতকিছু জানে সে নিজেই চাঁদ দেখতে এলো না।যদিও এলেও দেখতে পেত না। মেঘের জন্য কিছু দেখা যায়নি। তবু রিংকির বয়সী বাচ্চাগুলো লাফালাফি করছিলো,চাঁদ না দেখেই চাঁদ দেখছি!চাঁদ দেখছি! বলে চিৎকার করছিলো।

    রিংকিরা সন্ধ্যার পর খবর পেল চাঁদ দেখা গেছে। কাল ঈদ।

    রিংকি ওর মায়ের পুরনো একটা ওড়না কেটে পাঁচ খন্ড করেছে। প্রতি খন্ডের মাঝখান থেকে আবার গোল করে কেটেছে। এগুলো নিয়ে সে বাড়ির পিছনের পুকুরপাড়ে চলে এলো। পুকুরটার একদিকের পাড় ভাঙা থাকায় খালের সাথে একটা সংযোগ তৈরি হয়েছে।সেখান থেকে পাঁচটা কচুরী পানা ভেসে এসেছে।কচুরীপানা গুলোতে বেগুনী রঙের ফুল ফুটেছে। রিংকি ফুলগুলোতে ওড়নার টুকরাগুলো জামার মতো পড়িয়ে দিলো। বেগুনী ফুলে লাল জামা। রিংকির কাছে অদ্ভূত রকমের সুন্দর লাগছে।

    আজকে গ্রামের সবার ঈদ।কচুরী ফুলদেরও। রিংকির গ্রামটা টুসির আঁকা গ্রামগুলোর মত হলেও ততটাও খারাপ না।

    Close