• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • শিক্ষামন্ত্রীর ব্যর্থতার দায় মহাজোট সরকার কেন নেবে | জামিল আহম্মেদ মুকুল

    জামিল আহম্মেদ মুকুল ●

    দেশের শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসে নিরবে এক কলঙ্ক জনক অধ্যয় রচিত হয়ে গেল। দেশের শিক্ষা কাঠামোয় বেতন পাইনা অথচ শিক্ষাদানে নিয়োজিত এমন এক শ্রেণীর শিক্ষক যাদেরকে নন এমপিও নামে চিহ্নিত করা হয় তারা এবারে প্রেসক্লাবের সামনের রাজপথে ঈদের নামাজ আদায় করেছে। এইসব নন এমপিও শিক্ষকরা এমপিওর দাবিতে তেইশ রমজান রাজধানি ঢাকাতে এসেছে। আমার যতদুর মনে পড়ে এদের আর কখনোই রাজপথে আসার কথা নয়। জানুয়ারি মাসেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দাবি পূরণে আশ্বাস দিয়েছিলেন তারপরও কেন এইসব শিক্ষকরা আবার রাজপথে আসলো। এসব জানার কৌতুহল থেকেই আমি প্রথম কয়েকদিন আন্দোলনকারীদের সাথে থেকেছি, অর্জন করেছি বিচিত্র কিছু অভিজ্ঞতা।

    পুলিশের দূর্বব্যহার, রাজপথে পলিথিন বিছিয়ে সামান্য ছোলা-মুড়ি ভাগাভাগি করে খাওয়া, ভেজা বালির উপর পেপার বিছিয়ে ঈদের নামাজ পড়া। আমাদের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী দুইটার্ম শিক্ষামন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন এর আর একটা অর্থ হচ্ছে তিনি কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন অনেক বেশি। সার্বিক বিবেচনায় প্রায় দশ বছরের এই দায়িত্বকালে তাঁর সফলতার চেয়ে ব্যর্থতা ঢের বেশি। মহাজোট সরকারের নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা কাজ করার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে দিয়েছিল। শিক্ষামন্ত্রীর দশ বছরের নয় বছরই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে লাগামহীন ভাবে তিনি হম্বিতম্বি করেও রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

    আন্দোলনকারীদের অনেকের সাথে কথা বলে জেনেছি এদের কেউ কেউ পনের বা বিশ বছর বিনা বেতনে শিক্ষাকতায় নিয়োজিত। এই দীর্ঘ জীবনে তারা শুধু আশ্বাসই পেয়েছে বাস্তবে কিছুই পাইনি।

    আমি বিস্মিত হয়েছি এই ভেবে যে,একটি রাষ্ট কিভাবে তার এক শ্রেণীর নাগরিকের প্রতি এমন বৈষাম্য মূলক আচরণ করতে পারে। একজন মানুষ তার জীবনের সোনালী দিনগুলো রাষ্ট্রের সেবায় উৎসর্গ করল অথচ বিনিময়ে পেল অসম্মান আর লাঞ্জনা। আন্দোলনকারীরা আমাকে তাদের প্রকাশিত একটি ছোট পুস্তিকা( শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভূক্তির স্বারক) দিয়েছে যেখানে তাদের অতীত আন্দোলনের প্রমাণাদি স্থান পেয়েছে। এরা আমাকে জানিয়েছে এবারের রাজপথে আসা সাতাশতম এর আগে ছাব্বিশবার তারা এছেছে। তাদের নিকট প্রশ্ন রেখেছিলাম ‘অতীতের ছাব্বিশ বারে কি শিক্ষামন্ত্রী সাথে আপনাদের বৈঠক হয়নি ?’ তারা বলেছে, ‘প্রতি বারই তিনি ওয়াদা করে তা খেলাফ করেছেন’। কতোটা নীতি নৈতিকতাহীন হলে একটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এমনটি করতে পারেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে শিক্ষক সমাজের নিকট সবচেয়ে অজনপ্রিয় শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ সাহেব।

    ২০১০ সালে এমপিও সংক্রান্ত যে নীতিমাল তিনি দিয়েছিলেন সেই নীতিমালা খোদ তিনি এবং অর্থমন্ত্রী পদদলিত করছিলেন। সেই নিতিমালা উপেক্ষা করে তাদের জেলা সিলেটের সকল নন এমপিও প্রতিষ্ঠান এমপিওভূক্ত করে নিয়েছিল। সমালোচকরা বলেন, সে সময় কোনো গোয়াল ঘরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাইন বোর্ড ঝুলানো থাকলে সেটাও এমপিওভূক্ত হয়েছে। যে মন্ত্রী নিজেই তার প্রণীত নীতিমালা পদদলিত করেন তাঁর মুখে আর যাই হোক নীতিকথা মানায় না।

    সিলেট জেলার মহান দুই মন্ত্রী বাংলাদেশের ইতিহাসে নজির স্থাপন করেছেন। বর্তমান অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের আমলে বাংলাদেশের আর্থিক খাত চরম ঝুকির মধ্যে পড়ে গেছে ৯টি ব্যাংক ( যুগান্তর ১৯/৩/১৮) বেসরকারি ব্যাংক ফার্মাস ব্যাংক দেওলিয়া হয়ে গেছে অর্থমন্ত্রী রাজস্ব খাতের টাকা দিয়ে এই ব্যাংক বাঁচানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

    অথচ দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। তাঁর আমলে এদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে সবচাইতে বেশি। তিনি প্রতিকার করতে পারেননি উপরোন্তু নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় তিনি বলেছিলেন চার হাজার কোটিটাকা কিছুই না । এনেনট্যাক্সের বাবুল জনতা ব্যাঙ্কের পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেছে মাননীয় অর্থমন্ত্রী তার সাথে ডিনার করেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিবছর বরাদ্দকৃত অর্থের অব্যবহৃত অংশ ফেরত যায় কিন্তু ঐ টাকা দিয়ে এমপিও দেওয়া হয় না। সর্বশেষ ১৭-১৮ অর্থ বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ফেরত পাঠানো হয়েছে এমপিও দেওয়া হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলন্ত সিড়ি প্রকল্প বাস্তবায়নে তৎপর হয় নন এমপিও প্রতিষ্ঠান এমপিওকরণে কোনো উদ্যোগ নেয় না। শিক্ষামন্ত্রী বারবার একটা কথা দেশবাসিকে বোঝাতে চেষ্টা করেন ‘আমাদের টাকার সংকট তাই এমপিও দিতে পারছি না’। একজন সিনিয়র মন্ত্রী যখন জাতির সাথে চাতুরতার আশ্রয় নেয় তখন তাকে কী বলা যেতে পারে ? টাকার সংকট থাকলে মন্ত্রণালয়ে চলন্ত সিড়ি প্রকল্প সহ অপ্রয়োজনীয়সব প্রকল্প কিভাবে আসে ? দেশের একজন বিশিষ্ট নাগরিক বলেছেন, ‘আমাদের শিক্ষা বিশ বছর পিছিয়ে গেছে’। আমার মনে হয় তিনি কম করে বলেছেন।

    রাজপথে নন এমপিও শিক্ষকদের ঈদ জামাত আদায়

    এই দুই মন্ত্রী যখন প্রতি মাসে সম্মানীর নামে বেতন তোলেন তখন তাতে একজন নন এমপিও শিক্ষকের ঘাম ঝরানো অর্থও থাকে। একজন নন এমপিও শিক্ষক মাঠে কামলা দিয়ে, ইজি বাইক চালিয়ে দিন শেষে যখন চাল-ডাল-নুন, কেরোসিন-দেয়াশলাই কিনে বাড়ী যান সেখান থেকেও সরকার ভ্যাট-ট্যাক্স নিয়ে থাকে। নন এমপিও বলে তাকে ছাড় দেওয়া হয়না। সতেরো কোটি মানুষের এমন সম্মিলিত টাকা দিয়েই এই দেশটা চলে। আর এদের টাকায় চলেন মন্ত্রী-এমপিরা। তাই আমাদের মনে হয় নন এমপিও শিক্ষকদের দাবি

    অত্যান্ত যৌতিক। শ্রমের বিনিময় দাবি করা যতার্থ। যারা তা দিতে অস্বীকার করে বা গড়িমশি করে তারা সভ্য সমাজে বসবাসের অযোগ্য বলেই আমরা মনে করি। আর একটি তথ্য দিয়ে এই লেখার ইতি টানতে চাই ঃ ২০১৬ সালের ২৯ আগস্ট প্রথম আলো পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ আমাদেরকে জানাচ্ছে, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার শেখ ফজিলাতুনন্নেছে মুজিব মহিলা কলেজ থেকে ২ জন পরীক্ষার্থী H S C পরীক্ষা দিয়েছিল ২ জনই ফেল করেছে। এই প্রতিষ্ঠানটি সরকার জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

    প্রশ্ন হচ্ছে, কোন্ নীতিমালার ভিক্তিতে ? শিক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এতো নীতি কথা বলেন, আপনাদের নিকট কোনো সদুত্তোর আছে কি ?

    সর্বশেষ যে কথাটি জোর দিয়ে বলতে চাই তা হলো মহাজোট সরকার কেন এই দুই মন্ত্রীর বারবার ব্যর্থতার দ্বায় নিতে যাবে ? শত শত সাফল্য দু’একটি বড় ব্যার্থতার নিচে যে চাপা পড়ে যায় সে কথা কি মহাজোট সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনুধাবন করেন না। অনেক আগেই এদেরকে ফেরত পাঠানের প্রয়োজন ছিল তাহলে ব্যার্থতার পাল্লা কিছুটা হলেও কমতো।
    আমরা আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতিশ্রুতী রক্ষা উদ্যোগী হবেন অর্থাৎ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সকল নন এমপিও প্রতিষ্ঠান এমপিও দিয়ে এইসব শিক্ষকদেরকে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেবেন।
    নন এমপিও শিক্ষকরা সেই ভরসাতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দিকে তাকিয়ে আছে।

    লেখক :
    সম্পাদক
    ফাস্ট বিডি নিউজ ২৪ ডট কম
    jamilmukul365@gmail.com

    Close