• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • নন এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান : যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে হবে আর কতোবার ?

    জামিল আহম্মেদ মুকুল ●

    বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু নয় বিশ্বের শিক্ষা আন্দোলনের ইতিহাসে এদেশের এক শ্রেণীর শিক্ষক রেকর্ড সৃষ্টি করলো। সরকারি বেতন কাঠামোর বাইরে থাকা একদল শিক্ষক গত ১০ জুন থেকে ঢাকার রাজপথে অবস্থান করছে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে আমাদের বাংলাদেশটা মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ আর সে সময়টা ছিল পবিত্র রমজান মাস। মুসলিম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী একজন মুসলিম দীর্ঘ একমাস আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সিয়াম সাধন করে থাকে।

    তারপরই পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উদযাপন করে। ঈদ মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। বিষয়টি একারণে উল্লেখ করলাম যে, মুসলমানরা রমজান মাসে কঠোর সংযোম পালন করে থাকে।সেই মাসে এদেশে অতীতে কখনো কোনো দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলন হয়নি যা এবারে শিক্ষকরা করেছেন এবং এই লেখা যখন লিখছি তখনও তাঁরা রাজপথে অবস্থান করছেন। কোন্ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে শিক্ষকরা পবিত্র মাসে রাজপথে আসতে বাধ্য হয় তা কি আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্বনামধন্য মন্ত্রী বাহাদুর অনুধাবন করেন? সারাদিন সিয়াম সাধনা শেষে ঢাকার রাজপথে নিউজ পেপার বিছিয়ে ইফতার করা, ঈদের দিন রাজপথে নামাজ পড়ে ভূখা মিছিল করার মতো পরিস্থিতির দিকে এই সব সম্মানিত শিক্ষকদের কারা ঠেলে দিল ? এক বাক্যে সবাই আমাকে বলেছেন এর জন্য একমাত্র দায়ী যে ব্যক্তি তিনি স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরেই বেতন কাঠামোর বাইরে থাকা শিক্ষকদের সাথে তিনি ছল চাতুরির আশ্রয় নিয়ে আসছিলেন।

    বেতন কাঠামোর বাইরে থাকা শিক্ষক-কর্মচারিদের সংগঠন স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারি ফেডারেশন-এর নেতৃবৃন্দের ভাষ্য মতে এর আগে ২৬ বার তারা আন্দোলনে এসেছেন। প্রতিবারই আশ্বাস মিলেছে সামনের বাজেটে কিছু একটা মিলবে। কিন্তু ফাঁকা বুলি ছাড়া কিছুই মেলেনি। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর নতুন নেতৃত্বর নেতৃত্বে এমপিওর দাবিতে তারা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এসেছিল। সে সময় বেশ কয়েকটি ঘটনার প্রকাশ পাই। ১. মাননীয় অর্থমন্ত্রী এমপিও প্রদান প্রক্রিয়াকে বাজে প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করে তখন বলেছিলেন, ‘আমি নিজেই সাত বছর এএমপিও বন্ধ রেখেছি এখন যখন দিতে হবে দেবো ‘। ২. মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী অতীতে জাতীয় সংসদে এবং বাইরে সব সময় বলে এসেছেন ‘ এমপিও একটি চলমান প্রক্রিয়া, অর্থ প্রাপ্তি সাপেক্ষে এমপিও দেওয়ার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় আছে ‘।

    সর্বশেষ ৫ জানুয়ারি ১৮ আন্দোলনের এক পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নেন। অর্থাৎ আন্দোলনের আর প্রয়োজন ছিল না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিই চুড়ান্ত। কিন্তু আমরা দেখলাম ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে নন এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও খাতে সুনিদৃষ্ট কোনো বরাদ্দ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে চাওয়া হয়নি। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে শিক্ষকরা আবার রাজপথে আসে।

    ২৭তম আন্দোলন শিক্ষকদের দাবি আদায়ের আন্দোলন নয় ‘ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিগত ৫ জানুয়ারি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়নের আন্দোলন, শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন।

    আমি ভেবে অবাক হই মন্ত্রী পরিষদ শাসিত একটি দেশে প্রধানমন্ত্রী সর্বচ্চো ক্ষমতার অধিকারি। সেই দেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন কোনো ওয়াদা করেন তা বাস্তবায়নে ঐ প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারির জন্য ফরজ হয়ে যায়। অথচ বাংলাদেশ নামক দেশে তার ব্যাতিক্রম ঘটছে শিক্ষকদের বেলায়। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আন্দোলন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা, বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে। নিরন্ন,নিরস্ত্র শিক্ষকদের তাই আবার রাজপথে এসে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প পথ ছিল না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিলেন এমপিওর দাবি মেনে নেওয়া হলো আর শিক্ষামন্ত্রী বললেন ‘ আপনারা কিভাবে এমপিও পান তা আমি দেখে নেবো ‘। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী একবারও ভেবে দেখলেন না যে, হুমকিটা কাকে দিলেন বা এই কথার প্রেক্ষিতে কে খাট হলো।

    আমাদের দেশে যখন নির্বাচন আসে তখন এক শ্রেণীর মানুষ ভোটে দাঁড়ায় দেশ ও জনগনের খেদমত করার জন্য। এরা বাড়ী বাড়ী যেয়ে ভোটারদের নিকট নানান প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। জনগনের খেদতম করার ওয়াদা করা এ সব মানুষ গুলোই নির্বাচিত হয় নিজেদের খেদমতে আত্মনিয়োগ করে। ট্যাক্স ফ্রী গাড়ী, রাজধাণিতে আবাসিক প্লট, মোবাইল ফোন কেনার জন্য ৭৫ হাজার টাকা, মাসিক ফোন বিল ১৫ শত টাকা, মাসিক ১৬ হাজার টাকা বাবুর্চি খরচ, গাড়ীর তেল, ড্রাইভার বাবদ বিল সহ হাজার রকমের সুবিধা নিয়ে এরা জনগনের খেদমত করে থাকে। আর কলুর বলদের মতো জনগনকে তার ভার বহন করে যেতে হয়। এসব কাজে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের কোনো ভাটা পড়ে না ভাটা পড়ে সামান্য লাখ খানেক শিক্ষক-কর্মচারির বেতনের সংস্থান করতে।

    এমপি-মন্ত্রী-আমলাদের বিলাসীতার যোগান ১৭ কোটি মানুষের সাথে এই সব আন্দোলনরত নন এমপিও শিক্ষকরাও দিয়ে থাকে। এদের সম্মিলিত ট্যাক্সের টাকায় এই দেশটা চলে। আমাদের মন্ত্রী-এমপিরা প্রায় বলে থাকেন আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছে তারা একবারও বলেন না যে মাথাপিছু ব্যায় কতোটা বেড়েছে। এদেশের শিক্ষা ব্যাবস্থা অনেক দুর এগিয়েছে বলে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী গর্ববোধ করেন কিন্তু শিক্ষাদানে নিয়োজিত শিক্ষকদের জীবন যাত্রার মান কতোটা কমেছে তা মন্ত্রী বাহাদুরকে বলতে শোনা যায় না। মন্ত্রী মহাশয় শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর ঘোষণা দিয়েছেন। যে মন্ত্রী চলমান শিক্ষকদের বেতনের নিশ্চয়তা ঠিক মত দিতে পারছেন না তার স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর ঘোষণা শিক্ষক সমাজের আস্থা কতটুকু অর্জন করতে পারবে জানিনা। তিনি অতীতে এমপিও না দিতে পারার জন্য অর্থের সংস্থান করতে না পারার কথা বলতেন। কিন্তু সম্প্রতি সাবেক শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান বলেছেন ভিন্ন কথা। খান সাহেব বলেছেন, প্রতি বছর এমপিও খাতে বরাদ্দকৃত টাকা ফেরত যায়। অর্থাৎ এমপিও দিতে না পারা অর্থের কারণে নয় মন্ত্রী বাহাদুরের স্বদিচ্ছার কারণে ঘটে থাকে বলে আমরা জানতে পারছি।

    এদেশে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ৯৭ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। অতএব এ খাতকে হীন
    মানসিকতায় বিচার করার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সময় প্রাথমিক স্বীকৃতি, পাঠদানের অনুমোদন, শিক্ষক নিয়োগ সকল প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয় সরকারি কঠোর নজরদারি এবং বিধি মেনেই। তাই নতুন করে এমপিওর জন্য আলাদা নীতিমালা করার প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না।

    তাছাড়া যে সব প্রতিষ্ঠান গুলো দীর্ঘদিন সরকারের বেতন কাঠামোর বাইরে থেকেও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে শিক্ষার্থীদের পাঠদান অব্যাহত রেখেছে নতুন করে তাদের যোগ্যতার প্রশ্ন তোলা বাতুলতা মাত্র। এমপিওর জন্য যে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে আন্দোলনরত শিক্ষকসহ সকল বুদ্ধিজীবিরাই বলেছেন এমপিও না দেওয়ার জন্যই মূলত তা করা হয়েছে। দেশের পঁচিশ লক্ষ শিক্ষার্থীদেরকে যে শিক্ষকরা পড়াচ্ছেন সেই শিক্ষকরা সরকারের বিভিন্ন ট্রেনিং পান, পরীক্ষার ডিউটি, খাতা পান, অন্যায় করলে শাস্তির সম্মুখিন হতে হয় শুধু বেতন পান না। এটা নিতান্তই অমানবিক এবং একই সাথে রাষ্ট্র কর্তৃক বৈষাম্য মূলক আচরণও বটে। আমরা মনে করি আধুনিক বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে অন্যান্য বিষয়ের সাথে একজন শিক্ষককে শ্রেণীকক্ষে ধরে রাখা অপরিহার্য। এর জন্য যা যা করা প্রয়োজন তা রাষ্ট্রকেই করতে হবে। নন এমপিও শিক্ষকরা প্রায় মাসখানেক ধরে রাজপথে অবস্থান করছে এতে করে সরকারের মর্যাদা দেশের অভ্যন্তরে বা বাইরে বাড়ছে না। শুধুমাত্র শিক্ষামন্ত্রীর প্রেষ্টিজ ইস্যু রক্ষা করার জন্য মহাজোট সরকার শিক্ষকদের প্রতি অমানবিক সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আমার মনে হয় না। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি ওয়াদা করেছিলেন, তাঁকেই সেই ওয়াদা রক্ষা করতে হবে। এটা ‘ প্রধানমন্ত্রী ‘ চেয়ারের মর্যাদার প্রশ্ন।

    আশা করি দেরিতে হলেও সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। সম্মানের সাথে রাজপথে পড়ে থাকা শিক্ষকদেরকে শ্রেণী কক্ষে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নেবেন।

    লেখক:
    সম্পাদক
    ফাস্ট বিডি নিউজ ২৪ ডট কম
    jamilmukul365@gmail.com

    Close