• আজ রবিবার, ২২শে জুলাই, ২০১৮ ইং ; ৭ই শ্রাবণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ ; ৮ই জ্বিলকদ, ১৪৩৯ হিজরী
  • প্রথমবার পাহাড়ে || নাবিলা মারজাহান

    ফাস্ট বিডিনিউজ ২৪ ●

    Nabila Marjahan

    নাবিলা মারজাহান সূর্যের লাল আভা তখন একটু একটু করে ছড়াচ্ছিল।অনেকটাই অন্ধকার তখনো বাইরে।ঘুমে ছিলাম।হঠাৎ কেন যেন ঘুম ভেঙ্গে গেলো।আর আমি হলাম সেই অপার্থিব সৌন্দর্যের সাক্ষী… । পাহাড়ি রাস্তায় সেই আমার প্রথম জার্নি। এরপর গন্তব্যে পৌছাতে দেড় ঘণ্টা লেগেছিল কিন্ত আমি আর ঘুমাইনি।শুধু দুচোখ ভরে দেখেছি। আমার এতোটুকুর জীবনের বেশিরভাগই কেটেছে নোয়াখালীর মফস্বলে।সেখানকার জীবনে কোন বৈচিত্র্য নেই। আর তারপর ঢাকায়।সেটা তো আরও যান্ত্রিক একটা শহর।

    সেটা ছিলো আমার ঘুরাঘুরির একদম শুরু। সাহস করে একাই চলে গেলাম রুমমেটের বাড়ি যদিও প্ল্যান হয়েছিলো আরো কজন কে নিয়ে। পরবর্তিতে বহুবার মনে পরেছিলো এই জার্নির কথা। ভাগ্যিস সেবার পিছিয়ে যাইনি!

    সেখানে এতো সবুজ আর আঁকাবাঁকা পথ- তাই আমার জন্য দারুন কিছু। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম – শেষ পর্যন্ত আমি আসতে পেরেছি খাগড়াছড়ি !!! আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করলাম- পুরো পথ জুড়ে একটা নদী আমাদের সঙ্গী ছিল চেঙ্গি নদী!!

    গিয়েছিলাম উপজাতি রুমমেটের বাসায়।খাগড়াছড়ির মেইন শহর খাগড়াপুরে আপুর বাসা।বাসায় ছিলো আংকেল, আন্টী, ছোট মাসী, রুমমেট আপু, ভাইয়া(রুমমেট আপুর হবু বর)।আপুরা ছিলেন ত্রিপুরা উপজাতি। যাই হোক, বাসায় পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে-দেয়ে একটা ঘুম দিলাম।ঘুম থেকে উঠে সবার সাথে কথা বল্লাম।দুপুরের খাবার সবাই একসাথে খেয়েছিলাম। মানুষগুলোর সাথে তখনি আমি অনেক ইজি হয়ে গিয়েছিলাম,ভাল লেগেছিল।
    খাবার খেয়ে রেস্ট নেয়ার টাইম পাইনি, রেডি হতে হয়েছে বেরুবো বলে। যাব আলুটিলার পাহাড়ি গুহায়।আমরা ছিলাম তিন জন। বাসা থেকে বের হয়ে সিএনজি তে করে যাওয়ার সময় শিলাছড়া সেতুতে থেমেছিলাম আপু ছবি তুলবে বলে।উঁচু একটা পাহাড়ের গা কেটে বানানো হয়েছিলো সেতু টি। বাসে করে যাওয়ার সময় দেখেছিলাম।

    hhhho

    উনারা ছবি তুলছিল,আর আমি রাস্তার ওই পাশে পাহাড়ের নিচে কি আছে দেখতে গিয়েছিলাম। মৃদু একটা শব্দ পাচ্ছিলাম,মনে হচ্ছিলো নদীর বহমানতার শব্দ। ঠিক ই ধরেছিলাম। একদম কিনারে গিয়ে দেখি নিচে নদীর চিকন একটা পানির রেখা বয়ে চলেছে। আমি খুব আনন্দিত হয়েছিলাম ঠিক ধরতে পেরেছি বলে। সেখানে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম শেষ পর্যন্ত আসতে পেরেছি তাই। ভাইয়া ডাকছিল আমাকে দেখতে পাচ্ছিলনা বলে। আমি উঠে আসার সময় কয়েকটা পাথর কুরিয়েছিলাম(বাতিক!!)।

    যাই হোক ,তারপর আবার যাত্রা শুরু।আলু টিলা কাছেই ছিল আপুদের বাসা থেকে।একটু পর পৌঁছে গেলাম।কাউনটার থেকে মশাল কিনতে হয়েছে দুইটা।তারপর সামনে এগুচ্ছিলাম উঁচুনিচু পথ বেয়ে।ওখানে এমন একটা জায়গা আছে যেখান থেকে পুরো খাগড়াছড়ি শহরটা দেখা যায়। মনে হচ্ছে তখন ও স্বপ্ন!

    সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে পৌঁছে গেলাম গুহার মুখে।মশাল জ্বালিয়ে তৈরি হলাম ভেতরে যাওয়ার জন্য। একটা সেলফি তো বানতা হ্যাঁয়! ঠাণ্ডা পানি,একেবারে অন্ধকার,আর বাতাশ।মশাল না থাকলে কিছু দেখা যেত না।মাঝামাঝি একটা জায়গায় সোজা হয়ে দাঁড়ানো যায়না।আমার হাতে আলো ছিলনা তাই ঠিকভাবে না দেখে পা দিয়ে একটু বেশি পানিতে পড়ে গিয়েছিলাম। একটা জায়গায় ছাত টা বেশি নিচুতে ছিল বলে উবু হয়ে পার হতে হয়েছে।গুহা টা বেশি বড় না। কিছুক্ষণ পর ই আলো দেখতে পেলাম-তারমানে কাছাকাছি এসে পড়েছি। একটু পর উঠে এলাম সিঁড়ি দিয়ে উপরে।
    শেষ হয়ে গেলো আলু টিলা ভ্রমণ।

    তারপর গেলাম জেলা পরিষদ এর বানানো ইকো পার্কে । সেখানে একটা ঝুলন্ত সেতু আছে কাঠের।সন্ধ্যে হয়ে আসছিল তাই একটু জলদি পুরোটা এক চক্কর মারলাম।খাগড়াছড়িতে এত সবুজ যে মনে হয় রাস্তার ধারে বসে এই সবুজ দেখতে দেখতেই বেলা পার করে দেয়া যাবে।সেখান থেকে পুজার মণ্ডপ আর তারপর বাসায়। তখন দুর্গা পুজার সপ্তমী চলছিল।

    পরদিনের প্লান ‘সাজেক’। বহু আকাঙ্ক্ষিত সাজেক,স্পেশালি যার জন্য আমার যাওয়া।
    পরদিন সকাল………….

    সাড়ে সাতটায় আমাদের গাড়ি ছাড়ার কথা।সকালে তাই একটু আগে উঠতে হয়েছে।তারপর রেডি হয়ে এক জায়গায় জড় হতে হতে প্রায় আটটা বেজেছে। শুরু হল সেই তিন সাড়ে তিন ঘণ্টার জীপ চলা।

    hhhaaaa

    আমরা ছিলাম বিশ জন,পিচ্চি-পাচ্চি সহ।আমি বসেছিলাম ড্রাইভার এর পাশের সিট এ ছোট মাসির সাথে। সাজেক যাওয়ার রাস্তা টা আমার অনেক ভাল লেগেছে। দীঘীনালা, বাঘাইছড়ি, মাসালং আরো অনেকগুলো গ্রাম পেরিয়ে জীপ চলছিলো সাজেকের দিকে। শুধু সবুজ আর সবুজ,মাঝে মাঝে নদীর জলরেখা, কোথাও কোথাও সেটা আবার চওড়া হয়ে গিয়েছে, পাহাড়ের উপরে পাহার,পাশে পাহার,আল্লাহ্‌ দুহাত ভরে সৌন্দর্য দিতে কার্পণ্য করেননি। এত সেই সৌন্দর্য লিখে বা বলে প্রকাশ করা যাবেনা।

    স্মরণীয় সেই ভ্রমণ। জীবনে বেঁচে রয়েছি এগুলো দেখার জন্য- এটাই মনে হয়েছে আমার।আল্লাহর কাছে অনেক কৃতজ্ঞতা আমাকে সেই সুযোগ করেদেয়ার জন্য। মাঝখানের অনেকগুলো চেকপোস্ট পেরিয়ে দুপুর নাগাদ পৌঁছুলাম মুল সাজেকে।

    জীপ গাড়ী থেকে নেমেই আমি আর মাসি পাহাড়ে উঠা শুরু করে দিলাম।সবাই তখন ফটোসেশন নিয়ে বিজি। একটু পর আরও কয়েকজন যোগ দিল আমাদের সাথে। একটু কষ্ট হচ্ছিলো মহাকর্ষের বিপরীতে উঠতে। যাই হোক, উঠতে উঠতে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি পাথরের ফাঁক দিয়ে চূড়ায় উঠে আমি একটা গ্রাম দেখতে পাব।সাজেকের চূড়ার সেই গ্রামের নাম কংলাক পাড়া।সেখানে মানুষ থাকে, বেশ কয়েক টা ঘর আছে।একটা গীর্জা দেখলাম।পাহাড়ের উপর পাথরের মধ্যে ক্রুশ দেয়া কিছু কবর ও দেখলাম। কিছুক্ষণ বসে তারপর আবার উঠলাম একটু ঘুরে দেখব বলে। ভেতরের দিকে গেলাম।কংলাকের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ে উঠে এতো ভাল লাগছিলো। সেদিনের আবহাওয়া টাও এতো ঝকঝকে ছিল,আকাশ খুব সুন্দর ছিল।

    ওই পাহাড় থেকে নেমে আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়েছি।রান্না বাসা থেকে করে নেয়া হয়েছিলো। মুরগি, কলাগাছের তরকারি,আদাফুল রান্না আরো কি কি যেন ছিলো।খাওয়া শেষে নিচের দিকে নামছিলাম আবার।ওখানে দুইতিনটা হ্যালিপ্যাড আছে। আমরা এক্টাতে গিয়ে সবাই কিছু গ্রুপ ছবি তুলেছিলাম। নিচের সাজেকে আরেকটা পাড়া আছে নাম রুইলুই পাড়া।রুনময়, সাজেক রিসোর্ট, মন্দিরের বটতলা এসবো দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম। তারপর আবার শুরু ফেরার পালা।একটু তাড়াতাড়ি রওনা হয়েছি পথে কিছু জায়গায় থামা হবে বলে।

    সেই পথ আবার শুরু। আমি শুধু দেখেছি আর দেখেছি। সুন্দর কিছু দেখলে কেন জানি আমার খেতে ইচ্ছা করে। যাই হোক দেখতে দেখতে আর খেতে খেতে ফিরছিলাম।

    পথে থেমেছি হাজাছড়া ঝর্ণা দেখার জন্য, ঝর্ণায় তখন পানি খুববেশি ছিলোনা, তবু আমি অর্ধেকটা ভিজেছি। তখনো অনেক পথ বাকি বলে আপু ভিজতে মানা করলো। আমিও বাধ্য হয়ে শুনেছি ঘুরতে এসে জ্বর বাঁধানোর ভয়ে। কিন্তু পরবর্তীতে সেই আধভেজার আফসোস নিয়ে প্রায় প্রতিজ্ঞা করেছি আর কখনো কোনো শখ অপূর্ণ রাখবোনা বলে। বাসায় ফেরার পথে কয়েকটা পূজার মন্ডপে জীপ থামানো হয়েছিল সবার জন্য। সন্ধ্যা নাগাদ ফিরলাম বাসায়।গেল পাহাড়ের রাজ্যে আমার আরো একটা দিন।

    এরপরের দিন যাবো হাতির মাথার সিঁড়ী নামের কোনো এক স্পটে। ভাইয়ার মামাবাড়ি যেতে হবে সেজন্য। গাছবান নামক জায়গাটার পিছনে সে পাহাড়। আমরা আট-দশজন যাত্রা শুরু করলাম। একটা আধমরা নদী পার হয়ে শুরু হলো পাহাড়ী পথের চড়াই-উৎরাই পার হওয়া।কিছুটা ভুল পথে যাবার দরুন আমাদের প্রায় তিন চারটা পাহাড় বেয়ে ঘুর পথে যেতে হয়েছে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিলো হাতির মাথার সিড়ীর হলুদ-নীল রঙ। কাছে গিয়ে দেখলাম নিচ থেকে একটা পাহাড়ের চুড়া পর্যন্ত ঢালু করে সিঁড়ি দেয়া হয়েছে আর জায়গাটার নাম হাতির মাথার সিঁড়ি কারণ ওই চুড়া টা ঝপ করে খাড়াভাবে নেমে গেছে হাতির শুঁড়ের মত। ফটোসেশন করতে করতে উঠছিলাম উপরে। আর উপরে গিয়ে দেখি সে এলাকার অনেকটুকু দেখা যাচ্ছে। একটা মন্দিরের সোনালি চুড়ার দৃশ্য আজো চোখে ভাসে।এরপর শুরু ফেরার পালা। ফেরার সময় দুইদলে ভাগ হয়ে গেছি আমরা। একদল স্লো মোশন আরেকদল ইন আ হারি। তো আমি স্লো মোশনের দলে ছিলাম অবশ্যই কারণ আমি দেখতে দেখতে ঘুরতে ঘুরতে যাচ্ছিলাম। আমরা পাঁচজন পিছিয়ে গেছিলাম তাই।

    হঠাত চলতে চলতে নিরব জঙ্গলে একটা কূল কূল ধ্বনি শুনতে পেলাম। ভাইয়ার মামা ছিল উনাকে জিজ্ঞেস করলাম এখানে কি কোনো ঝর্ণা আছে ? উনি একটু সামনে এগিয়ে দেখে ফিরে এসে জানালো হ্যাঁ একটা ছড়া আছে বটে সামনে ! আমার খুশি আর ধরেনা। দৌড়ে গেলাম সেদিকে। গিয়ে দেখি ছড়ার পানি যে গর্তে পড়ছে সেখানে কিছু ফুল ভাসছে। হয়ত পুজার ফুল কেউ ভাসিয়ে গেছে ! আমি ত গুটি গুটি পায়ে জলদি নেমে গেছি পানিতে। কেন যেন আমার মনে হয় যেকোনো জায়গায় ই পানি না থাকলে প্রাণ পাওয়া যায়না। তো জেদ ধরলাম ছড়া টা কোথা থেকে আসলো সেদিকে যাবো। ভাইয়া কিছুক্ষণ দোনামোনা করে রাজি হলেন। আর আমি অনেক কসরত করে সেই পিচ্ছিল ছড়ার গা বেয়ে সাম্নের দিকে আগালাম। অপেক্ষাকৃত উঁচু একটা খাঁজ থেকে পানি পড়ছিল, সেখানে বসে পড়েছি ভেজার জন্য। কি যে ভালো লেগেছিল!! শেষমেশ ভাইয়া আর মাসির তাগাদা শুনে ফেরার পথ নিলাম আর ফেরার সময়ই খেলাম একটা আছাড়। আছাড় খেয়ে আমার সেকি হাসি ! ভাইয়া প্রথমে উদ্বিগ্ন হয়ে পরে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন তুমি কি ইচ্ছে করে আছাড় খেলে !? আমি আবারো হাসি। আসলে হাসছিলাম আছাড় খেয়েছি কিছু বাদ রইলোনা আর এটা ভেবে।

    ভাইয়ার মামাবাড়ির লোকগুলো এত ভালো ছিলো, আমাকে এত জলদি আপন করে নিয়েছে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম ভালোও লেগেছিল। সন্ধ্যার পর ফিরে এলাম আবার খাগড়াপুরে।

    এরপর দিন সকাল বেলা।আমার ফেরার পালা। আগের রাত থেকেই খুব মন খারাপ। একদম ইচ্ছে হচ্ছিলো না যেতে। কিন্তু আমি নিজেই জেদ করে সেদিনের টিকেট কেটেছিলাম, যেতে ত হবেই ! শুরু হলো বিদায় নেবার পালা। শুধু পাহাড়ের জন্য না, মানুষগুলোর জন্যও আমি মায়া ত্যাগ করতে পারছিলাম না। সবাইকে বলে বেড়াচ্ছিলাম আমি কিন্তু আবার আসবো। সবাই আমার পাগলামী প্রশ্রয় দিয়ে বলছিলো আচ্ছা তুমি অবশ্যই আবার আসবে। মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম আবার কখনো যাবো সময় করে।

    কিন্তু হায়! কে জানতো সেবারের খাগড়াছড়ি যাবার ঠিক একবছরের মাথায় ও আমি খাগড়াছড়ি তেই থাকবো!!

    Close