‘রকমারি ডটকম’ । অনলাইন বুকশপের মধ্যে সর্বপ্রথম বৃহৎ আকারে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের কথা বললে যে নামটি প্রথমেই চলে আসে। বর্তমানে অনলাইন বুকশপ অনেকগুলো থাকলেও সবচেয়ে বড় সংগ্রহ রকমারিতেই। নতুন আর পুরনো লেখক বা লেখিকা হোক, নতুন বই প্রকাশ হলে সে বই রকমারিতে থাকবে না সেটা তো হয় না! পাঠক-পাঠিকা যেমন বই কিনতে রকমারির দ্বারস্থ হচ্ছেন, তেমনি প্রকাশক ও লেখকরা রকমারিতে বই প্রদান করে চাহিদা পূরণ করছেন।

রকমারি ডটকম শুরু হয় ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি রাজধানীর আরামবাগের ছোট এক অফিসে স্বল্পসংখ্যক বই নিয়ে। বুয়েট থেকে পাস করা পাঁচ উদ্যোগী মানুষ, যাদের কি-না যেকোনো কোম্পানিতে দক্ষ কর্মী হিসেবে যোগদান করার সুযোগ থাকলেও তারা চেয়েছিলেন নিজেরা উদ্যোক্তা হতে। যদিও তখন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বই বিক্রির প্রচলন ছিল না, কিন্তু তাদের পরিকল্পনা ছিল সুদূরপ্রসারি। তবে এর জন্য ঝড়-ঝাপটা কম পোহাতে হয়নি। ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে থেমে যাননি রকমারির চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান সোহাগ, এমডি আবুল হাসান লিটন, সিইও খায়রুল আনাম রনি, ডিরেক্টর যুবায়ের বিন আমিন ও এহতেশাম রাকিব। তাদের লক্ষ্য ছিল দেশের সবখানে বই পৌঁছে দেওয়া এবং চাকরিজীবী না হয়ে নিজে উদ্যোক্তা হওয়ার। সঙ্গে সঙ্গে দেশের মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান গড়ে তোলার।

প্রথম দিকে সব বই সরবরাহ করা সহজ ছিল না রকমারির জন্য। যেসব বই তাদের সংগ্রহে ছিল না, সেগুলো অন্য স্থান থেকে সংগ্রহ করে গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করতে চেষ্টার কমতি ছিল না তাদের। পাঁচজনের হাত ধরে রকমারির শুরুটা হলেও বর্তমানে রকমারিতে কর্মীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫০ জনের বেশি। গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে রকমারির বই বিক্রির সংখ্যা ছিল ১১ লাখের বেশি, যেখানে ২০১৮ সালে বিক্রি হয়েছিল ১০ লাখের বেশি। কোন ধরনের বইয়ের চাহিদা বেশি সেটা জানতে চাইলে রকমারি থেকে জানানো হয়Ñ মোটিভেশনাল বইয়ের কাটতি সবচেয়ে বেশি। এরপর বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ, উপন্যাস আর অনুবাদ তো আছেই। উপন্যাসের মধ্যে বরাবরের মতো এখনো সবচেয়ে বেশি চাহিদা হুমায়ূন আহমেদ আর জাফর ইকবালের লেখা বিভিন্ন সায়েন্স ফিকশনের। এছাড়া উঠতি লেখকের বইয়ের চাহিদারও কমতি নেই।

নীলক্ষেত, আজিজ সুপার মার্কেট অথবা ফুটপাত থেকে বই কিনতে আমাদের আলাদা করে কোনো খরচের প্রয়োজন না হলেও ই-কমার্স ওয়েবসাইট থেকে বই কিনতে ডেলিভারি চার্জ বহন করতে হয় সেটা আমরা সবাই জানি। তবে ক্ষেত্রবিশেষ কিছু কিছু ই-কমার্স বেশি ডেলিভারি চার্জ নিচ্ছে সে অভিযোগ প্রায় অনেকের। তবে রকমারি এ বিষয়ে বেশ সচেতনতার পরিচয় দিয়েছে। সাধারণত সুন্দরবন বা অন্যান্য ডেলিভারি সার্ভিস যে পরিমাণ চার্জ রাখে তার থেকে রকমারি কখনো বেশি চার্জ রাখে না। উপরন্তু তারা কম রাখে। তাদের খরচ কেমন সেটা জানতে চাইলে রকমারির জনসংযোগ কর্মকর্তা মিশু হালদার জানান, ‘ওয়েবসাইট অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক থেকে বই অর্ডার করলে সেজন্য ক্রেতাকে বহন করতে হবে ৫০ টাকা। তবে এখনো অনেকেই অনলাইনে অর্ডার করতে পারদর্শী নন। আবার অনেকে স্বাচ্ছদ্যবোধ করেন না সেভাবে বই অর্ডার করতে। তাই সর্বস্তরের মানুষের কথা বিবেচনা করে ফোনকলের মাধ্যমে বই অর্ডার করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে ফোনকলের মাধ্যমে বই কিনতে ক্রেতাকে বহন করতে হবে ৭০ টাকা।’ তবে একসঙ্গে একাধিক বই ক্রয় করা হলে সেক্ষেত্রে অন্যান্য বইয়ের জন্য খরচ ক্রেতাকে বহন করতে হবে না বলে জানান তিনি। এছাড়া ৩০০০ হাজার টাকার বই ক্রয় করলে ফ্রি ডেলিভারি সার্ভিস প্রদান করে থাকে রকমারি। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রমোকোড বা অফারে স্পেশাল ডিসকাউন্ট প্রদান করা হয়ে থাকে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে নজর রাখতে হবে রকমারির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক পেজে।

দেশের বাইরেও সরবরাহ করা হচ্ছে বই : দেশে বই বিক্রির পাশাপাশি বাইরের দেশে নিজেদের সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়ায় পিছপা হয়নি রকমারি। তাছাড়া প্রবাসী বাঙালির কাছে দেশের বই পৌঁছে দেওয়া নিজেদের দায়িত্ব মনে করেন তারা। কীভাবে বাইরের দেশ থেকে ক্রেতা বই ক্রয় করবেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে রকমারি থেকে জানানো হয়, অন্যান্য অর্ডারের মতো তাদের ওয়েবসাইটে অথবা ফেইসবুক পেজে যোগাযোগ করে ক্রেতা বই সংগ্রহ করতে পারবেন। পোস্ট অফিস অথবা ডিএইচএলের মাধ্যমে এই বইগুলো ডেলিভারি দেওয়া হয়। এজন্য ক্রেতাকে কোম্পানি প্রদত্ত ডেলিভারি চার্জের বাইরে আলাদা কোনো খরচ অথবা সার্ভিস চার্জ দিতে হয় না।

বইমেলায় রকমারি : এবারের ২০২০-এর বইমেলায় রকমারির আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাইলে রকমারি জানায়, পাঠক-পাঠিকার জন্য নতুন ও পূর্বে প্রকাশ হওয়া বই সরবরাহ করবে তারা। বইমেলা উপলক্ষে এবারের আয়োজন অন্যান্যবারের থেকে কোনো অংশে তাদের কম নয়। তবে তারা আশাবাদী ২০২০ সালের বইমেলাতে ৬ লাখের অধিক বই পাঠক-পাঠিকার কাছে রকমারি পৌঁছে দিতে পারবে।

বইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য সার্ভিস : যদিও রকমারির মূল উদ্দেশ্য বই বিক্রি, তবে বইয়ের পাশাপাশি আরও বেশ কিছু সার্ভিস দিয়ে থাকে। বিভিন্ন স্টেশনারি পণ্য যেমন খাতা, কলম তারা বিক্রি করে। এ ছাড়া বিভিন্ন ডিজিটাল পণ্যও কম মূল্যে সরবরাহ করে। ডিজিটাল মিডিয়ার পণ্য হিসেবে তাদের কাছে কম্পিউটারের মাউস, হেডফোন, অ্যান্টিভাইরাস এবং গ্রাফিক্স কার্ড। সঙ্গে সঙ্গে প্লে-স্টেশন ও কম্পিউটার গেমস, গৃহসজ্জার পণ্য, টিউটোরিয়াল, সফটওয়্যার, ট্রাভেল এক্সেসরিজ, বাইসাইকেল, টিশার্টসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য তারা সরবরাহ করেছে। এ বিষয়ে তাদের আরও কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি না সে বিষয়ে জানতে চাইলে রকমারি জানায়, ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্য সবার কাছে বই পৌঁছে দেওয়া। তাই অন্যান্য ক্ষেত্রে আমরা আলাদা করে জোর দিচ্ছি না। তবে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী এর পরিবর্তন হতে পারে। আমরা চাই সর্বদা ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করতে।’

শিশুদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা : মানুষের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি বাচ্চাদের বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তোলা নিজেদের দায়িত্ব মনে করে রকমারি। আর সেই লক্ষ্য সামনে রেখে তারা বাজারে ‘সায়েন্স কিট’ নিয়ে এসেছে। ‘অন্যরকম বিজ্ঞান’ বাক্স নামে ২০ থেকে ৫০ ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করার মতো সায়েন্স কিট তাদের সংগ্রহে রয়েছে। এছাড়া পেরিস্কোপ আর সোলার সিস্টেম নিয়েও রয়েছে বিভিন্ন পরীক্ষামূলক এক্সপেরিমেন্ট কিট। রকমারি মনে করে, এ ধরনের ইনস্ট্রুমেন্ট বাচ্চাদের তো বটেই বড়দেরও বিভিন্ন আকর্ষণীয় এক্সপেরিমেন্ট করতে সহায়তা করবে, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে উপভোগ্য করে তুলতে আর শিশুদের মনের বিকাশ ঘটাতে সহায়তা করবে।

ইসলামি পণ্য : ধর্মীয় বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ইসলামি পণ্য রকমারিতে পাওয়া যাচ্ছে। তজবি, ইলেকট্রনিক কাউন্টার, জায়নামাজ, রেহাল, মেসওয়াক ও নামাজের টুপি তাদের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া সৌদি থেকে আনা আসওয়াদসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আতর বিক্রি করছে।
ছাড় ও সুযোগ-সুবিধা : ক্রেতাদের কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন উপলক্ষে রকমারিতে সারা বছর হরেক রকম ছাড় আর সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে। ডিসেম্বরের পুরো মাসে বই বিক্রির পাশাপাশি প্রতিটি পাঠক-পাঠিকাকে একটি বাংলাদেশের পতাকা ও চিরকুট তারা গিফট করেছে। হুটহাট চমকে দেওয়া ডিসকাউন্ট ছাড়াও অন্যান্য উপহারের তালিকায় ছিল বুকসেলফ, বুকমার্ক। এছাড়া ২০২০ বইমেলাতে ২৫ শতাংশ ছাড়ে বই বিক্রির পাশাপাশি বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে আসছে বলে জানানো হয় রকমারি থেকে।
ইউটিউবে রকমারি : বিভিন্ন প্রমোকোড আর ছাড় দিয়ে ক্রেতাকে তুষ্ট করার পাশাপাশি লেখকদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ইউটিউব চ্যানেলে সম্প্রচারিত করছে রকমারি। বই সম্পর্কে মানুষের জানার আগ্রহ এভাবে বাড়বে বলেই রকমারির ধারণা। তাছাড়া বিভিন্ন গবেষণামূলক আলোচনা-সমালোচনা থেকে মানুষ নতুন কিছু জানতে পারবে সে বিষয়ে না বললেই নয়। লেখকদের নিয়ে সাক্ষাৎকার ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের নয়টা যুদ্ধের গল্পের নাটক নির্মাণ করেছে রকমারি। যেটা তাদের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে পাওয়া যাবে বলে জানানো হয়।
নতুন লেখকদের নিয়ে উদ্যোগ : আমরা ভালো লেখক বলতে হাতেগোনা কয়েকজনকে চিনি। আর সেসব লেখকের বইয়ের কাটতি নিয়ে না বললেও হয়। তবে তাদের বাইরে কোনো নতুন লেখকের বই বিক্রি হওয়া কতটুকু দুঃসাধ্য সেটা নবীন লেখকরা ভালো বলতে পারবেন। তাই এই নবীন লেখকদের প্রচারের জন্য বিন্দুমাত্র অবহেলা করে না রকমারি। নতুন লেখকদের বই প্রচার ও প্রসারের জন্য সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছে। নতুন লেখকদের বই নিয়ে ইন্টারভিউ, পাঠক রিভিউর মাধ্যমে প্রচার করে যাচ্ছে রকমারি।
সামাজিক উদ্যোগ : রকমারির প্রথম উদ্দেশ্য ছিল সবার কাছে বই পৌঁছে দেওয়া। তবে এ কাজ করতে গিয়ে সামাজিক সেবার কথা ভুলে যায়নি। বিভিন্ন লাইব্রেরি গঠনে সহায়তা করার পাশাপাশি মাদ্রাসা স্কুল কলেজে বই প্রদান করে সমাজসেবায় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
বিভিন্ন ঝড়-ঝাপটার মধ্যে থেকেও উদ্যোক্তারা হাল ছেড়ে দেননি। আর তাদের প্রচেষ্টার ফলেই পাঠক-পাঠিকার বই সংগ্রহের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে রকমারি।